পড়তে পারবেন 2 মিনিটে Berger Weather Coat

।। বিশেষ প্রতিনিধি, রাজশাহী ।।

ভারতের গুরগাঁও আর দিল্লির আকাশে দেখা দিয়েছে হরিয়ানা থেকে উড়ে যাওয়া ঝাঁকে ঝাঁকে পঙ্গপাল। সংবাদমাধ্যমে এই সচিত্র খবর আলোচিত হওয়ার পর বিশেষজ্ঞরা এখন বুঝতে চাইছেন, ঠিক কোনদিকে যেতে পারে পঙ্গপালের এই ঝাঁক।

ভারতের সংবাদমাধ্যমগুলোর খবরে বলা হচ্ছে, দিল্লি হয়ে উড়ে এই ঝাঁক উত্তর প্রদেশের দিকে যাচ্ছে। সেই হিসেবে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি করতে সক্ষম এই পঙ্গপালের পরবর্তী নিশানা হতে পারে উত্তর প্রদেশ।

কিন্তু তারপর? এরা কি থেমে যাবে? নাকি হাজার হাজার কিলোমিটার অতিক্রমে সক্ষম পঙ্গপাল উত্তরপ্রদেশের পর নতুন কোনো উদ্দেশে যাত্রা করবে?

বিবিসির কাছে এই প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পতঙ্গবিজ্ঞানের অধ্যাপক অম্লান দাস বলেন, “এই পঙ্গপালের হানাকে প্লেগ বলা হয়। কয়েক দশক পর পর এরা আসে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে পাকিস্তান হয়ে রাজস্থানে ঢোকে এরা। ক’দিন ধরেই রিপোর্ট পাওয়া যাচ্ছিল যে গুরগাঁও, দিল্লি এই অঞ্চল দিয়ে যাবে এরা। মূলত ভূট্টা, গম, ধানের মতো ফসল খেতে এরা ভালবাসে। আবার উষ্ণ এবং আর্দ্র অঞ্চলও চাই এদের। যদি একটা প্যাটার্ন দেখেন, তাহলে দিল্লির পর এরা গঙ্গা অববাহিকা অঞ্চল, অর্থাৎ উত্তরপ্রদেশ, বিহার হয়ে পশ্চিমবঙ্গ পর্যন্তও আসতে পারে।”

যদিও বাস্তবে তেমনটা নাও হতে পারে বলে উল্লেখ করে ভারতের এই বিশেষজ্ঞ বলেন, “থিওরিটিক্যালি (তাত্ত্বিকভাবে) বললে এরা এভাবেই যাবার কথা। তবে এতদূর এরা নাও আসতে পারে। কারণ পঙ্গপাল ডানা গজানোর পরে গড়ে ৩৬ থেকে ৪০ দিন বাঁচে। এই যে দলগুলো, হানা দিয়েছে তারা আগে থেকেই উড়ছে। আর গড়ে প্রতিদিন ১০০ কিলোমিটার মতো উড়তে পারে ওরা। সূর্যোদয় আর সূর্যাস্তের আগে পরেই এরা ওড়ে। সেই হিসাব করলে আরও দিন পনেরো লাগতে পারে পশ্চিমবঙ্গে আসতে। কিন্তু ততদিন এত পঙ্গপাল জীবিত থাকবে কি না, সেটা বলা কঠিন।”

আরও পড়ুন: গুরগাঁও দিল্লি পেরিয়ে উত্তরপ্রদেশের পথে পঙ্গপালের ঝাঁক

এখন প্রশ্ন হলো, অধ্যাপক অম্লান দাস ‘তাত্ত্বিকভাবে’ পঙ্গপালের সম্ভাব্য গতিপথের যে ছক দিচ্ছেন, সেই গঙ্গা অববাহিকা ধরে পশ্চিমবঙ্গের পরেই অবস্থান বাংলাদেশের। আরও সুনির্দিষ্ট করলে, সেটি রাজশাহী ও কুষ্টিয়া অঞ্চল। পঙ্গপালের জন্য খানিকটা অনুকূল আবহাওয়া রয়েছে এখানকার বরেন্দ্র অঞ্চলে।

তাহলে কি পঙ্গপালের ঝাঁক এবার এ অঞ্চলেও আসতে পারে? প্রশ্নটি নিয়ে উত্তরকাল মুখোমুখি হয়েছিলো রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও পতঙ্গ বিশেষজ্ঞ বিধান চন্দ্র দাসের। তিনি বলেন, “বিশ্বে ৪০টির মতো পঙ্গপালের প্রজাতি রয়েছে। এদের মধ্যে দিল্লির আকাশে যেগুলোকে দেখা গেছে, সেগুলো মরুপঙ্গপাল প্রজাতির সিস্টোসারকা গ্রিগেরিয়া উপ-প্রজাতির অংশ। এদের জন্য খানিকটা অনকূল আবহাওয়া আমাদের এই অঞ্চলেও রয়েছে। তবে এবছর এই পঙ্গপাল আমাদের এদিক পর্যন্ত আসবে না বলেই আমার ধারণা।”

এই ধারণার পক্ষে যুক্তি দিয়ে তিনি বলেন, “পঙ্গপালের গন্তব্য নির্ধারনের একটি বড় নিয়ামক হলো বাতাসের গতিপ্রবাহ। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে, এই মুহূর্তে বাংলাদেশে বাতাসের যে প্রবাহ তা পঙ্গপাল আসার পথের বিপরীতে। এর বাইরে অতোদিন ধরে এতো লম্বা পথ পাড়ি দেয়া এবার তাদের পক্ষে সম্ভব হবে না বলেই মনে হয়।”

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি বিষয়ক সংস্থার (এফএও) পঙ্গপাল বিশেষজ্ঞ ড. মাইকেল লেককের সঙ্গে এ সংক্রান্ত একটি ব্যক্তিগত আলাপচারিতার কথা তুলে ধরেন ড. বিধান। তিনি জানান, এবছর আসার আশঙ্কা না থাকলেও ঐতিহাসিভাবে বাংলাদেশ পঙ্গপাল আগমনের সম্ভাবনার বাইরে নয় বলে মনে বরেন ড. লেকক। অর্থ্যাৎ দীর্ঘ সময় আগে এ অঞ্চলে পঙ্গপালের প্রাদুর্ভাব ঘটেছে বলে তিনি দাবি করেন। তার মতামতের আলোকে ড. বিধান বলেন, “এবছর হয়তো বাংলাদেশে পঙ্গপালের আক্রমন হবে না। তবে ভবিষ্যতের কথা ভেবে এখনই আমাদের প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে হবে। কারণ আগামী কোনো এক মৌসুমে পঙ্গপাল হানা দিলেও দিতে পারে।”

এদিকে কীভাবে পঙ্গপালের আক্রমণ থেকে ফসল বাঁচানো যায়, তা নিয়ে গবেষণা করেছেন ইন্ডিয়ান এগ্রিকালচারাল রিসার্চ ইনস্টিটিউটের পতঙ্গবিজ্ঞান বিভাগের প্রাক্তন প্রধান গোভিন গুজার। তিনি বলেন, “শব্দ করা বা সাইরেন বাজালে অথবা গাড়ির হর্ণ বাজালে পঙ্গপাল সরে যায়, আর পতঙ্গনাশক ওষুধও স্প্রে করা যায়। এখন তো বিভিন্ন জায়গায় ড্রোনও ব্যবহার করা হচ্ছে। সবটাই করতে হয় রাতের বেলা, যখন পঙ্গপাল গাছের ভেতরের দিকে ঢুকে আশ্রয় নেয়। ওরা রাতে উড়তে পারে না।”

গুজারের কথায়, “গবেষণায় দেখা গেছে কৃষক যদি জৈব পদ্ধতিতে ফসল রক্ষা করতে চান, তাহলে নিম ফল থেকে তৈরি ওষুধও ব্যবহার করতে পারেন।”