।। বিশেষ প্রতিনিধি, রংপুর ।।

দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে রাতবিরেতে বাংলোয় ঢুকে ইউএনওর (উপজেলা নির্বাহী অফিসার) ওপর হামলার ঘটনার একদিন পরই এলিট ফোর্স র‌্যাব জানিয়েছিলো তাদের ‘ছায়াতদন্ত’ থেকে পাওয়া তথ্যের কথা।

সংবাদ ব্রিফিংয়ে র‌্যাব-১৩ অধিনায়ক জানিয়েছিলেন, চুরির উদ্দেশ্যে এই ঘটনা ঘটায় বলে আটক আসাদুল তাদের কাছে স্বীকারোক্তি দিয়েছে। যদিও সেখানে র‌্যাব জানিয়েছিলো, এই দাবি আসাদুলের।

সপ্তাহ না ঘুরতেই দেশজুড়ে আলোচিত এই ঘটনা তদন্তে নাটকীয় মোড় নেয়। শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) দিনাজপুরে পুলিশ সংবাদমাধ্যমের সামনে আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়, তদন্তে তারা নিশ্চিত হয়েছেন যে, ইউএনও ওয়াহিদা খানমের সাবেক কর্মচারী রবিউল এই ঘটনা ঘটায়। রবিউলের স্বীকারোক্তি মোতাবেক উপজেলা পরিষদের পুকুর থেকে হামলায় অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হাতুড়ীটিও উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানান রংপুর রেঞ্জ পুলিশের ডিআইজি দেবদাস ভট্টাচার্য।

দুই সংস্থার দুই তথ্য

২ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাতে ঘোড়াঘাটের ঘটনার পর স্থানীয় যুবলীগের একজন নেতাসহ তিনজনকে গ্রেফতারের পর র‍্যাব জানিয়েছিল, তারা চুরির উদ্দেশে ওই বাড়িতে ঢুকে হামলা চালিয়েছিল বলে স্বীকারোক্তি দিয়েছে।

সেই সময় র‍্যাব-১৩ অধিনায়ক কমান্ডার রেজা আহমেদ ফেরদৌস বলেছিলেন, তাদের কাছে জিজ্ঞাসাবাদে আসাদুল জানিয়েছেন, নবীরুল নামে এক ব্যক্তি এই ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যাওয়া ব্যক্তি নবীরুল বলেও সে জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছে।

এই ঘটনার পর বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছিল যে, তারা মনে করেন, এটা কোন চুরির ঘটনা নয়।

লিখিত বক্তব্যে অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এবং স্থানীয় সরকার বিভাগের সিনিয়র সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ বলেন, “অ্যাসোসিয়েশন মনে করে এটি কোনও চুরির ঘটনা নয়। কারণ দুর্বৃত্তরা কোনও প্রকার জিনিস বা সম্পদ চুরি করেনি। এটি একটি পরিকল্পিত আক্রমণের ঘটনা এবং এর সঙ্গে আরও অনেক ব্যক্তি জড়িত থাকতে পারেন।”

পরে আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভা শেষে সভাপতি ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, ‘ইউএনওর বাসায় চুরির ঘটনা মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হয়নি। কী কারণে তাঁর ওপর হামলা হয়েছে, তা আরও তদন্তের জন্য গোয়েন্দা সংস্থাকে নির্দেশ দিয়েছি।’

এরপরেই ডিবি পুলিশ মামলাটির তদন্ত করতে শুরু করে। সেই সময় ঢাকার একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল তাদের অনুসন্ধানে জানায়, ইউএনওর বাসা ও অফিসের কর্মচারীদের কয়েকজনের ব্যাপারে গুরুতর কয়েকটি অভিযোগের কথা। ফলে ডিবি পুলিশ তদন্তের শুরুতেই অগ্রাধিকার দেয় ইউএনওর বাসা ও অফিসে কর্মরতদের ব্যাপারে।

তদন্তের এক পর্যায়ে গত শনিবার দুপুরে দিনাজপুরে রংপুর রেঞ্জ পুলিশের ডিআইজি স্বয়ং এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে জানান, কিছুদিন আগে সাময়িক বরখাস্তকৃত কর্মচারী রবিউল এই ঘটনাটি ঘটায়। আগের দিন দিনাজপুরের বিরলের এই বাসিন্দাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরে তার স্বীকারোক্তি মোতাবেক উপজেলা পরিষদের পুকুর থেকে হামলায় ব্যবহৃত হাতুড়ী উদ্ধার করা হয়।

পুলিশের দেয়া এই তথ্যের পর প্রশ্ন ওঠে, আলোচিত এই মামলার তদন্তে রাষ্ট্রের দুই গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার কাছ থেকে দুই ধরনের তথ্য উঠে এলো কীভাবে?

এব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে র‍্যাব-১৩ অধিনায়ক কমান্ডার রেজা আহমেদ ফেরদৌস বলেন, “প্রথমে যখন ঘটনাটা ঘটলো, তখন আমরা সবগুলো সংস্থা এটার পেছনে লেগেছিলাম। তখন যাদের আটক করা হয়েছিলো, তারা সবাই সন্দেহভাজন ছিলেন। আমরা তাদের র‌্যানডম জিজ্ঞাসাবাদ করেছিলাম। তখন আসাদুল স্বেচ্ছায়ই বলেছিলো যে, সে এটা (ইউএনওর ওপর হামলা) ঘটিয়েছে। আমরা সংবাদমাধ্যমে শুধু সেই তথ্যটুকুই দিয়েছিলাম।”

র‌্যাব অধিনায়ক আরও বলেন, “আমরা কিন্তু তখনও বলেছিলাম যে, এটা (চুরির উদ্দেশ্যে ইউএনওর ওপর হামলা) ওর (আসাদুল) দাবি। আমরা এটা বলছি না। আর বিষয়টি পুরোপুরি তদন্ত করতে আরও সময় লাগবে। এরপর এর তদন্ত করেছে ডিবি। কাজেই এখন পুলিশ যেটা বলছে সেটাই কনক্লুসিভ (চূড়ান্ত)।”

এব্যাপারে জানতে চাইলে রংপুর রেঞ্জ পুলিশের ডিআইজি দেবদাস ভট্টাচার্য সরাসরি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি বলেন, “ঘটনার পর সরকারের সবগুলো সংস্থা তদন্তকাজে হাত বাড়িয়েছে। যারা তদন্ত করেছেন, তারা যথেষ্ট দক্ষতা রাখেন। কাজেই আজকের যে অগ্রগতি, এটা সব তদন্তেরই ফলাফল।”

এর আগে ১২ সেপ্টেম্বর সংবাদ ব্রিফিংয়ে একই ধরনের প্রশ্নের জবাবে ডিআইজি বলেছিলেন, “আমি এই বিষয়ে কোন মন্তব্য করতে চাই না। আসাদুল এটি কেন বলেছে…হয়তো তাকে মিসগাইড করেছে, বা অন্য কোন ইয়ে থাকতে পারে, সব বিষয়গুলো কিন্তু আমরা দেখছি তদন্ত করে।”

ঘটনার নেপথ্যে তাহলে কী?

র‌্যাবের দাবি অনুযায়ী, তাদের ‘ছায়াতদন্তে’ উঠে এসেছিলো, এই ঘটনা নিছক চুরির উদ্দেশ্যে আসাদুল ঘটায় বলে স্বীকার করে।

আর পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, আসাদুল নয়, এই ঘটনা রবিউল ঘটায় তা সে নিজেই স্বীকার করেছে। কিন্তু এর নেপথ্যে কী তা নিয়ে এখনই চূড়ান্ত কোনো কথা বলতে রাজি হননি পুলিশ কর্মকর্তারা।

ডিআইজি বলেন, “আমরা সব তথ্য যাচাই বাছাই করে দেখছি। এগুলো সম্পন্ন হলেই আমরা বলতে পারবো ঠিক কী কারণে এই ঘটনাটা ঘটেছে।”

পুলিশের তদন্তকারী সংস্থার একটি সূত্র জানিয়েছে, ইউএনওর ওপর হামলার পর ঢাকার একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের কাছে এক কর্মচারী জানান, রবিউল কিছুদিন আগে ইউএনওর ব্যাগ থেকে মোটা অংকের অর্থ সরায়। পরে সিসিটিভি ফুটেজে তা ধরা পড়ে। সেই তথ্যটি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে তদন্ত শুরু হয়। পরে রবিউলকে গ্রেফতারের পর পুরো বিষয়টি বেরিয়ে আসে।

সূত্রের দাবি, ওই ঘটনার পর রবিউলকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। সেই রাগ থেকেই পরিকল্পিতভাবে এই হামলা বলে এখনও পর্যন্ত রবিউল দাবি করেছে।

ইউএনওর বাবার কেনা জমি, দলিল দানপত্রের

দায়িত্ব নেয়ার পর ইউএনও ওয়াহিদা খানমের বাবা ওমর আলী শেখ খোর্দাদপুর মৌজায় প্রায় ৫ বিঘা জমি কেনেন। এই জমি তিনি কেনার আগে স্থানীয় প্রভাবশালীরা দখলের চেষ্টা চালায়। কিন্তু জমি কেনার পর তারা আর সুবিধা করে উঠতে পারেনি।

ওই জমি বেচাকেনার একটি দলিলের অনুলিপি উত্তরকালের হাতে এসেছে। সেখানে দেখা যায় ফারুক সিদ্দিকীসহ ১৮০ শতক জমির দুই মালিক এই জমি দানপত্র করে ইউএনওর বাবার নামে হস্তান্তর করেন এ বছরের মার্চে।

ফারুক সিদ্দিকী নিজে এব্যাপারে মুখ খুলতে রাজি না হলেও ঢাকায় বসবাসরত তার এক পুত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ওই জমি ২০ লাখের কিছু বেশি টাকার বিনিময়ে ইউএনওর বাবার কাছে বিক্রি করেন তারা। তবে দলিলে কেন দানপত্র লেখা হয়েছে, সে ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি কিছু বলতে পারেননি।

প্রসঙ্গত, দীর্ঘদিন ধরে ঘোড়াঘাট উপজেলায় সহকারী কমিশনার (ভূমি) পদটি খালি থাকায়, সেখানকার ইউএনওই এসিল্যান্ড অফিসের যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন।

শুরুর দিকে এই জমি কেনার ঘটনা হামলার নেপথ্যে রয়েছে কি না সে ব্যাপারে সন্দেহ দেখা দেয়। তদন্তকারীরা জানান, তাদের তদন্তে এই বিষয়টিও তারা গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখেছেন। তবে এখনও পর্যন্ত এর সঙ্গে হামলার কোনো সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি।

এখনও বাকি যেসব প্রশ্নের জবাব

ঘোড়াঘাটের ঘটনার পর আশেপাশের জেলা থেকে রাষ্ট্রের নানা সংস্থা ছুটে আসে। তেমনই একটি সংস্থার একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে তার চাকরিজীবনের অভিজ্ঞতা থেকে জানান, ইউএনওর ওপর হামলার ঘটনাটি খুব সহজভাবে তদন্ত করার সুযোগ নেই।

তিনি বলেন, “রবিউল বা কোনো কর্মচারী এই ঘটনা ঘটিয়ে থাকলে, তাদের অজানা থাকার কথা নয় যে, বাংলোর ভেতরে বাইরে কতগুলো ক্লোজসার্কিট ক্যামেরা রয়েছে। অথচ তাদের কারো আচরণেই আমরা সেসব নিয়ে উদ্বেগের কোনো চিহ্নও দেখতে পাইনি ধারণকৃত ফুটেজে। এই বিষয়টি আমলে নিয়ে অপরাধের মনস্তত্ব বোঝার চেষ্টা করা জরুরি।”

ঘটনার পর ক্রাইমসিনে কাজ করেছেন, সিআইডির এমন একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, “যেভাবে হামলা হয়েছে, তাতে দুটো বিষয় স্পষ্ট। প্রথমত, তারা ঘটনাচক্রে ইউএনওকে আঘাত করেনি। আর ইউএনওকে আঘাতের পর তাদের এই তৎপরতা লুকানোর কোনো চেষ্টাও তারা করেনি।”

সিআইডির ওই কর্মকর্তা বলেন, “অন্য ক্যামেরার কথা বাদও যদি দিই। যদি তর্কের খাতিরে ধরেই নিউ যে অন্য ক্যামেরাগুলো তারা দেখেনি বা বোঝেনি, তাহলেও যেদিক দিয়ে হামলাকারীরা উঠেছে, সেখানে স্পষ্ট সিসিটিভি ক্যামেরা রাখা আছে। ওটা না দেখার কোনো সুযোগই নেই। অথচ ওরা সেই ক্যামেরা নিয়ে মাথাও ঘামায়নি। তারমানে এটা স্পষ্ট যে, হামলাকারীরা অনেকটা ইচ্ছেকৃতভাবেই ক্যামেরায় ধরা দিয়েছে।”

ঘটনার পর পাশের জেলা থেকে আসা রাষ্ট্রের একটি সংস্থার ওই কর্মকর্তা সিআইডির এই কর্মকর্তার সঙ্গে একমত পোষণ করেন। তিনি বলেন, “ওরা জানতো যে, সিসি ক্যামেরায় ওদের দেখা যাবে। ওরা সেখান থেকে নিজেদের গোপন করার চেষ্টাও করেনি। শুধুমাত্র পোশাকের ব্যাপারে কিছুটা সচেতন ছিলো যাতে স্পষ্ট চেহারা বোঝা না যায়। এর অর্থ হলো তারা দেখাতে চেয়েছে যে তারা সদর্পে এমন ঘটনা ঘটিয়ে চলে যেতে পেরেছে।”

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, “ইউএনওর বাবা আপনাদের (সংবাদমাধ্যমে) যে বিবরণ দিয়েছেন, তা থেকে এটা স্পষ্ট যে, হামলাকারীদের উপস্থিতিতেই তার শিশু সন্তানের ঘুম ভাঙে এবং সে তার নানার আশেপাশে ঘোরাঘুরি করে। গতানুগতিক ধারার অপরাধের ক্ষেত্রে আমরা দেখে থাকি, হামলাকারীরা প্রত্যক্ষ সাক্ষী যথাসম্ভব কমানোর চেষ্টা করে। কিন্তু এক্ষেত্রে বরং তারা উল্টো কাজটি করেছে। এমনকি সিসি ক্যামেরার ফুটেজে হাতুড়ীও দেখা গেছে।”

এসব বিষয় তুলে ধরে অভিজ্ঞ ওই কর্মকর্তা প্রশ্ন করেন, “তাহলে কি হামলাকারীরা চেয়েছিলো যে, ঘটনার বিবরণ পরে সবিস্তারে প্রকাশ পাক? যদি সেটা হয়ে থাকে তাহলে এই মামলার তদন্তে ব্যক্তিগত ঘটনার বাইরে অন্যদিকেও নজর দেয়া জরুরি।”

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দিনাজপুর জেলা ডিবির পরিদর্শক ইমাম জাফর জানান, রিমান্ডে এখনও আসামীদের জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। সেখান থেকেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলছে।

তিনি বলেন, “আশা করি তদন্ত শেষ হলে সব প্রশ্নের জবাব পাওয়া যাবে। তখন আপনাদের সব প্রশ্নেরও জবাব দেয়া সম্ভব হবে।”

Berger Weather Coat