বামপন্থাই বিকল্প, মনে করেন সৌমিত্র

।। কনটেন্ট এডিটর, সোশাল মিডিয়া ডেস্ক ।।

“ভাবলে অবাক লাগে, যাঁর আমলে ২০০২ সালে গুজরাতে ভয়ঙ্কর দাঙ্গা হল, সেই তিনিই আজ ভারতবর্ষের মসনদে! ভারতবর্ষের মানুষ এঁদের সহ্য করছেন, তাঁদেরই ভোট দিয়ে আবার জেতাচ্ছেন!” এভাবেই নিজের বিস্ময়কাতর ব্যথাতুর ভাবনাকে মেলে ধরলেন কিংবদন্তি অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়।

ধর্মের নামে গোঁড়ামি এবং বিভাজনের রাজনীতির খেলায় তিনি ব্যথিত হলেও সত্যজিতের ‘বড়’ অপু বিশ্বাস করেন, এই অবস্থার পরিবর্তন সম্ভব। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে জীবন-মৃত্যুর লড়াইয়ে নামার আগে সৌমিত্র খোলাখুলি তাই পরিবর্তনের লড়াইয়ের ডাক দিয়ে গেছেন তারই এক লেখায়। আর সেই লেখাটি কলকাতার গণশক্তি পত্রিকা ছেপেছে তাদের শারদ সংখ্যায়।

‘গণশত্রু’র ‘ডাক্তারবাবু’ হয়ে তিনি একদিন পর্দায় বারেবার জানিয়েছিলেন, চরণামৃতের নামে যে দূষিত খাচ্ছেন মানুষ, তাতে রোগ বাড়বে। এবারও তিনি গলা চড়িয়ে জানিয়েছেন ভারতবর্ষের আরেক রোগের কথা। তিনি লিখেছেন, “ধর্মের প্রভাব সব দেশের সব অংশের মানুষের মধ্যেই কম-বেশি আছে…আবার ভারতেও হাতে গোনা কয়েক জনকেই ধর্মনিরপেক্ষতা বোঝানো যায়। অধিকাংশই বুঝতে চান না। রামকে নিয়ে এই জায়গাতেই রাজনীতি চলছে। রাম যেহেতু প্রত্যেকের কাছেই এক অনুভবের ও ভালোবাসার জায়গায় আছেন, তাই হিন্দুত্ববাদীরা রামকেই ধরেছে নিজেদের সাম্প্রদায়িক অ্যাজেন্ডা পূরণের জন্য। ওঁরা জানেন, রামকে রাজনৈতিক কাজে ব্যবহার করা হলেও কেউ বাধা দেবেন না…অত্যন্ত ধুরন্ধর মতলববাজ রাজনীতিকরা এ সব করে চলেছেন…গোঁড়ামি তৈরি করতেই চালাকি করে ধর্ম আর রাজনীতি মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে।”

তাহলে উপায়? সত্যজিতের ‘ফেলুদা’ সমস্যার শেকড়টায়ও হাত দিয়েছেন। সমাধান খুঁজতে গিয়ে লিখেছেন, “কে রামকে ভালোবাসল, কে রহিমকে—তা কোনও ব্যাপারই হতে পারে না। তাই বার বার মনে হয়, এসবের বিকল্প হতে পারে একমাত্র বামপন্থাই।”

বারবার প্রকৃতির সরলতার সঙ্গে হারিয়ে যেতে ফিরে ফিরে অরণ্যে ছুটে আসা ‘অসীম’ নিজেদের প্রজন্মের স্মৃতিচারণও করেছেন কিছুটা। লিখেছেন, “ছেলেবেলায় সাম্প্রদায়িকতা শব্দটা শুনিনি এমন নয়। তবে আর পাঁচটা শব্দের মতোই আমাদের কাছে সাধারণ এক শব্দ ছিল মাত্র। কোনও বিশেষত্ব ছিল না। ফলে মাথায় গেঁথে যায়নি। বা গেঁথে যাওয়ার মতো পরিবেশও তৈরি করা হয়নি তখন। ছেচল্লিশের দাঙ্গায় নদীয়া জেলার কোথাওই কোনও প্রভাব পড়েনি। কৃষ্ণনগরেও না।”

কিন্তু তারপর? এখন? লিখেছেন, “এখন সত্যিই খুব হতাশ লাগে। আমার চেনা দেশ এখন কোন অন্ধকারের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, আদৌ সেই অন্ধকার কাটিয়ে উঠতে পারবে কি না জানি না..একটা বড় কারণ আমার মনে হয়, মানুষ শক্তিশালী কোনও বিকল্প পাচ্ছেন না বা বুঝে উঠতেই পারছেন না।”

‘মাস্টারমশাই’ বারবার ‘আপনি কিন্তু কিছু দেখেননি’ শুনে নীরব থেকেছেন। কিন্তু এখনও কি ‘মাস্টারমশাই’ নীরব থাকবেন? নাকি বলবেন, “‘ফাইট, কোনি, ফাইট?” সৌমিত্র লিখেছেন, “মহামারীতে এত মানুষ আক্রান্ত, এত মানুষের মৃত্যু হচ্ছে, এককথায় দুঃসহনীয়। তার মধ্যেও রামের নামে চলছে রাজনীতি…১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর যেভাবে বাবরি মসজিদ ভাঙা হয়েছে, তা অত্যন্ত সংগঠিতভাবে। তাদের বিরুদ্ধে দেশে কী হয়েছে? যে রাজনৈতিক দলগুলি এতে বাধা দিতে পারত, তারা কোথায় ছিল?”

‘ডা. অশোক গুপ্ত’ যেন আবারও সতর্ক সংকেত দিচ্ছেন। ‘গণশত্রু’র শারদ সংখ্যায় তাই লিখে দিয়েছেন, “আমার বিশ্বাস, বিকল্প কেউ হতে পারলে তা বামপন্থীরাই হতে পারেন। কিন্তু সেই দৃঢ়তা কোথায়? মানুষের মনে ভরসা তৈরি করতে পারছেন কোথায়?”

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের এই লেখাটি এরই মধ্যে সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

Berger Weather Coat