যুগের হাওয়া যতই ধাক্কা দিক, মনে-মগজে অনলাইনের আলোকবাদ্যে কেঁপে উঠুক প্রাণ। তবু নির্জনতা—সে আছে, থাকবে ত্রিকোণ প্রেমের ফাঁদে ফস্কে যাওয়া গেরোর আকারে। কোলাহলেও কোকিল যেমন মিষ্টি বলেই দৃষ্টি কাড়ে। তেমনি, শরৎ এলেই সর্বাঙ্গে শক্তি আর সাহসের সরল পত্রগুলো সবুজাভ রূপ নিয়ে শান্ত করে দেয় আমাকে। পুরোনো দিঘির তল থেকে কত কত রহস্যের ঘাই ছুঁড়ে মারে। এই ঋতু এতটাই আলাভোলা, বেদনা ছাড়াই অহর্নিশি কাঁদায় আমাদের।

শরৎ। লিখছি বলে নয়, অতীব প্রিয় এই ঋতু আমার কাছে আজও নববধূর মতো প্রচণ্ড শিহরণ জেগে তোলে—মনে, মগজে, শরীরে। আঁকাবাঁকা নদীর পাড়ে ওই যে শুভ্র, শান্ত কাশফুল দুলে দুলে হেলে পড়ে কী কথা বলছে তারা একে ওপরের সাথে! তুমি কী জানো? এত বড়ো আকাশজুড়ে অভূত নীলের মধ্যে হঠকারী সাদা মেঘের বেহুদা অনুপ্রবেশ। নানা রঙের কত স্তরের প্রজাপতি! শরৎই জানে কি নামে ডাকবো তাদের!

খুব ছোটবেলার, মধ্যবয়সের আর আজ বর্তমানের শরতে খুঁজে পাই সাংঘাতিক গরমিল। শিউলি-শেফালি অনেক-না-হলেও ঝরে তো পড়ে আজও কোনো অচেনা বাড়ির উঠোনে। একান্ত প্রভাতে হয়তো নাম-না-জানা কোনো অষ্টাদশীর কোমল স্পর্শে তা আজও জীবন্ত হয়ে ওঠে আমার আঁখির অলিন্দে। বস্তুত গরম আর ঠাণ্ডার এই দেশে শরৎ কিন্তু সত্যিই স্বাতন্ত্র্য। উল্লিখিত দুই তাপ-ই অপছন্দ আমার। আমি মধ্যবিত্তের মহান এক মশকরা। না পারি গরমকে দমন করতে, না পারি শীতকে সহ্য করতে। শরৎ চিরকালই সহনীয় আমার দেহের সঙ্গে। বোধের সঙ্গে। ব্যক্তিত্বের সঙ্গে। শরৎ এলেই ভেসে ওঠে বিভূতিবাবুর অপু আর দূর্গার মুখচ্ছবি। শুভ্রতার প্রতীক—প্রচণ্ড সাদার মধ্যে বানভাসি সাদা হয়ে ফুটে থাকা বিস্তারিত কাশফুলের মন ভোলানো আবেশ। শরৎ এলে রবীন্দ্রনাথও বসে নেই। তিনিও আমার মগজে টনক নাড়ে বারেবারে। ওই যে ‘নীল আকাশে কে ভাসালে সাদা মেঘের ভেলা।’ আহা! মরি মরি! জীবন তুমি কতটা জীবন্ত বুঝি এ শরতেই। শরৎ এলেই বুঝি শীতের কড়ানাড়া। যদিও হেমন্ত রয়ে যায় মাঝেখানে। এই শরতেই ধেয়ে আসে ছাতিম ফুলের পাগল করা ঘ্রাণ। সারাটি বছর কোথায়, কীভাবে যে রয়ে যায় এই মুখচোরা, বেঢপ বৃক্ষবাবাখানি। গন্ধ যে এমন কোনো আলোচ্য—তা-ও নয়। প্রকারন্তরে বিদঘুটেই বলা চলে। খুব কাছ থেকে ঘ্রাণে ঘৃণারও উদ্রেক ঘটে। ঘটে সর্দির সফলতা। তবুও এই ঘ্রাণই আমাকে চমকে দেয়, বলে দেয় শীত আসন্ন। বৈচিত্র্যের বারোমাসি এই দেশে হয়তো ঘটে চলেছে সবার অজান্তে হাজারও বৈচিত্র্যের ঘনঘটা; কিন্তু শরতেই দেখি সে ইনিস্ট্যান্ট। একটুর জন্য হলেও স্থির, ধীর, কোমল। কেমন স্নেহপরায়ণ, নাদুস-নুদুস। সামান্য হলেও সে সত্যের সহোদরা। কেমন পবিত্র আর প্রফুল্ল হয়ে ফুটে থাকা। আমি মুগ্ধ হই। খুব ভোরের অনাবিষ্কৃত গ্রাম্য মেঠোপথে যদি হেঁটে যাই তোমারই খোঁজে—ও শিশির, ও আমার মুক্তাদানার মণিহার, ও আমার বুকভরে শ্বাস নেওয়া স্নিগ্ধ শরৎ। গন্ধের গৌরব নয়, তবু বলি—আরও একটি গন্ধের গদ্যালাপে আমি আন্দোলিত হই। পাট-পচার অলিখিত অপূর্ব এক ঘ্রাণ চিরকালই অন্য মাত্রায় মাতোয়ারা করে তোলে আমাকে। বাল্যোবেলায় কতবার গোপনে মুখ গুঁজে নিয়েছি সে ঘ্রাণ। হে আমার শরৎপচা গন্ধ-গোকুল। তবে এ সবই বাণিজ্যিক শহরে আজ অতীব অর্বাচিন। এ মাত্রায় মুগ্ধ হতে গেলে আপনাকে, আমাকে ছুটতে হবে গ্রাম থেকে গঞ্জে। পথ থেকে প্রকৃতির মাঝখানে। যেখানে শিউলির সঙ্গে সতত মিশে থাকে শাপলার শতহাসি—ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র খাল আর বিলে, নদ হতে নদীর উপকূলে। বহুদিন হল শহুরে আর তথাকথিত সভ্য হয়ে যাওয়া এই আমাকে তারা ডাকে ইশারা-ইঙ্গিতে। শোনায় শরতের সাতকাহন আজও আমার পুনর্মুদ্রিত প্রতিটি ভোরের স্বপ্নে।

কত আয়োজন, কত বরণ, শিশু ঘুরছে বৃদ্ধ হাসছে ফোকলা দাঁতে। এত যে বেদনবাক্য, তার থেকে ছিটকে যাওয়া লাখো শব্দের আহাজারি; কিন্তু ঠাকুর বলছে, ঢাক বলছে দূর্গা এলো অলিগলি। যেন মাকড়সার মতো তুমি হে শরৎ পৃথিবীর সকল আত্মকথন একমনে সকল চক্রজাল ভেদ করে কেবল বুনেই চলেছ। হিংসায় জ্বলে-মরে অন্য ঋতু। শরৎ এমনই এক কাল—ভুলেও তাকে অনুবাদ করতে যেওনা কেউ। তার আছে হাজারও চিহ্নেশ্বরী। আছে বৃহৎ পরিসর।

যেন শরৎ এলেই সবকিছু কেমন সরল আর সত্য হয়ে ওঠে। নানান দিক থেকে তারা ধেয়ে আসে। তার প্রতিটি আচরণ জীবনকে আমার নতুন করে স্পন্দিত করে তোলে। সকাল থেকে দুপুর সেই এক শরৎ শরৎ খেলায় কেটে যায়। বাহিত জীবন তবু যেতে যেতে গোধূলির প্রান্তে এসে সব যখন নীরব, নিশ্চুপ তখনই আজানের ধ্বনির সঙ্গে হঠাৎ ভেসে আসে দূর হতে অতি পরিচিত আর এক ধ্বনি—ঢাকের শব্দ। কী দারুণ, কী যে চুম্বকায়িত তার তাল, লয়। উচাটন এই মন মুহূর্তে জাত-পাত-বর্ণ ভেদাভেদ ভুলে মিশে যেতে, যুক্ত হতে চায়—সেও তো শরৎ বিনা নয়। বুঝে যাই দেবীর আগমন। মিশে যাই মেলা আর উৎসবের উৎসাহে।

বিবিধ বিশৃঙ্খলা শরৎই শৃঙ্খলে আনে, প্রকাশ্যে বন্দি করে প্রথমে। শান্ত আর শান্তির বয়ান তুলে ধরে দিকে দিকে। অনেকটা ঘোমটাআঁটা বিধবা নারীর মতো। রূপে সে বহুমাত্রিক। আয়তনে সর্বব্যাপী। বিরহের স্কুল থেকে সে পাঠায় মেঘেদের কাছে চাঁদের চালাকি চুরি করে গেঁথে দেয় সুপর্ণার কপালের ঠিক মাঝখানে। স্বরবৃত্তের ধুয়া তুলে জাত-পাত একাকার করে মেতে ওঠে রঙিন উৎসবে। সেই স্রোতে দস্যুও হয়ে ওঠে দরদী। কান পেতে বলে, কে যেন আসছে। কে যেন আসবে। ওরে! তোরা সব উলুধ্বনি দে। ও আমার চৈতন্য জয়দেব, বাবা কাহ্নপা, ওহে চণ্ডীদাস! ওগো লালন—আমি আছি কায়াবৃক্ষ তলে। মুখোশ খুলে রাধিকা যায় তমাল, মহুয়া বনে। কৃষ্ণ বলে, এত গরম! হেমন্ত যাক তুমি এসো—ডাক পাঠালাম শীতের মনোগ্রামে।   

শরতে স্নান করতে করতে আমি নতুন করে লিখতে বসি, শুনতে বসি, দেখতে বসি। ভাবি—তোমার কাছে অনেক ঋণ, হায় রে শরৎ! দিন চলে যায়, দিন!

প্রচ্ছদ: হিম ঋতব্রত  

Berger Weather Coat