।। নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী ।।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সাপে কাটা রোগীদের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে বিষ নিবারণ ইনজেকশন (অ্যান্টিভেনাম) থাকলেও বৃহত্তর রাজশাহী জেলার অধিকাংশ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেই। ফলে সঠিক সময়ে চিকিৎসা না পেয়ে মারা যাচ্ছে সাপেকাটা রোগীরা। রাজশাহী জেলার ৯টি উপজেলার মধ্যে মাত্র দুইটি উপজেলায় রয়েছে অ্যান্টিভেনাম। তবে বাকি ৭টি থানা স্বাস্থ্যকমপ্লেক্স এ অ্যান্টিভেনাম আনার প্রস্তুতি চলছে বলে জানিয়েছে রাজশাহী সিভিল সার্জন অফিস। কিন্তু এই অ্যান্টিভেনাম ইনজেকশন বর্ষা মৌসুমের আগে আনা উচিত ছিল বলে মতামত ব্যক্ত করেছেন চিকিৎসকগণ। তাদের মতে, সঠিক সময়ে সকল উপজেলায় অ্যান্টিভেনাম ইনজেকশন থাকলে রোগীদের মৃত্যুহার অনেক কমিয়ে আনা সম্ভব হতো।

নাটোর সদর হাসপাতালে চলতি মাসে অ্যান্টিভেনাম এসেছে মোট ২৮০টি। আর সিংড়া উপজেলায় ৬০টি আর বাকি উপজেলাগুলোতে মোট ৪০টি করে অ্যান্টিভেনাম ইনজেকশন দেয়া হয়েছে।

নওগাঁয় কোনো স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সাপের বিষের প্রতিরোধক ‘অ্যান্টিভেনাম’ নেই।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা সিভিল সার্জন জানান, সাপে কাটা রোগীদের বিষয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জে চিকিৎসকদের ট্রেনিং হয়েছে। তবে জেলার স্বাস্থ্যকমপ্লেক্সগুলোতে অ্যান্টিভেনাম নেই। 

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তথ্য মতে, ২০১৯ থেকে ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট ৪৬৩ জন রোগী রাজশাহীর বিভিন্ন জেলা ও থানা থেকে এসে চিকিৎসা নিয়েছেন। ২০১৯ সালে চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরেছে ২৩৮ জন এবং মারা গেছে ৪০ জন। আর চলতি বছরে এখন পর্যন্ত চিকিৎসা নিয়েছে ২২৫ জন এবং মারা গেছে ১২ জন।

রামেক হাসপাতালের চিকিৎসকদের মতে, মৃত এই রোগীদের সঠিক সময়ে হাসপাতালে নিয়ে আসা সম্ভব হলে হয়ত তাদের বাঁচানো যেত। সময় নষ্ট ও গ্রামের ভুয়া চিকিৎসক দিয়ে সেবা নেয়ার ফলে বেশির ভাগ রোগীর মৃত্যু হচ্ছে বলে জানান চিকিৎসকরা। 

চিকিৎসকদের মতে, আষাঢ় থেকে আশ্বিনের এই দুই মাসে অন্য সময়ের চেয়ে উপজেলাগুলোতে অ্যান্টিভেনাম ইনজেকশন না থাকায় বিষাক্ত সাপে কাটা অনেক রোগী মারা গেছে। তবে করোনার কারণে গত বছরের চেয়ে এ বছরে মৃত্যু ও ভর্তির সংখ্যা কম আছে। সাপে কাটা রোগীদের বেশির ভাগ রাজশাহী বিভাগের নওগাঁ ও নাটোর জেলার। অন্যদিকে রাজশাহীর দূর্গাপুর, বাগমারা, তানোর, গোদাগাড়ীর থানার রোগী সবচেয়ে বেশি।

রামেক হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসক ডা. পার্থ মণি ভট্রাচার্য জানান, গ্রামে বৃষ্টির পানি বাড়ায় নদ-নদী ও খালে বিলে সাপের বিচরণ বেড়ে গেছে। দিনের বেলায় কম বের হলেও রাতে বেলায় সাপের বিচরণ বেশি। এ সময় বাসাবাড়ি রাস্তা-ঘাট আর বিশেষ করে খালবিলে মাছ ধরার সময় সাপের কামড়ে আক্রান্ত হয় মানুষ। তাই গ্রামে এই সময় রাস্তা ঘাটে চলাফেরা করতে হবে সাবধানে।

তিনি জানান, রাজশাহী অঞ্চলে সাপে কাটা রোগীর ৯০ শতাংশই নির্বিষ আর বিষাক্ত ১০ শতাংশ। তবে বেশির ভাগ রোগী মারা যাচ্ছে সাপ দংশন করার পর গ্রামের ওঝাঁ বা গ্রামের চিকিৎসকে দেখানোর জন্য। তারা সময় নষ্ট করে হাসপাতালে আসেন, তখন অনেক দেরি হয়ে যায়। অনেক সময় বাঁচান সম্ভব হয় না।

মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসকরা জানান, সময় নষ্ট করার পরে হাসপাতালে রোগীকে আনায় চিকিৎসকদের কিছু করার থাকছে না। আর নির্বিষ সাপে আক্রান্তদের উপজেলাতে চিকিৎসা দেয়া সম্ভব হচ্ছে। তবে সিংহভাগ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অ্যান্টিভেনাম না থাকায় রামেক হাসপাতালে নিয়ে আসতে হচ্ছে। দেরি করে আসায় রোগীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে।

রামেক হাসপাতালে বিষাক্ত সাপের মাঝে রাসেল ভাইপার সাপে কাটা রোগীদের মোট তিনজন রোগী পাওয়া গেছে চলতি বছরে। তার মাঝে দুই জন গোদাগাড়ী এলাকার, তারা মারা গেছে। বাকি এক নারী কুষ্টিয়া জেলার। তাকে হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) এ রেখে বাঁচানো সম্ভব হয়েছে।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. আবু শাহীন জানান, সিংহভাগ রোগী মারা যায় গ্রামের ওঝা বা ভুয়া চিকিৎসকের কাছে চিকিৎসা নেয়ার ফলে। বিষাক্ত সাপে কাটলেই সেই রোগীকে সময় মত হাসপাতালে না আনলে মারা যায়। আর উপজেলাতে অ্যান্টিভেনাম থাকলে অনেক ভালো হয়’।

তিনি বলেন, ‘এই বিষয়গুলো নিয়ে আমাদের নিয়মিত ট্রেনিং হয়েছে। রাজশাহীর সকল উপজেলাতে অ্যান্টিভেনাম দেয়ার বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। করোনার মাঝে সেপ্টেম্বর মাস থেকে সাপে কাটা রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে’।

সূত্র জানায়, রাজশাহী অঞ্চলে মোট সাপের প্রজাতি রয়েছে ৭২ টি। এর মধ্যে বিষাক্ত সাপ রয়েছে ছয় প্রজাতির। এগুলো হলো, চন্দ্রবোড়া বা রাসেল ভাইপার, খোয়া গোখরা, পদ্ম গোখরা, কেউটে, সিন্ধু কালার, ব্ল্যাক ক্লেট। এদের মাঝে রাসেল ভাইপার ভারতীয় এলাকার সাপ। আর বাকি পাঁচটি দেশীয় সাপ।

তথ্যমতে, সম্প্রতি বাগমারা উপজেলায় বিষাক্ত সাপের কামড়ে মৃত্যু হয় সত্য সরকার নামে চতুর্থ শ্রেণির এক ছাত্রের। স্থানীয় ভাবে খোঁজ নিয়ে জানা যায় সাপে দংশন করার পরে তাকে গ্রামের ওঝাকে দেখানোর জন্য অনেকটা সময় নষ্ট করা হয়। পরে তার পরিস্থিত খারাপ হলে রামেক হাসপাতালে আনা হয়।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার হোসেন আলী (৪০) ও আশা নামের দুইজনের মৃত্যু হয়। তাদেরও প্রথম অবস্থায় গ্রামের চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে পরিস্থিত খারাপ হলে রাজশাহীতে আনা হয়।

রামেক হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. সাইফুল ফেরদৌস জানান, বর্ষা মৌসুমেই সাপে কাটা রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। সবচেয়ে বেশি রোগী আসে নওগাঁ ও নাটোর জেলা থেকে। এর মাঝে রাসেল ভাইপার সাপে কাটা রোগী আছে। বিষাক্ত সাপে কাটা রোগীদেরও বাঁচানো সম্ভব- যদি সময়মত তাদের হাসপাতালে নেয়া হয়।

তিনি জানান, এখন পর্যন্ত রামেক হাসপাতালে তিন শতাধিক অ্যান্টিভেনাম রয়েছে। রোগীকে সময় মত হাসপাতালে নিয়ে আসলে সঠিকভাবে চিকিৎসা দিয়ে বাঁচানো সম্ভব।

রাজশাহী সিভিল সার্জন ডা. এনামুল হক জানান, সাপে কাটা রোগীদের বিষয়ে আমরা মাঝে মাঝেই চিকিৎসকদের ট্রেনিং করাচ্ছি। উপজেলা স্বাস্থ্যকমপ্লেক্সগুলোতে অ্যান্টিভেনাম ইনজেকশন জন্য ঢাকাতে বলা হয়েছে। সময় মত সেগুলো সরবরাহ করা হবে। এখন বাঘা ও চারঘাট উপজেলায় অ্যান্টিভেনাম রয়েছে। এতো দেরি করে কেন অ্যান্টিভেনাম আনা হচ্ছে? এই বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

Berger Weather Coat