পড়তে পারবেন 3 মিনিটে Berger Weather Coat

স্তব্ধ বাঁশ‌রি

❑ 

বিকেলের সূর্যালোকটা প্রতিদিনকার মতো নয়। আকাশ কালো মেঘেদের দখলে। বিকেলটা উজ্জ্বলতা হারিয়ে, ম্লানমুখ, বিষণ্ন। প্রতিদিনের মতো অফিস শেষ করে হেঁটে চকের মোড় আ‌সি, রিকশার জন্য দাঁড়াই। ‌দে‌খি, গুটিকয় রিকশাঅলা অ‌পেক্ষারত। দূর থেকে হেঁটে আসা মানুষগুলোর মুখের দিকে তাকিয়ে তারা বোঝার চেষ্টা করে ভাড়া পাওয়া যাবে কিনা। গোধূলির আগেই শহরটা কেমন ভয়ে লুকিয়ে নেয় নিজেকে, গু‌টি‌য়ে যায় নি‌জের ভেতর। আজন্ম চেনা নিজের এই শহরটাকেই ভীষণ অচেনা মনে হয়।

এই যে ভাই, যাবেন? চার কিল্লার পশ্চিম পাড়? ভাড়া ঠিক করে উঠে পড়ি রিকশায়। প্যাডেলে পায়ের চাপ, চলার গতি আর রিকশাঅলার শরীরের ভাষায় মনে হয় লোকটা এ লাইনে নতুন। হঠাৎ ‌লোকটার মোবাইল বেজে ওঠে।

হ্যালো, শোনো, ফেরার সময় বাকী মুদি থেকে আধা কে‌জি চাল নিয়ে এসো। -লাউড‌স্পিকা‌রে কথাগু‌লো স্পষ্ট কা‌নে আ‌সে। খানিক এগিয়ে গেলে চো‌খে প‌ড়ে রাস্তার পাশে ভ্যানে জাম বিক্রি হচ্ছে। রিকশাঅলাকে থাম‌তে বলি চটজল‌দি।

জাম কিনে আবার রিকশায় ওঠার সময় খেয়াল হয়, রিকশাঅলার মুখটা তখনও গামছায় একই রকমভা‌বে বাঁধা। মুখ থেকে সরেনি একটুও। কেবল চোখ থেকে মুখের ওপরের অংশটুকু দেখা যায়। কৌতূহল হয় খুব! জিজ্ঞেস করি, আপনি মুখটা এভাবে ঢেকে রেখেছেন কেন?

স্যার আমি আপনাকে চিনি। আমার মুখ দেখলে হয়তো আপনিও আমাকে চিনবেন!

মা‌নে! কে আপনি?

রিকশাঅলা মুখ থেকে গামছা সরিয়ে নেয় এবার। বলে, স্যার আমি আপনার সাথে অনেক বার রেডিও টিভিতে বাঁশি বাজিয়েছি। মনে করতে পারছেন আমাকে? আমি পার্থ সারথি! রিকশায় ওঠেন স্যার, আকাশের অবস্থা ভালো না ব‌লে পার্থ রিকশা টানে একম‌নে।

আপনার এ অবস্থা কেন? -কৌতূহল চাপ‌তে না পে‌রে আবার প্রশ্ন ক‌রে বসি।

স্যার, আপনি তো জানেন করোনার এ মহামারীতে বাঁশি বাজানোর মতো কোনো অনুষ্ঠান নাই এখন। গত দুমাস একটা টাকাও আয় নাই। ছেলেটার জ্বর। ওষুধ তো কিনতে হ‌বে, বাঁচ‌তেও হ‌বে। আর উপায় নাই। মুখ ঢেকে রিকশা চালাই। কেউ যেন চিনতে না পারে। -বলতে বলতে রিকশা এসে পড়ে সওদাগর বাজারের কা‌ছে, সাম‌নে উঁচু পথ। পার্থকে বলি, রিকশা থামান। আমি হাঁটি। এতটা উঁচু খাঁড়া পথ আপনি টানতে পারবেন না।

পার্থ উত্তর দেয়, বসেন স্যার, দেখি চেষ্টা করে, টানতে তো হবেই!

শান্তভাবে পার্থ রিকশা টেনে তুলতে থাকে, কোনো তাড়া নেই, যেন তার এ সংগ্রাম অনন্তকালের জন্য।

আমার বিম্ময়ের ঘোর কাটে না, ঝুমঝুমিয়ে বৃষ্টি না‌মে হঠাৎ।

আকাশজু‌ড়ে প্রিয়মুখ

❑ 

ভোর ছয়টার কিছু পরে মোবাইলটা বে‌জে ও‌ঠে হঠাৎ। শ‌ব্দে পাশে স্বপ্নদীপ নড়ে উঠলে সুলতানার ঘুম ভাঙে। ফোনটা তখনও বেজে যাচ্ছে। হ্যালো, সুলতানা, আব্বা আর নেই! হুম, আর বাঁচানো গেল না। শেষ রাতে একশ ছয় এর মতো জ্বর আসে, সাথে খিঁচুনি। এই তো দশ মিনিট হলো। আম্মা কি ঘুমে? থাক, আম্মাকে এখন জাগাতে হবে না, ঘুমাক। এর মধ্যে আমি ফরমালিটিগিু‌লো সেরে নিই। কেঁদো না। রাখছি।

কথা শেষে সুলতানা প্রাণপ‌ণে কান্না গেলার চেষ্টা ক‌রে। স্তব্ধতা নেমে আসে। ততক্ষণে ভোরের আলো জানালার পর্দার ফাঁক চি‌রে ঘরের অন্ধকারকে ফি‌কে করে তু‌লে‌ছে অ‌নেকটাই। সুলতানা ধীরে শাশুড়ির রুমের দিকে যায়। মতিয়া বেগম তখনও ঘুমে। নির্ঘুমতার সাথে যুদ্ধ করে শেষ রাতে ঘু‌মি‌য়ে পড়ে‌ছেন অজা‌ন্তেই। সুলতানা ভাবে। গতকালও এ রুমে তার শ্বশুর বিছানায় শুয়ে ছিলেন। বিশ্বাস কর‌তে কষ্ট হয়। মি‌থ্যে ম‌নে হয় সকালটা।

করোনার উপসর্গ নিয়ে মোজা‌ম্মেল হ‌কের অসুস্থতায় বড় মেয়ে রূপা এ ক’দিনে ভাইয়ের বাসায় আসেনি একবারও। পিতার মৃত্যু সংবাদ তাকে আর আটকে রাখতে পারে না। ছুটে আসে মায়ের কাছে। ঘুমন্ত মা‌য়ের পা‌য়ের কাছে ব‌সে ফোঁপায়। কান্নায় ফু‌লে ফু‌লে ও‌ঠে তার শরীর।

নয়টার দিকে মতিয়া বেগমের ঘুম ভাঙে। আচমকা রূপাকে দেখে তার মনে ধাক্কা লাগে। কী রে মা, কী হয়েছে, তুই এখানে যে?

প্রশ্নটা ক‌রে রূপা আর সুলতানার মু‌খের দি‌কে তা‌কি‌য়ে বু‌ঝে নেন যা বোঝার। বোবা হ‌য়ে যান একদম।

রূপার স্বামী রহমত এসে হাসপাতালে পৌঁছায়। রাতুল আর রহমত, দু’জন। আর কেউ আস‌বে না, জা‌নে তারা। একটি স্বেচ্ছাসেবী দল মোজাম্মেল হকের মৃতদেহের শেষকৃ‌ত্যের আয়োজন করে।

মতিয়া বেগমকে ঘিরে সুলতানা আর রূপা। তাদের কান্নার রোল ক্রমশ বাড়তে থা‌কে, রুম ছাপিয়ে ছড়িয়ে পড়ে বা‌ড়িময়। ম‌তিয়া বেগম পাথ‌রের মতো ব‌সে থা‌কে, নিশ্চুপ। কো‌নো সান্ত্বনা বাক্য এ মুহূর্তে তার ছেচ‌ল্লিশ বছরের দাম্পত্য ভাঙনে প্রলেপ দিতে পারে না।

এত কাছে থেকেও শেষবারের মতো উনার মুখটা আর দেখতে পেলাম না!’ গু‌ঙি‌য়ে ও‌ঠেন তি‌নি আচমকা। তার কান্নাগু‌লো হাহাকার হ‌য়ে বা‌জে, স্বপ্নদীপের কানে পৌঁছে যায়। ঘুম থেকে জেগে ওঠে সে। অদ্ভুত, বোবা চোখে তা‌কি‌য়ে থা‌কে। বোঝার চেষ্টা ক‌রে হঠাৎ গু‌মোট হ‌য়ে ওঠা প‌রি‌বেশ। ম‌তিয়া বেগমের কান্না তখন আকাশ ছুঁয়ে যায়, দু‌চোখ হ‌ন্যে হ‌য়ে খুঁ‌জে ফেরে হারি‌য়ে যাওয়া প্রিয়মুখটা, আকা‌শের গা’য়।

সত্য কিংবা ভ্রম

❑ 

মাথা থেকে বাম কানের পাশ দিয়ে হেঁটে গলার দিকে নামছে একটি, ডান হাতের আঙুল বেয়ে উঠে হাতের তালুর ওপর হেঁটে কবজি দিয়ে আরেকটি উঠছে ওপরের দিকে। শরীরের ওপর একটি, দুটি, তিনটি করে অগুন‌তি তেলাপোকা পুরো শরীরে কিল‌বিল করছে, স্থির হয়ে যাচ্ছে আর আমি চোখ মেলে দেখছি মশারির ভেতর মাথা ছাড়া অসংখ্য তেলাপোকার মি‌ছিল। বিছানা থেকে হঠাৎ লাফ দিয়ে উঠে রুমের আলো জ্বালতেই ভ্রম ভাঙল। বিছানা তেমনই পরিপাটি। দ্রুত বিছানা থেকে নেমেই বিদিশার রুমের দিকে ছুটলাম। রুমের দরজাটা আলতো খুলে বিছানার কাছে দাঁড়িয়ে মৃদু আলোয় মশারির ভেতর খেয়াল করলাম। বিদিশা অনুভবকে নিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে।

জুন মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে অফিস যাওয়া শুরু করায় আমি আর ওদের সাথে এক রুমে ঘুমোই না। ডাইনিং এ এসে বাতি জ্বালিয়ে ঘড়িতে দেখি রাত দুটো। কপালে হাত দেই। গরম। থার্মোমিটার নিয়ে টেম্পারেটার মাপি। একশ এক এর চে কিছুটা বেশি। ওষুধ খুঁজে নিই। শুতে ইচ্ছে করে না আর। তেলাপোকাগুলো ঘাপটি মেরে নিজেদের মধ্যে শলাপরামর্শ করে তখনও।

প্রচ্ছদ  ◘ রাজিব রায়