রাজু আহমেদ, রাজশাহী ॥

হঠাৎ আলুর দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় পণ্যটির সর্বোচ্চ দাম বেঁধে দিয়েছে সরকার। এভাবে পরিস্থিতি উত্তরণ হবে বলে সরকারের ধারণার মধ্যই ব্যবসায়ীদের একটি সিন্ডিকেট হিমাগার থেকে আলু বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে তৈরি হয়েছে, বাজারে আলুর কৃত্রিম সংকটের শঙ্কা।

রাজশাহীর বাজারে বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) দুপুর পর্যন্ত খুচরা পর্যায়ে প্রতি কেজি আলু বিক্রি হয়েছে ৪২ থেকে ৪৫ টাকা দরে। অথচ সরকার নির্ধারিত দাম ধরা হয়েছে ৩০ টাকা।

রাজশাহীর স্থানীয় বাজারসহ কয়েকটি কোল্ডস্টোরেজ ঘুরে আলুর ব্যবসায়ী ও কৃষকদের সাথে কথা বলে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে।

এই মাসের শুরুতে আলুর অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধির পর গত ৭ অক্টোবর খুচরা, আড়ত ও কোল্ডস্টোরেজ পর্যায়ে আলুর সর্বোচ্চ দাম বেঁধে দেয় কৃষি বিপণন অধিদফতর। যেখানে কোল্ড স্টোরেজ পর্যায়ে প্রতি কেজি আলুর মূল্য ২৩ টাকা, পাইকারি বা আড়তের মূল্য ২৫ টাকা এবং ভোক্তা পর্যায়ে সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ৩০ টাকা হওয়া বাঞ্ছনীয় বলে উল্লেখ করা হয়।

সরকারি হিসেবে বলা হয়েছে, দেশে মোট আলুর চাহিদা প্রায় ৭৭ লাখ ৯ হাজার মেট্রিক টন। গেল বছর উৎপাদন হয় এক কোটি ৯ লাখ মেট্রিক টন। এবার কৃষক পর্যায়ে প্রতিকেজি আলু উৎপাদনে খরচ পড়েছে প্রায় সাড়ে ৮ টাকা। কোল্ড স্টোরেজ ও লেবার খরচ যোগ দিয়ে এই খরচ দাড়িয়েছে ২১ টাকা।

তবে বাজার ঘুরে দেখা গেছে, দ্বিগুণেরও বেশি দামে খুচরা বাজারে প্রতি কেজি আলু বিক্রি হচ্ছে ৪২ থেকে ৪৫ টাকায়। এদিকে ভোক্তাদের দাবি পেঁয়াজ ও মরিচের সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকলেও আলু সংরক্ষণে ব্যবস্থা রয়েছে। আর এই সুযোগকেই কাজে লাগিয়ে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে আলুর দাম বৃদ্ধি করা হচ্ছে।

রাজশাহী পবা উপজেলায় অবস্থিত সরকার কোল্ড স্টোরেজে গিয়ে আলু ব্যবসায়ী ও কৃষকদের দল বেঁধে বসে থাকতে দেখা যায়। তারা জানান, সরকার যে দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে ওই দামে তারা আলু বিক্রি করতে রাজি না। কারণ হিসেবে তারা বলেন, গত ৬ বছর আলুতে যে লোকসান হয়েছে, এবার তা পুষিয়ে নিতে চান তারা।

পবার কৃষক রজব আলী জানান, প্রতি বিঘায় এবার আলু উৎপাদনে খরচ পড়েছে ৪২ হাজার টাকা। যেখানে তারা ৬৫ থেকে ৭০ মণ আলু পেয়েছেন। কৃষক পর্যায়ে প্রতি কেজি আলু উৎপাদনে গড়ে খরচ পড়েছে ১৫ টাকা। মার্চ মাসে তারা আলু জমি থেকে তুলে কোল্ড স্টোরেজে রাখা শুরু করেন। এখন লেবার খরচ ও কোল্ডস্টোরেজ খরচ যোগ দিয়ে তাদের প্রতি কেজি আলুতে খরচ পড়ছে ২২ টাকা।

তবে ২০১৩ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত তারা আলু ব্যবসায় যে ক্ষতির সম্মুখিন হয়েছেন তার বিবরণ দিয়ে ওই কৃষক জানান, এবার আলুর দাম ভালো পাওয়ায় গত ৬ বছরের সেই ক্ষতি তারা এবছরেই পুষিয়ে নিতে চাইছেন।

কৃষকদের কাছ থেকে আলু কিনে কোল্ড স্টেরেজে আলু রেখে ব্যবসা করছেন নওহাটা পৌরসভার সাব্বার আলী। তিনি জানান, সব খরচ বাদ দিয়ে কেজি প্রতি তার আলু কেনা পড়েছে ২১ টাকা। তিনি কোল্ড স্টোরেজ মালিক পক্ষের থেকে ঋণ নিয়ে আলুর ব্যবসা করেন। মালিক পক্ষ ১৬ থেকে ১৮ শতাংশ সুদ নেন। আলু ব্যবসায়ীদের জন্য ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা না থাকায়, তারা এতো বড় অংকের সুদ দিতে বাধ্য হচ্ছেন।

সাব্বার আলী আরও জানান, গত ৬ বছরে যে ক্ষতি হয়েছে তা এবারে পুষিয়ে নেবার সুযোগ এসছে। যা তিনি হাতছাড়া করতে চান না। আর একারণেই তারা কোল্ড স্টোরেজ থেকে আলু ছাড়া বা বিক্রি বন্ধ রেখেছেন।

এদিকে কৃষি বিপণন অধিদফতর থেকে দেয়া তথ্যে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশে গত আলুর মৌসুমে প্রায় এক কোটি ৯ লাখ মেট্রিক টন আলু উৎপাদিত হয়েছে। দেশে মোট আলুর চাহিদা প্রায় ৭৭ লাখ ৯ হাজার মেট্রিক টন। এতে দেখা যায় যে, গত বছর উৎপাদিত আলু থেকে প্রায় ৩১ লাখ ৯১ হাজার টন আলু উদ্বৃত্ত থাকে। কিছু পরিমাণ আলু রফতানি হলেও ঘাটতির সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ।

এতে আরও বলা হয়েছে, আলুর মৌসুমে যখন হিমাগারে আলু সংরক্ষণ করা হয়েছে তখন প্রতি কেজি আলুর মূল্য ছিল সর্বোচ্চ ১৪ টাকা। প্রতি কেজি আলুতে হিমাগার ভাড়া বাবদ তিন টাকা ৬৬ পয়সা, বাছাই খরচ ৪৬ পয়সা, ওয়েট লস ৮৮ পয়সা, মূলধনের সুদ ও অন্যান্য খরচ বাবদ ২ টাকা ব্যয় হয়। অর্থাৎ এক কেজি আলুর কোল্ডস্টোরেজ পর্যায়ের সর্বোচ্চ ২১ টাকা খরচ পড়ে।

ওই তথ্যে আরো বলা হয়, সংরক্ষিত আলুর কোল্ডস্টোরেজ পর্যায়ে বিক্রয় মূল্যের ওপর সাধারণত ২ থেকে ৫ শতাংশ লভ্যাংশ, পাইকারি পর্যায়ে ৪ থেকে ৫ শতাংশ এবং খুচরা পর্যায়ে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ লভ্যাংশ যোগ করে ভোক্তার কাছে আলু বিক্রি করা যুক্তিযুক্ত। এক্ষেত্রে হিমাগার পর্যায় থেকে প্রতি কেজি আলু ২৩ টাকা মূল্যে বিক্রি করলে আলু সংরক্ষণকারীর দুই টাকা মুনাফা হয় বলে প্রতীয়মান হয়। অন্যদিকে আড়তদারি, খাজনা ও লেবার খরচ বাবদ ৭৬ পয়সা খরচ হয়। সেই অনুযায়ী পাইকারি মূল্য (আড়ত পর্যায়) ২৩ টাকা ৭৭ পয়সার সঙ্গে মুনাফা যোগ করে সর্বোচ্চ ২৫ টাকা করা যেতে পারে। একজন চাষির প্রতি কেজি আলুর উৎপাদন খরচ হয়েছে ৮ টাকা ৩২ পয়সা। এমতাবস্থায় হিমাগার পর্যায় থেকে প্রতি কেজি আলুর মূল্য ২৩ টাকা, পাইকারি/আড়তের মূল্য ২৫ টাকা এবং ভোক্তা পর্যায়ে সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ৩০ টাকা হওয়া বাঞ্ছনীয়।

আলোকচিত্র: মাহফুজুর রহমান রুবেল

Berger Weather Coat