বর্তমান আলাপচারিতাটি ২০০৯ সালে অ্যাকাডেমি অব আমেরিকান পোয়েটস এর দ্বিবার্ষিক জার্নাল ‘আমেরিকান পোয়েট’-এ প্রকাশিত হয়। ১৯৯৯ সালে লুইজ গ্লিকের সঙ্গে উদীয়মান নবীন লেখকের একজন হিসেবে ডানা লেভিনের পরিচয় ঘটে। পরবর্তীতে দুজনের বন্ধুত্ব প্রগাঢ় হয়। লুইজ গ্লিকের নোবেল জয়ের পরে ৯ অক্টোবর তারিখে প্যারিস রিভিউ-এ নোবেল বিজয়ীর সাহিত্যকর্ম নিয়ে ডানা লেভিনের স্মৃতিচারিতা ও পর্যবেক্ষণও প্রকাশিত হয়েছে। নোবেল বিজয়ীর নামটি তাঁর নামের প্রচলিত উচ্চারণ অনুযায়ী বাংলায় লেখা হয়েছে। আলাপচারিতাটি অনুবাদ করেছেন হাসিনুল ইসলাম

ডানা লেভিন: আমি প্রথমে আপনার ২০০৯ সালের বই ‘গ্রামের জীবন’ (আ ভিলেজ লাইফ) নিয়ে কথা বলতে চাচ্ছি। বইটিতে সময় যেন স্থানিকতার অবয়ব পেয়েছে– কেতাবটির সব স্বর যেন একই সঙ্গে কথা বলে, সব ঘটনা যেন একসঙ্গে ঘটে, সবকিছু যেন এক যুগপৎ ঘটমান সময়ের স্রোতে মূর্তিমান হয়ে উঠেছে।

লুইজ গ্লিক: এই কবিতাগুলোতে অদ্ভুত কিছু বিষয় আছে যেগুলোকে আমি নির্দিষ্ট করে চিহ্নিত করতে পারিনি। এটা নিশ্চিত করে বলা যাবে না যে সচেতন প্রয়াসের ফলেই এমন গুণের অর্জন হয়েছিল, তবে যুগপততার সঙ্গে এর কোনো না কোনো যোগ আছে। একটা বিষয় আমাকে ভাবায়, সেটা হলো, অ্যাভারনো গ্রন্থের একটি কবিতা ‘ভূদৃশ্য’ (ল্যান্ডস্কেপ) এর সঙ্গে এর মিল আছে। সেখানে জীবনের ভিন্ন ভিন্ন অধ্যায় পৃথক অনুচ্ছেদে জীবন্ত হয়েছে, সেইসঙ্গে প্রতিটি বিভাগে বিবরণের উপাদান ও দৃষ্টিভঙ্গিও বদলে গেছে– এরপরও গড় হিসাবে সেখানে এক পূর্ণাঙ্গ জীবনের স্বাদ পাওয়া যায়। ‘গ্রামের জীবন’ কাব্যের বিষয়ে আমার মনে একটা ছবি ভেসে আসে, সেই যে এক চিরন্তন গাথা, যে, জীবন সায়াহ্নে মৃত্যুর মুহূর্তে আমাদের সামনে যেন পুরো জীবনটা বন্যার তোড়ের মতো ভেসে উঠে দ্রুত পার হয়ে যায়। বইটা নিয়ে আমার এমনই অনুভূতি: জীবনের পূর্ণাঙ্গতা, তবে ধাপে ধাপে নয়, কাহিনির বর্ণনা না: যুগপততা। মৃত্যুর মধ্যে কোনো নাটকীয়তা নেই। জগত পরিত্যাগ করার নাটকেরও অতীত এটি; এ স্রেফ এক দীর্ঘ শ্বাসত্যাগ।

ডানা লেভিন: নন্দনতাত্ত্বিকতার বিচারে, কেতাবটি আপনাকে কী শিখিয়েছে?

লুইজ গ্লিক: অন্য কিছু না করার আগে আমি এ বিষয়ে কিছু বলতে পারবো না, এমনই মনে হচ্ছে। অ্যাভার্নো প্রকাশের পরে আমি রিচার্ড সাইকেনের সঙ্গে আলাপ করেছিলাম বলে মনে পড়ছে। তখন আমার লেখা বন্ধ, আমি সেটা নিয়ে বেশ হতাশায় ছিলাম, খেপে ছিলাম। মাঝে মাছে আমার এমন সময় যায়– প্রায় সময়েই বেশ লম্বা সময়– যখন আমি লিখতে পারি না। তবে আমি যে সবসময় সেটা নিয়ে দুশ্চিন্তা করি, তা নয়। হ্যাঁ, আমারও দুশ্চিন্তা হয়, তবে সেটা অন্য বিষয়ে। হঠাৎ নীরবতা এসে ভর করে আমার উপর, আমি হয়তো ভীত বিহ্বলও হয়ে পড়ি। আমি তেমন এক সময়ের ঘোরে প্রবেশ করার সময়, রিচার্ড বললেন, ‘তোমার পরের বইটা হবে একেবারে নতুন।’ আমার অনুভূতিও ঠিক তাই ছিল। আমার কবিতায় তুরীয় তুঙ্গ এবং বিষাদের শিখরে খেলা করার মতো সর্বোচ্চ চেষ্টা আমি ইতোমধ্যে করেছিলাম। নতুন পাণ্ডুলিপিকে হতে হবে অনেক বেশি দৃশ্যময়, কিছুটা কার্যকারণযুক্ত, সেখানে সুন্দর-নয়-এমন আভরণ থাকবে। কাব্যগ্রন্থটি আমাকে সুন্দর-নয়-এমন আভরণ লিখতে শিখিয়েছে। কী ভীষণ জয়। [কিছুটা ব্যঙ্গের হাসি তার মুখে]

বেশ লম্বা একটা কবিতা লেখার বিষয়টি কিন্তু মজার ছিল, আমার তেমনই মনে হয়েছে… এই কবিতাগুলো লিখে আমি বেশ আনন্দ অনুভব করেছি। আমি ওই জগতটায় থাকতে ভালোবাসতাম। আমি চাইলেই সেখানে যেতে পারতাম। হ্যাঁ, সেটা অবশ্য স্বল্প সময়ের জন্য ছিল। বুঝতেই পারছো, এখন পারবো না…

ডানা লেভিন: আমরা তো কখনোই সুখরাজ্য ব্রিগাডুনে ফিরে যেতে পারি না।

লুইজ গ্লিক: না, কক্ষনো না! আমি এসব স্থানের কোনোটাতেই আর যেতে পারবো না। কোনোটাই না। আমি কখনো আমার পুরনো লেখা পড়ে দেখি না। আর তাই, ওগুলো নিয়ে আমি কি ভাবছি তাও আমি বলতে পারবো না।

ডানা লেভিন: আপনার প্রতিটি কেতাবেই আপনার নিজেকে স্পষ্ট দেখতে পাওয়া যায়, আপনার স্বরের প্রতিধ্বনি থাকে সেখানে, কিন্তু এরপরও প্রতিটি নতুন কাব্যসংকলনে নতুনের চিহ্ন অনুভব করে পাঠক। এই যে পরিবর্তন, একটি থেকে অন্যটিতে, এটি কি আপনার সচেতন প্রয়াস?

লুইজ গ্লিক: আমার একমাত্র সচেতন প্রয়াস হলো, আশ্চর‌যান্বিত হওয়ার চাহিদা। আমাকে আমার লেখায় যে পরিমাণে পাওয়া যাবে, আমার জন্য তা ততটাই অভিশাপ।

ডানা লেভিন: [হেসে উঠে] আমার এখন ওয়ালেস শনের কথা মনে পড়ছে, ‘নিজসত্তার বিষয়ে আহম্মকির একটি বিষয় আছে, প্রতিদিন তুমি ঘুম থেকে উঠবে, আর তুমি সেই একই ব্যক্তি হবে।’

লুইজ গ্লিক: হুঁ! এটাই আমাদের সীমবদ্ধতা। এটা যদি গুণ বলে ধরা হয়, তো আমি খুশিই হবো।

ডানা লেভিন: আমি জানি যে আপনি শিক্ষকতাকে বেশ গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন এবং এক দশকেরও বেশি সময় ধরে উদীয়মান লেখকদের সাধারণ্যে আনার বিষয়ে আপনার জুড়ি নেই। মেন্টরের ভূমিকায় কাজ করা আর শিক্ষকতা, আপনার জীবনে কেমন প্রভাব ফেলে?

লুইজ গ্লিক: আহ্, কিভাবে শুরু করা যায়। আমার জন্য এটি উদারতাপূর্ণ এক কারয: শিক্ষকতা এবং সম্পাদনা। এতটা কষ্টকরভাবে অন্য কোনো কাজ আমি করতে পারবো না। আমার মনে হয় এতটা সময় লাগে, এমন কোনো কাজ কেউ করতে পারবে না– হ্যাঁ, ক্যাথলিক চার্চের ভেতরের কথা বাদ– তীব্র স্বার্থচিন্তার বাইরে থেকে এমন কিছু করার উদাহরণ তেমন নেই। নবীন লেখকদের নিয়ে আমি যে কাজগুলি করি, সেটি আসলে আমাকে মনের জ্বালানি হিসেবে কাজ করে। কখনো কখনো, আমি পুরস্কার বিজয়ী নবীনদের বলি, আমি ড্রাকুলা, আমি তাদের রক্ত পান করি।

আমি এই বিষয়টির পুরোপুরি রসাস্বাদন করি– আমি যতটা লেখক, লেখক হিসেবে আমি যতখানি জীবন্ত, যতখানি নতুন, এর জন্য আমি সেই সব নবীন লেখকদের লেখার কাছে ঋণী। আমি একেবারে নতুন, যেনবা ভীনগ্রহের কোনো বিষয়বস্তু পেয়েছি তাদের লেখায়, এমন কিছু স্বর যা আগে জীবনে কোথাও শুনিনি। আমি তো তেমন কিছুর জন্যই নবীনদের লেখা হাতড়ে বেড়াই।

আসলে, যেসব নবীন লেখকের লেখার প্রতি আমি আকর্ষণ বোধ করেছি, তাদের প্রত্যেকের কাছ থেকে কিছু না কিছু শিখেছি। তোমার কাছ থেকে আমি শিখেছি, কিভাবে একটা কবিতাকে চালিয়ে নিয়ে যেতে হয়। দীর্ঘ পঙ্ক্তিমালা লেখার কৌশল। এমন না যে আমি কখনো তোমার মতো কিছু লিখিনি, তবে আমি নিশ্চিতভাবেই সেই চেষ্টা চালিয়েছি। আমি যখন পিটার স্ট্রেকফাসের কবিতা পড়ে তার কাব্যপ্রতিভার ধাঁধায় প্রভাবিত হলাম, সেই সময় একটা কবিতা লিখে আমার মনে হলো যে আমি তার থেকে চুরি করেছি। সেই বছরে ইয়েল পুরস্কার পাওয়া কেতাবটি আমি খুব গভীরভাবে পড়লাম, পাণ্ডুলিপিটাও– পিটারের কোন্ কথাটি আমি আমার লেখায় লিখেছি, তা খুঁজে পেলাম না। কিন্তু আমার খুব অপরাধবোধ কাজ করছিল, আমার মনে হলো তাকে ফোন করা দরকার, ক্ষমা চাওয়া দরকার।

ডানা লেভিন: উনি বিষয়টিকে কিভাবে নিয়েছিলেন?

লুইজ গ্লিক: আমি যাকে চুরি মনে করি, সে বিষয়ে পিটারের দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন। উনি তখন বললেন, ‘ওহ, এ তো মজার ব্যাপার। লেখকেরা তো এমনই করে। আমরা তো এক কথোপকথনের অংশীদার।’ আমি বললাম, ‘পিটার, বুঝছেন না আপনি– আমি চুরি করেছি!’ কিন্তু, তুমি তো জানোই, সাহিত্যিক দৃষ্টিকোণে আমি তো তা করিনি। কথাগুলো তো আমারই ছিল। তবে, আমি তো জানতাম, প্রেরণা আর উদ্দীপনা কোথা থেকে এসেছিল। তখন, আমি চেষ্টা করলাম, পিটারের সাহিত্যকর্মে যা দেখিনি তাই নিয়ে কিছু করার চেষ্টা, যেন আমি অনুভব করি যে সেটি আমারই।

ডানা লেভিন: এই যে এখন আপনার যে বিশাল পাঠকগোষ্ঠী, যে বিপুল প্রশংসা আপনার ঝুলিতে– আপনি কি আগে কখনো আপনার সাহিত্যকর্মের এমন সম্ভাবনার কথা ভেবেছিলেন? সাধারণ্যে আপনার যে ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছে, এর কথা যদি ভাবেন, তাহলে পিছন ফিরে তাকালে আপনার কেমন অনুভব হয়? এ পর্যন্ত আসার পথটাই বা কেমন ছিল?

লুইজ গ্লিক: আপনার বিশাল পাঠকগোষ্ঠীর অস্তিত্বের কথা বা প্রশংসার বিষয়টি তো আমি অনুভব করি না।

ডানা লেভিন: আমি নিশ্চিত প্রমাণ দিতে পারি: এই তো, বাইরে বেরোলেই এর প্রমাণ মিলবে।

লুইজ গ্লিক: আমি যখন কোনো কবিতা পাঠের আসরে যাই, আমি যখন দর্শকের সামনে পাঠ করি– প্রথমত, সেখানে দাঁড়িয়ে তুমি কি দেখতে পাও? শূন্য আসন। হ্যাঁ, তুমি দেখবে, কেবল শূন্য আসন। কারণ আমি এমন মায়ের হাতে মানুষ হয়েছি যিনি বলতেন, ‘৯৮ পেলে কেন? ১০০ পেলে না কেন?’

ডানা লেভিন: আমার মা-ও এমন ছিলেন!

লুইজ গ্লিক: হ্যাঁ, আমি জানি, তোমার জীবনেও তেমনটা ঘটেছে। তাহলে– আপনাদের দৃষ্টিতে আসে কেবল শূন্য আসন, আর মাঝপথে লোকজন উঠে যায়, আপনি দেখতে পান যে শ্রোতাসারির কেউ কেউ উঠে চলে যাচ্ছেন, আর তখন আপনার ভাবনায় এমন ঝলক আসে: ওই লোকগুলো তো পুরো হলঘরের সবার আদর্শ প্রতিনিধি। আসলে সবাই হলঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়তে চায়, কিন্তু অল্প কয়েকজনের সেই সাহস আছে। পাঠের আসরে এমন ভাবনাই আসে। আর, প্রশংসার কথা বলছেন? আমি জীবনে যথেষ্ট পরিমাণ রিভিউ পেয়েছি যেগুলো ছিল ভয়ংকর রকমের, সেইসঙ্গে মৃদু প্রশংসার ছোঁয়াযুক্ত কিছু রিভিউও ছিল।

আসলে, প্রশংসার বিষয়টি আমার অনুভূতিতে আসে না। আমাকে যখন বলা হয় যে আমার পাঠকগোষ্ঠী বিশালবিপুল, আমি ভাবি, ‘বেশ তো, ভালোই, আমি তাহলে লংফেলো হতে যাচ্ছি: এমন কেউ যাকে সহজেই বোঝা যায়, যে এমন অভিজ্ঞতা বিলোবে যা কমবেশি সবারই থাকে। কিন্তু আমি তো এমন লংফেলো হতে চাই না। দুঃখিত, হেনরি লংফেলো, আমি যে অমনটা হতে চাই না। প্রশংসার বিষয়টিকে আমি এভাবেই দেখি, সাহিত্যকর্মের সোনায় মেশানো খাদ এটি।

ডানা লেভিন: তাহলে, ব্যাপারটি কি এমন? উনারা যদি আরো বেশি পরিপক্ক হতেন তাহলে আপনার লেখা আর পড়তেন না?

লুইজ গ্লিক: তাঁরা যখন আরো বেশি জেনে যাবেন, আমাকে তো তাঁরা পড়বেন না। না।

ডানা লেভিন: আচ্ছা, আমার চলমান কোর্সের এক শিক্ষার্থী প্রবেশমূল্য নিয়ে কথা বলতে পছন্দ করে। তার অমন ধারার প্রশ্নটি হলো– আচ্ছা, এই কবিতার প্রবেশমূল্য কয় ডলার খরচ? সম্প্রতি সে আমাকে বলছিল, ‘লুইজ গ্লিকের কবিতায় ঢোকার প্রবেশমূল্য, এই ধরেন, স্রেফ এক ডলার। তবে, ভেতরে ঢোকার পরে আশপাশ বেশ জটিলতাপূর্ণ হয়ে দেখা দেয়।’ আসলে কথাটি সে ঠিকই বলেছে– আপনার কবিতায় ঢুকে পড়াটা তেমন কঠিন না। কিন্তু বেশ দ্রুতই পাঠক বুঝতে পারে যে মনস্তাত্ত্বিক ও অবয়বগতভাবে আবহ বেশ জটিল হয়ে ‍ওঠে, আসলে কবিতাগুলো একে অন্যের সঙ্গে মিলে কিভাবে এক পূর্ণতার সৃষ্টি করে, সেটি আয়ত্তে আনা সমঝদারির কাজ। আমার ছাত্রটি আপনার পুরো কাব্যের এক রূপরেখা দাঁড় করানোর চেষ্টা করছিল, কিন্তু সে আরারাত-এ আটকে আছে, সেই কিতাব ছেড়ে বেরোতে পারছে না। সে ওখানে যেন পথ হারিয়ে ফেলেছে, সেই বিশালতার মাঝে, যদিও সে কেবল এক ডলার দিয়ে ওখানে ঢুকেছে। এখন আমার কাজ হলো, ওকে ওখান থেকে বের করে আনতে হবে যেন সে সামনের দিকে এগোতে পারে।

লুইজ গ্লিক: তেমনটা সত্য হলে ভালোই হতো। আমি আশায় আছি যে এমন সত্যই ঘটুক।

ডানা লেভিন: শেষ একটা প্রশ্ন করি। আমরা এক অভূতপূর্ব কালে বাস করছি। আমি বুঝি যে আমি নিজে প্রায়শই এই প্রশ্নের মুখোমুখি হই: চারিদিকে যখন সামাজিক-রাজনৈতিক, পরিবেশগতভাবে বহু কিছু ঘটে চলছে, এমন এক সময় পরিক্রমায় ব্যক্তিগত ও মনঃসমীক্ষণে জড়িয়ে থেকে আমরা কি করছি? আমার অনেক শিক্ষার্থী এমন প্রশ্ন করে, নিজের অভিজ্ঞতাকে কিভাবে সাধারণ্যের উক্তিতে প্রকাশ করবে, বা এর উল্টোটি। শ্রোতা ও কালহীনতা এবং সাংস্কৃতিক আমদানির প্রশ্নও এসে যায়। এ বিষয়ে কি কিছূ বলবেন?

লুইজ গ্লিক: আমার মনে হয় না, তুমি সচেতনভাবে মাথা খাটিয়ে এমন ধারার প্রশ্নর উত্তর দিতে যাবে। এগুলোর এক ধরনের ওজন আছে, সেটা তোমার সত্তায় খেলা করবে। সমাধানগুলো আসবে সচেতনতার সীমার বাইরে, অবচেতনে। সেগুলো তখন কোথাও প্রকাশিত হবে, যেমন তোমার সাহিত্যকর্মে কিছুটা উঁকি দিবে। আমি কখনো শ্রোতার কথা ভাবি না। শব্দটাতে আমার ঘেন্না হয়। আমি পাঠকের কথা ভাবি। আমি মনে করি আমার কবিতার জন্য পাঠকের দরকার, সেগুলো লেখাও হয়েছে পুরোপুরি একজন পাঠকের হাতে। একজন পাঠকের দরকার আমার, সে বহুর মাঝে থাকবে, বা থাকবে না, সে বিষয়টি আমার মননে কোনো প্রভাব ফেলে না। অবশ্য, এর বাস্তব প্রভাব আছে। আমি পাঠকের গুহ্যতা এবং তার সাড়া দেওয়ার গভীরতার কথা ভাবি– সেগুলি কতটা টেকসই সে বিষয়ে ভাবি। পাঠকের সংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়টি আমার কাছে হাস্যকর ঠেকে।

কবিতাকে আমি ঠোঁট ও কানের মাঝের যোগাযোগ বলে ভাবি– ঠিক মাংসপিণ্ডের ঠোঁট-কান নয়, বরং মনের মতো কিছু একটা যা বার্তা পাঠায় এবং সে আবার বার্তাটি গ্রহণ করে। আমার কাছে কবিতার এক শ্রবণক্ষম চাক্ষুষতার গুণ আছে। একেবারে কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া, আমি চোখ দিয়ে শুনি এবং সশব্দে পড়া অপছন্দ করি, আমাকে পড়ে শোনালেও তা আমার অপছন্দের। সশব্দে পড়ার সময় কবিতা অনেক সরল, ধারাবাহিক অবয়বের কিছু হয়ে ওঠে: মাকড়সার জাল হয়ে যায় এক ঋজু একমুখী সড়ক। পাঠকের যে অস্তিত্ব আছে, এই জ্ঞান বা আশাটি আমার কাছে অতীব শান্তির নীড় হয়ে ধরা দেয়।

Berger Weather Coat