গরুপাচারের হোতা এনামুল

।। বার্তাকক্ষ প্রতিবেদন ।।

ভারতের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা ব্যুরো সিবিআই’র চলমান গরু পাচার বিরোধী অভিযানে দেশটিতে এখন আলোচিত নাম বিশু ওরফে এনামুল। কয়েকজন ঊর্ধ্বতন বিএসএফ কর্মকর্তাসহ বড় বড় সব চাঁইদের কথা আলোচনায় এলেও তাদের সবাইকে ম্যানেজ করে পাচারের ‘গডফাদার’ হয়ে উঠেছিলেন এই এনামুল।

ভারতের জি চব্বিশ ঘণ্টার খবরে বলা হয়েছে, কলকাতার কয়েকটি চিহ্নিত রেস্তোরাঁয় চাচক্রে এনামুলের সঙ্গে মিলিত হতেন অভিযুক্ত বিএসএফ ও শুল্ক কর্মকর্তারা। সেখানেই গরু পাচারের সব বন্দোবস্ত ও অর্থের লেনদেন হতো। সিবিআই এখন ওইসব রেস্তোরাঁর সিসি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করছে।

পড়ুন: গরু চোরাচালানে বিএসএফ-কাস্টমস যোগ, ভারতে তদন্তে গোয়েন্দারা

সিবিআই’র একটি সূত্র জানায়, প্রাথমিক তদন্তে এনামুলের সঙ্গে শক্ত যোগাযোগ রেখে বাংলাদেশে গরু পাচারের এই ব্যবসা পরিচালনা করতেন, এমন বেশ কয়েকজনের তথ্য তারা পেয়েছেন। এদের মধ্যে কয়েকজন রাজশাহী অঞ্চলের।

আনন্দবাজার পত্রিকা জানায়, ২০১৫ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে বড় চাঁইদের ম্যানেজ করে এনামুলের সিন্ডিকেট গরু পাচার থেকে কয়েক শ কোটি টাকা কামিয়ে নেয়।

সিবিআই সূত্রের বরাত দিয়ে কলকাতার বাংলা পত্রিকাটি আরও জানায়, মেসার্স হক ইন্ডাস্ট্রিজ নামে একটি কোম্পানি খুলে পাচারের টাকা অন্য ব্যবসায় খাটিয়ে ‘সাদা’ করা শুরু করে এনামুল। ওই কোম্পানিতেই চাকরি করতেন পাচারে অভিযুক্ত এক বিএসএফ কমান্ডান্ট-এর ছেলে। এরপর তৈরি হয় জেএইচএম এক্সপোর্ট নামে অন্য একটি কোম্পানি। তৈরি হয় জেএইচএম গ্রুপ অফ কোম্পানিজ। শাখা খোলা হয় বাংলাদেশ এবং দুবাইতে। সিবিআই কর্মকর্তাদের দাবি, ওই কোম্পানিগুলো সবটাই ‘আইওয়াশ’। গরু পাচারের কালো টাকা ভারতের বাইরে পাঠাতে ব্যবহার করা হয়েছে ওই কোম্পানিগুলিকে।

লালগোলায় এনামুলের বাড়ি

সিবিআই’র একটি সূত্র জানায়, বাংলাদেশে জেএইচএম গ্রুপের নামে এনামুলের ব্যবসা পরিচালনা করে আসছেন মেহেদী ও মুকুল নামের দুই ব্যক্তি। প্রথম জন চট্টগ্রাম অঞ্চলের ও দ্বিতীয়জন রাজশাহীর।

এবছরের ১৪ জানুয়ারি ভারতের ইউনাইটেড নিউজ অব ইন্ডিয়া এক খবরে জানায়, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ওই সময় কলকাতার বেন্টিক স্ট্রিট, আটঘর, এম জি রোড, ঠাকুর রোড, ক্লাইভ রোডসহ একযোগে ১২ স্থানে অনুসন্ধান চালায় গোয়েন্দাদল। সেই সময় জেএইচএম গ্রুপের অ্যাকাউন্টবিহীন লেনদেনের তথ্য মেলে। ভারতের ওই গণ্যমাধ্যমে আরো বলা হয়, দুবাই ও বাংলাদেশভিত্তিক কিছু ব্যবসায়ীর সঙ্গে মিলে অবৈধ এসব কাজ করে যাচ্ছে সিন্ডিকেটটি।

পড়ুন: বিএসএফ’র ভূমিকা নিয়ে বিজিবির তোলা প্রশ্নই যথার্থতা পাচ্ছে!

দেশটির শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগ ডিরেক্টর অব রেভিনিউ ইন্টেলিজেন্স (ডিআরআই) জেএইচএমের রুদ্ধে হাতে পেয়েছে চাঞ্চল্যকর বেশ কিছু তথ্য। গোয়েন্দা সূত্র জানায়, দামি জামাকাপড় কলকাতা থেকে চেন্নাই হয়ে দুবাই পাঠানোর নামে দেওয়া হয় কম দামি কাপড়সহ বিভিন্ন জিনিস। গোয়েন্দাদের কাছে খবর আসে, কাগজে-কলমে দামি জামাকাপড় দেখিয়ে তাঁরা রপ্তানি করেন সস্তা কাপড়। যে দাম নথিতে দেখানো হয়েছে তার চেয়ে আসল দাম ছিল ৫০ গুণ কম। এভাবেই তাঁরা ভারত থেকে দুবাইয়ে অর্থপাচার করে গেছেন। অভিযোগ রয়েছে, রপ্তানি কাগজ দেখিয়ে ভারত সরকারের কাছ থেকে ২০১৬ সালের আগস্ট ও ডিসেম্বরের মধ্যে প্রায় দুই কোটি টাকা এবং ২০১৭ সালে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে প্রায় তিন কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছেন।

ভারতের গোয়েন্দা সূত্র আরও জানায়, বাংলাদেশে জেএইচএম গ্রুপের তৎপরতায় মেহেদীর পাশাপাশি যে মুকুলের নাম আলোচনায় এসেছে, তার বাড়ি রাজশাহী মহানগরীতে। গরু পাচারের মূল হোতা এনামুলের ব্যবসা বৃহত্তর রাজশাহী অঞ্চলে তার মাধ্যমেই নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে। সম্প্রতি মুকুল এই সিন্ডিকেটের ব্যবসার অর্থ তার নামে স্থানীয় ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছে বলেও গোয়েন্দাদের হাতে খবর আছে। মুকুল পেঁয়াজ ও পাথর আমদানির মাধ্যম হিসেবে জেএইচএম ইম্পোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট ও হক এন্টারপ্রাইজ নামের যে দুটি প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করে, সেগুলো এমানুলের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান। তদন্তে মুকুলের সম্পৃক্ততার বেশ কিছু নথিপত্রও গোয়েন্দারা হাতে পেয়েছেন।

আনন্দবাজার পত্রিকা জানায়, কলকাতার বেন্টিঙ্ক স্ট্রিটের এমকে পয়েন্টে জেএইচএম গ্রুপ অফ কোম্পানিজের কর্পোরেট দফতর। ওই ঠিকানাতেই রয়েছে হক ইন্ডাস্ট্রিজ প্রাইভেট লিমিটেড এবং এ বছর তৈরি এনামুলের নয়া কোম্পানি ইএম ট্রেডার্স প্রাইভেট লিমিটেড। শেষের দু’টি কোম্পানিরই ডিরেক্টর হিসেবে রয়েছে মহম্মদ এনামুল হকের নাম।

ভারতের সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, এরই মধ্যে এনামুল গা ঢাকা দিয়েছেন।

Berger Weather Coat