সৈয়দ শামসুল হক (জন্ম: ২৭ ডিসেম্বর ১৯৩৫, মৃত্যু: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৬)। তিনি নানা বিশেষণে পাঠক-সমালোচকের কাছে পরিচিত। সব্যসাচী লেখক পরিচয়েই সুনাম। প্রায় ছয় দশকেরও বেশি তার সাহিত্যিক জীবন। কবিতা, গল্প, উপন্যাস, ছোটগল্প, নাটক, অনুবাদ মিলিয়ে বইয়ের সংখ্যা শতাধিক। ছোটদের জন্যও লিখেছেন। অসংখ্য চলচ্চিত্রের কাহিনি ও সংলাপ রচয়িতা সৈয়দ শামসুল হকের কালজীয় গানের সংখ্যাও অনেক। কৈশোরেই দুই লাইনের পদ দিয়ে লেখার শুরু। বর্ণিল ও বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী সৈয়দ শামসুল হক মৃত্যুর আগ পর্যন্ত লেখার মধ্য দিয়ে সাহিত্যের সবশাখাতেই নিজেকে উজ্জ্বল করে তুলেছেন। সাহিত্যের সব শাখাতেই সোনা ফলিয়েছেন। কবিতায় তার খ্যাতি ঈর্ষণীয়। সৈয়দ শামসুল হকের প্রথম কবিতার বই প্রকাশিত হয় ১৯৫৯ সালে। ‘বুনোবৃষ্টির গান’ নামের বইটি কবিতার পাঠকের সঙ্গে সেতু গড়ে তুলতে পারেনি। কারণ প্রকাশ হলেও বইটি বাজারে আসেনি। এরপর একটু বিরতি দিয়ে তার দ্বিতীয় কবিতার বই প্রকাশিত হয় ১৯৬১ সালে। ‘একদা এক রাজ্যে’ কাব্যগ্রন্থের মধ্য দিয়ে কবিতার পাঠকের কাছে তিনি উপস্থিত হন।

শুরু থেকেই সৈয়দ শামসুল হক কবিতায় মনোজাগতিক বিষয়ের সঙ্গে লোকায়ত বাংলাকে মিলিয়ে দিতে চেয়েছেন। দিতে চেয়েছেন গ্রামীণ জীবনকে আলাদা দ্যোতনা। সীমাবদ্ধ পরিসর থেকে বেরিয়ে এসে ইতিহাস-ঐতিহ্যকে উজ্জীবিত ও প্রাণদীপ্ত করার যে সূচনা তিনি সাহিত্যের অন্য শাখায় শুরু করেছিলেন, কবিতায়ও তা করেছেন অনলসভাবে। মানুষের প্রত্যাশা-প্রাপ্তির মাঝে যে বিরোধ, যে বেদনা ও বিক্ষোভ; তাকেই নিজের পারিপার্শ্বিকতার ভেতর থেকে তিনি খুঁজে ফিরেছেন। ফলে দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থে ‘একদা এক রাজ্যে’ তিনি যে অভিজ্ঞতা ও জীবনের কথা হাত ধরে তুলে এনে দেখিয়ে দিয়েছেন, সেই পথ পরবর্তীসময়ে অন্তর্গত এবং বহির্গত উভয় পর্বেই স্থাপন করেছেন। যেন তার কবিতা বরবারই হয়ে উঠেছে অনুভবের চেতনালব্ধ রূপ।

সৈয়দ শামুসল হক প্রতিনিয়ত নিজেকে পাল্টেছেন। রূপান্তর ঘটিয়েছেন। জীবনভাবনার অনুরণনে আলোড়িত হয়ে আশা-নিরাশার বহুরূপী রূপকে ধারণ করেছেন। তাই তার কবিতা জীবন থেকে কখনোই মুখ ফিরিয়ে থাকেনি।
মাঝে মাঝে মনে হয় স্বপ্নগুলো আসলে নৌকো
এই দুঃখ দরিদ্র দীঘিতে অন্যপারে
শৈশবের বাড়ীতে ফিরে যাবার যান; আর কিছু নয়।
তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘বিরতিহীন উৎসব’-এ বর্ণিত এই যাত্রা পথে জীবনের বিভিন্ন রূপ প্রত্যক্ষ করেছেন সৈয়দ শামসুল হক। স্মৃতির সেতু বেয়ে নির্মাণ করেছেন নতুন ভুবন। যা ঠুনকো কোনো শিল্পবোধে আক্রান্ত নয়। সেখানে আত্মপ্রতারণা নেই। তা কোনো জীবনবিচ্ছিন্ন পঙ্ক্তিমালাও নয়। ফেলে আসা গ্রামের সঙ্গে প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত পরিস্থিতিকে তিনি মিলিয়ে নিতে চেয়েছেন। তাতে কোনো আয়োজনই কৃত্রিম হয়ে ওঠেনি। জীবনবিমুখ কোনো সুর নির্মাণ করেনি।

সৈয়দ শামসুল হক কবিতা রচনার দীর্ঘপথে বার বার বাঁকবদল করেছেন। নিজেকে, নিজের কবিমনকে শানিত করেছেন। কবিতার বাঁক বদলের পর্বে তার সবচেয়ে স্মরণীয় কীর্তি ‘পরানের গহীন ভিতর’। এই কাব্যগ্রন্থে তিনি নিজেকে অতিক্রম করে গেছেন, পেছনে ফেলে আসা সময়ের রূপান্তরের মধ্য দিয়ে। ১৯৮১ সালে প্রকাশিত এই কাব্যগ্রন্থটির ভূমিকায় তিনি নিজেই বলেছেন, ‘এই সনেটগুলো লিখতে গিয়ে বার বার আমি অনুভব করেছি আমার পেছনে অজানা অচেনা লোককবিদের উপস্থিতি এবং আমি একজন খেলোয়াড়ের আনন্দ পেয়েছি তাঁদের সঙ্গে লড়াই করে, আমার কালের এবং আমার অস্তিত্বের অভিজ্ঞতা এহেন বাক্যগঠনরীতি, উচ্চারণ-সুর ও ঝোঁক এবং লৌকিক অনুষঙ্গের ভেতরে প্রসৃত করে দিতে সক্ষম অথবা ব্যর্থ হয়ে।’

‘পরানের গহীন ভিতর’ কাব্যগ্রন্থে সৈয়দ শামসুল হকের তেত্রিশটি কবিতা রয়েছে। ১৮ মাত্রায় লেখা প্রত্যেকটি কবিতাই এক একটি সনেট। হৃদয়ের চিরন্তর অনুভূতিমালার যে প্রকাশ সনেটগুলোতে উঠে এসেছে, যে অন্তরঙ্গ কথামালায় জীবন এবং প্রেমকে তিনি এখানে উপস্থিত করেছেন, তা স্বতন্ত্র স্বর হয়েই চিহ্নিত হয়নি, বরং পাঠকপ্রিয়তা এবং শিল্প উপাদানেও হয়ে উঠেছে অতুলনীয়। কাব্যগ্রন্থের শুরুতেই তিনি পাঠককে শোনান:
জামার ভিতর থিকা যাদুমন্ত্রে বারায় ডাহুক,
চুলের ভিতর থিকা আকবর বাদশার মোহর,
মানুষ বেবাক চুপ, হাটবারে সকলে দেখুক
কেমন মোচর দিয়া টাকা নিয়া যায় বাজিকর।
চক্ষের ভিতর থিকা সোহাগের পাখিরে উড়াও,
বুকের ভিতর থিকা পিরীতের পুন্নিমার চান,
নিজেই তাজ্জব তুমি একদিকে যাইবার চাও
অথচ আরেক দিকে খুব জোরে দেয় কেউ টান।
সে তোমার পাওনার এতটুকু পরোয়া করে না,
খেলা যে দেখায় তার দ্যাখানের ইচ্ছায় দেখায়,
ডাহুক উড়াইয়া দিয়া তারপর আবার ধরে না,
সোনার মোহর তার পড়ে থাকে পথের ধুলায়।
এ বড় দারুণ বাজি, তারে কই বড় বাজিকর
যে তার রুমাল নাড়ে পরানের গহীন ভিতর।।
(পরানের গহীন ভিতর: ১)

ফেলে আসা সময়ের কাব্যভাষাকে আশ্রয়কে করে আধুনিক কবিতার রীতি-প্রকরণকে মেনে নিয়েই তিনি যখন এক নতুন দিগন্তের দিকে পাঠককে আকৃষ্ট করেন, তখন সেখানে সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে শব্দের এক বড় বাজিকরের শৈলী। যেখানে বর্ণনার ভেতর দিয়ে, প্রতীক, রূপক আর চিত্রকল্পের অসামান্য সামঞ্জস্যের ভেতর দিয়ে ফুটে উঠতে থাকে সংবেদনশীল মানুষের প্রাণের আকুতি। একজন কবি, যিনি প্রকৃতি ও মানুষকে দেখছেন নিবিড়ভাবে, যিনি তার অস্তিত্বকে, সৌন্দর্যমুগ্ধ মানুষের বিস্ময়াবেগকে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন। যেখানে জীবন-মৃত্যু, আশা- নিরাশা, প্রেম-বেদনা সমান্তরাল হয়ে উঠতে থাকে। বাঙালির চিরচেনা জগৎ, যা নগরবাস্তবতার ছোবলে হারিয়ে যেতে বসেছে, কিন্তু বুকের ভেতরে এখনো মানুষ খুঁজে ফেলে ভিন্নতার ছোঁয়া, সেই অনুভবেদ্য জগৎকেই প্রথানুসরণের মধ্য দিয়ে সৈয়দ শামসুল হক ভাষায় রূপ দান করেছেন। যেন পাঠক কাব্যগ্রন্থটি পাঠের মধ্য দিয়ে অনায়াসে ঢুকে পড়তে পারে এক নস্টালজিয়ার ভেতরে। খুঁজে নিতে পারে নিজের অন্তরের ব্যথা। যে নিসর্গকে পেছনে ফেলে আধুনিকতার পেছনে, যন্ত্রসভ্যতার হাতছানিতে ছুটে চলতে হয়, তা তীক্ষ্ণ হয়ে স্মরণ করিয়ে দিতে থাকে অস্তিত্বকে।

জীবনাভিজ্ঞতার যে অন্তর্গত শক্তি, যাকে ধারণ করে আবর্তিত হতে থাকে মানুষের চিন্তা ও চেতনের জগত। সেই বিশাল সঞ্চরণশীল জগকে একীভূত করে তুলেছেন সৈয়দ শামসুল হক। ফলে একইসঙ্গে ‘পরানের গহীন ভিতর’ কাব্যগ্রন্থের ভেতর দিয়ে নির্মিত হয়েছে বড় ক্যানভাসের ছবি। চিত্রকরের দৃষ্টি দিয়ে, তিনি এখানে ভাষাকে শাসন করেছেন। যাতে কাব্যগ্রন্থটি ব্যতিক্রমী অভিধায় চিহ্নিত হয়েছে।
আমি কার কাছে গিয়া জিগামু সে দুঃখ দ্যায় ক্যান,
ক্যান এত তপ্ত কথা কয়, ক্যান পাশ ফিরা শোয়,
ঘরের বিছান নিয়া ক্যান অন্য ধানখ্যাত রোয়?
অথচ বিয়ার আগে আমি তার আছিলাম ধ্যান।
আছিলাম ঘুমের ভিতরে তার য্যান জলপিপি,
বাঁশির লহরে ডোবা পরানের ঘাসের ভিতরে,
এখন শুকনা পাতা উঠানের পরে খেলা করে,
এখন সংসার ভরা ইন্দুরের বড় বড় ঢিপি।
মানুষ এমন ভাবে বদলায়া যায়, ক্যান যায়?
পুন্নিমার চান হয় অমাবস্যা কিভাবে আবার?
সাধের পিনিস ক্যান রঙচটা রদ্দুরে শুকায়?
সিন্দুরমতির মেলা হয় ক্যান বিরান পাথার?
মানুষ এমন তয়, একবার পাইবার পর
নিতান্ত মাটির মনে হয় তার সোনার মোহর।।
(পরানের গহীন ভিতর: ৪)

শিল্পের ভেতর দিয়ে সৈয়দ শামসুল হক মানুষের উপলব্ধিকে নিবিড়ভাবে স্পষ্ট করে তুলেছেন। অতীতের আয়নায় ভবিষ্যতকে যেমন তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন, তেমনিভাবে চিরন্তন জিজ্ঞাসাকেও আশ্চর্য শক্তিমত্তায় দেখিয়ে দিয়েছেন। ‘যা পাই তা চাই না, আর যা চাই তা পাই না’—এই যে মানবমনের চিরন্তর মীমাংসিত বিষয়, মানবীর মুখের কথায়, তার রক্তক্ষরণের ভেতর দিয়ে ব্যক্তিগত সেই স্বরকেও তিনি করে তুলেছেন সবার।
আমারে যেদিন তুমি ডাক দিলা তোমার ভাষায়
মনে হইল এ কোন পাখির দ্যাশে গিয়া পড়লাম,
এ কোন নদীর বুকে এতগুলা নায়ের বাদাম,
এত যে অচিন বৃক্ষ এতদিন আছিল কোথায়?
আমার সর্বাঙ্গে দেখি পাখিদের রাতির পালক,
নায়ের ভিতর থিকা ডাক দ্যায় আমারে ভুবন,
আমার শরীলে য্যান শুরু হয় বৃক্ষের রোপণ,
আসলে ভাষাই হইল একমাত্র ভাবের পালক।
তাই আমি অন্যখানে বহুদিন ছিলাম যদিও,
যেদিন আমারে তুমি ডাক দিলা নিরালা দুফর,
চক্ষের পলকে গেল পালটায়া পুরানা সে ঘর,
তার সাথে এতকাল আছিল যে ভাবের সাথীও।
এখন আমার ঠোঁটে শুনি আমি অন্য এক স্বর,
ভাষাই আপন করে আর সেই ভাষা করে পর।।
(পরানের গহীন ভিতর: ২৩)

সৈয়দ শামসুল হক লোককবিদের সঙ্গে লড়াইয়ের আনন্দের কথা বলেছেন, লোককবিতার সুর, উচ্চারণ ও ঝোঁককে অনুসরণের কথা বলেছেন, লৌকিক অনুষঙ্গের ব্যবহারের মধ্য দিয়ে মাটিগন্ধী করে তুলেছেন পরানের গহীন ভিতরের উপলব্ধিমালাকে। লোক-ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিক মনকে যেভাবে তিনি কবিতার বিষয়বস্তু করে তুলেছেন, তা বাংলা কবিতার ভাণ্ডারে চেতনা ও প্রকরণের দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। জৈবিক চাহিদা ও সত্যকে যেভাবে তিনি ঐতিহ্যভাবনার সঙ্গে মিলিয়ে, চিরন্তন অনুভূতিমালার ভেতর দিয়ে সচকিত করে তুলেছেন, তাকে নতুনত্ব বলেই অভিহিত করা যায়। যদিও বাংলা কবিতায় সৈয়দ শামসুল হকের সময়েই এরকম দৃষ্টান্ত আরো স্থাপিত হয়েছে, তবে সেক্ষেত্রে সৈয়দ হকের স্বাতন্ত্র্যতা তিনি বাংলার ঐহিত্যশাসিত হয়েই থেকেছেন। দৃশ্য বা বর্ণনার প্রয়োজনে ঐতিহ্যের বাইরে থেকে শব্দ এবং অনুভূতিমালা সংগ্রহের দিকে হাত বাড়াননি। শব্দের অন্তর্গত সত্যকে উপলব্ধি করার যে অসামান্য শক্তি তিনি সঞ্চয় করেছেন, ভাবনার সঙ্গে মিলিয়ে শব্দচয়নের যে আশ্চর্য সমন্বয় ঘটিয়েছেন, তার বৈচিত্র্য অন্বেষণই অনেককালের প্রেরণা হয়ে থাকবে।

Berger Weather Coat