।। শিবলী নোমান ।।

দুপুরের পর থেকেই হোটেলের লবিতে এক ভীষণ কর্মযজ্ঞ! কেউ কারো শাড়ি ঠিক করে দিচ্ছেন, কেউ বা অন্যজনের টাইয়ের নটটা জায়গায় বসিয়ে দিচ্ছেন। আবার অনেকে সহায়তার কোনো হাত না পাওয়ায় নিজে নিজেই টেনেটুনে গুছিয়ে নিচ্ছেন। ২০১৬ সালের ৫ ডিসেম্বরের সেই সময়টায় দিল্লির পাঁচতারকা হোটেল অশোকায় বাংলাদেশের এই একশ যুবার এমন ব্যস্ততার কারণ, আর কিছুক্ষণের মধ্যেই তাদের সাক্ষাৎ করার কথা রয়েছে ভারতের রাষ্ট্রপতির সঙ্গে।

ঘটনাক্রমে সেই দলের একজন ছিলাম আমিও। আমি তো টাইয়ের নটটাই ঠিকমত বাঁধতে জানি না! আমার রুম পার্টনার চ্যানেল টোয়েন্টিফোরের সাদমানও টাইয়ে খুব একটা আগ্রহী নন। কাজেই আমরা দুজন মিলে সিদ্ধান্ত নিলাম, ব্লেজার পড়বো বটে, তবে টাই নয়। হাজার হলেও ভারতের প্রথম বাঙালি রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা হবে। সেখানে টাই না পড়লেও চলে! দুজন খানিকটা রসিকতার ছলেই বলছিলাম, পুরোদস্তুর বাঙালি পোশাক পড়তে পারলে কতই না ভালো হতো!

সন্ধ্যায় আমাদের সাক্ষাতের সময়। কিন্তু আনুষ্ঠানিকতার আছে অনেককিছু। তাই আমাদের বহনকারী বাস হোটেল থেকে বেরিয়ে আগেভাগেই চললো রাজপথ পেরিয়ে রাষ্ট্রপতি ভবনের দিকে।

এই ভবনের প্রতি আমার আগ্রহ অনেক দিনের। তা শুধু এর স্থাপত্যশৈলির কারণে নয়। দেশভাগের সময়কালের নানা ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিশাল এই ভবনের একেকটি অংশ। সে কারণে ভবনের সামনে যখন বাস থেকে নেমে দাঁড়ালাম, তখন মুখটা একটু উঁচিয়ে সুউচ্চ সিঁড়ি পেরিয়ে দৃষ্টির নাগালে আসা ভবনের অংশটুকু দেখেই কেমন যেন এক শিরশিরে অনুভূতি তৈরি হলো। সেই অনুভূতি আরেক ভালোলাগার অদ্ভূত আবহে ছেয়ে গেলো, যখন মনে হলো, আর কিছুক্ষণের মধ্যেই সাক্ষাৎ হবে প্রণব মুখার্জির সঙ্গে। শুধু ভারতের রাষ্ট্রপতি হিসেবে নয়, কিংবা একজন বাঙালি হিসেবেও শুধু নয়, এই মানুষটি দুঃসময়ে বাংলাদেশের পাশে যেভাবে দাঁড়িয়েছেন, তাতে তার সাক্ষাৎলাভ আমাদের সবার জন্যই এক বিশেষ পাওয়া।

এতসব ভাবতে ভাবতেই নামডাকা, নিরাপত্তা তল্লাশি ইত্যকার নানা আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে কখন যে রাষ্ট্রপতি ভবনের ভেতরে ঢুকে গিয়েছি, বুঝতেই পারিনি। সম্বিৎ ফিরলো আশেপাশে নিরাপত্তাকর্মীদের তৎপরতায়। ওভাল-মতন একটা করিডোর পেরিয়ে আমরা ঢুকে পড়লাম দরবার হলে। এখানেই হবে সেই প্রত্যাশিত সাক্ষাৎ। বিশালাকায় হলদেরঙা ঝলমলে পিলারের মাঝ দিয়ে গিয়ে দাঁড়ালাম হলের ভেতরে। পায়ের নিচে পাথরের মেঝে। এক অদ্ভূত জমকালো পরিবেশ। আমরা যে যার নির্ধারিত জায়গায় বসে পড়লাম।

অল্প সময়ের অপেক্ষা। এরপরই প্রণব মুখার্জি এসে ঢুকলেন। একদম সহজ অভিব্যক্তি। আমাদের সামনে রাষ্ট্রপতির নির্ধারিত চেয়ারে বসলেন তিনি। কিছু আনুষ্ঠানিকতার পর তিনি যা বলে শুরু করলেন, সেই কথাটুকু বলার জন্যই আজকের এই স্মৃতিচারণ। তিনি খুব আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বাংলাদেশের শতযুবাকে স্বাগত জানিয়ে যা বলেছিলেন, তা মোটামুটি এমন, “এই রাষ্ট্রপতি ভবনে তোমাদের স্বাগত জানাতে পেরে আমি ভীষণ আনন্দিত। কারণ এ শুধু ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবন নয়, এতে তোমাদেরও অংশীদারত্ব রয়েছে।” তিনি ব্যাখ্যা করার সময় নিজের চেয়ার আর দরবার হলটি দেখিয়ে বলেন, এই রাষ্ট্রপতি ভবন ১৯৩১ সালে তৈরি। ১৯৪৭-এর আগ পর্যন্ত চারজন ব্রিটিশ ভাইসরয় থেকেছেন এ ভবনে। প্রায় দুশ বছর শাসন-শোষণের পর লর্ড মাউন্ট ব্যাটেন জওহরলাল নেহরুর কাছে এখানেই ক্ষমতা হস্তান্তর করে। সে কারণে তোমরাও অবিভক্ত ভারতের সেই ইতিহাস ও ঐতিহ্যের উত্তরসূরী।

সত্যিই তো, এভাবে তো আগে কখনও ভাবিনি! সত্যি সত্যিই তো এই ভবনের নানা ঘটনাপ্রবাহই শেষাবধি একটি বড় ভূখণ্ডের অনেক মানুষের সবকিছু বদলে দিয়েছে। সেই ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে যত পরিণতি লেখা হয়েছে, তার উত্তরপ্রজন্ম তো আমরাও। রাষ্ট্র হয়তো আলাদা হয়েছে। কিন্তু সেই ইতিহাসের উপাদানগুলোকে আলাদা করে ভাবাটা কি সম্ভব?    

সেদিন বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কসহ আরও নানা বিষয়ে তিনি কথা বলেছেন। সেগুলো এখানে উল্লেখ করছি না। তবে শেষদিকে তিনি বলেছিলেন, আমি আশা করি, তোমাদের প্রজন্মের নেতৃত্বে আগামীতে দুটি দেশ আরও এগিয়ে যাবে এবং জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এই অঞ্চলে সবার জন্য সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত হবে।

প্রণব মুখার্জির এই কথাগুলোকে যদি এই অঞ্চলের সবগুলো রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব বাস্তবে রূপ দিতে পারে, তাহলেই হয়তো স্মৃতি হয়ে যাওয়া মানুষটির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা হবে।

শিবলী নোমান রাজশাহীতে বসবাসরত বাংলাদেশি সংবাদকর্মী

Berger Weather Coat