হাটুরে কবিতা

প্রথমেই শুরু করি বন্দনা তোমার। পরেতে বন্দিবো আমি যতো পদকার॥ তারপর একে একে মহাজন কবি। পুঁথি দোঁহা পদাবলি মনে আছে সবি॥ বন্দনা করিবো শেষে শ্রোতাবন্ধুগণে। আমার কবিতা যারা মন দিয়া শোনে॥ শেষেতে করিয়া ক্ষান্ত সকল বন্দনা। গাইমু কবিতা আর সুরের বর্ণনা॥

এই বার নিজনামে রচিবো কবিতা। শোনো তুমি ভদ্র অতি আর যতো শ্রোতা॥ আমিও একদা সেই হাটে হাটে ঘুরে। কাটিয়েছি দিবারাতি শব্দাক্রান্ত ঘোরে॥ ভাট কবি নাম ধরি ভাবিয়াছি রোজ। তোমাকে নিরলে বসি করিয়াছি খোঁজ॥ আর তো চাইনি কিছু লিখেছি ভণিতা। মনে মনে রচে গেছি হাটুরে কবিতা॥ হাটুরে কবির মন তুমি শুধু বোঝো। দুর্জনেরা বলে বৃথা ভিনদেশে খোঁজো॥ লুকাইয়া রাখিও পুঁথি আঁচলের নিচে। রচেছি তোমাকে নিয়ে জানে লোকে মিছে॥ এই পদ গুপ্তকথা তুমি শুধু পড়ো। সেই শব্দে সেই সুরে এই বাণী ধরো॥

এইটুকু চাই শুধু চাই না তো আর। তুমি শুধু গীত হও জগত মাজার॥ পাশে বসি শোনো তুমি কবিতা আমার॥ হাটেঘাটে এই বাণী করহ প্রচার॥ মুজিব ইরম বলে এই বর দিও। ভাট কবি লোক কবি আমারে ডাকিও॥

পয়ার বন্দনা

পয়লা বন্দনা করি জগত মানুষ। পয়ারপুস্তকখানি শোনো দিয়া হুঁশ॥ সিলটি মানুষ আমি রাখিও স্মরণ। জালালী কৈতর ওড়ে কাজল বরন॥ উত্তরে বন্দনা করি হিমানী পর্বত। খাসিয়া পাহাড়ে রাখি অচিন শপথ॥ দক্ষিণে বন্দনা করি সেই সে-সায়র। যে-সায়রে পীরপরি বাঁধিয়াছে ঘর॥ পুবেতে বন্দনা করি পুবে ভানুশ্বর। একদিকে ওঠে ভানু চৌদিকে পসর॥ পশ্চিমে বন্দনা করি চিরচেনা পথ। পয়ারের লোক আমি পদের শপথ॥ চৌদিকে বন্দনা করি মধ্যে নিছি ঠাঁই। পয়ারে বাঁধিবো পদ বলি শ্রোতা ভাই॥ কামরূপী জাদু দিয়ে এই পদ বাঁধি। জাদুটোনা বাণ মেরে নয়া পথ সাধি॥ সুললিত ভাবামৃতে যার লোভ হয়। জাতি ধর্ম ত্যাগি তারা পয়ার ভজয়॥ পয়ার পয়ার নাম মুখে বলো ভাই। পয়ার বিহনে সুখ ত্রিভুবনে নাই॥ নাম করো নাম ভজো নাম সর্বময়। ভণিতা রচিলে পরে নাম সত্য হয়॥

ত্রিপদী চৌপদী আর লাচাড়ি পয়ার। বিচার করিয়া দেখি সকলি অসার॥ মুজিব ইরম বলে আমি দীনহীন। বন্ধে নি আনিবা ঘরে পয়ারের দিন॥

জন্মপুঁথি

শোনো ভাই সভাজন অধমের নিবেদন। যেমত হইলো লেখা পয়ার বচন॥ মালাধর বসু নামে সেই যে রচেছি। এই নাম ডেকে ডেকে পয়ার ধরেছি॥ ভাবগত অর্থ যতো পয়ারে ধরিয়া। লোক বুঝাইতে গাই পাঁচালি করিয়া॥ নারায়ণ দেব নাম ধরি তারপর। পয়ারে সঁপিয়া মন বাঁধিয়াছি ঘর॥ বিজয় গুপ্তের নামে বাঁধি এই পদ। নাম ধরি নাম জপি কাটাই বিপদ॥ লোচন দাসের কথা কী কহিবো আর। এই পদ বিরচিতে ধরি নাম তার॥ আরো আরো যারা যারা করিলা বর্ণন। শব্দলীলা পদ্যলীলা পয়ার তর্পণ॥ সেই কবে নিজগুণে বহু মহাজন। লাচাড়ি পয়ার ছন্দে করিলা সৃজন॥ তারপর ভিন রূপ ভিন ছলাকলা। বন্ধ হলো দেশি পদ দেশি রূপে বলা॥ একদা দুপুর বেলা কী যেন কেমনে। লিখিতে পয়ার বই পশিলো মরমে॥ অন্তরে আদেশ পাই নিজেই নিজের। তাইতো পয়ার বাঁধি মূলত বীজের॥ লিখিতে হইলো সাধ পুঁথির চরণ। পয়ারপুস্তক এক করিতে সৃজন॥ আমি অতি হীন মতি ছেড়েছুঁড়ে সব। আদি ও আসল সুরে করি জপতপ॥ ভুল হলে করো ক্ষমা জ্ঞানীগুণিজন। দেশি পদে দেশি সুরে রাখিও স্মরণ॥

মাতা অতি পুণ্যবতী লাল বিবি নাম। তাহার উদরে জন্মি জপি নামধাম॥ অন্তর শুকায় মোর শব্দ অভিলাষে। ইরমে রচিলা পদ গীত ভালোবেসে॥

গুপ্তকথা

এই বার সহি মনে গুপ্তকথা বলি। নিজে তো পারি না কিছু তুমি নামে চলি॥ তুমি বিনে কার সনে করি উঠাবসা। পানি ছাড়া মীন যেন হৈলো মোর দশা॥ তব মন যাচিয়াছি পুরাতন রীতি। ভুলি নাই মনে রাখি কালার পীরিতি॥ আমি তো প্রস্তুত আছি নেও গো কিনিয়া। যেন আমি গত হই তোমারে চিনিয়া॥ চিনিবো চিনিবো আমি ব্যথা হলে দূর। এই নাম জপে জপে কাটিবে বেঘোর॥ এমন বেতাল দিন চাই বা না চাই। কান্দনে মাতমে হুঁশ হামেশা হারাই॥ খুঁজিতে খুঁজিতে দিশ হুঁশটুশ নাই। এ-বেদনা হৈব সুখ যদি দেখা পাই॥ খুঁজিলে পাইবো জানি সুরে আর তালে। কেনো তবে খুঁজে মরি অনালে-বিনালে॥

শেষমেষ বুঝিয়াছি আদি গুপ্তবাণী। এই পদে তুমি নাম তাই তুলে আনি॥ তোমারে ডাকিবো আমি বিনোদিনী রাই। তুমি বিনে ইরমেরে আর কোথা পাই॥

পয়ার বাহার

এই বার বান্ধি পদ মনে থাকে ডর। ভুলভ্রান্তি হৈলে বুক করে ধড়ফড়॥ পয়ারপুস্তক লিখি জানা কিছু নাই। দূরবাস থেকে শেষে মিনতি জানাই॥ বিদেশেতে থাকি বন্দি বিদেশেতে ঘর। যদি বা হারাই দেশ এই মোর ডর॥ এই ডরে কান্দাকাটি করি বারোমাস। পরদেশে থেকে করি নিজদেশে বাস॥ কি বা জানি মারেফাত কি বা জানি ভেদ। জানি শুধু শব্দবাক্য সকলি অভেদ॥ দেশখেশ বাড়ি ছাড়া কি বা আছে আর। খায়েস হৈয়াছে বাঁধি পয়ার বাহার॥ এই পদে আমি নাই বৃথা খোঁজা তাই। আমারে খোঁজো না পদে নিষেধ জানাই॥

এই বার লিখে রাখি নিজ সমাচার। বিদেশেতে করি বাস জগতে প্রচার॥ মধ্যভূমি নাম তার বিলাত নগর। যত দূর যাই আমি সাথে যায় ঘর॥ জাহেরি বাতেনি নয় নিজ দেশ লিখি। ইরমে নিয়ত কয় পদ বাঁধা শিখি॥

পয়ার নছিহত

পয়ারপুস্তক পড়ে হও সাবধান। দেশি পদে দেশি গীতে রাখিও ইমান॥ ডাঙ্গায় বাইলা নাও কতো মহাজন। জলে ডুবে মোর নাও স্থলে ডুবে তন॥ তারা তো করিলা স্নান ভিজে নি বসন। আমার ভিজেছে দেহ ভিজে গেছে মন॥ সেই স্নান হয় নি তো মিটেনি পিয়াস। মন্ত্র দোয়া শিখি নি তো বেড়েছে তিয়াস॥ এসব ভেদের কথা যে কহিতে পারে। ভজিমু চরণ তার সৃজিমু পয়ারে॥ এই দুখ থাকে মনে এই দুখ থাকে। দিবানিশি মনমরা উচাটন রাখে॥ মুখে মুখে ঘুরেফিরে আকারে প্রকার। তেমন পয়ার লেখা হৈলো না তো আর॥ তবুও নিদানে আশা রাখি জমা মনে। প্রেমের বাজারে বুঝি নিবে সর্বজনে॥ কসম দোহাই তাই রাখি ধার করে। আমার পয়ার যেন প্রেমিকেরা পড়ে॥ জগতে প্রেমিক যারা তারা তো মহান। দয়ামায়া আশকারা বাটে দু’জাহান॥

মনেরে বুঝিয়ে তাই বলি বারে বারে। অপ্রেমিক ছেড়ে যাও প্রেমিকের দ্বারে॥ মুজিব ইরম বলে এই তার সন্ধি। জগত ঘুরিয়া শেষে পয়ারেতে বন্দি॥

সমাপ্তির আগে

পয়ারপুস্তক প্রায় হৈয়াছে পূরণ। অধম ইরমে কয় রাখিও স্মরণ॥ পড়িবে কিতাবখানি যারা খুশি মনে। হবে তারা শব্দাক্রান্ত বলি জনে জনে। দুই হাজার উনিশ জুলাই মাসেতে। পয়ারপুস্তক শেষ হৈলো কোনো মতে॥ কী লিখেছি জানা নাই ক্ষমা দিও ভাই। ভয়ে-ডরে লিখে রাখি মূল্য জানা নাই॥ পরগনা ইটা যার বাড়ি নালিহুরী। এতিম বালক বেশে বিদেশেতে ঘুরি॥ বাড়িছাড়া ঘরছাড়া আমি দীনহীন। মৌলভী বাজার জিলা শ্রীহট্ট প্রাচীন॥ হিউয়েন সাং মতে নামের আঁচল। আল বেরুনীর সাক্ষ্য হইলো প্রচল॥ ‘সিলাহেত’ ‘শীলাহাট’ ও ‘শি-লি-চা-ত-ল’। শ্রী সতীর হড্ড হৈতে নাম হৈলা চল॥ গুহক রাজার কন্যা শীলা দেবী নামে। শ্রীহট্ট হৈয়াছে নাম শুনি ইহধামে॥ ‘সিল হট্ যাহ্’ পীর করিলা হুকুম। এতোই নামের রূপ ডেকে আনে ঘুম॥ সেই ঘুমে জেগে উঠি রচি কিছু পদ। প্রাচীনে মজিয়া থাকি কাটাই বিপদ॥ জালালী কৈতর আমি শ্রীহট্ট মাজারে। ঘুরিয়া কাটাই দিন দূরের বাজারে॥ শরিয়ত উল্লা দাদা আমি তার নাতি। পয়ারপুস্তক রচে ধরি মারিফতি॥

মুজিব ইরম বলে নাই ডর নাই। পাঠক মুর্শিদ মেনে প্রণাম জানাই॥ পাঠক পাঠিকাগণে আদাব ছালাম। পয়ার পুস্তক হৈলো আপাত তামাম॥

Berger Weather Coat

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.