পড়তে পারবেন 5 মিনিটে Berger Weather Coat

।। সৌমিত্র দস্তিদার ।।

কাশ্মীরকে আপনি দুই ভাবে দেখতে পারেন। ১. ভারতের জাতীয়তাবাদী চোখ দিয়ে। ২. পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদের চোখে। অবশ্য তৃতীয় একটা নির্মোহ ইতিহাসের চোখ দিয়ে দেখার একটা ধারাও রয়েছে বটে। এ ধারায় রাজনীতির কচকচানি বাদ দিয়ে প্রাধান্য পাবে মানবতা। পাকিস্তানের বিষয় বলতে পারব না। তবে আমার দেশ অর্থাৎ ভারতে এখন নির্মোহ ইতিহাস চর্চা অত্যন্ত দুরূহ কাজ। বিরুদ্ধ মত ক্রমেই এখানে কোণঠাসা হয়ে পড়ছে। গণতন্ত্রের সবরকম পরিসর কমে যাচ্ছে। এ কারণে হিন্দুত্ববাদী শাসকদের কল্পিত মনগড়া ইতিহাসের বাইরে গিয়ে কিছু বলা বা লেখা শুধু কঠিনই নয়, বিপজ্জনকও। দেখতে দেখতে কাশ্মীরের ৩৭০ ধারা রদের এক বছর হয়ে গেল। কেমন আছে কাশ্মীর তা নিয়ে পরিষ্কার কোনো ছবি পাওয়া মুশকিল।

ধারা বাতিলের পরে পরেই সাধারণ এক কাশ্মীরি ছাত্র আফসোস করে লিখেছিল-‘এমন নাটকীয়ভাবে সব ঘটে গেল যেন আমরা সবাই এক একজন যুদ্ধবন্দি। সব গোপনে ঘটছে আমরা টেরও পাচ্ছি না কী হতে চলেছে। শুধু রাতভর মিলিটারি কনভয়ের শব্দে যাবতীয় নীরবতা খান খান হয়ে ভেঙে যেতে লাগল।’ শোনা যায় বাড়তি পঁচাত্তর হাজার মিলিটারি দেশের নানা রাজ্য থেকে নিয়ে আসা হয়েছিল কাশ্মীরে। কাশ্মীরে অন্যান্য রাজ্যের লোকজনকে মাত্র চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে উপত্যকা ছেড়ে চলে যেতে বলা হলো। প্রশাসন নানাভাবে তাদের চলে যেতে সাহায্য করল। নেটওয়ার্ক বন্ধ হয়ে গেল। ফোন ইন্টারনেট সব বন্ধ। সংবাদমাধ্যমকেও পুরোপুরি স্তব্ধ করে দেওয়া হলো। এভাবেই দেশের মূলস্রোতে আনার নাম করে ৩৭০ ধারা বাতিল করে গোটা দেশ থেকে কাশ্মীরকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হলো।

এ ঘটনার পর দিল্লি যাচ্ছি। আমাকে বহনকারী প্লেনটি দিল্লি ছুঁয়ে সোজা শ্রীনগর যাবে। পাশের সিটে যে ছেলেটি বসল তার চুলের ছাঁট দেখে নিমেষে ওর পেশা কী আন্দাজ করলাম। একটু পরেই ভাব হয়ে গেল। তার পোস্টিং ছিল আসামে। এক সপ্তাহের ছুটি নিয়ে বীরভূমের বাসায় এসেছিল। চব্বিশ ঘণ্টা না যেতেই ওপরতলার হুকুমে চলে যাচ্ছে কাশ্মীরে। কথায় কথায় একসময় খুব চাপা গলায় বলতে লাগল ‘আমাদেরও দোষ আছে। যেভাবে পথেঘাটে স্রেফ সন্দেহের বশে নিরীহ কাশ্মীরিদের আমরা মারধর করি তাতে সমস্যা সমাধান দূরে থাক, তা আরও জটিল হয়ে যায়।’ ৩৭০ ধারা বাতিলের পরে কলকাতায় এক সাক্ষাৎকারে কাশ্মীর টাইমসের বিশিষ্ট সাংবাদিক নন্দিনী ভাসিন বলেছিলেন যে, এবার তো শুধু সাধারণ মানুষ নয়, প্রায় প্রতিটি থানাকেই মিলিটারি ঘিরে রেখেছে। যাতে কোনোভাবে সাধারণ কোনো জওয়ান বিদ্রোহ না করে। পুলিশ, আমলা, আমজনতার পাশাপাশি সমস্ত রাজনৈতিক নেতাকর্মীকে বন্দি করে রেখে সবরকম বিরোধী রাজনীতি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে কাশ্মীরে।

কাশ্মীরের বাইরের লোকের কাশ্মীর সম্পর্কে নানারকম ধারণা। আগে ছিল কাশ্মীর মানেই ভূ-স্বর্গ। চমৎকার ডাল লেক, চিনারের সারি মুঘল যুগের একাধিক অপূর্ব সুন্দর বাগান। শোনা যায় মুঘল বাদশাহ গরমের দিনে বেগম সাহেবাদের নিয়ে এখানে আসতেন বিশ্রাম ও আনন্দ নিতে। জ্যোৎস্নায় ভেসে যাওয়া ডাল লেকের সৌন্দর্যের কোনো তুলনা নেই।

এখনো অধিকাংশ লোকজনের মনে সুন্দর কাশ্মীরের ছবিই রয়ে গেছে। কিন্তু কয়েক বছর ধরে আধা সত্যি, পুরো মিথ্যে সব মিলিয়ে এদেশের চরম দক্ষিণপন্থি রাজনীতি কাশ্মীর সম্পর্কে জনমনে ক্রমেই ছড়িয়ে দিচ্ছে কাশ্মীর মানেই সন্ত্রাসবাদীদের আখড়া। ফলে পুলওয়ামা ও অন্যান্য ঘটনার পর অতি সাধারণ কাশ্মীরি জনতার ওপরে হামলা হচ্ছে। সারা ভারতে এরকম অজস্র ঘটনা ঘটেছে। কোনো কোনো জায়গায় ছাত্র, এমনকি ছাত্রীদের হোস্টেলে আটকে রেখেও ভয় দেখানো হয়েছে। যদিও এসব বিক্ষিপ্ত ঘটনা। সর্বত্রই সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের প্রতিরোধে পিছু হটেছে দুষ্কৃতিরা।

কাশ্মীরের সন্ত্রাস নিয়ে কথা হয় অথচ তার ইতিহাসের সত্যাসত্য চাপা পড়ে যায়। এটা সত্যি যে, ১৫৮৬ সালে মুঘল সম্রাট আকবর কাশ্মীরকে নিজেদের সাম্রাজ্যের ভেতরে নিয়ে এলেন। এটা আজও আমাদের শাসকরা জোর গলায় বলেন। যেটা বলেন না কিছুটা ধর্ম বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কায় জনপদ থেকে ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের বড় অংশ যখন দলে দলে উপত্যকা ছেড়ে চলে যাচ্ছিলেন তখনই তিনি দ্রুত সিদ্ধান্ত নেন ব্রাহ্মণদের ওপর কেউ হামলা করলে কঠিন শাস্তি হবে। ব্রাহ্মণদের থেকে কর নেওয়াও আকবর নিষিদ্ধ করলেন।

১৮০৮ সালে জম্মু শিখরা দখল নেয়। দশ-এগারো বছর বাদে উপত্যকার ক্ষমতাও শিখদের হাতে আসে। পাঞ্জাব কেশরী রনজিৎ সিংহ জম্মু জনপদ শাসনের ভার দেন তার কর্মচারী ডোগরা বংশের গোলাপ সিংকে। এই ডোগরা রাজপুত ছিলেন অত্যন্ত ধূর্ত ও প্রবল উচ্চাকাক্সক্ষী ক্ষমতালোভী। পরবর্তী সময়ে রনজিৎ সিংহের মৃত্যুর পরে শিখ সাম্রাজ্যের দুর্বলতার সুযোগে ১৮৪৬ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে পঁচাত্তর লাখ টাকা ঘুষ দিয়ে চিরকালের মতো জম্মু ও কাশ্মীর তিনি কিনে নিলেন। এভাবেই জম্মু ও কাশ্মীরের ডোগরা সাম্রাজ্য গড়েই উঠেছিল বেইমানি ও ঘুষের বিনিময়ে।

কৃষি অর্থনীতির জম্মু ও কাশ্মীরে মহারাজা বল্গাহীন যে শোষণ শুরু করল তা নিম্নবর্গের হিন্দু ও সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমদের ক্রমেই ক্ষুব্ধ করে তুলতে লাগল। এই সময় ১৮৩১ সাল নাগাদ আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী তরুণ শেখ আবদুল্লাহর নেতৃত্বে ধীরে ধীরে গণ-আন্দোলন গড়ে উঠতে লাগল। তা মোটেও সাম্প্রদায়িক ছিল না বরং অর্থনৈতিক শোষণবিরোধী প্রজা জাগরণ ছিল। প্রাথমিকভাবে শেখ সাহেবের সংগঠনের নাম ছিল মুসলিম কনফারেন্স। দলকে ধর্মনিরপেক্ষ হিসেবে ঘোষণার তাগিদে নাম পাল্টে হলো ন্যাশনাল কনফারেন্স।

শেখ আবদুল্লাহ বারেবারে বলতেন, ‘কাশ্মীরের লড়াই কখনো সাম্প্রদায়িক নয়। হিন্দু মুসলিম শিখ সবাই মিলে এ লড়াই আধিপত্যবাদী জমিদারতন্ত্রের বিরুদ্ধে।’ ন্যাশনাল কনফারেন্স ১৯৪৪ সালে এক ইশতেহারে ডোগরা মহারাজকে পরিষ্কার জানিয়ে দেয় যে, জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সমান অধিকার, সর্বজনীন শিক্ষা, ট্রেড ইউনিয়ন, সভা সমিতি মিছিল, বেকারভাতা সব বিষয়ে কাশ্মীরের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। বলাবাহুল্য তখন কোনো অধিকারই ডোগরা রাজত্বে আমজনতার ছিল না। শেখ সাহেবের পতাকার রং ছিল সবুজ-লাল। কৃষক ও মজুরদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই পতাকার এমন রং করা হয়েছিল। শেখ আবদুল্লাহ দেশে প্রথম আমূল ভূমি সংস্কার করেছিলেন।

এই উদারতা মুসলিম লিগ ও হিন্দু মহাসভা কেউই পছন্দ করেনি। হিন্দু মহাসভা জমিদারতন্ত্রের বিরুদ্ধে আন্দোলনকে হিন্দু রাজার উচ্ছেদ বলে জনগণের একাংশকে তাতিয়ে তুলেছিল। অন্য দিকে খোদ মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ সহ্য করতে পারতেন না জনগণের অবিসংবাদী এই কাশ্মীরের শেরকে। ১৯৪৭ সালে জম্মু ও কাশ্মীর ভারত না পাকিস্তান কোন পক্ষে যাবে তা নিয়ে মহারাজা ছিলেন দ্বিধায়। এই সুযোগে পাক বাহিনীর মদদে সীমান্ত পেরিয়ে পাকিস্তানের উপজাতিদের প্রভাবশালী এক গোষ্ঠী প্রায় শ্রীনগর অবধি পৌঁছে যাওয়ার পর মহারাজা বাধ্য হয়ে ভারতে থাকার সিদ্ধান্ত নেন। ততদিনে অবশ্য শেখ সাহেবের স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী সরাসরি লড়াইয়ে উপজাতিদের সীমান্তের ওপারে ঠেলে দিয়েছেন। অসাম্প্রদায়িক এই শেখ সাহেবের সমর্থনে দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে সেøাগান উঠেছিল ‘শের ই কাশ্মীর কা কেয়া ইরসাদ! হিন্দু মুসলিম শিখ ইত্তাহাদ…’ অর্থাৎ ‘শেখ আবদুল্লাহ কী চান! হিন্দু মুসলিম শিখ ঐক্য।’

হিন্দু মহাসভা তখনো মহারাজাকে স্বাধীন থাকতে চাপ দিচ্ছে। তাদের হিসাব হচ্ছে রাজত্ব থাকলে মহারাজাকে সামনে রেখে শেখ আবদুল্লাহর নেতৃত্বে যে লড়াই সংগ্রাম তাকে আগে দমন করে পরে না হয় ভারতে যোগ দেওয়ার কথা ভাবা যাবে। মুসলিমদের একটা অংশও ছিলেন মহারাজার শাসনের পক্ষে। তারা চাইলেন দুর্বল রাজ্যে যাতে ওপারের পাকিস্তান বকলমে এপারে প্রভুত্ব কায়েম করতে পারে। শেখ আবদুল্লাহর সামনে তখন পরিষ্কার তিনটে রাস্তা। ১. ভারতের সঙ্গে যুক্ত হওয়া। ২. পাকিস্তানের সঙ্গে মিলিত হওয়া। ৩. স্বাধীন রাজ্য যেমন আছে তেমনই থাকা। শেখ সাহেব নিজে ভারতের সঙ্গে থাকতে চেয়েছিলেন মূলত গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং ভূমি সংস্কার পাকিস্তানের চেয়ে ভারতে করা সহজ এই যুক্তিতে। জম্মু ও কাশ্মীরের মহারাজা হরি সিং অবশ্য সবদিক বিবেচনা করে ভারতের সঙ্গেই যুক্ত হলেন। তখন যে চুক্তি হয়েছিল ভারত সরকার ও মহারাজার সঙ্গে তা সামান্য এদিক ওদিক করে পরবর্তী সময়ে ১৯৫২ সালে জওয়াহেরলাল নেহরু ও শেখ আবদুল্লাহর মধ্যে ৩৭০ ধারা সংবলিত চুক্তি সম্পাদিত হয়। যার ক্ষমতা এমনিতেই কমতে কমতে দুর্বল হয়ে পড়েছিল। যেটুকু হাল্কাভাবে টিকেছিল তাই ঢাকঢোল পিটিয়ে ভারত সরকার বাতিল করে দিল। এবং তা বাতিলের মধ্য দিয়ে সারা দুনিয়াকে জানান দিল একটা দেশের মধ্যে কোনো আলাদা আইন চলতে পারে না বলে গণতন্ত্রের স্বার্থে তারা দীর্ঘদিন ধরে চলা এক ‘বৈষম্য’ দূর করল।

৩৭০ ধারা নিয়ে ভারতের শাসকদের মূল আপত্তি ছিল কাশ্মীরে বাইরের রাজ্যের লোকজন জমি কিনতে পারেন না। অথচ বলা হচ্ছে না এই আইনটি ১৯২৮ সালে ডোগরা রাজাদের করা। সংঘ পরিবার এমনভাবে বিষয়টি প্রচার করছে যে এ ধারাটির নেপথ্যে আছে মুসলিম তোষণ। কিন্তু আসল সত্যি হচ্ছে যে বাইরের রাজ্যের কোনো মুসলিমও জমি কেনার অধিকারী নয়। পাশেই হিমাচল প্রদেশ হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ। সেখানেও জমি কেনাবেচা বেআইনি। সেটা বেমালুম চেপে গিয়ে সাম্প্রদায়িক তাস খেলা আর যাইহোক একুশ শতকের ভারতের পক্ষে ঠিক নয়। ইতিহাসের এই তৃতীয় ধারা বা সত্যি বিষয় সামনে আনা দরকার।

সৌমিত্র দস্তিদার ভারতের নামকরা তথ্যচিত্র নির্মাতা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।