।। বার্তাকক্ষ প্রতিবেদন ।।

বন্যাকবলিত ১৮ জেলার মধ্যে এখন পর্যন্ত চার জেলায় কোনও আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়নি। বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় তিন জেলায় সীমিত আকারে খোলা আশ্রয়কেন্দ্র থেকে বন্যাদুর্গত লোকজন বাড়ি চলে গেছেন। তবে এখনও দেশের ১১ জেলায় খোলা আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে বন্যাকবলিত মানুষজন দিনরাত অতিবাহিত করছেন। বন্যাকবলিত এলাকার যেসব মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে আসেননি, তারা হয়তো বাড়িতেই মাচা করে আবার কেউ কেউ উঁচু বেড়িবাঁধের ওপর আশ্রয় নিয়েছেন। সেখানেই সাময়িক সময়ের জন্য পেতেছেন সংসার। বন্যাকবলিত জেলাগুলোর সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের ন্যাশনাল ডিজাস্টার রেসপন্স কো-অর্ডিনেশন সেন্টার (এনডিআরসিসি) সূত্রে জানা গেছে, এই মুহূর্তে দেশের ১৮ জেলা বন্যাকবলিত। জেলাগুলো হচ্ছে−রংপুর, নীলফামারী, লালমনিরহাট, মানিকগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, সিলেট, বগুড়া, মাদারীপুর, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল, কুড়িগ্রাম, জামালপুর, গাইবান্ধা, ফরিদপুর, রাজবাড়ী, মুন্সীগঞ্জ, নেত্রকোনা, নওগাঁ ও ফেনী।

সূত্র জানিয়েছে, এসব জেলার মধ্যে এখন পর্যন্ত আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়নি চার জেলায়। জেলাগুলো হচ্ছে−লালমনিরহাট, রংপুর, টাঙ্গাইল ও রাজবাড়ী। এর মধ্যে লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ, হাতীবান্ধা, লালমনিরহাট সদর, আদিতমারি ও পাটগ্রাম উপজেলায় পানিবন্দি ৩৯ হাজার ৫৪৮টি পরিবারের মানুষের সংখ্যা এক লাখ ৭৭ হাজার ৯৬৬ জন। রংপুর জেলায় গংগাচড়া, কাউনিয়া ও পীরগাছা উপজেলায় পানিবন্দি পরিবারের সংখ্যা ১৮ হাজার এবং মানুষের সংখ্যা ৫০ হাজার। টাঙ্গাইল জেলার গোপালপুর, ভূঞাপুর, কালিহাতি, টাঙ্গাইল সদর, নাগরপুর ও দেলদুয়ার উপজেলায় পানিবন্দি ২২ হাজার ৪০০ পরিবারের ১ লাখ ৪৫ হাজার ৩০৪ জন। রাজবাড়ী জেলায় এখন পর্যন্ত বন্যার উদ্ভব হয়নি বলে আশ্রয়কেন্দ্র খোলার প্রয়োজন হয়নি। যেহেতু এ জেলার পাশ দিয়ে বয়ে গেছে পদ্মা নদী, সেহেতু বন্যার পানি নেমে যাওয়ার সময় এ জেলা আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এছাড়া মানিকগঞ্জ জেলায় ১০৪টি আশ্রয়কেন্দ্র খুলে তা বন্যাকবলিত মানুষের জন্য প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে। এ জেলায় এখন পর্যন্ত বন্যাকবলিত মানুষের সংখ্যা মাত্র ৩ হাজার ৯৬ জন। পরিবারের সংখ্যা ৬৮৮টি। হরিরামপুর, দৌলতপুর, সাটুরিয়া, মানিকগঞ্জ, শিবালয়, ঘিওর ও সিংগাইর উপজেলার ২১টি ইউনিয়ন। কিন্তু এখন পর্যন্ত কেউ এসব আশ্রয়কেন্দ্রে আসেননি। তারা নিজেরাই নিজেদের বাড়িঘরে মাচা করে বসবাস করছেন, আবার কেউ আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন যেগুলো বন্যাকবলিত হয়নি।

অপরদিকে বন্যার পানি কিছুটা কমতে শুরু করায় নেত্রকোনা ও নওগাঁ জেলায় খোলা আশ্রয়কেন্দ্র থেকে মানুষজন বাড়ি চলে গেছে। ফেনীতে এখনও বন্যার উদ্ভব হয়নি বিধায় আশ্রয়কেন্দ্র খোলার প্রয়োজন পড়েনি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকরা। নেত্রকোনা জেলায় বন্যাকবলিত উপজেলাগুলো হচ্ছে দুর্গাপুর, কলমাকান্দা, খালিয়জুড়ি, বারহাট্টা ও মদস। এসব উপজেলার ৩১টি ইউনিয়নের ৮ হাজার ৬০০ পরিবারের ৬৪ হাজার ১০০ মানুষ বর্তমানে পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন।

এনডিসিসিআর সূত্র জানায়, এ পর্যন্ত এক হাজার ১২৬টি বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে, সেখানে ৩০ হাজার ৭০৫ জন মানুষের সঙ্গে ৫৬ হাজার ৩১টি গবাদিপশু আশ্রয় নিয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষে এসব মানুষ ও গবাদি পশুর খাবারের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এসব জেলায় স্থাপিত আশ্রয়কেন্দ্রে আসা মানুষ ও গবাদি পশুর চিকিৎসার জন্য ৫৯৬টি মেডিক্যাল টিম গঠন করলেও ১৯৭টি টিম কাজ করছে। আশ্রয়কেন্দ্রের নিরাপত্তায় আনসার, গ্রাম পুলিশ, স্বেচ্ছাসেবক ও এনজিও প্রতিনিধিরা কাজ করছেন। রাতে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা। তবে এর বাইরেও এলাকার উঁচু বাঁধের ওপর বা আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন হাজার হাজার পানিবন্দি মানুষ।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক আবু জাফর জানিয়েছেন, জেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া তিস্তা ও ধরলার পানি কখনও স্থিতিশীল নয়। আটকে থাকে না। পানি বয়ে যায়। তাই এ সময় এই দুই নদীর অতিরিক্ত পানিতে জেলা বন্যাকবলিত হলেও কয়েক ঘণ্টা পর নেমে যায়। এ কারণে এখানকার মানুষ বাড়িতেই থাকে। আশ্রয়কেন্দ্র খুললেও সেখানে আসে না বিধায় কোনও আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়নি। তবে সরকারি সহায়তা তাদের বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে বলে জানান জেলা প্রশাসক।

প্রায় একই কথা বললেন টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক আতাউল গনি। তিনি জানিয়েছেন, জেলার শুধু ভূঞাপুরে বন্যার পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে, তবে তা জটিল নয়। নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এখানকার বন্যা পরিস্থিতি। তিনি জানিয়েছেন, এখানকার মানুষগুলো বন্যা পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিয়েছেন। তারা ধরেই নেন, বছরের কিছু দিন এভাবে বন্যার পানি আসবে। সেজন্য তারা আগাম প্রস্তুতি নিয়ে রাখেন। অনেককেই দেখেছি বাড়িতে উঁচু মাচা করে বসবাস করছেন। হাসিখুশি এসব পরিবার সরকারি সহায়তাও নিতে চান না।

অপরদিকে সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ জানিয়েছেন, জেলার দিরাই ও শাল্লা উপজেলা ছাড়া প্রায় সর্বত্র বন্যায় তলিয়ে গেছে। জেলার ১১টি উপজেলা ও ৪টি পৌরসভা ও ৮৭টি ইউনিয়নের পানিবন্দি পরিবারের সংখ্যা ২ হাজার ৩২৪টি। এসব পরিবারের মানুষের সংখ্যা এক লাখ ৮ হাজার ১২৯ জন। সরকারি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান বলেছেন, সরকার সব সময় প্রস্তুত। যে কোনও সময় যে কোনও সহায়তা ও সাহায্যের জন্য জেলা প্রশাসন সার্বক্ষণিক তৈরি হয়ে আছেন। বন্যার কবল থেকে মানুষ ও তাদের সম্পত্তি রক্ষায় সরকার সকল ব্যবস্থা নিয়েছে।

Berger Weather Coat