পত্রে পত্রে প্রেমের প্রতিচ্ছাপ

আমি বারো বছর ধরে এক প্রেমের পত্র লিখছি
বারোটা বছর ধরে একটু একটু করে
রূপসা ভৈরবের জলের রঙ আর মধুমতির মায়া নিয়ে
পদ্মার স্রোতধারার কুলকুল চলমান তৃষ্ণা নিয়ে
আমি লিখে চলেছি সেই প্রেমপত্র।

রাজশাহী থেকে খুলনা
সিলেট থেকে বগুড়ার সুফি সাধকের বেদীতে
মৌলভীবাজার থেকে টাঙ্গাইল হয়ে
যশোর-চিটাগং কবিতার ভাসমান নদীতে;
খানজাহানের প্রতœশহর বাগেরহাট থেকে
গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার সৌধভূমির পরশ
আর বরিশাল থেকে জীবনানন্দের আশীর্বাদ নিয়ে
নীল নীল মায়াবী জলের ঢেউ পেরিয়ে
কুয়াকাটা হয়ে কক্সবাজার
টেকনাফ থেকে সমুদ্রের অতলান্তের দ্বীপ সেন্টমার্টিন
মহেশখালির বুক চিতিয়ে দাঁড়ানো আদিনাথ চূড়ায়
সাগরের মায়াবী আর্দ্র বাতাস
বাঁকখালি আর সাগরের মোহনায় ভেসে আসা সুগন্ধি প্রেম
নীলাচলের নীল আঁচলের অভয় উচ্চতায় জয়ের আনন্দ
কপালে সিঁথির মত শঙ্খনদী—মিলনছড়া যেন প্রেয়সীর মুখ!

পত্রটি লিখছি,
কোলকাতার হুগলী নদীর পাড়ে জোড়াসাঁকোর
লালরঙা ইটের ফাঁকে ফাঁকে জমানো কাদম্বরী দেবীর নিশ্বাস
আর ভবতারিনীর পদচ্ছাপের নৈঃশব্দ্যের বিশ্বাস বুকে নিয়ে
শান্তিনিকেতনে দুপুরের রোদ মেখে ভবনে ভবনে প্রবেশ
কবিগুরুর অনন্ত উপস্থিতির বোধিসুরের আশীর্বাদী পরশ
অনতিদূরের হেঁসেল ঘরের মাছের ঝোলে জিহ্বার স্বাদ,
কাঁসার তৈজসের ঝনঝন শব্দের ছন্দ বুকে নিয়ে লিখছি—

লিখে যাচ্ছি প্রেমপত্র।
পত্র লিখতে লিখতে কু-ঝিক ঝিক ট্রেনে চেপে চলেছি
বঙ্গোপোসাগর রেখে ভারত মহাসাগরের কোল ঘেষে
পাহাড়ী মিলনের দেশ বিশাখা পত্তমের
সবুজ-নীল শিহরণে অপরূপ সূর্যের খেলা
তারপর মেরিনা, কোভালাম, থিরুপুরার পথে পথে সাগর!
পথের নিচে সবুজে সবুজে আলিঙ্গন;
জলের ঢেউ, ‘অলিভ ওয়েভ!’
তারই রঙের জলজ খেলায় পত্রে পত্রে
লিখে চলেছি প্রেমের কথা
এইসব প্রেমের কথা ভিজিয়ে নিলাম
মহাবলিপুরামের কৃষ্ণের বলের ছায়ায়
লিখতে লিখতে আকাশের পথে হিমালয় পেরিয়ে
চিঠি ছুঁয়ে দিল দিল্লীর কুতুব, দিল্লীর নিজামের ঐশ্বরিক আশীর্বাদ
রোশনী নিলো মির্জা গালিবের
মিহিসুরের ভাব ও ভবের মহাকাব্যিকতা।
দিল্লী থেকে আজমীর!
ইচ্ছে পূরণের পূর্ণতা।
দৃষ্টির মহা অনুভব!
অবাক বিস্ময় জীবন, জীবনের অনুভবে প্রতুলতা।
নীল সাগরের অলৌকিক মৌনতা।

রাজস্থানের মরুর বুক চিরে খাঁ-খাঁ পথে
বালি ও পাথরের রুদ্র অসীমতায়
ছুটে চলা আত্মসন্ধানে নাগুর শরীফের পথ।
পথের ধাবায় জল আহারের শক্তিযোগে
ক্ষুধার্থ পত্রে যুক্ত হয় প্রেম!

এই প্রতিটি যাত্রায় প্রায়োগিক প্রেরণায়
লিখে যাচ্ছি বারো বছর ধরে…
একটা যুগ লিখে লিখে পাঠালাম প্রেমিকার কাছে,
একটা যাত্রা লিখে লিখে পাঠালাম প্রেমিকার কাছে।
একটা যুগের যাত্রায় বহুযুগের প্রেম; বহু যুগের প্রেমিকা—
প্রেম তো এ সকল যাত্রায় শীতল সহযাত্রী আমার।
প্রেমিকা পত্রটি পড়ে নিলে এক নিমিষেই!

প্রেমিকাও উত্তর পাঠালো পরপরই। দেখি, এ কী!
আমারই প্রতিচ্ছাপে, অভিন্ন প্রেমে,
অভিন্ন যাত্রায়, অভিন্ন মাত্রায়
সেও লিখেছে যুগ যুগ ধরে প্রেমেরপত্র—
হাতের লেখাটা ভিন্ন শুধু।

আর তাই তো—বারো বছরের শব্দগুলো, যুগ যুগের লেখাগুলো
দু’জনের পত্রে পত্রে—জমে জমে—
সহম্র পৃষ্ঠার যে মহাগ্রন্থের জন্ম হয়েছিল,
তা ‘ভালোবাসি’ নামে একক শব্দের এক মহা মহাপত্র!

প্রচ্ছদ হিম ঋতব্রত

Berger Weather Coat