পড়তে পারবেন 3 মিনিটে

।। হাসানুজ্জামান সাকী ।।

ভুল শব্দ প্রয়োগে কতই না হাস্যরসের সৃষ্টি হয়। আর এতে বিড়ম্বনার শিকার হতে পারেন কেউ কেউ। শব্দ বিভ্রাটের এমন অসংখ্য ঘটনার কথা আমরা জানি। এবার এই বিভ্রাটে নাজেহাল হচ্ছেন আয়ারল্যান্ডের এক নারী। যার জন্য মোটেও তিনি দায়ী নন। এই গল্প বলার আগে আরও কয়েকটি মজার গল্প বলি শুনুন।

০২.
একবার বাংলাদেশের কোনো এক মফস্বল শহরে একটি সভায় যোগ দিতে গেলেন দেশের খ্যাতিমান একজন নারী কবি। আমরা ছোটবেলায় ওই কবির লেখা কবিতা আমাদের পাঠ্যবইয়ে পড়েছি। গল্পটি বাস্তব হলেও (!) রসাত্মক হওয়ার কারণে কোনো ভাবেই যেন তাঁর প্রতি অশ্রদ্ধা প্রকাশ না পায় এজন্য নামটি উহ্য রাখছি। তো, কবির সেই সভার সংবাদ পরদিন কাগজে ছাপা হলো। রিপোর্টের শেষ বাক্যটি ছিল– “সভা শেষে কবি ‘অমুক’কে চা দিয়ে আপ্যায়ন করা হয়। তখনকার সময় হ্যান্ড কম্পোজে লেখা টাইপ করা হতো। কাঠের একটি কাঠামোর মধ্যে অনেকগুলো ছোট ছোট খোপ থাকতো। একেকটি খোপে ভিন্ন ভিন্ন সীসার অক্ষর রাখা হতো। সেখান থেকে অক্ষর নিয়ে তৈরি হতো শব্দ। যা হোক, কবির সভায় যোগদানের ওই খবরটির শেষ লাইনটিতে “চ” এর পর “আকার” না বসে “হ্রস্বউকার” ছাপা হলো! বিপত্তিটা বাধলো তখনই।

০৩.
ষাটের দশকের শুরুর কথা। সালটি সম্ভবত ১৯৬২-৬৩। পাকিস্তান সরকারের প্রথম বাঙালি চিফ সেক্রেটারি হন কাজী আনোয়ারুল হক। তাঁর বাবা কাজী ইমদাদুল হক ছিলেন সাহিত্যিক। আনোয়ারুল হকের এই দায়িত্বে বাঙালি সাংবাদিক-সম্পাদক সাহেবরা খুব উচ্ছ্বসিত হলেন। সংবাদের সম্পাদক জহুর হোসেন চৌধুরী সেই উচ্ছ্বাসে প্রথম পৃষ্ঠায় এক বিশাল কলাম লিখে ফেললেন। তো, একদিন চিফ সেক্রেটারি সাহেব কোনো এক স্থানে সেতু উদ্বোধন করতে গেছেন। তখন পত্রিকায় ছবি ছাপা হতো খুব কম। সংবাদ-এ সেই খবরটি অতি উচ্ছ্বাস নিয়ে প্রথম পৃষ্ঠায় ছাপা হলো তিন কলাম ছবি-সহ। ছবির ক্যাপশনটি ছিল– সেতু উদ্বোধন করছেন চিফ সেক্রেটারি কাজী আনোয়ারুল হক। কিন্তু ছাপা হয়ে পরদিন বের হলো– পাজী আনোয়ারুল হক।

০৪.
ইংরেজি থেকে অনুবাদ করার সময়ও অনেক ক্ষেত্রে বিভ্রাটের সৃষ্টি হয়। কখনও ভুল উচ্চারণ, কখনো ইংরেজি ধরতে না পারার কারণে অর্থটাই পাল্টে যায়। এমনই একটি উদাহরণ দিই। ঘটনাটি সম্ভবত আশি দশকের। ইন্টারন্যাশনাল ডেস্কের সহ-সম্পাদক সাহেব এজেন্সির সার্ভিস থেকে একটি রিপোর্ট পেলেন– ঠু কারস ক্র্যাশড হোয়াইল পুলিস কার ওয়াজ পেট্রোলিং টোয়ান্টি ফিটস এওয়ে এজ দ্য ক্রো ফ্লাইস (Two cars crashed while police car was patrolling 20 ft away as the crow flies)। এটির প্রকৃত অর্থ হচ্ছে– দুটি গাড়ির মুখোমুখি সংঘর্ষের সময় টহলরত পুলিশের গাড়িটি ২০ ফুট সমান্তরাল দূরত্বে ছিল। কিন্তু পত্রিকায় খবরটি ছাপা হয় এভাবে– দুটি গাড়ির সংঘর্ষের সময় পুলিশের গাড়িটি ২০ ফুট দূরে পাম্পে পেট্রোল ভরছিল এবং একটি কাক তখন উড়ে যায়। উল্লেখ্য, As the crow flies ইংরেজিতে একটি Idiom।

০৫.
একবার দুবাইতে পাম জুমেরায় একটি পার্কে এক ব্যক্তির সাথে আমার পরিচয় হয়। জানলাম তিনি ভেনিজুয়েলার নাগরিক। আমি তখন বললাম, তোমার দেশের হুগো শ্যাভেজকে আমি চিনি। লোকটি কোনো ভাবেই তাঁকে চিনতে পারলেন না। আমি তো বিস্মিত। ভেনিজুয়েলার নাগরিক হয়ে হুগো শ্যাভেজকে চিনবে না এ কী করে সম্ভব। অনেক পরে বুঝতে পারলাম, ভুলটি আমার। কারণ ছোটবেলা থেকে পত্রিকার পাতায় পড়ে আসা হুগো শ্যাভেজ আসলে ভুল উচ্চারণ। প্রকৃত উচ্চারণ হলো– উগো চাভেজ। ভুল উচ্চারণের কারণে তিনি আমার বলা হুগো শ্যাভেজকে চিনতে পারছিলেন না।

০৬.
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের নামটি আমরা প্রায় সবাই ভুলভাবে উচ্চারণ করি। বলি ডোনাল্ড ট্রাম্প। প্রকৃত উচ্চারণ হবে ডনাল্ড ট্রাম্প। উচ্চারণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের একটি পত্রিকা বেশ যত্নবান। কিন্তু সেই পত্রিকাটিও মাঝে মাঝে ভুল করে বসে। একবার যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের পরিচিত শহর হিউস্টনকে (Houston) হাউস্টন উল্লেখ করেছিল তারা। প্রসঙ্গত, সম্প্রতি পাঠাওয়ের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ফাহিম সালেহ নিজের যে এপার্টমেন্টটিতে খুন হন সেটি নিউ ইয়র্কের যে সড়কের উপর অবস্থিত সেটির নাম হাউস্টন স্ট্রিট। যদিও ইংরেজি বানানে দুটো একই (Houston)। অর্থাৎ স্থানীয় ভাবে যদি এই স্ট্রিট খুঁজতে গিয়ে কাউকে প্রশ্ন করেন হিউস্টন স্ট্রিট কোথায় তাহলে তিনি উত্তর দিতে পারবেন না। কারণ টেক্সাসের “হিউস্টন” নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটানে “হাউস্টন” হয়ে গেছে। যদিও ইংরেজি বানানটি একই রকম।

০৭.
এমনই জটিল এক শব্দ বিভ্রাটে বিড়ম্বনায় পড়েছেন ইউরোপের এক স্বীকৃত সুন্দরী নারী। আয়ারল্যান্ডের এই বাংলাদেশি নারী সেখানকার একজন অভিনয়শিল্পী, মডেল, লেখক ও কলামিস্ট সর্বোপরি একজন গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব। মাকসুদা আখতার প্রিয়তী নামের ওই বাংলাদেশি নারী পাঁচটি সুন্দরী প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে মুকুট ছিনিয়ে এনেছেন। প্রতিযোগিতাগুলো হলো– Miss Universal Royalty 2013, Miss Hot Chocolate 2014, Top 25 finalist in Top Models UK 2014, MS. Ireland 2014 এবং MS. Earth International 2016/2017.

এবার জেনে নেওয়া যাক, Miss এবং MS. এর মধ্যে প্রার্থক্যটা কি? এই দুটোই সম্মানসূচক সম্বোধন। যেমন পূরুষদের সম্মান জানিয়ে মিস্টার (Mr.) ও বিবাহিত নারীকে বলা হয় হয় মিসেস (Mrs.)। সাধারণত ৩০ বছরের নীচে কোনো অবিবাহিত নারীকে Miss বলা হয়। আর ৩০ বছরের উর্ধ্বে কোনো নারী যার বৈবাহিক অবস্থান সম্পর্কে আপনি নিশ্চিত নন তাকে MS. বলে ডাকা হয়। কিন্তু এই Miss এবং MS. এর উচ্চারণ অনেকটা কাছাকাছি– Miss (মিস) ও MS. (মিজ)। পশ্চিমাদেশগুলো এই শব্দের উচ্চারণ এভাবে করে যে তা বোঝা অনেক সময় কঠিন।

এই বুঝতে না পারার কারণে কিংবা অজ্ঞতার কারণে কিংবা বানান বিভ্রাটের কারণে বাংলাদেশের পত্রপত্রিকায় মিজ আয়ারল্যান্ড ২০১৪ হয়ে গেছে মিস আয়ারল্যান্ড। যদিও শিরোপা জয়ের যে ছবি তাতে প্রিয়তীর শরীরে ঝুলানো স্যাশে পরিস্কারভাবে মিজ (MS.) লেখা রয়েছে। তবু বেজায় ক্ষেপেছেন কিছু ছিন্দ্রান্বেষী মানুষ। তারা শিরোপাজয়ী মাকসুদা আখতার প্রিয়তীকে দোষারোপ করছেন। তাদের দাবি, মিস (Miss ) আয়ারল্যান্ড হিসেবে পরিচয় দিয়ে দুই সন্তানের জননী প্রিয়তী (প্রকৃত মিজ MS. আয়ারল্যান্ড) আসলে নিজেকে তন্বী-তরুণী হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছেন। আর এই দোষ চাপাতে গিয়ে তারা বিশ্বে বাংলাদেশকে পরিচিত করে তোলা মানুষটির চরিত্রে কালিমালেপন করতেও ছাড়ছেন না।

০৮.
আমরা (বাঙালি) ভীষণ জাজমেন্টাল। আচ্ছা হরহামেশাই যে “জাজমেন্টাল” আমরা ব্যবহার করি শব্দটা কি ডিকশনারিতে আছে? যেমন ডিকশনারিতে “চিটার” বলে কোনো শব্দ আছে কি নেই, আবার “মিস ইউ” বা “প্রাইভেসি” শব্দের কোনো আভিধানিক বাংলা আছে কি-না, আমার জানা নেই।

হাসানুজ্জামান সাকী নিউইয়র্ক প্রবাসী বাংলাদেশি সাংবাদিক। লেখাটি তাঁর ফেসবুক পেজ থেকে নেয়া।

Berger Weather Coat