এ কথাটা এখন আর স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, আমার স্কুল জীবনে, ১৬ বছর বয়স পর্যন্ত আমি জীবনানন্দ দাশের নামই শুনিনি। গ্রামের ছেলে, গ্রামের স্কুলে যা পাঠ্য ছিল তাই পড়তাম। রবীন্দ্রনাথের সমকালে কবি যাঁরা ছিলেন, অক্ষয়কুমার বড়াল, কুমুদরঞ্জন মল্লিক, দেবেন্দ্রনাথ সেন, করুণানিধান বন্দ্যোপাধ্যায়, কালিদাস রায় এঁদের কবিতা পড়তাম। রবীন্দ্রনাথ-নজরুল তো অবশ্যই পড়েছি। রবীন্দ্রনাথ-নজরুল ছাড়া আর কারো কবিতা তেমন দাগ কাটেনি মনে। রবীন্দ্রনাথ প্রথম থেকেই আমার চিরকালের পাঠ্য হয়ে গেল। আমার জীবন রবীন্দ্র-নেশাযুক্ত জীবন।

যখন গ্রামের ছোট্ট পরিসর থেকে বেরিয়ে এলাম, খুলনার দৌলতপুর কলেজে ভর্তি হলাম, সেই সময়টাতে একটা রচনার বইতে প্রথম চোখে পড়ল, ‘চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা/ মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য।’ কে লিখেছেন এই কবিতা! রবীন্দ্রনাথের গানে আছে, ‘আমার প্রাণের পরে চলে গেল সে।’ মনে হল আমার প্রাণের উপর দিয়ে একটা সুবাতাস বয়ে গেল। বলা যেতে পারে, এই প্রথম জীবনানন্দ দাশ পড়া। সেই রচনা বইতে এই কয়েকটি পঙ্তি ছাড়া কিছু ছিল না। পুরো ‘বনলতা সেন’ কবিতাটা ছিল না। কিন্তু আমার কাছে এতো অভিনব লেগেছিল যে, মনে হয়েছিল, আমার ভাষাতে এরকম কোনো কিছু লেখা যেতে পারে, এটা আমার কিছুতেই বিশ্বাস হয়নি। জীবনানন্দ দাশের কবিতা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘চিত্ররূপময়’। তারপর আস্তে আস্তে জীবনানন্দ পড়া। অন্য সব আধুনিক কবি সুধীন দত্ত, বিষ্ণু দে, অমিয় চক্রবর্তী, বৃদ্ধদেব বসু এঁদের কবিতা তো পড়েছি আরও অনেক পরে । তিরিশের যে কয়জন কবি তাদের সঙ্গে জীবনানন্দ দাশকে এক আসনে বসানো যায় না। তিনি বড়ো কবি। আমার মতে, রবীন্দ্রনাথের পরে জীবনানন্দ দাশই বাংলাভাষার দ্বিতীয় প্রধান কবি। নজরুলের কথা মনে রেখেই বলি তিনি সত্যিকার বাঙালি কবি। জীবনানন্দ দাশের কাছ থেকে রবীন্দ্রনাথের কিছু নেবার তো প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকেও জীবনানন্দ দাশেরও প্রায় কিছু নেবার ছিল না। তাঁর কাব্যভাষা সম্পূর্ণ আলাদা একটা ভাষা। কবিতায় যে শব্দের ব্যবহার কল্পনাও করা যায় না তিনি তা করেছেন। অভাবনীয় সব চিত্রকল্পের ব্যবহার। ‘বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই আমি পৃথিবীর রূপ/খুঁজিতে যাই না আর; অন্ধকারে জেগে উঠে ডুমুরের গাছে/ চেয়ে দেখি ছাতার মতন বড়ো পাতাটির নিচে বসে আছে/ ভোরের দোয়েল পাখি—’ গোটা রূপময় বাংলাদেশ আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠল। ‘মরা শালিকের হলুদ ঠ্যাং’, ‘বিয়োবার দেরি নেই আর।’ এমন সব পাড়াগাঁয়ে প্রচলিত শব্দের ব্যবহার আর কোনো কবি ভাবতেই পারেননি। জীবনানন্দ দাশের প্রথম পর্যায়ের কবিতা আমি এখনও বেশি ভালোবাসি। ‘বনলতা সেন’, ‘রপসী বাংলা’ এখন চিরকালের অবসরের আনন্দ-বিনোদনের সঙ্গী। বই খুলি, পড়ি, আর একটা পড়ি, সব পড়ার দরকার পড়ে না। অস্তিত্বের মগ্নতা, অস্তিত্বের নির্জনতা, অস্তিত্বেরই অন্তর্ভুক্ত নির্জনতাবোধ অনুভব করার চেষ্টা করি। জীবনানন্দ দাশ তত্ত্বকথার কচকচানি নয়, এসব উপলব্ধি এনেছেন তাঁর অন্তর্গত বোধের ভেতর থেকে, ‘মাথার ভিতরে/স্বপ্ন নয়—প্রেম নয়—কোনো এক বোধ কাজ করে।’ 

এই কবির জীবনের কথা আমরা সবাই জানি। চাকরি চলে গিয়েছিল। শুচিবায়ুগ্রস্ত অধ্যাপকেরা তাকে চাকুরিচ্যুত করতে, হেনস্তা করতে পিছপা হননি। ‘ক্যাম্পে’ কবিতার জন্য হেনস্তা হয়েছিলেন।

‘তোমার নগ্ন নির্জন হাত, উটের গ্রীবার মতো কোন এক নির্জনতা এসে।’, হায় চিল, সোনালি ডানার চিল, তুমি আর কেঁদে কেঁদে উড়ো নাকো, ধানসিঁড়ি নদীটির পাশে’, ‘তোমার কান্নার শব্দে বেতের ফলের মতো তার ম্লান চোখ মনে আসে।’ কোথাও কোথাও যেন কবি ইয়েটসের কবিতার কথা মনে পড়ে যায়। 

জীবনানন্দ দাশ মৃত্যুবোধ, অতল অনিশ্চিত অস্তিত্বের ভার যেন বইতে পারেন না। ‘সকলের মাঝে বসে/ আমার নিজের মুদ্রাদোষে? আমি একা হতেছি আলাদা?’ সুতীক্ষ্ন ব্যঙ্গও আছে তাঁর কবিতায়। ‘বরং তুমি নিজেই লেখো না একটা কবিতা—’/ ‘নষ্ট শশা পচা চাল কুমড়োর ছাঁচে’/ ‘যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দেখে তারা;/যাদের হৃদয়ে প্রেম নেই—প্রীতি নেই—করুণার আলোড়ন নেই/ পৃথিবী অচল আজ তাদের সুপরামর্শ ছাড়া।’

রাজনৈতিকভাবে তিনি অত্যন্ত সচেতন ছিলেন। দাঙ্গা দেখেছিলেন। ‘বেলা অবেলা কালবেলা’ তাঁর একখানি গ্রন্থের নাম। তিনি আমাদের একটা আলাদা জগতই তৈরি করে দিয়েছেন—জীবনানন্দীয় জগৎ। স্বদেশের বৃত্তের মধ্যে এতো ভালোবাসা! যিনি জীবনে কোনদিন দেশের গণ্ডির বাইরে যাননি, তাঁকেই বলা মানায়, বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই পৃথিবীর রূপ/ খুঁজিতে যাই না আর;../ ছিন্ন খঞ্জনার মতো যখন সে নেচেছিলো ইন্দ্রের সভায়/ বাংলার নদী মাঠ ভাঁটফুল ঘুঙুরের মতো তার কেঁদেছিল পায়।’

প্রায় সব বড় লেখকদের ক্ষেত্রে একটা দুর্ভাগ্য হচ্ছে, তাঁদের কেউ আগাগোড়া পড়ে না, লক্ষ করে না, তাঁরা কোথা থেকে শুরু করছেন? কেমন করে ঘুরছে তাঁর লেখা? আস্তে আস্তে উপরে উঠছে এবং যতো উপরে উঠছে ততো নিচের দৃশ্য বদলে যাচ্ছে। এভাবে একজন কবিকে সম্পূর্ণভাবে দেখা আমাদের দেশে সাধারণত হয় না। কোন বড় কবির ক্ষেত্রেই ঘটেনি।  রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে দেখা যায় ধরাবাঁধা একটা জায়গাতেই পাঠকরা বা সমালোচকরা পড়ে থাকেন। তাঁর শেষের দিকের কবিতাগুলোর মধ্যে যে প্রজ্ঞার চিহ্ন আছে, সেই প্রজ্ঞার পরিচয় আমরা কিন্তু ঠিকমতো নেইনি। আবু সয়ীদ আইয়ুবের মতো দু-একজন সমালোচক আছেন, তাঁরা হয়তো তাঁকে সামগ্রিক বিচারের চেষ্টা করছেন। জীবনানন্দ দাশ সম্পর্কেও কথা বলার বেশি লোক পাওয়া যায় না। তাঁকে সম্পূর্ণভাবে এবং মোটামুটি সম্পূর্ণভাবে পাঠ করেছেন এমন লোক পাওয়া যায় না। বাংলাদেশে একমাত্র প্রয়াত আবদুল মান্নান সৈয়দ একজন নিবিড় পাঠক ছিলেন এবং একজন নিবিড় গবেষকও ছিলেন। তাঁর গবেষণার মান এবং মাত্রা ভিন্ন রকম। তিনি জীবনানন্দ দাশের উপরে অসাধারণ গ্রন্থ রচনা করেন। সমালোচনা জিনিসটা কি আমি আজও ভালো করে জানি না। খুঁত ধরা নাকি স্তুতি করা নাকি একটু এ-কুল বাঁচে ও-কুল বাঁচে দু-কুল বাঁচে এমন একটা অবস্থা নেয়া আমি বুঝতে পারি না। দাঁড়িপাল্লার একদিকে ঝুলে থাকবেই। এতে যারা পাঠক তাদের বাধার সৃষ্টি হয়। জীবনানন্দ দাশ তাই অতিরিক্ত বিরক্ত হয়েই ‘সমারূঢ়’ কবিতাটি লিখেছিলেন। ঠাট্টা করে লিখেছিলেন, “বরং নিজেই তুমি লেখো না একটি কবিতা—/ বলিলাম ম্লান হেসে; ছায়াপিণ্ড দিলো না উত্তর;/ বুঝিলাম সে তো কবি নয়—সে যে আরূঢ় ভণিতা;” এই সচেতন চাবুকটা ঠিক এভাবে কেউ মারে নি। জীবনানন্দ দাশ যে একেবারে নির্বিকার ছিলেন না সেটা আমাদের বুঝতে হবে। তিনি মানুষের সঙ্গে মিশতে জানতেন না, মানুষের সঙ্গে কথা বলতে জানতেন না, হাসতেও নাকি তিনি জানতেন না, সে অনেক কথা তাকে বলা হয়েছে। তারপরে ‘নির্জনতার কবি’র তকমা দিয়ে বুদ্ধদেব বসু তো প্রথমেই একটা সর্বনাশ সাধন করে বসে আছেন। খুব মুশকিল হয়ে যায়, বুদ্ধদেব বসুর কথা ফেলতেও পারব না। আমি  যে কথাটা বলতে চাচ্ছি সে কথাটি বিস্তারিত আলোচনা করার জায়গা এটা নয়। আমি শুধু মনোযোগটা সেদিকে ফেরাব। জীবনানন্দ দাশের কবিতার মধ্যে মুগ্ধতাবোধ, বিস্ময়বোধ, রহস্যবোধ, ধূসর অন্ধকার জগৎ এই বিষয়গুলো আস্তে আস্তে কমে আসছে। সামনে দাঁড়াচ্ছে সরাসরি বাংলাদেশ। বাংলাদেশকে আর কেউ এমন চাক্ষুষ দেখেছেন কি না জানি না। তাঁর শেষের দিকের কবিতায় বাস্তববিশ্বের প্রতি সচেতন দৃষ্টি পড়েছে বেশি। দুটি বিশ্বযুদ্ধ সরাসরি প্রত্যক্ষ করেছেন। রক্তপাত, ধ্বংসলীলা এসব তাঁর কবিসত্তাকে আলোড়িত করেছিল। শেষের দিকের কবিতায় এসবই বেশি। দেখা যায়, এমন এক পৃথিবী তিনি চাইছেন, প্রতিটি মানুষের ব্যক্তি অস্তিত্ব, প্রতিটি মানুষের সম্মিলিত অস্তিত্বের গভীরে ডুব দিয়ে তিনি দেখতে চেয়েছেন মানুষ কেন অসুখী। কাকে খুঁজে ফিরেছেন সারা জীবন? সে কে?

জীবনানন্দ দাশের কবিতার বিমুগ্ধতা আমরা কাটিয়ে উঠতে পারব না। কিন্তু মুগ্ধতার চশমাটা আমরা মাঝে মাঝে খুলতে চাই। সাদা চোখেও জীবনানন্দ দাশকে দেখতে চাই।

প্রচ্ছদ রাজিব রায়

Berger Weather Coat