Loading...
উত্তরকাল > বিস্তারিত > শিল্প ও সাহিত্য > যতীন সরকারের গদ্য: ধনবানে কেনে বই জ্ঞানবানে পড়ে

যতীন সরকারের গদ্য: ধনবানে কেনে বই জ্ঞানবানে পড়ে

পড়তে পারবেন 6 মিনিটে

কন্ট্রাক্টরি করে অনেক কাঁচা পয়সার মালিক হয়েছেন এমন একজন ব্যক্তি নিজের জন্য একটি আলিশান বাড়ি তৈরি করলেন। খুবই আধুনিক ধাঁচের বাড়ি। দামি আসবাব দিয়ে সারাটা বাড়ি সাজানো। এক সমঝদার বন্ধুকে বাড়িটি দেখাতে নিয়ে এলেন এলেন এবং বাড়িটি সম্পর্কে তাঁর অভিমত জানতে চাইলেন। বন্ধু বললেন, ‘হ্যাঁ, খুবই চমৎকার বাড়ি তুমি তৈরি করেছ, আর বাড়ির আসবাবপত্রগুলোও খুবই চমৎকার ও রুচিশীল বটে। কিন্তু এ-রকম একটা বাড়িতে ভালো একটা লাইব্রেরি না থাকলে ঠিক মানায় না। বাড়িতে বই থাকাটা খুবই জরুরি।’

বাড়ির মালিক কন্ট্রাক্টরটি ‘কুচ পরোয়া নেই’ ভঙ্গিতে বললেন, ‘ঠিক আছে, আজই আমি আহম্মদ অ্যান্ড কোম্পানিতে সাতাশ টন বইয়ের অর্ডার দিয়ে দিচ্ছি।’

চুন-বালি সুড়কি নিয়ে যাঁর কারবার, তিনি তো সবকিছুকেই টনের মাপে বিচার করবেন। তাই বইয়ের কথায়ও তাঁর টনের হিসেবই মনে এল, বইয়ের সম্পর্কেও অন্য রকম কিছু তিনি ভাবতে পারেন না।

এটি হয়তো নিছক একটি গল্প। তবু এ-গল্পের ভাবসত্যটিকে না-মেনে পারা যায় না। একালের নব্যধনিক এবং লুটেরা ধনিকরা যে বই নিয়ে মাথা ঘামায় না, গল্পটিতে সে-সত্যেরই প্রকাশ ঘটেছে। বাংলায় একটি প্রবাদ আছে— ‘আনাড়ির ঘোড়া নিয়ে বুদ্ধিমান চড়ে/ধনবানে কেনে বই বুদ্ধিমানে পড়ে।’ একালের ধনবানদের ব্যাপারে এ-প্রবাদটি বোধহয় তার সত্যতা ও কার্যকারিতা একেবারেই হারিয়ে ফেলেছে।

প্রবাদটি তাহলে কখন সত্য ছিল? কখনো সত্য ছিল কি?

বিপুল ধনে ধনবান হওয়ার যেসব পথ বিগত অর্ধশতাব্দী কাল ধরে— বিশেষ করে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে— এখনে খুলে গেছে, সেসব পথ এর আগে তৈরি হয়নি। সে-সময় এখানে ধনবান হওয়ার ভিত্তি ছিল ভূমির স্বত্ব-স্বামিত্ব। কর্নওয়ালিশের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পথ ধরে ছোট-বড়-মাঝারি যে-ভূস্বামীগোষ্ঠীর পত্তন ঘটেছিল, ধনবান বলতে মূলত সে-গোষ্ঠীর মানুষগুলোকেই বোঝাতো। সরকারি-বেসরকারি চাকরি কিংবা ওকালতি ডাক্তারি মাস্টারি ইত্যাদি পেশার লোকজনও ওই গোষ্ঠী থেকেই বেরিয়ে আসতেন। অর্থে বিত্তে এঁরা সম্পন্নতা ও স্বচ্ছলতা অর্জন করতেন অবশ্যই, তবে একেবারে লাগাম ছাড়া ধনবান হয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ এদের সামনে খুলে যায়নি।

তবে, এরও অনেক আগে, আঠারো শতকের শেষে সদ্য ব্রিটিশ রাজত্ব প্রতিষ্ঠার সুবাদে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাত ধরে এদেশে একটি মুৎসুদ্ধি ধনিক শ্রেণি গড়ে উঠেছিল, ওদেরকে বলা হতো ‘হঠাৎ নবাব’। সেকালের ওই ‘হঠাৎ নবাব’দের সংস্কৃতিহীনতা ও রুচিহীনতার অনেক মিল খুঁজে পাওয়া যাবে একালের নব্য ধনিক ও লুটেরা ধনিকদের সঙ্গে। এদের মতোই বই-সংস্পর্শহীন ছিল সেকালের হঠাৎ নবাবরা।

হঠাৎ নবাবদের গোষ্ঠীটি সমাজ মঞ্চ থেকে আস্তে আস্তে বিদায় নিতে থাকে, এ গোষ্ঠীর অনেকেই পরে ভূস্বামীতে রূপান্তরিত হন। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত থেকে উপজাত এই গোষ্ঠীটি সম্পর্কে আমাদের বিরূপতা অবশ্যই সঠিক ও সঙ্গত। এদেরকে যে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের খোজা প্রহরী রূপে গড়ে তোলা হয়েছিল— সে কথা মোটেই মিথ্যা নয়। পরজীবী এই নয়া সামন্ততন্ত্রীরাই-যে সমাজ প্রগতির পথে দুস্তর বাধার সৃষ্টি করে রেখেছিল—সেকথাও নিশ্চয়ই সত্য। তবু, না-মেনে পারি না যে, ওর ভেতরেই সত্যেও একটি উল্টো ধারাও সক্রিয় হয়ে উঠেছিল। এই গোষ্ঠীর মানুষেরাই বইয়ের সংস্পর্শে এসেছিলেন, বইপ্রেমিক হয়েছিলেন, বই লিখেছিলেন। অর্থাৎ পূর্বেকার ‘হঠাৎ নবাব’দের বিপরীতে এঁরা হয়ে উঠেছিলেন সংস্কৃতিবান ও রুচিমান। তাই, এঁরা নিজেরা যেমন বই পড়তেন, তেমনই অন্যদেরও পড়তে উৎসাহ জোগাতেন।

এঁদের ভেতর বইপড়ায় মোটেই উৎসাহী ছিলেন না যাঁরা তাঁরাও— কখনো কখনো নিতান্ত অনিচ্ছায় হলেও—উৎসাহী পড়ুয়াদের জন্য বইয়ের জোগান দিতেন। সে-সময়কার পুস্তক-প্রকাশকদের কাছে দেশের সকল ছোট বড় জমিদারের তালিকা থাকত। নতুন বই প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই তালিকা দেখে প্রকাশকরা জমিদারদের নামে ভিপিযোগে বই পাঠিয়ে দিতেন। জমিদারের বাড়ি থেকে ভিপি ফেরত যাওয়াটাকে একান্তই অসম্মানজনক মনে করা হতো, এ-রকম অসম্মানের বোঝা বইতে কোনো জমিদারই রাজি ছিলেন না। তাই, অন্তত ময়মনসিংহ জেলার এমন কিছু জমিদারের কথা শুনেছি, তাঁরা প্রকাশকদের পাঠানো-বইগুরোর তালিকা তৈরি করে সে-সবের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বিশেষ কর্মচারী নিয়োগ করে রেখেছিলেন। এ-রকম বইয়ের সংগ্রহ নিয়েই প্রতিটি জমিদার বাড়িতে একেকটি লাইব্রেরি গড়ে উঠেছিল। সেই সব লাইব্রেরিতে কোনো জমিদার বা জমিদার নন্দন প্রবেশ করুন আর না-ই করুন জ্ঞানপিপাসু প্রজাদের অনেকেই সেগুলোতে ভিড় জমাতেন। এভাবেই—এবং এ-সময় থেকেই—বোধ হয় ‘ধনবানে কেনে বই জ্ঞানবানে পড়ে’ প্রবাদটির প্রচলন ঘটেছে।

অনিচ্ছায় নয় শুধু। জ্ঞানবান-সৃষ্টিতে—অথবা জ্ঞানবানদের পৃষ্ঠপোষকতা-দানে—স্বেচ্ছায় এগিয়ে এসেছেন যাঁরা তেমন ধনবানের সংখ্যাও একেবারে কম ছিল না। এ রকম অনেক জমিদারই নিজেদের বাড়িতে সমৃদ্ধ লাইব্রেরি গড়ে তুলেছিলেন। ধনবাড়ি, মুক্তাগাছা ও শেরপুরের জমিদারদের লাইব্রেরির কথা তো সর্বজনবিদিত। বাড়ির বাইরে পাবলিক লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠায়ও অনেক জমিদার আর্থিক সহায়তা দান করেছেন। রাজশাহীর ‘বরেন্দ্র অনুসন্ধান সমিতি’ ও তার সমৃদ্ধ পাঠাগারটি তো এ-রকম বিদ্যোৎসাহী জমিদারের দানেই প্রতিষ্ঠিত। ব্রিটিশ শাসনামলেই স্বদেশ-প্রেমিক স্বাধীনতা-সংগ্রামীরা বইপড়াকে স্বদেশপ্রেম ও স্বাধীনতা-সংগ্রামের অপরিহার্য অঙ্গে পরিণত করে ফেলেছিলেন। তাঁদের উদ্যোগেই গ্রামে গ্রামে বা মহল্লায় মহল্লায় পাঠাগার-প্রতিষ্ঠা একটি আন্দোলনে রূপ নেয়। সে আন্দোলনেও তখনকার ধনবানদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের সক্রিয় সহযোগিতা ছিল।

দুই

দুঃখ এই : ব্রিটিশ শাসন-আমলের ধনবানদের পথে ব্রিটিশ-শাসনমুক্ত দেশের ধনবানরা পা বাড়ালেন না। পাকিস্তান-জামানাতেও না, স্বাধীন বাংলাদেশেও না। ‘লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’-এর জিগির তুলে সেই অদ্ভুত রাষ্ট্রটি কায়েম করে সেখানে রাতারাতি ধনবান হয়ে উঠেছিল যারা, তাদের ধন অর্জনের পেছনে বইয়ের কোনো ভূমিকা ছিল না। বরং বই ছিল তাদের মতলব হাসিলের পথের প্রতিবন্ধক। তাই তারা বই-বিরোধী না হয়ে পারেনি। বই নয়, নির্বিবেক বিষয়বুদ্ধিই হয়ে উঠেছিল তাদের চালিকাশক্তি। বিষয়বুদ্ধিই তাদের ভেতর সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধিকে উসকে দিয়েছিল। সেই ভেদবুদ্ধি থেকে জন্ম নিয়েছিল ‘পাকিস্তান’ নামক যে সংস্কৃতিবিরোধী রাষ্ট্রটি, তার পক্ষে বই-ভীত হওয়াই ছিল একান্ত স্বাভাবিক।

তবে পাকিস্তান কায়েম হয়ে যাওয়ার পর সমাজের সব মানুষই-যে সংস্কৃতিহীন হয়ে গিয়েছিল—তা তো নয়। অন্তত পাকিস্তানের পূর্ব অংশের বাঙালি জনগোষ্ঠীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ছিল সাংস্কৃতিক রুচিঋদ্ধ। এই সংষ্কৃতিমান মানুষগুলোর বইপ্রীতি পাকিস্তান রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারক ও কর্তৃত্ববানদের একান্ত স্বস্তিহীন করে তুলেছিল। এ-ব্যাপারে নাৎসিবাদী হিটলার ও তার অনুচরদের সঙ্গে পাকিস্তানবাদীদের ভাবনা একেবারে খাপে খাপে মিলে যায়। নাৎসিবাদ ও পাকিস্তানবাদ—দুয়েরই লক্ষ্য ছিল সভ্যতার চাকাটাকে পিছন দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া। আর সে-কাজে বই-ই হচ্ছে প্রধান বাধা, কারণ বই-ই তো সভ্যতার বাহক। সভ্যতার বাহককে সভ্যতা-বিরোধীরা সুনজরে দেখে কী করে?

নাৎসিবাদীরা সভ্যতার বাহক বইয়ের বহ্নুৎসব করেছিল প্রকাশ্যে—ঢাকঢোল পিটিয়ে। পাকিস্তানবাদীরা ঠিক তেমনটি করেনি। তারা মানুষকে বই-বিমুখ করার অন্য রকম একটি ধারা চালু করতে চেয়েছিল। সে-ধারাটি সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের। পবিত্র ধর্মেও অপবিত্র ব্যাখ্যা দিয়ে এখানকার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের বোধবুদ্ধিকে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের খাতে প্রবাহিত করে দেওয়ার মতলব এঁটেছিল তারা, ধরেছিল বই নিষিদ্ধ করার পথ। সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষমুক্ত উদার ও মুক্তবুদ্ধি সাধকদের তারা ভয় পেত।  সমাজ বদলের প্রবক্তাদের সম্পর্কে তো তাদের ভীতি ছিল সীমাহীন। তাই যে-বইয়েই প্রকাশ আছে, কিংবা আছে সমাজবদলের আর্তি ও পথনির্দেশ, সে-রকম সকল বই-ই হয়ে উঠেছিল তাদের চোখের বালি। কিন্তু সংখ্যাধিক্য তো সে-রকম বইয়েরই। কটা বইকে নিষিদ্ধ করতে পেরেছিল পাকিস্তানবাদের প্রবক্তারা?

বইয়ের প্রতি পাকিস্তানবাদীদের নিষেধ বিধিই বরং পাকিস্তান রাষ্ট্রের অধিকার বাঙালিদের বইপ্রেমকে আরো জোরদার করে তুলেছিল, নিষিদ্ধ বইয়ের প্রতি তাদের আকর্ষণ দুর্বার হয়ে উঠেছিল। বলা যেতে পারে, বাঙালি জাতির স্বাধিকার-চেতনা ও স্বাধীনতা-সংগ্রামের অন্যতম প্রেরণাটি তার বইপ্রেম থেকেই উৎসারিত হয়েছিল।

কিন্তু হায়, রক্ত দিয়ে ইজ্জত দিয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর এ-রাষ্ট্র তথা এ জাতির হর্তাকর্তা বিধাতা হয়ে বসল যে গোষ্ঠীটি, সে-গোষ্ঠীটির ভেতর বইপ্রেমিক সংস্কৃতিমান বাঙালি জাতির ঐতিহ্যের ছিটেফোঁটাও নেই। আগেই বলেছি, বাংলাদেশের এই নব্যধনিক ও লুটেরা ধনিকগোষ্ঠী অষ্টাদশ শতকের কলকাতার ‘হঠাৎ নবাব’দেরই সগোত্র। ‘হঠাৎ নবাব’দের চেয়ে এরা বরং অনেক বেশি ধূর্ত ও ধড়িবাজ। আঠারো শতকের বাঙালি ‘হঠাৎ নবাব’দের হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা ছিল না; কিন্তু বিশ শতকের স্বাধীন বাংলাদেশে রাষ্ট্র ক্ষমতাটি এখানকার নব্যধনিক ও লুটেরা ধনিকরাই দখল করে নিয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানে দেশের জনগণকেই বলা হয়েছে রাষ্ট্রের ‘মালিক’। কিন্তু সেই মালিকানা বেহাত হয়ে যেতে বেশিদিন লাগেনি। এখন তো বাংলাদেশের জাতীয় সংসদেরও নিয়ন্তা নব্যধনিকরাই, রাজনীতিকদের বদলে তারা সে-সংসদের অধিকাংশ আসনের দখলদার হয়ে বসেছে। আর একথা তো জানাই আছে যে, ক্ষমতাধিকারীদের সংস্কৃতিই হয়ে ওঠে পুরো সমাজের সংস্কৃতি। বর্তমানে এদেশে ক্ষমতার মঞ্চে অধিষ্ঠিত যারা তাদের কি সত্যি সত্যিই কোনো সংস্কৃতি আছে? সংস্কৃতিহীন ক্ষমতাবানদের দেশটি তো সংষ্কৃতিহীনই হবে। সে-দেশে বইয়ের কদর করবে কে?

তিন

ব্রিটিশ আমলে ধনবানদের পৃষ্ঠপোষকতায় এদেশে যেসব লাইব্রেরি গড়ে উঠেছিল সেগুলোর অধিকাংশই পাকিস্তান জামানাতেও টিকে ছিল। কোনো কোনোটির শ্রীবৃদ্ধি হয়েছিল। জমিদারি প্রথার বিলুপ্তি ও অনেক জামিদারের দেশত্যাগের ফলে অবশ্য জমিদারদের লাইব্রেরির অনেকগুলোই নষ্ট হয়ে যায়। এরপরও যেসব পাবলিক লাইব্রেরি টিকে গিয়েছিল, সেগুলোরও অধিকাংশ ধ্বংস হয়ে যায় একাত্তরের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময়। এ-রকম অন্তত দুটো লাইব্রেরির কথা আমি অত্যন্ত বেদনার সঙ্গে স্মরণ করছি—একটি ময়মনসিংহের দুর্গাবাড়ি ধর্মসভা লাইব্রেরি ও অন্যটি ঢাকার রামমোহন লাইব্রেরি। প্রথমটি ছিল সনাতনী হিন্দুদের পরিচালিত ও দ্বিতীয়টি প্রগতিশীল ব্রাহ্মদের। দুটো লাইব্রেরিরই প্রতিষ্ঠাতারা ছিলেন ধর্মান্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। কিন্তু লাইব্রেরি দুটোতে ধর্মীয় বই যত ছিল, তার চেয়ে অনেক বেশি ছিল ধর্মনিরপেক্ষ বই। এমন অনেক অমূল্য ও দুর্লভ বই এ দুটো লাইব্রেরিতে ছিল যেগুলোর আর কোনো কপি হয়তো আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। ময়মনসিংহের ধর্মসভা লাইব্রেরিতে তো হাতেলেখা পুঁথিই ছিল কয়েক শ। সবই লুণ্ঠিত হয়ে মুদি দোকানের ঠোঙ্গায় পরিণত হয়েছে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে এ-রকম পাবলিক লাইব্রেরির পাশাপাশি কতজনের ব্যক্তিগত গ্রন্থাগারের যে একই পরিণতি ঘটেছে—আমরা কেউই সে-সবের খোঁজ নিইনি। এভাবে আমাদের সামাজিক-সাংস্কৃতিক ইতিহাসের কত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য-উপাত্ত যে হারিয়ে গেছে—সে-সম্পর্কেও আমরা অবহিত ও সচেতন হইনি বললেই চলে।

এ-রকম শূন্যতার মধ্যে কিছুতেই বেঁচে থাকা যায় না অন্তত মননশীল মানুষ রূপে বেঁচে থাকা তো যায় না। সত্যিকার মননশীল মানুষ রূপে বেঁচে থাকার নামই যেহেতু সংস্কৃতি, আর বই যেহেতু সেই সংস্কৃতির অপরিহার্য বাহন, তাই বই পড়ার আয়োজনের বিস্তৃতি ঘটাতেই হবে।

কীভাবে সেটি সম্ভব? ‘বই কিনে কেউ দেউলে হয় না’—বিদগ্ধ সংস্কৃতিমান প্রমথ চৌধুরী এমন একটা কথা বলে এক সময়ে আমাদের আশ্বস্থ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু নুন আনতে পান্তা ফুরোয়— বইপ্রেমিকদের মধ্যে এমন মানুষদেরই তো সংখ্যাধিক্য। এ-রকম যারা প্রায় জন্মসূত্রেই দেউলে হয়ে আছে, প্রমথ চৌধুরীর আশ্বাসবাণী তাদের কতটুকু কাজে লাগবে? বই কিনে বইপড়ার আগ্রহ চরিতার্থ করা তো তাদের পক্ষে একেবারেই অসম্ভব।

কাজেই সকলের বইপড়ার সুযোগ অবারিত করে দেওয়ার জন্য পাবলিক লাইব্রেরির কোনো বিকল্প নেই। ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় আগেকার জমিদাররা যেভাবে পাবলিক লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠায় অর্থের জোগান দিত, এখনকার নব্য ধনিকরাও যাতে তেমনটি করে তার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নানা কায়দা-কানুন খুঁজে বের করতেই হবে। যতদিন পর্যন্ত সমাজে ধনবৈষম্য বজায় থাকবে, ততদিন পর্যন্ত ‘ধনবানে কেনে বই জ্ঞানবানে পড়ে’ প্রবাদটির সত্যতাকে অবশ্যই প্রতিষ্ঠিত রাখতে হবে। যেভাবেই হোক বই কেনার জন্য ধনবানদের উদ্বুদ্ধ অথবা প্রলুব্ধ কিংবা বাধ্য করা খুবই প্রয়োজন।

লাইব্রেরি-আন্দোলন বা পাঠাগার-আন্দোলনের কথা এক সময় খুবই শোনা যেত। এখনো মাঝে মাঝে শোনা যায় বটে। কিন্তু এ-আন্দোলনের আগের সেই রমরমা ভাব কিংবা উচ্ছ্বাস এখন আর অবশিষ্ট নেই। তবু, লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠায় একালেও কোনো কোনো তরুণকে যখন উৎসাহিত হতে দেখি, তখন আমার উৎসাহের পালেও কিছুটা হাওয়া লাগে বৈকি। তবে সেই সঙ্গে তিক্ত অভিজ্ঞতা-জাত কিছু হতাশাও মনকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। দেখেছি : লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করা যত কঠিন, তার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন একে টিকিয়ে রাখা। স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়া কিংবা উঁই আর ইঁদুরের মতো প্রাকৃতিক ও জৈবিক উপদ্রবে আমাদের দেশে বইয়ের আয়ুক্ষয় হয় খুবই দ্রুতবেগে। আবার বই পড়ি বা না পড়ি, বই-অপহরণে আমরা সবাই কৃতবিদ্য। অপহরণের হাত থেকে লাইব্রেরির বই রক্ষা করা খুবই কঠিন হয়ে পড়ে এবং তাই দেখা যায়, জন্মের স্বল্পকাল পরেই অধিকাংশ লাইব্রেরির মৃত্যু ঘটে যায়। তবে চুপি চুপি বলি, আমি ক্ষেত্রবিশেষে ও বিশেষ শর্তাধীনে বই চুরিরও সমর্থক। কিছু কিছু ধনবান যখন তার উন্নত রুচির প্রমাণ প্রদর্শনের জন্য শেলফে বই সাজিয়ে রাখে, কিংবা নিতান্ত খেয়ালের বশে দু’চারটা বই কিনে ফেলে, অথচ সেসব বই নিজেও পড়ে না এবং অন্যকেও পড়তে দেয় না, তখন ধনহীন জ্ঞানবানদের দায়িত্বই হয়ে যায় জ্ঞানহীন ধনবানের কবজা থেকে বইগুলোকে বের করে আনা। এর জন্য প্রয়োজনে চৌর্যের আশ্রয় নেওয়াটা মোটেই অবৈধ বা অসঙ্গত নয় বলেই আমার বিশ্বাস। এভাবেই বরং আমরা ‘ধনবানে কেনে বই জ্ঞানবানে পড়ে’ প্রবাদটিকে এ-যুগেও সার্থক করে রাখতে পারি।

কিন্তু লাইব্রেরিতেই হোক কিংবা ব্যক্তিগত সংগ্রহেই হোক, বই না-পড়ে আসবাবরূপে সাজিয়ে রাখা অবশ্যই অবৈধ ও অসঙ্গত। সঠিক রূপে বই পড়ে বইয়ের ভেতর থেকে এর সঠিক মর্মবস্তু যারা আহরণ করতে পারবে, তারাই হবে যথার্থ জ্ঞানবান। আর এই যথার্থ জ্ঞানবানরাই মানুষদের সমাজ বদলের পথ দেখাবে এবং তৈরি হবে এমন সমাজ যেখানে সবাই হবে জ্ঞানবান, অন্যায় ধনে ধনবান হওয়ার পথ সে-সমাজে খোলা থাকবে না।

প্রচ্ছদ ◘ রাজিব রায়

সবশেষ আপডেট

উত্তরকাল

বিশ্বকে জানুন বাংলায়

All original content on these pages is fingerprinted and certified by Digiprove
%d bloggers like this: