পড়তে পারবেন 6 মিনিটে

শীতের ভয়াবহতা আরো বেশি অসহনীয় হয়ে ওঠে শৈত্যপ্রবাহ শুরু হলে। কদিন ধরে চলছে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ। দেশের এই অঞ্চলে এমনিতেও শীতের দাপট বেশি। ধোঁয়াশা চাদর জড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে দ্রুত। মসজিদে মসজিদে আজান শুরু হয়েছে। কিন্তু মেয়েটি এখনও ফিরছে না। মায়ের মনে দুশ্চিন্তা।  
বাড়ির সদর দরজা খুলে উদ্বেগ নিয়ে বড় রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকেন মা। এদিকে আজান শেষ হয়েছে,  নামাজ পড়তে হবে। মাগরিব নামাজের সময় খুব সংক্ষিপ্ত। তিনি একবার ঘরে যান আবার সদর দরজায় আসেন। কই ওকে তো দেখা যাচ্ছে না। বাস থেকে নেমে বাকি পথটুকু ও হেঁটেই আসে। দরজা ছেড়ে ঘরে গিয়ে এবার তিনি জায়নামাজ বিছিয়ে দাঁড়িয়ে যান। নামাজ শেষে খুব বিমর্ষ হয়ে পড়েন, কারণ নামাজে পূর্ণ মনোযোগ তিনি দিতে পারেননি। যুদ্ধের সময়ের ভয়াবহ দিনের কথা তাঁর মনে পড়েছে। মাঝে মাঝে তিনি নিজের উপর ক্ষুব্ধ হন। কিছুতেই তিনি সেসময়ের কথা ভুলতে পারেন না। চেষ্টা করেন ভুলে যাবার। চেষ্টা করেন ছেলেমেয়ে নিয়ে নতুনভাবে বাঁচার। কিন্তু মনের মাঝে সেই নির্মম সেলুলয়েডের ফিতা চলতে থাকে।
ডিউটি সেরে বাড়ি ফেরে বড় মেয়ে চিকিৎসক মঞ্জিলা। মা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মুখে বড় মেয়েকে জানায় ও এখনও ফেরেনি। মঞ্জিলা শোনে মায়ের কথা। মনে মনে ভাবে ফেরে নাই ফিরবে। হয়তো কোনো কারণে দেরী হচ্ছে। যদিও ছোটবোনটি বাসায় ফিরতে কখনো দেরী করে না। সময় গড়াতে থাকে নিজস্ব গতিতে। সন্ধ্যা মিলিয়ে রাত নামে এখনও বোনটির দেখা নাই। মঞ্জিলা মনে মনে চিন্তিত হয়ে পড়ে। উৎকণ্ঠিত মা দুশ্চিন্তার বহিঃপ্রকাশ না ঘটিয়ে এশার নামাজে দাঁড়িয়ে যান।
ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলে মঞ্জিলা ছোটভাইকে নিয়ে বের হয়। বোনের বান্ধবীদের বাসায় যায়। ইয়ারমেটদের বাসায়, আত্মীয়দের বাসায় খোঁজ নিতে শুরু করে। কিন্তু কোথাও বোনের খোঁজ পাওয়া যায় না। বাসায় ফিরে দেখে নাহ এখনো আসেনি সে। শীতের রাত বাড়তে থাকে।
ভোরের অপেক্ষায় বসে থাকে মা মেয়ে। ছোট ভাইবোনেরা শুয়ে পড়ে, হয়তোবা ঘুমিয়েও পড়ে। উৎকণ্ঠা, উদ্বিগ্নতার দীর্ঘরাত যেন আর শেষ হতে চায় না। একাত্তরে যেদিন পাকিস্থানী সৈন্যরা তাদের বাবাকে ধরে নিয়ে যায় সেদিনের মত দম বন্ধ লাগে মায়ের। সারারাত কেটে যায় নির্ঘুম। সকালে উঠে মঞ্জিলা প্রথমে যায় থানায়। এরপর নিকটস্থ হাসপাতালে। দিন শেষে আবার আসে অন্ধকার রাত। সারারাত কাটে অস্থিরতায় অনিশ্চয়তায় এবং অনিদ্রায়।
পরদিন আত্মীয়, পরিজন, বন্ধুরা সবাই জেনে যায় নীহারকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। 
অনেকেই বাসায় আসতে শুরু করে। তারাও চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ নেয়া শুরু করে। মঞ্জিলা ভার্সিটিতে গিয়ে বিভাগের চেয়ারম্যান ও শিক্ষকদের সাথে কথা বলে জানতে পারে রেজিস্টার খাতায় বোনের নাম আছে। সহপাঠিরা জানায় ও ক্লাস করেছে। কেউ কেউ জানালো ক্লাস শেষে অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ বিল্ডিঙয়ের পাশে এক সহপাঠী ছাত্রের সঙ্গে তাকে কথা বলতে দেখা গেছে। কেউ কেউ বলল, দুপুরের দিকে তাকে রিকশায় শহরের দিকে যেতে দেখা গেছে, এটাই ছিল নীহার সম্পর্কে সর্বশেষ খবর। আর কেউ কোনো তথ্য দিতে পারল না।   
এর পরের দিনগুলো আশানিরাশার দোলাচলে কাটতে থাকে। পরিবারের সদস্যরা বিশেষ করে মা ভীষণ মুষড়ে পড়েন। তিনি ভাবেন এটা তো ৭১ নয়, এটা ৭৬। দেশ আজ স্বাধীন, আজ আর পাকবাহিনী নেই। নিয়ম করে সূর্য ওঠে,  অস্ত যায়,  মানুষ জন্মায় মানুষ মারা যায়। চন্দ্রের অমাবস্যা পূর্ণিমা হয়, নদীতে ঢেউ ওঠে। মানুষ বুকভরে নিঃশ্বাস নেয় সবই ঠিকঠাক কিন্তু আমার মেয়ে কোথায় গেল! অবুঝ শিশু নয়, বদ্ধ উম্মাদ নয়,  ভার্সিটিতে পড়া সুস্থ সবল মেয়ে আমার চিলে নেয়া মুরগির বাচ্চার মতো কোথায় হারিয়ে গেল! আজও কেন ফিরছে না। অনিদ্রায়,  অনাহারে,  শোকে মা মুহ্যমান হয়ে পড়েন।
নজিবুর রহমান ছিলেন একাত্তরের অগণিত শহীদদের একজন। পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের অধীন সমবায় অধিদপ্তরে তিনি চাকরি করতেন।
স্বাধীন দেশের আরো বহু পরিবারের মতোই যুদ্ধের পরের যুদ্ধ ও দহনের ভেতর দিয়ে আশাবাদী ভবিষ্যতের দিকে চলছিল এই পরিবারটিও। পিতার অবর্তমানে পুরো পরিবার নির্ভরশীল বড়মেয়ে ডা. মঞ্জিলার উপার্জনের উপর। মঞ্জিলা বাকি পাঁচ ভাইবোনদের লেখাপড়ার ব্যাপারে খুব সচেতন। এই বোনটি খুব শান্ত নম্র, ভালো ছাত্রীও। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শেষ বর্ষের ছাত্রী।
দিন যায় কিন্তু কোনো খবর পাওয়া যায় না। যেন সে হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। মঞ্জিলা নিজ কর্মক্ষেত্রে ছুটি নেয়। সে সর্বশক্তি দিয়ে খুঁজতে থাকে বোনকে। বারবার ছুটে যায় ভার্সিটিতে, নীহারের বন্ধুদের কাছে। ছুটে যায় বাবার সমবায় অফিসের কলিগদের কাছে। থানায় পুলিশের কাছে। পুলিশও বসে থাকে না।
মিন্টু নামে একটি ছেলে মঞ্জিলাদের পরিবারের সাথে পরিচিত ছিল। নীহারের ক্লাসমেটদের নজরে আসে মিন্টু এবং বাবু কিছুদিন ধরে ক্লাসে অনুপস্থিত। বিষয়টি পুলিশের গোচরে আনা হলে পুলিশ তৎপর হয়ে ওঠে। গোপনে পুলিশ মিন্টুর উপর নজরদারি শুরু করে।
মাকে কিছুতেই সামলানো যাচ্ছে না। যে মানুষটি মাত্র বছর পাঁচেক আগে স্বামীকে হারিয়েছেন এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে তিনি এখন কী করবেন! কার কাছে যাবেন! কোথায় গেলে তার নীহারকে পাবেন! তার চোখে ঘুম নেই। ক্ষুধা তৃষ্ণা তাকে ত্যাগ করেছে। ’৭১ এ যেদিন পাকিস্থানী সেনারা ওদের বাবাকে ধরে নিয়ে যায় সেদিনের মত দমবন্ধ করা দুর্বিসহ সময় এ পরিবারকে অল্প সময়ের ব্যবধানে আবার পাড়ি দিতে হবে এ তিনি কল্পনাও করেননি। এ কেমন ভাগ্যলিপি! তবে কি তিনি এক পাপী মানুষ! বিধাতা তাকে পছন্দ করেন না! জ্ঞানত তিনি তো কোনো অন্যায় করেননি। পাপ করেননি। তাহলে কেন এই অসহনীয় শাস্তি তার জন্য! স্বামী চলে গেলেন, আজ মেয়ের কোনো খোঁজ নাই। জীবন কি কেবল অকল্পনীয় দুঃখ কষ্টের সমাহার! কেবলই শূন্যতা আর হাহাকার!
নীহারের পোষা বিড়ালটা অব্যক্ত চোখে সবার দিকে তাকিয়ে স্পষ্ট জিজ্ঞাসায় নীহারকে খোঁজে। কখনো তীব্র ব্যাকুলতায় মিনতি জানায় ‘তোমরা সবাই আছ, সে কোথায়? তাকে নিয়ে এসো।’   
মঞ্জিলাও অসহায় বোধ করে। গভীর শূন্যতা আর সীমাহীন ক্লান্তি নিয়ে সে শুয়ে থাকে। বন্ধ চোখের কোণা বেয়ে ঝরে যায় নিরব অশ্রু।
‘নীহার, তুই কোথায় গেছিস! তোর কি হয়েছে! তোর পছন্দের কেউ কি ছিল যার সাথে তুই অন্য কোথাও গিয়ে আছিস!’ মঞ্জিলা খুব ভালো করে জানে নীহারের তেমন কেউ ছিল না। থাকলেও সে কারো হাত ধরে পালিয়ে যাবার মেয়ে নয়। পরিবারকে বিব্রত করার, বিপদে ফেলার মেয়ে সে নয়। তারপরও ভাবনার ঘোরে দৃশ্য থেকে দৃশ্যে অন্ধকারে হাতড়ে বেড়ায়। আচমকা মগ্নচৈতন্যে আলোর পিন ফোটে, ওই তো নীহার ওর ভালোবাসার মানুষের হাত ধরে পৃথিবীর কোনো এক সুন্দর তটে বসে সমুদ্রের ঢেউ দেখছে। ফকফকে জোসনায় পাহাড়ি ফুলের ঘ্রাণে কবিতা পড়ছে, গুনগুন করে গান গাইছে।
নীহার গান শুনতো, বই পড়তো, কবিতা পড়তো। এসব ছিল ওর ভালোলাগার বিষয়। মেডিকেলের মানুষ মঞ্জিলার গ্রে এনাটমির বাইরে সময় ছিল না কাব্যচর্চার। কিন্তু ওর ছিল। সে মনে মনে প্রার্থনা করে, এটাই যেন সত্য হয়। কিছুদিন পরে ছায়ামেঘের এক দুপুরে সে এক রাজপুত্তুরের হাত ধরে ফিরে আসবে। নতমুখে দাঁড়িয়ে থাকবে। মঞ্জিলা বলবে, ‘আরে বোকা মেয়ে এতে লজ্জা পাওয়ার কি আছে? আয় ভেতরে আয়। মা! ওমা! দেখ কারা এসেছে! মা! এক কাজ করতো, আজ পোলাও রান্না করতো। আচ্ছা দাঁড়াও আমি বাজারে যাই। ফেব্রুয়ারি মাসেও সাহেববাজারে নিশ্চয়ই বড় ইলিশ মাছ পাওয়া যাবে, ইলিশ পোলাও বড় ভালোবাসে।’…
কল্পনা কল্পনাই থাকে। বাস্তব আরো রুঢ় দুর্বিসহ হয়ে সামনে আসে। কেউ কিচ্ছু বলতে পারে না। তবে সবাই সহযোগিতা, মমতা নিয়ে পাশে দাঁড়ায়। কেউ কেউ বাজার করে নিয়ে আসে। কেউ রান্না করা খাবার দিয়ে যায়।
মঞ্জিলার ছুটি শেষ হয়ে আসে। মা পুরো ভেঙে পড়েছেন। বাড়ির অবস্থা করুণ। এদিকে কাজে জয়েন না করে উপায় নেই! মাকে সামলানো, ভাইবোনদের সামলানো, ডিউটি পালন মঞ্জিলার অবস্থা ক্রমশ নাজুক হয়ে যায়। যে ক্রমশ চোরাবালিতে ডুবতে থাকে। কিন্তু সময় থেমে থাকে না। দিন যায়…মাস যায়… 
মার্চ শেষ হয়ে এপ্রিল শুরু হয়। মা সকালে উঠে ফজরের নামাজ শেষে দীর্ঘ মোনাজাত করেছেন। আজ ভোরেই তিনি সোয়ালক্ষ বার দোয়া ইউনুস পাঠ খতম করেছেন। আজ মনটা হালকা লাগছে। মনে হচ্ছে আজ কিছু ঘটবে। নিশ্চয়ই তার বুকের ধন ফিরে আসবে। পরমকরুণাময়ের কাছে প্রার্থনা শেষ করে তিনি বাইরে আসেন। দেয়ালের ধার দিয়ে নীহারের লাগানো ফুলগাছগুলো শুকিয়ে আসছে। তিনি দুর্বল হাতে বালতি ভরে পানি এনে সন্ধ্যামালতি, মোরগঝুটি, দোপাটি, নয়নতারা গাছগুলোতে পানি দেন। রঙ বেরঙয়ের ডালিয়াগুলো হাসছে। শুকনোপাতা কুড়িয়ে ফেলে দেন। প্রিয় ফুলগাছ মরে গেলে নীহার কষ্ট পাবে।
তিনি সদর দরজা খুলে হাঁটতে থাকেন। এই পথেই তো মা আমার হেঁটে হেঁটে ফিরে আসতো। ওইদিন ওর পরনে ছিল জারুল রঙ জর্জেট শাড়ি আর একটি চমৎকার নকশি পুলওভার। তিনি পায়ে পায়ে মোড় পর্যন্ত গিয়ে ঝাপসা চোখে তাকিয়ে থাকেন একটা জারুল রঙ শাড়ি দেখবেন বলে! নকশাদার পুলওভার পরা এই পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর রাজকুমারীকে দেখবেন বলে! দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে পাদুটি তার ভার বহন করতে অক্ষম হয়ে পড়ে… তিনি লুটিয়ে পড়েন পথের মাঝে। দীর্ঘ সময় তিনি ধুলায় পড়ে থাকেন।

ছেলেমেয়েরা টের পেয়ে ধরাধরি করে মাকে বাসায় নিয়ে আসে। বাসায় কান্নার আহাজারি ওঠে।    
মিন্টু মাঝে মাঝে আসে। মা ওর সাথে দু একটা কথা বলে। মঞ্জিলাও কথা বলে। কিন্তু মঞ্জিলার মনে কেমন যেন খটকা লাগে মিন্টু আগের মত সহজ হয় না, মাটির দিকে চোখ রেখে কথা বলে। ওর আচরণ কেমন যেন সন্দেহজনক লাগে। সন্দেহের বাষ্পটা চুয়ে চুয়ে ঢুকে পড়ে চিন্তায়। নিদ্রাহীন ঘন আঁধারে ক্রমশ যেন ছোট হয়ে যায়। গুটিয়ে যায়। গুটোতে গুটোতে একটা গিরগিটি হয়ে গেল। সেখান থেকে কেন্নো, আরও ছোট হচ্ছে। একেবারে ছোট মাছি হয়ে গেল। মাছিটার দিকে পলকহীন তাকিয়ে থাকে সে।
এরপর মঞ্জিলা পুলিশকে জানায়।
মিন্টুর উপর পুলিশের নজরদারি ছিলই, কিন্তু কোনো অকাট্য তথ্য প্রমাণ পায় না। কেবল এই নজরদারির কালে দেখতে পায় হাতে রুমাল বা ব্যান্ডেজ নিয়ে ঘোরে মিন্টুর এক বন্ধু সেতু। পুলিশ সেতুকেও নজরে রাখে। এক বিকেলে সেতু রাজশাহী শহরের এক চিকিৎসকের চেম্বারে যায়। বাইরে তার অজ্ঞাতে দাঁড়িয়ে থাকে পুলিশ। ঘণ্টাখানেক পরে হাতে নতুন ব্যান্ডেজ নিয়ে সে বেরিয়ে চলে যায়। পুলিশ কর্মকর্তা চিকিৎসকের কাছে সেতুর হাত সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি জানান, যে যুবক এসেছিল তার বাঁহাতে বড় একটি ক্ষত রয়েছে। সে তাকে কুকুরের কামড় বলে জানালেও তিনি সেটি মানুষের কামড় বলে সন্দেহ করছেন।
কদিন ধরে ঘুরে ঘুরে সেতুর আস্তানা পুলিশ কর্মকর্তার চেনা হয়ে গিয়েছিল। ফোর্স নিয়ে তিনি সেখানে যান এবং সেতুকে গ্রেফতার করেন। এই সেতুই ছিল নীহার বানু সম্পর্কে হদিস পাওয়ার প্রথম সূত্র।
শীতের পরে গ্রীষ্ম চলে গিয়ে বর্ষাও প্রায় এসে যায়। সাতাশে জানুয়ারি নীহার শেষবারের মত বাসা থেকে বেড়িয়ে ভার্সিটি গিয়েছিল। রেজিস্টার খাতায় ওর উপস্থিতির প্রমাণ আছে। ক্লাসও করেছিল। কিন্তু এরপর আর ওর কোনো হদিস পাওয়া যায়নি।
তবে মঞ্জিলার মনে হয় পুলিশ কর্মকর্তারা অনেক কিছু জেনে গেছেন। পারিপার্শিক অবস্থা দেখে বোঝা যায় পুলিশি তদন্ত শেষের দিকে। তারা হয়ত শিগগিরই তদন্তের রিপোর্ট জানিয়ে দেবে। সে জানা কি মঞ্জিলাদের জন্য কোনো আশার আলো বয়ে আনবে! আদরের ছোটবোন নীহার কী আদৌ বেঁচে আছে এ নির্মম পৃথিবীতে? মঞ্জিলার বড় ভয় করে। নতুন করে ভয় করে। কী রিপোর্ট অপেক্ষা করছে তাদের জন্য? একজন অপেক্ষমাণ অসহায় মায়ের জন্য?
পুলিশি জেরার মুখে একপর্যায়ে সেতুর মুখ থেকে বেরিয়ে আসে রোমহর্ষক নৃশংস এক বিবরণ। নীহার বানু নিরুদ্দেশ বা বেঁচে আছেন এমন ক্ষীণ আশার চির সমাপ্তি ঘটে সেতুর জবানবন্দি থেকে। বেঁচে থাকার শেষ চেষ্টায় মনুষ্যরূপী পশুদের প্রতিরোধের ব্যর্থ চেষ্টার মুহূর্তে খুনি সেতুর হাতে কামড় দেয়ার সেই চিহ্নটি তাঁর মৃত্যুর সাক্ষী হয়ে দাঁড়ায়। 
২৭ জানুয়ারি ১৯৭৬ সাল, মঙ্গলবার গোধূলি লগ্নে নীহারবানুকে হত্যা করা হয়েছিল উপর্যুপরি শ্লীলতাহানি এবং নির্মম নির্যাতনের পর। কারণ একতরফা প্রেমে নীহার সাড়া দেয়নি। বিয়ের প্রস্তাবে নীহার রাজি হয়নি। খুনি তাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিল সে প্রত্যাখ্যান করেছিল। শেষবারের মত গলায় শাড়ির আঁচল পেঁচিয়ে নিষ্ঠুর খুনি জিজ্ঞেস করেছিল,
বিয়ে করবে কি করবে না?
নীহারবানু মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ার আগেও বলেছে,
না বিয়ে করব না।
হত্যার পর তার শব ট্রাঙ্কের ভেতর রেখে ভার্সিটির নিকটবর্তী ‘মীনা মঞ্জিল’ এর ভেতর মাটি খুঁড়ে চাপা দেয়া হয়। পরবর্তীতে সেই মেঝে সিমেন্ট দিয়ে ঢালাই করা হয়েছিল।

হত্যার প্রায় মাস ছয়েক পরে, পুলিশ শহরের উপকণ্ঠে মীনা মঞ্জিলের মেঝে খুঁড়ে ট্রাঙ্কের ভেতর থেকে উদ্ধার করে নীহারবানুর কঙ্কাল। কঙ্কালের পাশে ওর হাইহিল স্যান্ডেল,  একটা ভ্যানিটি ব্যাগ আর ছিল লম্বা বেণী করা চুল।

প্রচ্ছদ রাজিব রায়
 


         

Berger Weather Coat