বলিউডে মোদি

।। সিদ্ধার্থ ভাটিয়া ।।

১৯৩৩ সালে, ভীষণভাবে ইহুদিবিদ্বেষী নাৎসি প্রচারমন্ত্রী জোসেফ গোয়েবলস জার্মান চলচ্চিত্র পরিচালক ফ্রিটজ ল্যাংকে তাঁর অফিসে আমন্ত্রণ জানান। সেই সময় ল্যাং সম্ভবত জার্মানির সবচেয়ে বিখ্যাত পরিচালক ছিলেন, তিনি সদ্য মেট্রোপলিস নির্মাণ করেছেন, যার উপজীব্য এক কল্পিত পৃথিবী ও শ্রেণি বিভাজন।

কম্যুনিস্ট এজেন্ডাকে ঠেলার মতো একটি চলচ্চিত্র হিসাবে অনেকেই এটিকে দেখেছিলেন। ল্যাং জানতেন যে এর ভেতরে নাৎসিপন্থী একটি বার্তা লুকিয়ে আছে, মূলত তার চিত্রনাট্যকার স্ত্রী থিয়া ফন হার্বুর কারণে। অবশ্য বহু বছর পর তাকে আমরা এই চলচ্চিত্রটি প্রত্যাখ্যান করতে দেখি।

গোয়েবলস মেট্রোপলিসকে পছন্দ করেছিলেন। ল্যাংয়ের জন্য সোজাসাপ্টা প্রস্তাব করেছিলেন, নাৎসিরা চায় তিনি একটি ‘জাতীয়তাবাদী সমাজতান্ত্রিক চলচ্চিত্র’ বানাবেন এবং সম্ভবত রাষ্ট্রের চলচ্চিত্র প্রযোজনা ইউনিটেরও দায়িত্ব নেবেন।

ল্যাং যেমন বলেছেন, সেদিন তিনি বাড়িতে এসে  প্যারিসে যাত্রা করেন। ১৯৫০ এর দশকের শেষাবধি আর কখনও তিনি জার্মানি ফিরে আসেননি। ততদিনে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পরিচালক হিসেবে খ্যাতি পেয়েছেন।  দ্য বিগ হিটের মতো ক্লাসিক তৈরি করেছিলেন।

সিদ্ধার্থ ভাটিয়া

সিদ্ধার্থ ভাটিয়া ভারতের দ্য ওয়্যারের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। তিনি মুম্বাইয়ের একজন সাংবাদিক এবং লেখক। তিনি সেই সম্পাদকদের মধ্যে ছিলেন যারা ২০০৫ সালে ডিএনএ চালু করেছিলেন। তিনি এর সম্পাদকীয় এবং মতামত বিভাগটি পরিচালনা করতেন। তিনি রাজনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতি নিয়ে লিখে থাকেন। সমসাময়িক বলিউড নিয়ে তার এই লেখাটি দ্য ওয়্যার থেকে ভাষান্তরিত।

নাৎসিরা পাত্রবদল করলো। প্রধানত অভিনেত্রী-পরিচালক লেনি রিফেনস্টাহলকে কাজে নামানো হলো  যিনি হিটলারের দুর্দান্ত প্রশংসক ছিলেন এবং তিনি অনেকগুলি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিলেন। এর মধ্যে দুটি ক্লাসিক ডকুমেন্টারি হিসাবে বিবেচিত হয়- ট্রায়াম্ফ অব দ্য উইল এবং অলিম্পিয়া।

বিশ্বের অন্য রাষ্ট্রপরিচালকদের মতো সিনেমা নাৎসিদেরও খুব আগ্রহী করেছিল। জনগণের ধারণার আকার দেওয়ার ক্ষেত্রে এর অপরিসীম মূল্যটি জেনে তারা সোভিয়েতদের মতো জাতীয় ইস্যু তৈরির জন্য এটিকে বেছে নিয়েছে। আবার সরকারের দৃষ্টিকোণ বা আদর্শের পক্ষে যায় না এমন বিষয়গুলোর বিরোধিতার ক্ষেত্রে কাজে লাগিয়েছে।

ফিল্মের লোকদের খানিকটা উদারপন্থি হিসেবেই দেখা হয়, খানিকটা বামঘেঁষা হিসেবেও, সে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা ভারত যেখানেই হোক না কেন। সৃজনশীল লোকেরা মুক্তচিন্তা এমনকি বোহেমিয়ানও থাকে; তাদের কী করা উচিত তা বলা যায় না, অবশ্যই সরকার বা কোনও রাজনৈতিক দলের তো নয়। হিন্দি ছায়াছবি বড় পরিসরে প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গেই প্রতিফলিত করেছে। এটি প্রায়শই রক্ষণশীল রাজনীতিবিদদের কষ্ট দেয়। যেমন হলিউডের অনেক কাজকেই পর্যায়ক্রমে ওয়াশিংটনের রাজনীতিবিদরা ‘পক্ষপাতমূল ‘ বলে নিন্দা করেছেন। পক্ষপাতিত্ব, যদি তা নাও হয়, তবে বাণিজ্যিকভাবে কার্যকর চলচ্চিত্র নির্মাণের পাশাপাশি এমন অনেকগুলি চলচ্চিত্র রয়েছে যা বিভিন্ন পক্ষের ঝান্ডা তুলতে ব্যবহৃত হয়েছে। একইভাবে, রবার্ট ডি নিরো থেকে মেরিল স্ট্রিপ থেকে শুরু করে জর্জ ক্লুনি পর্যন্ত ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে খোলামেলা ও শক্তভাবে কথা বলেছেন।

বলিউডের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে এমন কণ্ঠস্বর খুব কমই রয়েছে। অনুরাগ কাশ্যপ এবং প্রকাশ রাজ ব্যতিক্রম। তামিলনাড়ু ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে অবশ্য এমন অনেক নাম রয়েছে। অবাক হওয়ার মতো বিষয় নয়, রাজনীতিবিদরা তাদের লাইনে আনার উপায় খুঁজতে থাকেন। ভারতে, বলিউডের অনেক মানুষকে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট বা টেলিভিশন চ্যানেলের মাধ্যমে সরকারি সংস্থা দ্বারা টার্গেট করা হচ্ছে। হঠাৎ করেই সেইসব অভিনেতা এবং পরিচালকদের জন্য একটি উন্মুক্ত মৌসুম শুরু হয়েছে, যারা ক্ষমতাসীন বিজেপির বিরোধিতা করছেন বা তাদের কর্মকাণ্ডে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করছেন।

১৯৩০ এর দশকের শেষদিকে, সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের মধ্যে কমিউনিস্ট সহানুভূতিশীলদের খুঁজে বের করার জন্য হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভস হাউস আন-আমেরিকান অ্যাক্টিভিটিস কমিটি গঠন করে। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৪৭ সালে হলিউডের বেশ কয়েকজন ব্যক্তিত্বকে ডেকে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল। অন্তত ৩০০ নারী-পুরুষকে স্টুডিওগুলো কালোতালিকাভুক্ত করে। শুধুমাত্র কাজ না পাওয়ায় তাদের জীবন ও জীবিকা ধ্বংস হয়ে যায়। চার্লি চ্যাপলিন, ওরসন ওয়েলস এবং পল রোবেসনের মতো অনেকেই দেশ ত্যাগ করেছিলেন, ডাল্টন ট্রাম্বোর মতো অনেকে আত্মগোপনে গিয়ে ছদ্মনামে লেখা শুরু করেন। কেউ কেউ জেলেও গিয়েছিলেন। কমিটির কাছে তথ্যদাতাদের একটি বড় অংশ, যারা তাদের সহকর্মীদের কমিউনিস্ট বলে অভিযোগ করেছিলেন, তাদের নাম প্রকাশ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। ১৯৫০ এর দশক অবধি এই উইচহান্ট থামেনি।

ভারতেও, জরুরী জামানায়, ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির বিখ্যাত নামগুলিকে সরকারের পক্ষে নেয়ার সব চেষ্টা করা হয়। কিশোর কুমারের মতো অনেকে সরকারের পক্ষে গান করতে অস্বীকার করেছিলেন এবং ফল হিসেবে অল ইন্ডিয়া রেডিওতে তার গান নিষিদ্ধ করা হয়।‘ কিসসা কুরসি কা’ কখনও আলোর মুখ দেখেনি। তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী ভি.সি. শুক্লা এই শিল্পের প্রতি আগ্রহী হয়েছিলেন। একবার তিনি একটি প্রতিনিধি দলের সাথে কানাডায় বেড়াতে গিয়েছিলেন যেখানে তাঁর বিরুদ্ধে অভিনেত্রী বিদ্যা সিনহার দরজায় গভীর রাতে কড়া নাড়ার অভিযোগ আনা হয়। তিনি নাকি দরজায় ধাক্কা দিতে দিতে বলেছিলেন, “আমি বিদ্যা, তুমি বিদ্যা।”

বিজেপি সর্বদা হিন্দি চলচ্চিত্র জগতে আগ্রহী – প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি অভিনেতাদের সাথে দেখা করতে এবং মাঝে মাঝে সেলফি তোলা পছন্দ করেন। ইন্ডাস্ট্রির তরফে প্রতিক্রিয়াও ছিলো দারুন! নির্বাচনের আগে অক্ষয় কুমার নরম নরম প্রশ্ন নিয়ে প্রধানমন্ত্রীও সাক্ষাৎকারও নেন।

জাতীয়তাবাদী চলচ্চিত্রগুলির আধিক্য দেখা যাচ্ছে, যেখানে প্রায়শই ইতিহাসের বিকৃত সংস্করণ তুলে ধরা হচ্ছে। আবার পুরানো কাহিনি ও মিথকথার জয়জয়কার ফিরিয়ে আনার আগ্রহও সমানতালে রয়েছে। করণ জোহর থেকে শুরু করে এখন জয়া বচ্চন এবং সাধারণভাবে ‘উদারপন্থী’ বলে পরিচিত হাই প্রোফাইল নামের বিরুদ্ধে অভিযোগের নেতৃত্ব দিয়েছেন কঙ্গনা রানাউত। কঙ্গনা ঝাঁসির রাণী লক্ষ্মীবাইয়ের চরিত্রে মনিকর্নিকায় অভিনয় করেছেন। যেখানে জাফরান পতাকা ও তার উচ্চারিত স্লোগান মিশিয়ে তাকে পুরোদস্তুর হিন্দু আইকন হিসেবে তুলে ধরা হয়। অন্যরাও তাই করেছেন। দেশপ্রেম ও দেশভক্তি বলিউডে সবার আগে!

মতবিরোধ বা বিরোধী মতামত দিয়ে বিজেপি এবং তার সমর্থকদের পক্ষ থেকে কেমন প্রতিক্রিয় আসে, তা অনেকেই জেনে গেছেন। আমির খান সম্ভবত ২০১৫ সালের দিকে, মোদি সরকারের বছরটাকের মধ্যে, ভারতে ক্রমবর্ধমান অসহিষ্ণুতা সম্পর্কে তার স্ত্রীর ভীতি বিনীতভাবে প্রকাশ করেছিলেন এবং দেশত্যাগ বিষয়ে চিন্তাভাবনা করেছিলেন। ফলাফল স্ন্যাপডিলের সাথে তাঁর চুক্তি হারিয়ে ফেলেন। তৎকালীন একজন মন্ত্রী প্রয়াত মনোহর পরিকর ঘোষণা করেছিলেন, যারা এই জাতীয় বক্তব্য রাখেন তাদের “একটি শিক্ষা দেওয়া উচিত। এর প্রত্যাশিত প্রভাব পড়েছিলো। হঠাৎ করে বলিউডের অনেক বড় নাম তাদের কন্ঠস্বর হারাতে থাকেন, মত প্রকাশের স্বাধীনতা শিকেয় উঠতে থাকে।

তবে সবাই চুপ করে থাকেননি। দীপিকা পাডুকোন জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাসের ভিতরে যারা লাঞ্ছিত হয়েছিল, তার প্রতিবাদের প্রতি সমর্থন জানান। অনুরাগ কাশ্যপ এবং রিচা চাড্ডা টুইটারে তাদের উদার মতামত নিয়ে সোচ্চার ছিলেন, যা সরকারের বিরুদ্ধে গিয়েছিলো। এখন এই যে মাদক তদন্তের মামলায় দীপিকাকে তলব করা হয়েছে, এটি কি নেহাতই কাকতালীয় ঘটনা? অনুরাগ কাশ্যপের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ তুলেছেন একজন অভিনেত্রী, যিনি স্বীকার করেন যে তিনি কখনও তাঁর সাথে সাক্ষাত করেননি। চাড্ডার নামটিও পরবর্তী অভিযোগে টেনে আনা হয়েছে। এসব ঘটনা কী ইঙ্গিত দেয়? সরকার বা নির্দিষ্ট রাজনীতিবিদরা সরাসরি জড়িত নাও হতে পারেন, তবে বার্তাটি পরিষ্কার – আপনি যদি কথা বলেন, আপনি তার জন্য মাশুল গুনবেন। এটি অন্যদের উপরও নীরব প্রভাব ফেলেছে যারা ভিন্নমতের পথে হাঁটতে পারেন।

বিজেপি এবং সংঘ পরিবার বলিউডের উপর শক্ত কর্তৃত্বের বাইরে অন্য কিছু চাইবে না। এটি লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে তাদের কথা ছড়িয়ে দেওয়ার একটি সঠিক মাধ্যম। আবার এখন, নেটফ্লিক্স এবং অ্যামাজনের মতো ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলিতে চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হচ্ছে, যেগুলোকেও মোদি সরকার সেন্সর কোডের আওতায় আনতে চায় (ডিজিটাল নিউজ সাইটগুলির মতো)।  কল্পনা করুন – লক্ষ লক্ষ ভারতীয় তাদের ফোন এবং ল্যাপটপে রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য চলচ্চিত্রগুলি দেখে, অনুমোদিত হিন্দুত্বের ইতিহাস সম্পর্কে জানবে- ব্যাপারটা বেশ লোভনীয়। টেলিভিশন নিউজ চ্যানেলগুলি ইতিমধ্যে ব্যাগে পুড়ে ফেলা হয়েছে। খবরের কাগজগুলিও সরকারের সমালোচনাযর ক্ষেত্রে নিঃশব্দ হয়ে পড়েছে। এখন সুস্পষ্টভাবে সিনেমা পরবর্তী লক্ষ্য – ক্ষমতাসীন দল তার পক্ষে প্রোপাগান্ডার সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে তোলার জন্য এর চেয়ে আর ভাল কিছু কী চাইবে?

মোদী সরকারের প্রথম কয়েক বছরে বলিউডের বাকসর্বস্ব বিজেপি সমর্থকরা ফ্লপ হয়েছেন। ধর্মনিরপেক্ষ উদারপন্থিদের নিয়ে ট্রল আর আরবান নক্সাল কপচানোর একই ফাঁদে পড়ে তারা জেরবার হয়েছেন। সবচেয়ে বাজে ব্যাপারটি হলো, তারা এমনকি উপযুক্ত চলচ্চিত্র নির্মাতাও নন। যে কারণে বিজেপির এখন চাই, তাদের পক্ষে শীর্ষ শ্রেণির পেশাদারদের কাজে লাগানো।

লেখার শুরুতে যে জার্মান পরিচালকের কথা বলেছিলাম সেই ল্যাং, তার সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন যে তার ধারণা ছিলো, মেট্রোপলিসে এক চরিত্রের মুখে নাৎসিবিরোধী মন্তব্য করার জন্য তাকে গোয়েবলস ডেকে নিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু তার বদলে, গোয়েবলস তাকে বলেছিলেন যে, হিটলার ছবিটি পছন্দ করেছেন। কারণ মেট্রোপলিসে যে চরিত্রটি নাৎসিবিরোধী কথা বলে, সে ছিলো একজন অপরাধী! নাৎসিদের সেবায় ল্যাং হয়তো আদর্শ হত। কিন্তু  তিনি দেশান্তরের পথ বেছে নিয়েছিলেন। বলিউডের বড় নামগুলি হিন্দুত্ববাদ প্রকল্পে যোগদানের বিষয়ে এখনও বিশেষ আগ্রহ দেখায় নি। সম্ভবত সঠিক জায়গায় প্রয়োগ করা সামান্য চাপ, তাদের মন পরিবর্তন করতে পারে।

Berger Weather Coat