বিস্মরণ থেকে উঠে

কতদূর গৌরাঙ্গবাড়ি
কতদূর বিলকুমারী—
দু’পাশে দীর্ঘপথ পায়ে চলা বাবলার সারি!
ফণিমনসার ঝাড়, আকন্দ, ধুন্দুল আর
ইতস্তত ভাঁটফুল হাসে—

কতদিন যাইনি আমি প্রিয়তম কৃষ্ণ-সকাশে!

আর সেই নারী—
পরনে জলের শাড়ি, শ্যাওলা ছড়ানো চুল
বুকে মৃদু তরঙ্গিত স্তন—
আমি কি চিনেছি তাকে
বুঝেছি কি আমি তার মন!
স্বার্থান্ধ, অধীর, আকুল—
কতদিন একা একা চলে গেছি কোমরের বাঁকে!

কতদিন আয়েশে-আলসে
মদিরা মাতাল তালবন-ছায়াসনে বসে—
দেখিনি দ্বিপ্রহরে ঘূর্ণিতোলা হাওয়ার মাতম,
প্রান্তরে ভরতনাট্যম!

শীতরাত্রিতে কালো বেড়ালটা

কালো বেড়ালটাকে তাড়িয়ে দিই।

তবুও সে ঘুরেফিরে আসে বারবার
ওপারে কার্নিশ বেয়ে, জানালার গ্রিল গলে—
সোফার ওপর দিয়ে নিঃশব্দে ঢুকে পড়ে ঘরে।
অদ্ভুত চেহারা, চক্ষু আর লোমশূন্য শরীর
তুলনামূলক তার ছোট্ট আকার—
ঠিক যেন ক্ষুদে প্যান্থার!

তাকে দেখে আমাদের পোষা শাদা আদুরে বেড়ালটা
কেমন ভয়ার্তস্বরে একটানা গড় গড় করে
বেলুনের মত ফোলে হিংসায়, লোমগুলো খাড়া—
কলহ বাঁধার আগে লাঠি হাতে দিই আমি তাড়া।

তাড়া খেয়ে আর সেই অনাহূত আগত অতিথি
চকিতে লাফিয়ে ঠিক জানালার গ্রিল গলে—
সোজা কার্নিশে উঠে যায়।

বাইরে গভীর রাত্রি, অন্ধকার, ঘোর শৈত্য, ঘন কুয়াশায়
কালো বেড়াল কাঁদতে কাঁদতে চলে যায় কে জানে কোথায়—
বহুদূর থেকে তার থেকে থেকে কান্না শোনা যায়!

পুনরুজ্জীবনের গান

জমে আছে জল, পাত্র এক খুলি।

কে জানে কোথায় থেকে উড়ে এসে
একটি বুলবুলি—
সেই জলে চঞ্চু ডোবায়, তৃষ্ণা মেটায়।

আর ধরে গান,
জীবনের স্পন্দনে ভরে ওঠে শূন্য গোরস্থান।

ইস্টার দ্বীপের মনুষ্যমূর্তিগুলো

ইস্টার দ্বীপের মনুষ্যমূর্তিগুলো কাদের,
কারা বানিয়েছিলো এদের!
সারিবদ্ধ পাথরের মূর্তিগুলো যেন আজো
কোনকিছুর জন্য দণ্ডায়মান প্রতীক্ষায়।

নাকি যারা একদিন বানিয়েছিলো এদের
তারাই সেখানে প্রতীক্ষায় ছিলো কোনকিছুর—
নিজেরা গিয়েছে চলে যথারীতি, অবর্তমানে
মূর্তিগুলো রেখে গেছে যথাস্থানে, নিজেদের জায়গায়।

এক চাষী বলছে

কবিতা লিখিনি কোন, বইপত্র পড়িনি কখনো
নিতান্তই গণ্ডমূর্খ, গেঁয়ো অতি আর গোবেচারা
চাষাবাদ করি সব জমিজমা, খাই ও ঘুমাই
আয়নায় কোনদিন দেখিনিও নিজের চেহারা!

চেহারা কেবল বুঝি, সেই এক বউ আছে ঘরে
তাকেই জড়িয়ে দেখি ঘুরেফিরে আয়নার মত
পড়ি না, লিখি না সত্য, জানি আমি কৃষিতত্ত্ব
আমিও তো কবি, শস্য-সন্তানের জন্ম দিই কত।

পাখিমেয়ে

পাখিরা নেমেছে এসে মাঠে
পাখি নয় মেয়ে—
ঝাঁকে ঝাঁকে আছে দেখো সারা মাঠ ছেয়ে!

বুনছে শস্যচারা
তুলছে ফসল তারা
দিনমান তারা শুধু খাটে—
পাখিদের মত মাঠে মাঠে।

কবিতা এখন

কবিতা কোথায় থাকে,
কোনখানে কবিতার ঘর?
কবিতার খোঁজে ঘুরি—
কত গ্রাম-গঞ্জ-শহর!

কবিতা কি নারী?

পরনে কোথায় শাড়ি,
কোথায় উনুন-হাঁড়ি?

কবিতার সেইদিন শেষ!

কবিতা জ্যাকেট পরে
কবিতা বিমানে চড়ে—
ঘোরেফেরে দেশ-মহাদেশ!

প্রচ্ছদ: রাজিব রায়

Berger Weather Coat