পড়তে পারবেন 4 মিনিটে Berger Weather Coat

।। হাসান আজিজুল হক ।।

অস্বাভাবিক ও অপ্রত্যাশিত কঠিন এক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে আমরা সময় অতিক্রম করছি। যে করোনা-দুর্যোগ চীনের উহান থেকে শুরু হয়েছিল তা প্রায় গোটা বিশ্বকে গ্রাস করেছে। মর্মন্তুদ চিত্র পরিলক্ষিত হচ্ছে বিশ্বের দেশে দেশে। এই ভাইরাসের সংক্রমণ শুধু যে প্রাণই কেড়ে নিচ্ছে তাই নয়; অর্থনীতিতেও চরম বিরূপ ধাক্কা লেগেছে। টান পড়েছে মানুষের জীবন-জীবিকায়। এ পরিস্থিতি মানুষের মনোজগতেও আঘাত করেছে। বিশ্বের কয়েকটি মানসিক স্বাস্থ্য গবেষণা কেন্দ্র এ ব্যাপারে যে বার্তা দিয়েছে তাতে উদ্বিগ্ন না হয়ে উপায় নেই। এই বার্তাগুলো গণমাধ্যমে আরও ব্যাপকভাবে প্রচার ও প্রকাশ করে জনসচেতনতা বাড়াতে ব্যাপক উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন মনে করি। কারণ মানুষ যদি এসব বিষয়ে সচেতন কিংবা সজাগ থাকে তাহলে মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ইতিবাচক ফল পাওয়া যাবে।

শারীরিক বিচ্ছিন্নতা কিংবা দূরত্ব এই সংক্রামক ব্যাধিমুক্ত থাকার অন্যতম উপায়। এই শারীরিক বিচ্ছিন্নতার বদলে ‘সামাজিক বিচ্ছিন্নতা’ শব্দযুগলও আমাদের অনেকের মনোজগতে বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। এরও নানারকম বৈরী চিত্র ইতোমধ্যে লক্ষ্য করা গেছে। উল্লিখিত বিষয়গুলো শুধু আমাদের সমাজেই নয়, অনেক দেশের সমাজ ব্যবস্থায়নই লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ‘সামাজিক বিচ্ছিন্নতা’ আমাদের মানসিকভাবে আলাদা করে দিচ্ছে। আমাদের বরং এখন ‘শারীরিক বিচ্ছিন্নতা’ কিংবা ‘দূরত্ব’ এই শব্দযুগল সামনে নিয়ে এসে সেভাবেই প্রচার-প্রচারণা চালানো দরকার। একে তো গৃহবন্দি জীবন, অন্যদিকে জীবনাচারে নানা পরিবর্তন আমাদের মনোজগৎটাকে সেভাবেই পাল্টে দিচ্ছে। মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক রাখার প্রয়োজন ও স্বার্থে আমাদের প্রত্যেককে সেই নিরিখেই সুরক্ষায় মনোযোগ বাড়াতে হবে। কারণ মানসিক স্বাস্থ্য বিপন্ন হলে সমাজে এর বিরূপ প্রভাব আরও প্রকট হয়ে উঠবে।

আমাদের নানারকম অভিজ্ঞতা রয়েছে। এর মধ্যে ‘ইতিবাচক-নেতিবাচক অভিজ্ঞতা দুই-ই আছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যে রকম পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল, এর আঙ্গিক ছিল এক রকম। আর করোনা-দুর্যোগের আঙ্গিকটা অন্য রকম। এত দীর্ঘ সময় একটানা গৃহবন্দি থাকতে হয়নি। আমরা যদি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকালীন পরিস্থিতির কথা স্মরণ করি, তাহলে সর্বাগ্রে সামনে আসে আতঙ্কের বিষয়টি। মানুষ প্রাণভয়ে সন্ত্রস্ত ছিল, পালিয়ে জীবন বাঁচানোর চেষ্টারত ছিল। কিন্তু এখনকার মতো একটানা গৃহবন্দি অবস্থায় কাটাতে তো হয়নি। প্রায় বিশ্বজুড়ে যে পরিস্থিতি বিরাজ করছে এটা যেন তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধেরই মতো। শ্রেণিবৈষম্য-বর্ণবৈষম্য বিশ্বব্যবস্থার পুরোনো ব্যাধি। করোনা-দুর্যোগ সেই ব্যাধিটি কি আরও বাড়িয়ে দেবে?

এই মুহূর্তে এমন অনেক প্রশ্নেরই উত্তর সহজে মিলবে না। তবে অনেক রকম প্রতিকূলতা-প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি আগামীতে আরও যে হতে হবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তবুও আশার আলো দেখি এত হতাশা-উদ্বেগের মাঝেও। এ রকম একটা বৈশ্বিক মহামারিকালে যখন প্রায় সবকিছু তছনছ হয়ে যাচ্ছে, তখন ভাবতে আমরা বাধ্য হচ্ছি ভবিষ্যৎ পথপরিক্রমা কী হবে এ নিয়ে। বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেবে (এখনই তো অনেকটা দেখা দিয়েছে) এবং তা যখন ক্রমেই প্রকট হবে, তখন কী হবে- এই আশঙ্কাও অমূলক নয়, নৈরাজ্য মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। বিশ্বে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র সংকুচিত হতে শুরু করেছে, অনেকে ইতোমধ্যে কর্মহীনও পড়েছে। আমরাও এর বাইরে নই। ইতোমধ্যে যে চিত্র পুষ্ট হয়েছে তাতে ভবিষ্যৎ নিয়ে আরও বেশি শঙ্কা জেগেছে। তাই আমাদের চারদিক পরিস্থিতি আমলে রেখে করণীয় সম্পর্কে দূরদর্শী কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নে যথাযথ উদ্যোগ নিতে হবে।

আন্তর্জাতিক শ্রমবাজার আমাদের অর্থনৈতিক শক্তি সঞ্চয়ের অন্যতম ক্ষেত্র। এ বাজারও যে সংকুচিত হবে তাতেও কোনো সন্দেহ নেই। অভ্যন্তরীণ শ্রমক্ষেত্রেও ক্রমেই পুষ্টভাবে লক্ষণীয় হয়ে উঠছে এই চিত্র। যখন কর্মসংস্থান ক্ষেত্র আরও সংকুচিত হবে, বেকার সংখ্যা চিত্র আরও স্টম্ফীত হবে, তখন মানুষের মাঝে ক্ষোভ এবং হতাশাও বাড়বে। এই ক্ষোভ-হতাশা বিক্ষোভের জন্ম দিতে পারে। আমাদের সরকার এসব বিষয় আমলে রেখেই ইতোমধ্যে বিভিন্ন কর্মপরিকল্পনা নিয়েছে; মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে নানারকম সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি চালু করেছে। এই কঠিন সময়ে সরকারের এসব উদ্যোগ যে সাধুবাদযোগ্য তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু শঙ্কাটা দেখা দিয়েছে অন্য ক্ষেত্রে।

সরকারের এসব কর্মসূচি বাস্তবায়নের দায়-দায়িত্ব যাদের (সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে) তাদের অনেকের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে উঠেছে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ। দরিদ্রদের হকে পড়েছে তাদের লোভাতুর থাবা। সরকার এই দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিয়েছে বটে কিন্তু প্রতিকারমূলক ব্যবস্থাটা আরও কঠোর করতেই হবে। কতিপয় দুর্নীতিবাজের জন্য তো সরকারের সাধু উদ্যোগ ভেস্তে যেতে পারে না। বেসরকারি খাতে সরকারকে আরও নজর বাড়াতে হবে। শ্রমঘন শিল্প তৈরি পোশাক খাতে সরকারের সহযোগিতার হাত আরও প্রসারিত হোক। এই খাত আমাদের অর্থনীতির অন্যতম জোগানদার। একই সঙ্গে নজর বাড়াতে হবে এক্ষেত্রেও যাতে সরকারি প্রণোদনার যথাযথ ব্যবহার হয়। বেসরকারি খাতে কর্মী ছাঁটাই ঠেকাতে হবে। আমাদের বেসরকারি খাতে বিপুলসংখ্যক মানুষ কর্মে যুক্ত রয়েছেন। আরও জোর দিতে হবে কৃষি খাতের ওপর। কৃষি খাত আমাদের কর্মসংস্থানের আরও বড় ক্ষেত্র হিসেবে যথারিত করার সুযোগ রয়েছে।

আমাদের স্বাস্থ্য খাতের নানারকম অব্যবস্থাপনা-অনিয়ম-দুর্নীতির চিত্র করোনা-দুর্যোগকালে আরও বেশি পরিলক্ষিত হলো। আমাদের স্বাস্থ্য খাত কত দুর্বল এও এই দুর্যোগকালে আরও বেশি স্পষ্ট হলো। বলা যায়, কম বরাদ্দ ও নানা রকম অব্যবস্থাপনা-অনিয়মের অসুখে ভুগছে এই খাত। জনস্বার্থ সংশ্নিষ্ট এই জরুরি খাতের খোলনলচে পাল্টে ফেলার সময় এসেছে। এই যে হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ঘুরে ঘুরে অন্য উপসর্গে আক্রান্ত রোগীর ইতোমধ্যে মৃত্যু ঘটেছে এর দৃষ্টিগ্রাহ্য প্রতিকার কেন হলো না? এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের জবাব দেওয়ার দায় যাদের, তাদের যে দায়হীনতা তাও অনাকাঙ্ক্ষিত-অনভিপ্রেত। প্রতিকার হোক এই দুরবস্থার। এভাবে মানুষের সাংবিধানিক কিংবা মৌলিক অধিকার পূর্ণ হতে পারে না।

আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের কথা আগেই বলেছি। করোনাকালে বিভিন্ন দেশ থেকে ফেরত আসা অভিবাসীদের পুনর্বাসনের পাশাপাশি যেসব দেশে তাদের অনেকেরই বকেয়া টাকা রয়েছে তা আদায়ে জরুরি ভিত্তিতে কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়াও বাঞ্ছনীয়। প্রবাসী শ্রমিকরা সুনির্দিষ্টভাবে দেশকে যেহেতু কিছু না কিছু দিয়েছেন সেহেতু তাদের দুর্দিনে পাশে দাঁড়ানো অবশ্যই উচিত ও কর্তব্য বলে মনে করি। ঈদুল আজহায় মানুষের চাহিদা আরও বেড়ে যাবে। এখন পর্যন্ত আমাদের অর্থনৈতিক চিত্র তুলনামূলকভাবে কিছুটা হলেও ভালো। তবুও সতর্ক ও সাবধানতার বিকল্প নেই। অনেক মানুষ পেশা পাল্টে ফেলতে বাধ্য হচ্ছে। সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে বাসা ভাড়া দিতে না পারার কারণে ইতোমধ্যে অনেক মানুষ ঢাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। এই সংখ্যা যে আরও বাড়বে তাতেও কোনো সন্দেহ নেই। তাদের নিয়ে নতুন কর্মপরিকল্পনা দরকার।

করোনা-দুর্যোগের কারণে কর্মহীন মানুষ বাধ্য হচ্ছে গ্রামে প্রত্যাবর্তন করতে। স্বল্প আয়ের মানুষ হয়তো কোনো রকমে টিকে থাকতে পারত, কিন্তু অন্যায্য মুনাফাপ্রবণ শ্রেণির কারণে বিকল্প কিছু ভাবতে পারছে না তারা। এই মুনাফাপ্রবণদের দমাতে সরকারকেই উদ্যোগ নিতে হবে। মানুষ স্বপ্ন দেখে বড় শহরের গিয়ে উন্নত জীবনযাপনের। কিন্তু করোনা-দুর্যোগে সৃষ্ট পরিস্থিতি মানুষের স্বপ্ন ভঙ্গ করেছে। তবু জেগে থাকে আশাবাদ। মানুষের অদম্য-উদ্ভাবনী শক্তি হার মানে না। করোনা নির্মূল পদ্ধতিও হয়তো আবিস্কৃত হবে। এ জন্য বিশ্বব্যাপী প্রচেষ্টা রয়েছে নিরন্তর। মানুষ জয়ী হবেই। কিন্তু এরই মধ্যে হয়তো আমাদের আরও অনেক ক্ষতি হয়ে যাবে। এই অন্ধকার একদিন নিশ্চয়ই কাটবে। মানুষ আবার জাগবে নতুনভাবে। আবার শুরু হবে নতুন করে জীবনযুদ্ধ। মানবিক বিপর্যয়ের সংকট কাটুক সম্মিলিত প্রয়াসে।

হাসান আজিজুল হক: কথাসাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ।