জিলিপি পাহাড়

৫১
জিলিপি পাহাড়ে ঢুকতেই রক্তজবা চেয়ে থাকে আমার দিকে, কখনও এই ফুলে ঠোঁট ভাসে, বেরিয়ে আসে ভালোবাসার কল্পিত অবয়ব! কখনও জবা জবাবও দেয় স্মৃতি উসকে দিয়ে! জবা জমিয়ে রাখে ভালোবাসার রঙ!
যেই না পাহাড়ে একটু ভেতরে প্রবেশ করবো পাখিদের উদ্বোধনী সংগীতে স্বাগতম জানাবে; এতো কিচিরমিচির শব্দ তবুও প্রত্যেক পাখির স্বতন্ত্র সুর কানে প্রবেশ করে স্বমহিমায় আর বিবেকের গানে প্রকাশ করে আলাদা অস্তিত্ব আলাদা স্বর!
প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে পাহাড়ের গল্পগুলো বৃক্ষের বংশ পরম্পরায় একটু প্রকাশ্যে একটু লুকিয়ে দেহের গোড়ায় জমা রাখে; মাটিকে বৃক্ষ স্বভাবজাত কৌশলে সমযোজী বন্ধনে আঁকড়ে ধরে যাতে গল্পটা প্রলম্বিত হয়ে পাহাড়ের খাঁজে-ভাঁজে উৎকীর্ণ থাকে…
বৃক্ষের মতো পাহাড়ের বাসিন্দাদের সংবেদন বেশি কিন্তু প্রতিক্রিয়া খুবই মন্তর। বৃক্ষের নিঃসৃত কষই তার অশ্রুপাত; বৃক্ষ বেশি বেদনা প্রকাশ করে না, দেহে বাড়তেও দেয় না তাতে পাতা ঝরে যাবে, ব্লটিং পেপারের মতো শোষণ করে মূলে প্রেরণের প্রেক্ষিতে মাটিছাপা দিয়ে রাখে যন্ত্রণাসব!
পাহাড়ের কাছে আছে মানুষের জীবনচক্রের ব্লু প্রিন্ট; উত্থান-পতনে আঁকাবাঁকা পথও পার হতে হয়, উপত্যকায় জিরিয়ে নিয়ে উঠতে হয় ঢালু খাত, পাবো-হারাবো পাতা জন্মানো ও ঝরার মতো, ঝড়-বাতাসে ধাক্কা খেলেও কঠিন সময়ে স্থির থাকা। তবুও পাহাড় ঘুমায় না জীবন থামে না, পাখির গান বাজে, প্রজাপতি দৌড়ে, বুনোফুলের ঘ্রাণে পাহাড় নিজেই নার্সিসাস!

৫২
বৃক্ষ ত্রিকালদর্শী কিন্তু ব্যক্ত করে না শুধু পুস্তকে লিখিত ধারাভাষ্যের মতো শরীরে বহন করে ঘটনার বিবরণ। নাগরিক বৃক্ষের শরীরে ধুলো-কালি জমতে জমতে কিছু কথা মুছে যায় হয়তো কিন্তু বনের বৃক্ষ স্বকীয় সবুজের আভায় ভোলে না কিছুই!
মানুষ ও বৃক্ষের যৌথক্রন্দন দেখেছিল ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল বঙ্গোপসাগরের উপকূলের অধিবাসী; ঘূর্ণিঝড়ে গাছের সঙ্গে মানুষের মেরুদণ্ড ভেঙে যায়। উভয়েই ঘরহারা, লাশ হয়ে ভেসে যায়। সেদিনের সেই ধ্বংসযজ্ঞের সাক্ষ্য বহন করে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৮০ ফুট উঁচু জিলিপি পাহাড়ের প্রাচীন বটবৃক্ষের মাটি আঁকড়ে থাকা জমিদারী গোড়ার অবশেষ! সিডর যায় আইলা আসে, মহাসেন যায় রোয়ানু আসে; নান্দনিক নামের ঘূর্ণিঝড় মানুষ ও বৃক্ষের ছন্দ থামিয়ে দিতে কার্পণ্য করে না একবিন্দু।
তবুও আশা জাগানিয়া সবুজের আবাহনে মানুষ আগুয়ান হয়, বৃক্ষ আশ্বাস দেয়-আশ্রয় দেয়; মহামতি গৌতমের জন্মের সময় তাঁর মা একটি বৃক্ষের কাছে আশ্রয় নিয়েছিলেন আর আলোকপ্রাপ্ত হয়ে বুদ্ধত্ব লাভ করেন বৃক্ষের ছায়ায়। বৃক্ষই শিক্ষা দেয় নীরব সাধনায় ফলে মোক্ষম দাওয়াই।
বৃক্ষ, গুল্ম ও তরুর কথা মর্মে মর্মে উপলব্ধিতে আনে মরুর বাসিন্দা, তাপে পুড়ে যায় তাদের গা-পা আর প্রার্থনা করে সমুদ্র, আকাশ ও বৃক্ষের কাছে, পরান জুড়াতে চায় শীতল মায়ায়…
বৃক্ষের বর্ণনা কিংবা অরণ্যের অনুবাদ যিনি করতে পারেন তিনিই প্রকৃত বৃক্ষসখা তখন দ্বিজেন শর্মার কথা খুবই মনে পড়ে…

৫৩
আমিই ক্ষমা চেয়ে নিলাম বৃক্ষের কাছে মৃত্যুর পূর্বেই; করোনা মহামারিকালে অকস্মাৎ মৃত্যু হানা দিলে সময় পাবো না জানাতে আমার নিবেদন। অপরাধের তালিকা জানি আমি আর বৃক্ষ। তবুও প্রকাশ্যে বলি, আমার প্রাসাদ কক্ষ বানিয়েছি পাহাড় কেটে জলজ্যান্ত বৃক্ষনিধনে। আমার মৃত্যু পরবর্তী শোকসভায় সন্তান হয়তো আবেদন জানাবে মানুষের কাছে পিতার বকেয়া ঋণ বা মনোকষ্টের কারণ হলে ক্ষমা করে দিতে কিন্তু বৃক্ষের কথা মনে নাও থাকতে পারে। কৃতজ্ঞতা জানিয়ে মনোভাব জানালাম দাতা বৃক্ষের সমীপে; নতশিরে দাঁড়িয়ে আছি কিন্তু কখনও বৃক্ষের ব্যস্ততা কমে না, অক্সিজেন যোগানো, ছায়া দেয়া আরও কতো কী কী! কর্মী বৃক্ষের খেয়ালেই নেই আমি যে জোড়হাতে এসেছি সম্মুখে কিন্তু আমি জানি ক্ষমা করা অরণ্য জাতকের সহজাত প্রবৃত্তি; বৃক্ষের কাছে ঘাতক যা পূজারীও তা যেন বৃক্ষেরা নির্বাণপ্রাপ্ত হয়ে জাগতিক অভিব্যক্তি বিসর্জন দিয়েছে ঝরা পাতায়!
বৃক্ষ বা বনের ঋণ শোধ করার সামর্থ্য নেই জেনেও বারংবার মিনতি জানাই, আমরা কৃতঘ্ন ও হন্তারক জানিও কিন্তু বুকে রেখো আমাদের উত্তরপুরুষদের; ছায়া দিয়ে রেখো, দিও না শ্বাসকষ্ট তাদের!
পরিশেষে একটু জানিয়ে রাখি, অজান্তে আরও কিছু ঋণ থাকতে পারে জিলিপি পাহাড়ে শীর্ষের প্রাচীন বৃক্ষের কাছে, যার ছায়ায় আত্মগত হয়ে বহুদিন নিয়েছিলাম জীবনের পাঠ।
বৃক্ষের কাছে ঋণী রয়ে গেলাম…

প্রচ্ছদ রাজিব রায়

Berger Weather Coat