সর্ববৃহৎ বিবর্তনের চালিকাশক্তি শনাক্ত

পৃথিবীর বিবর্তনের যে ইতিহাস আমাদের জানা, সে অনুসারে, শেষবার সবচেয়ে বড় বিবর্তনটি ঘটেছিলো ২৫২ মিলিয়ন বছর আগে। কিন্তু এর পেছনের সুনির্দিষ্ট কারণ নিয়ে বিজ্ঞানীরা একমত হতে পারেননি। যদিও তাগিদটা কম নয়। কারণ, এরই মধ্যে আমাদের বর্তমান পৃথিবীর ভূপৃষ্ঠের তিন চতুর্থাংশ ও সমুদ্রের ৯৫ শতাংশ প্রাণবৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে। এ অবস্থায় আশার আলো নিয়ে এসেছে একটি নতুন গবেষণা, যা পৃথিবীর সর্ববৃহৎ বিবর্তনের চালিকাশক্তি শনাক্তে সক্ষম হয়েছে। হেমহোৎস অ্যাসোসিয়েশন অব জার্মান রিসার্চ সেন্টারের তথ্য অবলম্বনে জানাচ্ছেন শোয়াইব মোহাম্মদ।    

পৃথিবীতে জীবনের একটি দীর্ঘ এবং ঝঞ্ঝামুখর  ইতিহাস আছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রাণ-প্রজাতিগুলোকে বিলুপ্তির মধ্য দিয়ে যেতে হয়।

সবশেষ বিবর্তনের সবচেয়ে বড় ঘটনাটি ঘটেছিল আজ থেকে ২৫২ মিলিয়ন বছর আগে। কাজেই বলা যায় এই বিবর্তন যুগান্তকারী সময়কে স্পর্শ করেছে। তাই কয়েকশ বছরের মাঝে ভূপৃষ্ঠের তিন চতুর্থাংশ এবং সমুদ্রের শতকরা ৯৫ ভাগ প্রাণবৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে।

আজকের দিনে আমরা যাকে সাইবেরিয়া বলে জানি, সে অঞ্চলে বৃহদাকার আগ্নেয়গিরি এবং সমুদ্র হতে মিথেন গ্যস পার্মিয়ান-ট্রাইয়াসিক বিলুপ্তির পেছনে বহুলাংশে দায়ী। ব্যাপকভাবে বিলুপ্তির পেছনে যে সকল কারণ দায়ী, সেগুলো নিয়ে যদিও বিতর্ক আছে বিস্তর।

সম্প্রতি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তায় বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীরা বিষয়টি নিয়ে কাজ শুরু করেন। এসব দেশের মধ্যে রয়েছে জার্মানি, ইতালি, কানাডা। এই গবেষণার কাজ হয়েছে জার্মানির কিয়েল এ অবস্থিত একটি সমুদ্রবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান হেমহোৎস, যার নেতৃত্বে আছেন অধ্যাপক এন্টন আইজেনদাওয়ার। গবেষণাপত্রটি ‘ন্যাচারাল জিও সায়েন্স’ নামক আন্তর্জাতিক জার্নালে সম্প্রতি প্রকাশ পায়।

তাদের গবেষণার জন্য বেসলাইন দল প্রায় অবহেলিত একটি আর্কাইভ ব্যবহার করে। এখানে প্রাপ্ত ফসিলগুলো ৫০০ মিলিয়ন বছর আগের।

গবেষকদের একজন ড. হানা জুরিকোভা বলেন, গবেষণার জন্য আমরা দক্ষিণ আল্পস থেকে প্রাপ্ত ফসিল সংগ্রহ করেছিলাম । ২৫২ মিলিয়ন বছর আগে শেলগুলো সমুদ্রের গভীর হতে উৎপন্ন।

তিনি এই গবেষণার প্রথম পরীক্ষক ছিলেন। এই গবেষণাপত্রটি তাঁর পিএইচডি প্রজেক্টের জন্য তিনি ব্যবহার করেছিলেন। ফসিল শেলে আইসোটোপের ব্যবহার করে দলটি পিএইচ এর  ব্যবহারে  কার্যকরী ভূমিকা রেখেছিল। এই ঘটনাটি ঘটেছিল ২৫২ মিলিয়ন বছর পূর্বে। বায়ুমণ্ডলে পিএইচ কার্বন ডাই অক্সাইডের লঘুকরণে ব্যবহৃত হয়। বিশ্লেষণের জন্য দলটি উচ্চগতির আইসোটপ ব্যবহার করে থাকে, এছাড়া তারা উচ্চগতির আণুবীক্ষণিক যন্ত্রেরও ব্যবহার করে থাকে।

এই গবেষণার সহ লেখক ড. মার্কাস গুটজার বলেন, এই কৌশলের সাহায্যে আমরা কার্বন ডাই অক্সাইডের পুনর্গঠন, ভলকানিক কার্যক্রমের গতিবিধি শনাক্ত করতে পারি। মিথেন হাইড্রেড অদ্রবণীয়তা প্রাপ্ত তথ্যের উপর নির্ভর করে থাকে।

পরবর্তী ধাপের অংশ হিসেবে দলটি তাদের উপাত্তসমূহ বোরন এবং অতিরিক্ত কার্বন আইসোটোপ থেকে সংগ্রহ করে। পরবর্তীতে এগুলো কম্পিউটার ভিত্তিক ভূ-রাসায়নিক মডেলকে ত্বরান্বিত করে। ফলাফল এই তথ্য প্রকাশ করে যে, উষ্ণায়ন এবং সমুদ্রে এসিডের প্রভাবে ভলকানিক কার্বন ডাই অক্সাইড এর নির্গমন ঘটে এবং এর ফলে সামুদ্রিক অনেক দ্রবাদি বিলুপ্তির মুখে পড়তে পারে। কার্বন ডাই অক্সাইডের নির্গমনের ফলে আরো কিছু ঘটতে পারে যেমন-গ্রীনহাউজের প্রভাবে প্রকৃতিতে উষ্ণায়ন এবং রাসায়নিক দ্রবাদির পরিমাণ বৃদ্ধি।

হাজার বছর ধরে নদী ও উপকূলীয় ভূমির মাধ্যমে ক্রমবর্ধনমান দ্রবাদি মহাসাগরে গিয়ে পতিত হয়। এর ফলে সেখানে উর্বরতার পরিমাণ বেড়ে যায়। এর ফলশ্রুতিতে অনেক বেশি অক্সিজেনের ঘাটতি আসে এবং দ্রবাদির চক্রে পরিবর্তন সূচিত হয়। ড. জুরিকোভা বলেন, এর ফলে পার্মিয়ান ও ট্রাইআসিক সীমানায় বিস্তর পরিবর্তন হতে পারে।

গবেষণাটি ইউরোপিয় ইউনিয়নের বরাদ্দকৃত অর্থে পরিচালিত হয়। যেখানে একটি পরিবেশগত আর্কাইভ এর কথা বলা হয়। বেসলাইন প্রজেক্টের সমন্বয়ক এবং যুগ্ম লেখক ড. অ্যান্টন এইসেনজার জোর দিয়ে বলেন, এই নতুন পদ্ধতি অনুসরণ করা না হলে ২৫০ মিলিয়ন বছরের পূর্বের পরিবেশগত গবেষণার কৌশল আবিষ্কার করা সম্ভব হত না। উপরন্তু নতুন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিটি গবেষণার ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।