rajshahi city corporation corruption

।। নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী ।।

রাজশাহী সিটি করপোরেশনে ১৬টি ফ্লাডলাইট কেনায় দুর্নীতির অভিযোগ আলোচিত হচ্ছে সাম্প্রতিক সময়ে। ঢাকার একাধিক সংবাদমাধ্যমে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিষয়টি প্রচারের আলোয় আসে।

এরই মধ্যে এ সংক্রান্ত নথি সিটি করপোরেশন থেকে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সংগ্রহ করে তদন্ত শুরু করেছে বলে জানিয়েছে একাধিক সংবাদমাধ্যম।

এসব আলোচনার মধ্যেই বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) অভিযুক্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলন করে অভিযোগটি ভিত্তিহীন বলে দাবি করা হয়েছে। এমনকি ঢাকার যে সংবাদমাধ্যমে প্রথম সংবাদটি প্রকাশিত হয়, তার এক স্থানীয় সাংবাদিকের বিরুদ্ধে চাঁদা দাবির অভিযোগ এনেছেন সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার।

যদিও সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীদের প্রশ্নের জবাবে ঠিকাদার আশরাফুল হুদা টিটো জানান, সংশ্লিষ্ট সাংবাদিক সরাসরি তার কাছ থেকে অর্থ দাবি করেননি। তার অভিযোগ, সিটি করপোরেশনের সদ্য সাবেক প্রধান প্রকৌশলী আশরাফুল হক ওই সাংবাদিকের নাম করে অর্থ দাবি করেছিলেন। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকের সঙ্গে ঠিকাদারের সরাসরি কোনো যোগাযোগ হয়নি বলেও প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান।

‘উজ্জ্বল আলো’র উদ্ভাসন

২০১৯ সালের ৭ আগস্ট রাজশাহী সিটি করপোরেশন নগরীর ১৬টি স্থানে সুউচ্চ পোলে উজ্জ্বল বাতি সরবরাহ, সংযোজন ও স্থাপনের জন্য অনলাইনে দরপত্র আহ্বান করে। দরপত্র প্রক্রিয়া শেষে হ্যারো ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন নামের প্রতিষ্ঠান কাজটির জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়।

১৫ ডিসেম্বর শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামান চত্বরে প্রথম দু’টি সুউচ্চ লাইট ও পোল সেট উদ্বোধন করা হয়। ৩১ ডিসেম্বর মহানগরের ভদ্রা স্মৃতি অম্লান মোড়, তালাইমারি, আলুপট্টি, সাহেববাজার জিরোপয়েন্ট, সিঅ্যান্ডবি মোড়, ঐতিহ্য চত্বর, শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামান বিভাগীয় স্টেডিয়ামের সামনের মোড়ে উদ্বোধন করা হয় এসব বাতিসেট। এ বছরের ১২ জানুয়ারি নগরীর রেলস্টেশন, মনিচত্বর, বড়কুঠি, লালনশাহ পার্ক, কোর্ট স্টেশন, আম চত্বর ও আলিফ লাম মিম ভাটার মোড়ের বাতিসেটগুলো উদ্বোধন করা হয়।

নগরীর ১৬টি মোড়ে এই উজ্জ্বল আলোর বাতি সেট স্থাপনের উদ্যোগটি সেই সময় প্রশংসিত হয়। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে সেই সংবাদও প্রকাশিত হয়।

আলোর তলায় আঁধারের অভিযোগ

এ বছরের সেপ্টেম্বর মাসে প্রথমবারের মতো এই ক্রয়প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে লিখিতভাবে প্রশ্ন ওঠে। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব বরাবর ‘অসহায় নির্যাতিত ঠিকাদারবৃন্দ’ ব্যানারে এই ক্রয়প্রক্রিয়ায় ৭ কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ তুলে চিঠি দেয়া হয়। সেখানে ক্রয়প্রক্রিয়ার প্রতিটি খুঁটিনাটি ধরে ধরে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের অভিযোগ ব্যাখ্যা করা হয়।

২৩ সেপ্টেম্বর ঢাকার প্রভাবশালী দৈনিক যুগান্তর এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে প্রথমবারের মতো অভিযোগগুলোকে প্রকাশ্যে আনে। ‘রাসিকে নজিরবিহীন অনিয়ম: ১৬ ফ্লাডলাইটে ৭ কোটি টাকার বেশি পরিশোধ‘ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়, “ফ্লাডলাইট স্থাপন এবং সহায়ক উপকরণের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে সোয়া দুই কোটি টাকা হলেও রাসিকের বিদ্যুৎ বিভাগ সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারকে ৯ কোটি ৭ লাখ ৭৭ হাজার টাকার বিল পরিশোধ করেছে। এক্ষেত্রে ঠিকাদারকে বাজারমূল্যের চেয়ে ৬ কোটি ৮৯ লাখ ৮৪ হাজার ৪৩ টাকার বেশি বিল পরিশোধ করা হয়েছে।”

প্রতিবেদনের বাকি অংশ হুবহু এমন-

“রাসিকের ১৬ মিটার উচ্চতার হাই মাস্ট পোল টেন্ডার নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হ্যারো ইঞ্জিনিয়ারিংকে কাজ পাইয়ে দিতে প্রতিষ্ঠানটির এস্টিমেট অনুযায়ী টেন্ডার আহ্বান করা হয়। আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য অনুযায়ী পুরো প্যাকেজটির মোট মূল্য দাঁড়ায় ২ কোটি ১৭ লাখ ৯৩ হাজার ৭৩৪ টাকা।

প্রতিটি আইটেমের দাম তিন থেকে চার গুণ বেশি ধরে ৯ কোটি ২৯ লাখ ৫৫ হাজার ৩৬০ টাকার টেন্ডার আহ্বান করা হয়। আর পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী একটিমাত্র দরপত্রে পুরো কাজটি হ্যারোকে দিয়ে করানো হয়।

অভিযোগ, টেন্ডারের শর্তানুযায়ী পাঁচ বছরের কাজের অভিজ্ঞতা না থাকলেও হ্যারোকে কাজটি দেয় রাসিকের বিদ্যুৎ বিভাগ। বিদেশ থেকে আমদানি করা এসব বৈদ্যুতিক সরঞ্জামাদির শিপমেন্ট ডকুমেন্ট, এলসি, বিল অব ল্যান্ডিং, শুল্ক, কর ও ভ্যাট পরিশোধ সংক্রান্ত কোনো কাগজপত্রও দাখিল করেনি হ্যারো। বিল পরিশোধে এসব জরুরি বিষয় উপেক্ষা করা হয়েছে। এছাড়া সরবরাহ ও স্থাপন করা সরঞ্জামাদির মান যাচাইয়ে টেন্ডারের শর্তানুযায়ী বুয়েট থেকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানো হয়নি।

রাসিকের বিদ্যুৎ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী রেয়াজত হোসেন বলেন, নগরীতে স্থাপিত ১৬টি হাই মাস্ট পোল বা ফ্লাডলাইট ও সরঞ্জামাদি অতি উচ্চমানের বলেই দাম কয়েকগুণ বেশি ধরা হয়েছে।

একবারের টেন্ডারে অংশ নেয়া একমাত্র ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান হ্যারো ইঞ্জিনিয়ারিংকে কাজ দেয়ায় পিপিআরের শর্ত লঙ্ঘন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, টেন্ডারে অন্য প্রতিষ্ঠান অংশ না নেয়ায় হ্যারোকে কাজটি দেয়া হয়। একাধিকবার টেন্ডার আহ্বান করার প্রয়োজন হয়নি।

হ্যারোর অভিজ্ঞতার সনদ না থাকা ও পণ্যের মান পরীক্ষার বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। হ্যারো ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের স্বত্বাধিকারী আশরাফুল হুদা টিটো দাবি করেন, টেন্ডারের সব শর্ত পূরণ করেই কাজটি তিনি পেয়েছেন। অতিরিক্ত পণ্যমূল্য নেয়া হয়নি। বাজারমূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তিনি সব পণ্য সরবরাহ ও স্থাপন করেছেন।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, চীনের তৈরি ২০ থেকে ২৫ মিটার উচ্চতার একটি হাই মাস্ট পোল বা খুঁটির সর্বোচ্চ দাম তিন হাজার মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ২ লাখ ৬১ হাজার টাকা হয়।

এর সঙ্গে শতকরা ৬১ ভাগ হিসাবে ১ লাখ ৫৯ হাজার ২১০ টাকা আমদানি শুল্ক, ক্রয়মূল্যের ওপর শতকরা ২০ ভাগ হিসাবে ৪৩ হাজার ২০০ টাকা ভ্যাট ও আয়কর, বন্দর থেকে দেশের যে কোনো স্থানে সর্বোচ্চ পরিবহন ও স্থাপন ব্যয় ৭০ হাজার টাকা এবং প্রচলিত নিয়মে শতকরা ১৫ ভাগ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মুনাফা যোগ করলে একেকটি পোল বা ফ্লাডলাইটের খরচ পড়ে সর্বোচ্চ ৫ লাখ ৭২ হাজার ৫১৫ টাকা। কিন্তু রাসিকের বিদ্যুৎ বিভাগ প্রতিটি খুঁটির জন্য হ্যারোকে ৩২ লাখ ৫০ হাজার টাকা করে পরিশোধ করেছে। প্রতিটি খুঁটিতে অতিরিক্ত বিল দেয়া হয়েছে ২৬ লাখ ৭৭ হাজার ৪৮৫ টাকা করে।

গত বছর সেপ্টেম্বরে রাজশাহী নগরীর বিভিন্ন মোড়ে হাইভোল্টেজ এলইডিসহ ১৬টি হাই মাস্ট পোল বা ফ্লাডলাইট স্থাপনে ৯ কোটি ২৯ লাখ ৫৫ হাজার ৩৬০ টাকার টেন্ডার ডাকে রাসিক।

২০১৯ সালের ৭ সেপ্টেম্বর হ্যারো ৯ কোটি ৭ লাখ ৭৭ হাজার ৭৭৭ টাকা ৭০ পয়সা দর দাখিল করে। ফ্লাডলাইটে ব্যবহৃত ২০০ ওয়াট ক্ষমতার ৩২০টি এলইডি লাইটের প্রতিটির বাজারমূল্য ১৫ হাজার ৮৭৩ টাকা হলেও টেন্ডারে ৬৫ হাজার ৫০০ টাকা দর হিসাব করে মোট ২ কোটি ৯ লাখ ৬০ হাজার টাকা উল্লেখ করা হয়। ২০০ ওয়াটের প্রতিটি এলইডির দাম ৬৩ হাজার ৮০০ টাকা করে মোট ২ কোটি ৪ লাখ ১৬ হাজার টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।

অথচ বাজারমূল্যে ৩২০টি এলইডির মোট দাম পড়ে ৫০ লাখ ৭৯ হাজার ৩৬০ টাকা। এক্ষেত্রে ঠিকাদারকে অতিরিক্ত ১ কোটি ৫৮ লাখ ৮৪ হাজার ৬৪০ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।

ফ্লাডলাইটে সংযোজিত ২০০টি ২৫০ ওয়াট ক্ষমতার এলইডির প্রতিটির বাজারমূল্য ১৯ হাজার ৩০৯ টাকা হলেও টেন্ডারে প্রতিটির মূল্য ৭৫ হাজার টাকা হিসাবে মোট ব্যয় ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা ধরা হয়। চীনা আরওএইচএস কোম্পানির তৈরি ২০০টি এলইডির মোট বাজারমূল্য ৩৬ লাখ ৬১ হাজার ৮০৪ টাকা হলেও হ্যারোকে অতিরিক্ত ১ কোটি ১১ লাখ ৩৮ হাজার ২০০ টাকাসহ এই খাতে মোট বিল পরিশোধ করা হয়েছে ১ কোটি ৪৭ লাখ ২০ হাজার টাকা।“

প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর এ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। এরপর আরও কয়েকটি সংবাদমাধ্যমেও এ সংক্রান্ত সংবাদ প্রচার ও প্রকাশ করা হয়।

আলোচনায় দুদকের তৎপরতা

বাতি ক্রয়ের প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা সমালোচনার মধ্যেই দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবিষয়ে তৎপরতা শুরু করেছে বলে খবর দেয় ঢাকার কয়েকটি সংবাদমাধ্যম।

৭ অক্টোবর কালের কণ্ঠ এসংক্রান্ত প্রতিবেদন ছাপে। যেখানে লেখা হয়-

“রাজশাহী সিটি করপোরেশনে ফ্লাডলাইট স্থাপনে দুর্নীতির অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছে দুদক। নগরীর বিভিন্ন মোড়ে ১৬টি বাতি স্থাপনের জন্য ব্যয় করা হয়েছে প্রায় ৯ কোটি টাকা—যেটি অস্বাভাবিক। এ কাজ করতে সর্বোচ্চ গুণগত মানের জিনিস দিয়ে কাজ করা হলেও তিন কোটি টাকার ওপরে ব্যয় হওয়ার কথা না। কিন্তু সেখানে অনভিজ্ঞ ঠিকাদারকে দিয়ে ব্যয় করা হয়েছে প্রায় ৯ কোটি টাকা। যেটি করতে গিয়ে অন্তত ছয় কোটি টাকা লোপাট করা হয়েছে এই করোনাকালে। এসংক্রান্ত তথ্য যাচাইয়ের জন্য গত রবিবার দুদকের তিন সদস্যের এনফোর্সমেন্ট টিম সিটি করপোরেশনে অভিযান পরিচালনা করে সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনা করেছে।

অভিযানকালে দরপত্রের শর্তানুযায়ী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হ্যারো ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পাঁচ বছরের কাজের অভিজ্ঞতার সনদ দুদককে দেখাতে পারেনি রাসিক কর্তৃপক্ষ। বিদেশ থেকে আমদানি করা বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের শিপমেন্ট ডকুমেন্ট, এলসি, বিল অব ল্যান্ডিং, শুল্ক, কর ও ভ্যাট পরিশোধসংক্রান্ত কোনো কাগজপত্রের অস্তিত্বও মেলেনি।

এ ছাড়া কাগজপত্রে দেওয়া ঠিকানায় গিয়েও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হ্যারো ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কার্যালয় পাওয়া যায়নি। কেনাকাটায় ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ায় এ বিষয়ে দুদকের পরিচালক (জনসংযোগ) প্রণব কুমার ভট্টাচার্য জানান, বিস্তারিত অনুসন্ধানের অনুমোদন চেয়ে কমিশনে প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হবে। দুদকের এনফোর্সমেন্ট টিমে ছিলেন সহকারী পরিচালক আল আমিন ও নাজমুল হুসাইন এবং পরিদর্শক আমির হোসেন।

রাসিক সূত্র মতে, এই কাজের অনিয়মের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন খায়রুল বাসার এবং বৈদ্যুতিক প্রকৌশলী রেয়াজাত হোসেন রিটো। তাঁদের দুজনের যোগসাজশে দুর্নীতিটি করা হয়।”

বেনামী অভিযোগে ‘গডফাদার ঠিকাদার’

সুনির্দিষ্ট কোনো নাম ছাড়া ‘অসহায় নির্যাতিত ঠিকাদারবৃন্দ’ ব্যানারে মন্ত্রণালয়ে এই ক্রয়প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ জানানো সেই লিখিত চিঠিতে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে গণপূর্তের জিকে বিল্ডার্সের মতো রাসিক বিদ্যুৎ বিভাগের ‘অঘোষিত গডফাদার’ বলে আখ্যা দেয়া হয়।

অভিযোগে বলা হয়, ওই প্রতিষ্ঠানের পছন্দ অনুযায়ী বিদ্যুৎ বিভাগের উন্নয়ন কাজ গ্রহণ করা হয়। এমনকি প্রতিষ্ঠানের ইচ্ছা ও চাহিদা অনুযায়ী বর্তমান রেট সিডিউল ও বাজার দর যাচাই না করে উচ্চদরে উন্নয়ন কাজের অনুমিতিকরণের অভিযোগও তোলা হয়। মন্ত্রণালয়ে দেয়া সেই অভিযোগে রাসিক’র সাবেক প্রধান প্রকৌশলী আশরাফুল হকসহ বিদ্যুৎ বিভাগের আরও কয়েকজনের নাম উল্লেখ করে দাবি করা হয়, “এদেরকে নিয়েই হ্যারোর মাফিয়াচক্র”।

ঠিকাদারের সংবাদ সম্মেলন

বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) রাজশাহী মহানগরীর কুমারপাড়া এলাকায় নিজ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন হ্যারো ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের স্বত্বাধিকারী আশরাফুল হুদা টিটো।

লিখিত বক্তব্যে তিনি দাবি করেন, তার প্রতিষ্ঠান ১৯৯১ সাল থেকে পিডিবি, আরডিএ, বিএমডিএ, রাজশাহী সিটি করপোরেশন ও বিভিন্ন পৌরসভাসহ দেশের নামকরা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ‘সুনামের সঙ্গে’ বৈদ্যুতিক কাজ করে আসছে। তিনি তার অভিজ্ঞতার সপক্ষে বলতে গিয়ে তার প্রতিষ্ঠানের সম্পাদিত ৮টি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের বৈদ্যুতিক কাজের বিবরণ দেন।

সংবাদ সম্মেলনে হ্যারো ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের স্বত্বাধিকারী আশরাফুল হুদা টিটো

উত্থাপিত অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি দাবি করেন, সংশ্লিষ্ট দরপত্র ইজিপিতে (অনলাইন) উন্মুক্ত পদ্ধতিতে আহ্বানকৃত এবং তিনি শর্ত মেনে কাগজপত্রসহ দরপত্র দাখিল করেন। কাগজপত্র ঠিক থাকায় সিটি করপোরেশনের সঙ্গে চুক্তি হয় বলে জানান টিটো।

ঠিকাদার আরও দাবি করেন, তার সরবরাহকৃত প্রতিটি পণ্যের গুণগতমান রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) পরীক্ষা করে নিশ্চিত করার পরেই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজটি সম্পন্ন হয়।

আশরাফুল হুদা টিটো তার বিরুদ্ধে ওঠা ৫ ধরনের অভিযোগও ব্যাখ্যাসহ খণ্ডন করেন। সংবাদ সম্মেলনে তিনি দাবি করেন, অভিযোগে শর্ত, কাজের অভিজ্ঞতা ও টার্নওভার না দেয়ার কথা বলা হলেও পিপিআর অনুযায়ী এ ধরনের কাজে টার্নওভারের শর্ত আরোপের কোনো সুযোগ নেই। এ ধরনের কাজে অভিজ্ঞতা তার প্রতিষ্ঠানের নেই- এমন অভিযোগের জবাবে তিনি বলেন, দরপত্র দাখিলের ক্ষেত্রে অভিযোগে বর্ণিত অভিজ্ঞতার শর্ত ছিলো না। ক্যাটালগ না দেয়ার অভিযোগের জবাবে তিনি বলেন, দরপত্রের স্পেশিফিকেশন অনুযায়ী তিনি ইজিপিতে ক্যাটালগ দাখিল করেন। দরপত্রে দাখিলকৃত অভিজ্ঞতার সনদ সংক্রান্ত অভিযোগের ব্যাপারে টিটো দাবি করেন, অভিজ্ঞতার সনদের সত্যতা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে যাচাই করা হয়েছে।

বাজারদর অনুসরন না করার অভিযোগ খণ্ডন করে হ্যারোর স্বত্বাধিকারী দেশের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের দুটি বিমানবন্দরে স্থাপিত আলোকবাতির সেটের ব্যয় ‍তুলে ধরেন। সেখানে তিনি দাবি করেন, ওই দুটি বিমানবন্দরের তুলনায় কম দরে তিনি বাতিসেট সরবরাহ করেছেন। ঠিকাদার তার দাবির সপক্ষে পিডব্লিউডি’র রেট সিডিউলের সঙ্গে তার প্রদত্ত একক দরের তুলনামূলক চিত্র সরবরাহ করেন। তাতে দেখা যায়, ৯টি মালামাল বিবরণীর মধ্যে পিডব্লিউডির ৪টির রেট সিডিউল রয়েছে। এগুলোর মধ্যে তিনটিতে ঠিকাদারের একক প্রদত্ত দর সেই রেটসিডিউলের তুলনায় কম। একটির দর সমান। সর্বোচ্চ মূল্যের হাইম্যাস পোলসহ বাকি ৫টির কোনো রেট সিডিউল পিডব্লিউডির নেই। ফলে এই ৫টির ক্ষেত্রে তুলনামূলক চিত্রও পাওয়া যায় নি।

দরপত্রে বর্ণিত কাজটি হ্যারোর হুমকির মুখে অন্য ঠিকাদাররা দাখিল করতে পারেনি এমন অভিযোগের জবাবে আশরাফুল হুদা টিটো বলেন, “পৃথিবীর যেকোনো প্রান্ত থেকেই ইজিতে দরপত্র দাখিল করা যায়। কাজেই অভিযোগটি অযৌক্তিক, অবান্তর ও হাস্যকর।”

এবং চাঁদার অভিযোগ

সংবাদ সম্মেলনে ঠিকাদার আশরাফুল হুদা টিটো দাবি করেন, একটি মহল শুরু থেকেই এই কাজের জন্য বিভিন্ন কৌশলে চাঁদা দাবি করে আসছিলো। তার সন্দেহ, সেই মহলটিই এসব অভিযোগের সঙ্গে জড়িত।

তিনি অভিযোগ করেন, রাসিক’র সাবেক প্রধান প্রকৌশলী আশরাফুল হক তার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে একলাখ টাকা দিতে বলেন। ঠিকাদার সেই টাকা দেয়ার পর আশরাফুল হক বাসা ও অফিসে ডেকে তাকে আরো টাকার জন্য চাপ দেন। ঠিকাদার বলেন, “আমি আমার বিল প্রাপ্তির পর টাকা দেবো বলে সময়ক্ষেপন করতে থাকি।”

সংবাদ সম্মেলনে তিনি সিটি করপোরেশনের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী আশরাফুল হকের একটি অডিও কথোপকথন শুনিয়ে দাবি করেন, যে সংবাদমাধ্যমে দুর্নীতির অভিযোগ প্রথম প্রকাশিত হয়, তার একজন সাংবাদিককে টাকা দেয়ার জন্য তিনি চাপ দিতে থাকেন। এই টাকা না দেয়ায় অভিযোগ করে সংবাদ প্রকাশিত হয় বলে দাবি করেন তিনি। সংবাদকর্মীদের প্রশ্নের জবাবে ঠিকাদার টিটো জানান, ওই সাংবাদিক নিজে তার কাছে টাকা চাননি। তবে সাবেক প্রধান প্রকৌশলী বারবার তার নাম বলে টাকা চেয়েছেন।

এব্যাপারে কয়েক দফা মোবাইলে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সাবেক প্রধান প্রকৌশলী আশরাফুল হক তা রিসিভ করেননি।

Berger Weather Coat