।। পি. বৈদ্যনাথন আইয়ার, জয় মজুমদার কাউনাইন শেরিফ এম, দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ।।

তারা নিজেদের ‘হাইব্রিড যুদ্ধাস্ত্র’ ও ‘চীনাদের পুনর্জাগরণ’ বিষয়ে ‘বিগডেটা’ ক্ষেত্রের অগ্রপথিক হিসেবে বর্ণনা করে থাকে। চীনের সরকার এবং চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সাথে সংযুক্ত একটি শেনজেন ভিত্তিক এমনই এক প্রযুক্তি সংস্থা তাদের ‘বিদেশি লক্ষ্যবস্তু’ হিসেবে গ্লোবাল ডেটাবেজের মাধ্যমে ১০ হাজারেরও বেশি ভারতীয় ব্যক্তি ও সংস্থার ওপর নজরদারি করছে। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এমনই তথ্য।

জেনহুয়া ডেটা ইনফরমেশন টেকনোলজি কোম্পানি লিমিটেড নামের প্রতিষ্ঠানটি রিয়েলটাইমেই তাদের নজরদারির লক্ষ্যগুলোকে চিহ্নিত ও পর্যবেক্ষণ করছে, যার ক্ষেত্র প্রসারিত এবং গভীরতাও বেশ।

রাষ্ট্রপতি রাম নাথ কোবিন্দ এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী থেকে কংগ্রেসের অন্তর্বর্তীকালীন রাষ্ট্রপতি সোনিয়া গান্ধী এবং তাদের পরিবার; মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অশোক গেহলট এবং অমরিন্দর সিংহ থেকে উদ্ধব ঠাকরে, নবীন পট্টনায়েক এবং শিবরাজ সিং চৌহান; নির্মলা সিথারমন, স্মৃতি ইরানী, এবং পীযূষ গোয়েল, মন্ত্রী রাজনাথ সিং ও রবিশঙ্কর প্রসাদ; সেনাবাহিনী, নৌ ও বিমান বাহিনীর কমপক্ষে ১৫ জন প্রাক্তন প্রধান, প্রতিরক্ষা বাহিনী প্রধান বিপিন সিং রাওয়াত; ভারতের প্রধান বিচারপতি শরদ ববদে এবং বিচারক এ এম খানওয়িলকার, লোকপাল বিচারপতি পি সি ঘোস এবং নিয়ন্ত্রক ও নিরীক্ষক জেনারেল জি সি মর্মু; শীর্ষ শিল্প প্রযুক্তিবিদ রতন টাটা এবং গৌতম আদনি, ভারত পে (ভারতীয় পেমেন্ট অ্যাপ) এর প্রতিষ্ঠাতা নিপুণ মেহরা এবং অজয় ​​ত্রিহানের মতো স্টার্ট-আপ টেক উদ্যোক্তারাও রয়েছেন সেই নজরদারির তালিকায়।

ভারতের রাজনৈতিক, সরকারি প্রতিষ্ঠান বা অর্থনৈতিক ক্ষেত্রের প্রথম সারির ব্যক্তিত্বরাই শুধু নন, নজরদারির তালিকায় রয়েছেন বিভিন্ন ক্ষেত্রের গণ্যমান্যরা। আমলা, বিচারপতি, বিজ্ঞানী, শিক্ষাবীদ থেকে শুরু করে চিনা নজরদারিতে রয়েছেন সাংবাদিক, ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, সামাজিক অধিকারের আন্দোলনকারীরা। এমনকী, একশরও বেশি অর্থনৈতিক অপরাধ, দুর্নীতি, সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ, মাদক-সোনা ও অস্ত্র পাচারও চীনা নজরদারির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত।

নিয়ন্ত্রণরেখায় যখন ভারতীয় ও চীনা সেনা মুখোমুখি এবং ভারতের বিরুদ্ধে কার্যকলাপে বেশ কয়েকটি প্রতিবেশীকে মদত দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে বেজিংয়ের বিরুদ্ধে, তখন জেনহুয়া ডেটা ইনফরমেশন টেকনোলজির এই নজরদারি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উল্লেখ্য এই সংস্থার দাবি, তারা চীনা গোয়েন্দা বাহিনী, সেনা ও নিরাপত্তা সংস্থার সঙ্গে যুক্ত।

দুই মাস ধরে, দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, বিগ-ডেটা সরঞ্জাম ব্যবহার করে, জেনহুয়ার ক্রিয়াকলাপ থেকে মেগা ডেটা তদন্ত করে লগ ফাইলের বড়সর স্তূপ পেয়েছে। এটি সংস্থাটির বিদেশি প্রধান ডেটাবেস (ওকেআইডিবি) বলে পরিচিত। এই ডেটাবেস উন্নত ভাষা (কম্পিউটার প্রোগ্রাম ল্যাঙ্গুয়েজ), লক্ষ্য এবং শ্রেণিবদ্ধকরণ সরঞ্জাম ব্যবহার করে। কোনও সুস্পষ্ট চিহ্নিতকারী ছাড়াই এতে শত শত এন্ট্রি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

সংস্থার ডাটাবেসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জার্মানি, আরব আমিরাতের তথ্যও রয়েছে। গুয়াংডং প্রদেশের শেনঝেন শহরে সংস্থার নেটওয়ার্ক রিসার্চ থেকে একটি সোর্সের মাধ্যমে এসব তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। তবে “ঝুঁকি এবং সুরক্ষা” বিবেচনায় সোর্সের নাম উল্লেখ করা যাচ্ছে না।

শেনজেনে পড়াশোনা করা ক্রিস্টোফার বাল্ডিং নামের ভিয়েতনামের একজন অধ্যাপকের সঙ্গে কাজ করা সোর্সটি দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, দ্য অস্ট্রেলিয়ান ফিনান্সিয়াল রিভিউ, ইতালির ইল ফোগলিও এবং লন্ডনের দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ অন্তর্ভুক্ত সংবাদ সংস্থাগুলির সঙ্গে এসব তথ্য শেয়ার করেছেন।

রেকর্ড বলছে, জেনহুয়া ২০১৮ সালের এপ্রিলে সংস্থা হিসাবে নিবন্ধিত হয় এবং চীনজুড়ে ২০ টি প্রসেসিং কেন্দ্র স্থাপন করে। সংস্থাটি তার ক্লায়েন্ট হিসাবে চীন সরকার এবং সেনাবাহিনীকে গণ্য করে থাকে।

এ সংক্রান্ত বিষয়ে সংস্থার ওয়েবসাইটে উল্লেখিত ই-মেইলে গত ১ সেপ্টেম্বর প্রশ্ন করা হলে তার কোনও জবাব মেলেনি। এমনকী ৯ সেপ্টেম্বর থেকে ওয়েবসাইটটি অকার্যকর করে দেওয়া হয়েছে। এরপর জেনহুয়ার প্রধান কার্যালয় দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিনিধি পৌঁছালে সংস্থার তরফে কর্মীরা কোনও প্রশ্নের উত্তর দেননি। তা ‘ট্রেড সিক্রেট’ বলে জানানো হয় সংস্থার তরফে।

যদিও দিল্লির চীনা দূতাবাসের একটি সূত্র দ্য ইন্ডিয়ার এক্সপ্রেসকে জানায়, কোনও প্রযুক্তি সংস্থার কাছে অন্যদেশের কোনও ব্যক্তি, সংস্থা তথ্য থাকলে তা চীনা গোয়েন্দা ও সেনাকে দেওয়ার কথা তাদের সরকার বলেনি।

কিন্তু, জেনহুয়া দাবি করেছে চীনা সরকার ও সেনাবাহিনী তাদের ক্লায়েন্ট। এই দাবি কি সঠিক? চীন সরকার যদি ওসিআইডিবি ডেটা ব্যবহার করে, তবে কী উদ্দেশ্যে? এর জবাব অবশ্য চিনা দূতাবাসের সেই সূত্র দেননি। এক্ষেত্রে বিদেশে ব্যবসার জন্য চীন স্থানীয় আইন মোতাবেক সংস্থাগুলোকে পরিচালিত হওয়ার কথাই বলে বলে জানানো হয়েছে।

ওয়েব এবং সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলি থেকে তথ্য স্ক্র্যাপিং, গবেষণা কাগজপত্র, নিবন্ধগুলি, পেটেন্টস, নিয়োগের অবস্থানগুলি ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে জেনহুয়া একটি নজরদারিমূলক মানচিত্র তৈরি করে। একে তারা ব্যক্তি ও সম্পর্কের মাইনিং বলে অভিহিত করে। এখানে ব্যক্তি, পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সব তথ্য বহুমাত্রিক সোর্স থেকে সংগ্রহ করা হয়ে থাকে।

এটা অস্বাভাবিক নয় যে, ওকেআইডিবি ভারতের সব নজরদারিভুক্তদের ক্ষেত্রে পারিবারিক বিষয়ও রেখেছে।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের অনুসন্ধানে প্রমাণিত হয়েছে যে, ওকেআইডিবি যাদের পরিবার ও স্বজনদেরও নজরদারিতে রেখেছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী মোদী (স্ত্রী যশোদাবেন) এর আত্মীয়দের সনাক্ত করে; রাষ্ট্রপতি কোবিন্দ (স্ত্রী সাবিতা কোবিন্দ); প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং (স্ত্রী গুরশরন কৌর এবং তাদের কন্যা উপিন্দর, দামান, অমৃত); সোনিয়া গান্ধী (স্বামী, প্রয়াত রাজীব, পুত্র রাহুল গান্ধী, কন্যা প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভদ্র); স্মৃতি ইরানী (স্বামী জুবিন ইরানী); হর্ষস্রত কৌর (স্বামী সুখবীর সিং বাদল, ভাই বিক্রম সিং মজিথিয়া এবং পিতা সত্যজিৎ সিং মজিথিয়া); অখিলেশ যাদব (পিতা মুলায়াম, স্ত্রী ডিম্পল, শ্বশুর আর সি রাওয়াত, চাচা শিবপাল সিং এবং রাম গোপাল)।

জেনহুয়ার তদারকি করা ব্যক্তিদের তালিকায় রয়েছেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী রমন সিং, অশোক চভন ও সিদ্ধারামাইয়া; রাজনৈতিক দলগুলির নেতৃবৃন্দ, ডিএমকে প্রয়াত এম করুণানিধি, বহুজন সমাজ পার্টির প্রয়াত কাঞ্চি রাম এবং আরজেডি’র লালু প্রসাদ যাদব। এই ডাটাবেসটিতে পররাষ্ট্রসচিব হর্ষ বর্ধন শ্রিংলাসহ প্রায় আড়াই শতাধিক ভারতীয় আমলা ও কূটনীতি, নিতি আইয়োগের সিইও অমিতাভ কান্ত; প্রায় ২৩ জন প্রাক্তন ও বর্তমান মুখ্য সচিব এবং এক ডজনেরও বেশি প্রাক্তন ও বর্তমান পুলিশপ্রধান। তাদের পর্যাপ্ত কৌশলগত সংগ্রহ রয়েছে তাদের হাতে।

সংবাদমাধ্যমের তালিকাভুক্তরা হলেন: এন রবি, যিনি গত সপ্তাহে দ্য হিন্দু গ্রুপের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন; জি নিউজের প্রধান সম্পাদক সুধীর চৌধুরী; ইন্ডিয়া টুডে গ্রুপের পরামর্শদাতা রাজদীপ সারদেসাই; প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রাক্তন মিডিয়া উপদেষ্টা সঞ্জয় বারু; এবং ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রধান সম্পাদক রাজ কমাল ঝা।

খেলাধুলা, সংস্কৃতি এবং ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের মধ্যে তালিকায় নাম রয়েছে, প্রাক্তন ক্রিকেটার শচিন তেন্ডুলকার, চলচ্চিত্র পরিচালক শ্যাম বেনগাল, ধ্রুপদী নৃত্যশিল্পী সোনাল মানসিং, প্রাক্তন অকাল তখত জেঠেদার গুরুবচন সিং, চার্চের বেশ কিছু বিশপ এবং আর্চবিশপ, রাধে মা, দ্বিতীয়বারের মতো শিরোমণি গুরুদ্বার নিবন্ধ কমিটিতে নির্বাচিত মহিলা জগির কৌর এবং নিরঙ্কারী মিশনের হরদেব সিংয়ের।

“প্রতিটি দেশ কোনো না কোনোভাবে এটি করে। এটা ফরেন ইন্টেলিজেন্সের কাজ। তবে বিগডেটা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে বেইজিং স্পষ্টভাবে এটিকে পরবর্তী স্তরে নিয়ে গেছে।” ক্যানবেরাভিত্তিক সাইবার সুরক্ষা, প্রযুক্তি ও ডেটা বিশেষজ্ঞ রবার্ট পটার বলেন। তিনি জেনহুয়ার সোর্সের সঙ্গে তথ্যগুলো যাচাইয়ের কাজ করেন।

পটার বলেন, “কেবলমাত্র তারা যে পরিসরে লোকের তথ্য নিচ্ছে, তা দেখলে বোঝা যায় যে তারা হাইব্রিড যুদ্ধের কৌশলগত মান সম্পর্কে অত্যন্ত সচেতন। এসব তথ্যকে সম্পদে পরিণত করে তারা অবিরতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের পরিবার, তাদের তৎপরতা, নেতৃত্বের ভূমিকা এবং সংস্থাগুলোর অসংখ্য উপাত্ত সংগ্রহ করছে।”

Berger Weather Coat