জিয়া আরেফিন আজাদ

।। জিয়া আরেফিন আজাদ ।।

২০১৫ সালে ভারতের তামিলনাডু রাজ্যের রাজধানী চেন্নাইতে বাংলাদেশি শিক্ষকদের জন্য আয়োজিত একটি প্রশিক্ষণ কোর্সে অংশগ্রহণ করেছিলাম। কেন্দ্রীয় সরকার পরিচালিত এই প্রতিষ্ঠানটির নাম ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ টেকনিকাল টিচার্স ট্রেনিং অ্যান্ড রিসার্চ। ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি এ পি জে আবদুল কালাম একসময়ে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ছিলেন।

আমরা যখন সেখানে যাই তখন পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন ড. এস. ধ্যানপাল নামে একজন শিক্ষক। তিনি জাতিতে তামিল, সম্প্রদায়ে খ্রিস্টান এবং রাষ্ট্রপতি আবদুল কালামের নিজ শহর রামেশ্বরম দ্বীপের বাসিন্দা।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্যে তিনি আমাদের আন্তরিক ভাষায় অভ্যর্থনা জানান। বাংলাদেশ ও ভারতের ঐতিহাসিক বন্ধনের কথা তিনি বিনয় ও সম্মানের সাথে উপস্থাপন করেন। সেখানে মুক্তিযুদ্ধ ও অন্যান্য প্রসঙ্গ আসে। এক পর্যায়ে তিনি বলেন ‘ইন্ডিয়া ইজ লাইক এল্ডার সিস্টার অফ বাংলাদেশ’। ড. ধ্যানপাল অত্যন্ত বিনয়ী মানুষ। তার কণ্ঠে প্যাট্রোনাইজিং টোন ছিল না। সেই কোর্সে আমাকে দলনেতার দায়িত্ব পালন করতে হয়েছিল। প্রশিক্ষণার্থীদের পক্ষ থেকে আমাকে বক্তব্য রাখতে অনুরোধ করা হয়। শুভেচ্ছা সম্ভাষণের পর শ্রোতামণ্ডলীর উদ্দেশ্যে আমি ১৯৭১ সালের একটি ঘটনার বর্ণনা করি।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালে আমাদের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন শহীদ তাজউদ্দিন আহমদ। ১৯৭১ এর ২৯ মার্চ তিনি তরুণ আওয়ামী লীগ নেতা ব্যারিস্টার আমীরুল ইসলামকে নিয়ে তিনি কুষ্টিয়া সীমান্তে পৌঁছান। যুদ্ধকৌশল হিসেবে তাঁদের পরনে তখন সাধারণ কৃষকের পোশাক। কিন্তু স্বাধীন রাষ্ট্রের নেতা হিসাবে অন্য রাষ্ট্র্রের করুণাপ্রার্থী হওয়ার মানসিকতা ছিল না এই মহান নেতার। তিনি তার সহযোগী দু’জন মুক্তিযোদ্ধা এসপি মাহবুব উদ্দিন ও এসডিও তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরীকে (দু’জনেই পরবর্তীতে বীর বিক্রম) সীমান্তের ভেতরে এই বার্তা দিয়ে পাঠান ভারতীয় কর্তৃপক্ষ একটি স্বাধীন দেশের প্রধানমন্ত্রীকে আতিথ্য প্রদানে রাজি আছে কি না তা জেনে আসতে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী ব্যতীত অন্য কারো সাথে আলোচনা করতে প্রস্তুত ছিলেন না তাজউদ্দিন আহমদ। নৃশংস সামরিক অভিযানের মুখে কপর্দকশূন্য অবস্থাতেও একজন মর্যাদাবান জাতীয়তাবাদী নেতা হিসাবে নিজ রাষ্ট্রের পক্ষে অবিচল অবস্থানে ছিলেন তিনি। ঘণ্টা দুই পর তাজউদ্দিন আহমদের প্রেরিত প্রতিনিধিদ্বয় ইতিবাচক সংবাদ নিয়ে ফিরে আসেন। জনমানুষের সংগ্রামের ইতিহাসে এই ঘটনাটির একটি বিশেষ গুরত্ব আছে। বস্তুত বঙ্গবন্ধুর অবিচল সংগ্রাম আর তার ঘনিষ্ঠতম নেতাদের এই তেজস্বী মনোভাবের কারণেই আমাদের মুক্তি সংগ্রাম সাফল্যের সোপানে যেতে পেরেছে।

কিন্তু আরেকজন ব্যক্তির কথা উল্লেখ না করলে আমাদের সংগ্রামের ইতিহাস অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তিনি হলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী। বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের গভীরতা ও ব্যাপ্তি সম্পর্কে শ্রীমতি গান্ধীর সম্যক ধারণা ছিল। এই সংগ্রামের নেতৃত্ব সম্পর্কে তার আস্থা ছিল। তার চেয়েও বড় কথা হল একজন দূরদর্শী নেতা হিসেবে তিনি জানতেন, একটি সংগ্রামী জাতির মর্যাদাবোধ কতটুকু। বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে, এর নেতৃত্বকে তিনি যে সম্মান দেখিয়েছেন তা তুলনাহীন। এনআইটিটিটিআরের সেই অনুষ্ঠানে তামিলনাডু ও বাংলার, ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কের ঐতিহাসিক সম্পর্ক নিয়ে আরও কিছু কথা বলেছি। ড. ধ্যানপালের সাথে একমত হয়ে সেই বন্ধনকে আরও মজবুত করার, সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা বলেছি। আমার বক্তব্যের শেষে ড. ধ্যানপাল আরেকবার মাইক্রোফোন নিয়ে বারংবার সরি বলেন।

তিনি বলেন, জনসংখ্যা ও ভৌগোলিক আয়তনের দিক দিয়ে ভারত বড়। স্বাধীনতার পথে যাত্রায়ও সে কিছুটা বেশি পথ হেঁটেছে। তিনি কেবল সেই আঙ্গিকেই কথাটি বলেছেন। তথাপি তার কথায় বাংলাদেশের বন্ধুরা দুঃখ পেয়ে থাকলে তিনি আন্তরিকভাবে দুঃখিত। পরবর্তী দুই মাস সেই আবাসিক প্রশিক্ষণে ড. ধ্যানপাল, তার সহকর্মীগণ ও তামিলনাডুর মানুষের যে শ্রদ্ধা ও ভালবাসা আমরা পেয়েছি তা আমাদের জীবনের অন্যতম সঞ্চয় হয়ে থাকবে। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার এই গল্পটি করার কারণ হল ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ককে রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তি পর্যায়ে আমরা যেভাবে দেখি তারই দু’টি প্রেক্ষিতের তুলনা করা। ইন্দিরা গান্ধী ও তাজউদ্দিন প্রসঙ্গটিই আজকের আলোচনার মূল বিষয়বস্তু।

ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্কের স্বরূপ কী হওয়া উচিত- এই নিয়ে যখন আমাদের মধ্যে নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে তখন চেন্নাইয়ের স্মৃতিটি আমার কাছে প্রাসঙ্গিক মনে হচ্ছে। আমরা সকলেই জানি ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। এই দুই দেশের জনগণ একই উৎস হতে জীবনধারণের পানি সংগ্রহ করে, একই ইতিহাস ও সংস্কৃতির উত্তরাধিকার বহন করে, বৈদেশিক যোগাযোগের জন্য একই সমুদ্রপথ ব্যবহার করে- আরও বহু বিষয় রয়েছে যা রাষ্ট্রীয় সীমানার ছেদরেখা দ্বারা বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব নয়। কিন্তু দু’টি রাষ্ট্রের মধ্যে প্রতিযোগিতারও কিছু বিষয় রয়েছে। এ ছাড়া কখনও কখনও স্বার্থের দ্বন্দ্বও দেখা যায়। প্রতিবেশী দু’টি রাষ্ট্রের মধ্যে এমন কিছু বিষয় থাকা অস্বাভাবিক নয়। আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে যে, প্রতিযোগিতা ও স্বার্থের দ্বন্দ্ব যেন তিক্ততা সৃষ্টি করতে না পারে। কোনো পরিস্থিতিতেই যেন তা আস্থাহীনতার দিকে ধাবিত না হয়। এ কথা বলার কারণ হল, আমাদের দুই দেশের মধ্যেই এমন কিছু মানুষজন আছেন যারা ঐক্যের বিষয়গুলিকে গুরুত্ব না দিয়ে পার্থক্যের বিষয়গুলিকে সামনে নিয়ে আসতে চান। যে বিষয়গুলি আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা যায় সেগুলিকে নিয়ে রাজনীতি করতে চান। এমনকি রাজনীতিবিদদের একটি অংশের মধ্যে ১৯৪৭ এর দেশভাগজনিত সংঘাতের রাজনৈতিক আবহে ফিরে যাওয়ার প্রবণতাও দেখা যায়। এই সকল চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে বন্ধুত্বকে এগিয়ে নেওয়া দুরূহ কাজ বটে। তবে শক্ত রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও যৌথ উদ্যোগ থাকলে এই সকল প্রতিবন্ধকতা তেমন বড় কোনো চ্যালেঞ্জ নয়।

একক উদ্যোগে কখনও বন্ধুত্ব হয় না। বাংলাদেশের জনসাধারণের মধ্যে একটা আক্ষেপ আছে যে আমাদের গুরুতর উদ্বেগের বিষয়গুলোকে ভারতীয় প্রশাসন আমলে নিতে ব্যর্থ হয়েছে। তিস্তার পানিবণ্টন এবং সীমান্ত হত্যা তেমন দু’টি ইস্যু। রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারত বাংলাদেশের পাশে না থাকায় আমরা হতাশ হয়েছি। ভারতের আভ্যন্তরীন বিষয় হলেও এনআরসি নিয়ে আমাদের মধ্যে অস্বস্তি আছে। এমনই একটা প্রেক্ষাপটে চিন-ভারত উত্তেজনায় বাংলাদেশের নাগরিকদের একাংশকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হাততালি দিতে দেখা গেছে। বলা বাহুল্য, এমন মনোভাব বাংলাদেশের জন্য কোনো কল্যাণ বয়ে আনবে না। এটা নিজের নাক কেটে অপরের যাত্রাভঙ্গের মত। প্রতিবেশী ভারতের সাথে আমাদের যতই বিরোধ থাকুক, মনে রাখতে হবে, এই অঞ্চলের একশো আশি কোটি মানুষের ভাগ্য এক সূত্রে গাঁথা। হাজার হাজার বছর ধরে আমরা হিমালয়ের বরফগলা পানির উপর নির্ভরশীল। চিন যদি হিমালয়ের পানির প্রবাহ ভিন্ন দিকে নিতে সক্ষম হয় তা হলে বিবাদ করার মত পানিও থাকবে না। ভাটির দেশ হিসেবে বড় ক্ষতিটা আমাদেরই হবে। একই কথা প্রযোজ্য ভারত মহাসাগরে সামরিক উত্তেজনা টেনে আনার মধ্যে। যাই হোক, বিষয়গুলোর সাথে দীর্ঘমেয়াদী স্বার্থ এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন জড়িত। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের উত্তেজনা দিয়ে রাষ্ট্রীয় নীতি-নির্ধারণী সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না।

তা হলে কী হবে আমাদের নীতি? আমাদেরকে ভারতের উদ্বেগের বিষয়গুলো বুঝতে হবে। যৌথ স্বার্থের জায়গাগুলিতে আরও গভীরভাবে সম্পৃক্ত হতে হবে। ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্কের সুফলগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলি গ্রহণ করছে। তাদের মুনাফালোভী আচরণ দুই দেশের জনগণকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বন্ধুত্বের বন্ধনগুলি দুই দেশের জনগণের মাঝে প্রসারিত করতে হবে। প্রতিষ্ঠানের সাথে প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে। ক্রীড়া, সাহিত্য, শিক্ষা, চিকিৎসা, ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠন এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বিস্তৃত করতে হবে। ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান পর্যায়ের সম্পর্ক রাষ্ট্রীয় সম্পর্ককে প্রভাবিত করে। এনআইটিটিটিআরের আরেকটি ঘটনার উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে।

আমরা যখন প্রশিক্ষণ গ্রহণ করি তখন প্রতিষ্ঠানটির গ্রীষ্মকালীন ছুটি চলছিল। বিশেষ ব্যবস্থায় বাংলাদেশের শিক্ষকদের জন্য এই প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়। এর সিলেবাসটিও তৈরি করা হয় শুধুমাত্র আমাদের প্রয়োজন মাথায় রেখে। চেন্নাইয়ের প্রচণ্ড গরমে ছুটির মধ্যে এই কোর্স বছর বছর চালু রাখার বিষয়ে প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের কিছুটা অনাগ্রহ থাকাই স্বাভাবিক। প্রশিক্ষণটি নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়েরও তেমন কোনো পরিকল্পনা ছিল না। প্রশিক্ষণ শেষে দুই দেশের সরকারি পর্যায়ে কিছু চিঠি বিনিময় হয়। যার ফলশ্রুতিতে প্রশিক্ষণ কর্মসূচিটি প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক সূচিতে সন্নিবেশিত হয়। আনন্দের বিষয় হল, আমরা যারা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছি তাদের সাথে এনআইটিটিটিআরের ফ্যাকাল্টি সদস্যদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

এত সাধারণ পর্যায়ে বন্ধুত্ব যদি রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে ভূমিকা রাখতে পারে, শীর্ষ পর্যায়ের বন্ধুত্ব তা হলে কত বড় কাজ করতে পারে? সেই বিষয়টির উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন ভারতের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী। ব্যারিস্টার আমীরুলের লেখা থেকে তাজউদ্দিন আহমদের সাথে শ্রীমতি গান্ধীর প্রথম বৈঠকের কিছু কথা ‍উল্লেখ করা যায়-

‘একটা কথা তাজউদ্দিন সাহেব খুব স্পষ্ট করে বললেন, ‘এটা আমাদের যুদ্ধ। আমরা চাই ভারত এতে জড়াবে না। আমরা চাই না ভারত তার সৈন্য দিয়ে, অস্ত্র দিয়ে আমাদেরকে স্বাধীন করে দিক। এই স্বাধীনতার লড়াই আমাদের নিজেদের এবং আমরা এটা নিজেরাই করতে চাই।’

(তাজউদ্দিন আহমদ আলোকের অনন্তধারা; পৃ: ৬৯)

তাজউদ্দিন আহমদের কথার সাথে শ্রীমতি গান্ধী একাত্মতা প্রকাশ করেন। তারই প্রতিফলন আমরা দেখেছি মুক্তিযুদ্ধে ভারতীয় বাহিনীর অংশগ্রহণের প্রক্রিয়ার মধ্যে। আমীরুল ইসলাম আরও বলেছেন-

‘যখন ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে ইয়াহিয়া খান ভারতের উপর যুদ্ধ চাপিয়ে দিল এবং ভারতের সরাসরি যুদ্ধে জড়িত হওয়া ছাড়া উপায় নেই, সেই সময়ে তাজউদ্দিন সাহেব শ্রীমতি গান্ধীকে বললেন যে, বাংলাদেশে ভারতীয় সৈন্য ঢুকবার আগে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে হবে এবং কীভাবে সৈন্য ঢুকবে তার একটা ভিত্তি তৈরি করতে হবে। সেই ভিত্তি ছাড়া বাংলাদেশে ঢোকা যাবে না।’

(প্রাগুক্ত; পৃ: ৮৭)

শ্রীমতি গান্ধী বাংলাদেশের নেতার সকল দাবির সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেন। কীভাবে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল, কীভাবে ভারতের আভ্যন্তরীন রাজনীতিকে বাংলাদেশের অনুকূলে আনা হয়েছিল, কীভাবে কূটনৈতিক ফ্রন্টে বাংলাদেশের জন্য একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা হয়েছিল তার ইতিহাস আমরা জানি। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, সোভিয়েত ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্র্যান্সের পার্লামেন্ট সদস্যগণ- সকলেরই ভূমিকা আছে। কিন্তু সকল প্রচেষ্টাকে সমন্বিত করে সেটিকে আবার বাংলাদেশের জনপ্রতিনিধিদের নিয়ন্ত্রণে তুলে দেওয়ার বিরল কৃতিত্ব একজন একক ব্যক্তিকে দিতে হয়। তিনি শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্রবাহিনী যখন ফ্র্যান্সে প্রবেশ করে তখনও এ ধরণের চুক্তি স্বাক্ষর হয়নি। অস্ত্র, প্রশিক্ষণ ও আশ্রয়ের বিষয়ে ভারতের উপর নির্ভরশীল হওয়া সত্ত্বেও যৌথ কমান্ডের সর্বাধিনায়ক হিসেবে কর্নেল পদমর্যাদার এম. এ. জি ওসমানীকে ইস্টার্ন কমান্ডের প্রধান জগজিৎ সিং অরোরার সম মর্যাদায় নিয়ে এসে সমঝোতা স্বাক্ষর হয়েছিল। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবের সামনে দাঁড়িয়ে ভারতীয় দূত সমর সেন দৃঢ় প্রত্যয়ে ঘোষণা করছেন-

‘কেউ প্রস্তাব পেশ করে বা অনুরোধ করে আমাদের পথ থেকে দূরে সরাতে পারবে না। যে যুদ্ধবিরতির কথা আমি ইতিমধ্যে বলেছি, তা ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে নয়। সেটা পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে। ফলে এ ব্যাপারে বেশি অগ্রসর হওয়ার আগে আমাদের তাদের কথা শুনতে হবে।’

(জে এন দীক্ষিতের লিবারেশন অ্যান্ড বিয়ন্ড: ইন্ডো-বাংলাদেশ রিলেশন্স বই থেকে প্রতীক বর্ধনের অনুবাদ)

এই সকল কর্মযজ্ঞের নেতৃত্বে ছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ তাঁকে বিশ্বনেতার মর্যাদা প্রদান করে। আর দক্ষিণ এশিয়ার দু’টি দেশের ৬৪৩ মিলিয়ন দরিদ্র জনগণকে অনন্য উচ্চতায় স্থাপন করে। আমাদের ঔপনিবেশিক প্রভুরা চেয়েছে আমাদেরকে বিবদমান হিসেবে দেখতে। পাকিস্তানি সামরিক-বেসামরিক আমলানেতৃত্ব সেই পশ্চাৎযাত্রায় যুগের পর যুগ এই অঞ্চলের জনগণকে আটকে রেখেছে। শ্রীমতি গান্ধী বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের মধ্যে দিয়ে সেই পশ্চাৎমুখিতার চির অবসানের সম্ভাবনা দেখতে পেয়েছেন। এখানেই তিনি অনন্য। আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে তিনি মানবতার যুদ্ধ হিসেবে বিবেচনা করেছেন। নিজ দেশের দারিদ্র সত্ত্বেও এক কোটি দশ লক্ষ শরনার্থীকে আশ্রয় দিয়েছেন। তার দেশের ১৫০০ সৈন্য আমাদের মুক্তিযুদ্ধে শহিদ হয়েছে। অভ্যন্তরীন ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির কোনো বাধাই তাকে নিবৃত্ত করতে পারেনি। এ কারণেই তিনি শুধু ভারতের নেতা নন। তিনি আমাদেরও নেতা। তিনি বিশ্বনেতা।

৩১ অক্টোবর শ্রীমতি গান্ধীর মৃত্যুবার্ষিকী। ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণতন্ত্রের প্রতি আপসহীন অঙ্গীকারের কারণে তিনি জীবন দিয়েছেন। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের সতর্কতা সত্ত্বেও তিনি শিখ দেহরক্ষীদের পরিবর্তন করেননি। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ইতিহাসে তিনি একটি নজির সৃষ্টি করেছেন। বাংলাদেশের জনগণ ও সরকার গভীর কৃতজ্ঞতায় এই নেতাকে স্মরণ করে। ইন্দিরা গান্ধীর জন্মশতবর্ষ পালনের সময় আমাদের দাবি ছিল রাজধানীর একটা গুরুত্বপূর্ণ সড়কের নাম তার নামে করার জন্য। এ ছাড়া ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ‘ইন্দিরা মঞ্চ’টি পুনর্নিমাণের দাবিও আছে। আমার দাবি থাকবে, শ্রীমতি গান্ধীর মৃত্যুবার্ষিকীর দিনটিকে সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস হিসেবে পালন করা হোক। বাংলাদেশের উচিত হবে এই দিনে বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করা। ইন্দিরা গান্ধীকে সম্মান প্রদর্শন করার মাধ্যমে তাঁকে কিংবা ভারত রাষ্ট্রকে সম্মানিত করার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ যে কাজটি করা হবে তা হল, গণতন্ত্র ও আঞ্চলিক সৌহার্দ্যের বাণীকে উর্ধ্বে তুলে ধরা। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষিকী উদযাপনের মধ্যে এই কর্মসূচিগুলি সন্নিবেশ করা প্রয়োজন।

পরিশেষে স্বাধীন দেশের নেতা হিসাবে বঙ্গবন্ধুর প্রথম দু’টি ভারত সফরে দিল্লি ও কলকাতার বক্তৃতা থেকে দু’একটি লাইন উদ্ধৃত করব। ১০ জানুয়ারী ১৯৭২ দিল্লির প্যারেড গ্রাউন্ডের সভায় লাখো জনতার সামনে বঙ্গবন্ধু বলেন-

আমার ভাই ও বোনেরা, বাংলাদেশ ও ভারত পাশাপাশি বাস করবে শান্তিপূর্ণভাবে। আপনাদের প্রধানমন্ত্রী, আপনাদের সরকার, আপনাদের সৈন্যবাহিনী, আপনাদের জনসাধারণ যে সাহায্য ও সহানুভূতি আমার দুঃখি মানুষকে দেখিয়েছে চিরদিন বাংলার মানুষ তা ভুলতে পারবে না। ব্যক্তিগতভাবে আপনারা জানেন, আমি পশ্চিম পাকিস্তানের অন্ধকার সেলের মধ্যে বন্দি ছিলাম দু’দিন আগেও। শ্রীমতি গান্ধি আমার জন্য দুনিয়ার এমন জায়গা নাই যেখানে তিনি চেষ্টা করেন নাই আমাকে রক্ষা করার জন্য। আমি ব্যক্তিগতভাবে তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ। আমার সাড়ে সাত কোটি মানুষ ব্যক্তিগতভাবে তার কাছে এবং তার সরকারের কাছে কৃতজ্ঞ। আমার জনসাধারণ ভারতবর্ষের জনসাধারণের কাছে কৃতজ্ঞ। আর যেভাবে এক কোটি লোকের খাওয়ার বন্দোবস্ত ও থাকার বন্দোবস্ত আপনারা করেছেন, আমি জানি, ভারতবর্ষের মানুষও দুঃখি আছে সেখানে। তারাও কষ্ট পাচ্ছে, তাদেরও অভাব-অভিযোগ রয়েছে। তা থাকতেও তারা সর্বস্ব দিয়েছে, আমার লোকরে সাহায্য করার জন্য- চিরদিন আমরা তা ভুলতে পারব না। … আমি বিশ্বাস করি সেকুলারিজমে। আমি বিশ্বাস করি গণতন্ত্রে, আমি বিশ্বাস করি সোশালিজমে। আমাকে প্রশ্ন করা হয়, “শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধির সাথে আপনার আদর্শের এত মিল কেন?” আমি বলি, “এটা আদর্শের মিল, এটা নীতির মিল, এটা মনুষত্বের মিল, এটা বিশ্বশান্তির মিল।”

(এপি ভিডিও ক্লিপস)

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে ইন্দিরা গান্ধী ও বঙ্গবন্ধুর তৈরি রোডম্যাপই আমাদের বেঞ্চমার্ক। এর অন্যথা করার অর্থ হল নেতার আদর্শ থেকে বিচ্যুতি। বঙ্গবন্ধু ও ইন্দিরা গান্ধীর অনুসৃত নীতিতে জনসাধারণের মহত্তর আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটেছে। জনমানুষের কল্যাণ চাইলে আমরা কখনও সেই পথ থেকে বিচ্যুত হতে পারি না।

জিয়া আরেফিন আজাদ হবিগঞ্জ বৃন্দাবন সরকারি কলেজের ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান। ই মেইল: arefinprofile@gmail.com

Berger Weather Coat