।। সুমিত গাঙ্গুলী ।।

চীনের সাথে গত সপ্তাহে প্রাণঘাতী সঙ্ঘাতের পর (১৯৭৫ সালের পর সবচেয়ে প্রাণঘাতী) ভারত পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করছে। ভারত যদি এখন সীমান্ত পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে, তবে ভালো করবে। আর তা করতে হলে তাকে কেবল বেইজিংয়ের সাথে বিদ্যমান সমস্যাগুলোই নয়, প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে তার টালমাটাল সম্পর্কও বিবেচনা করতে হবে।

পরিস্থিতি খুব সহজেই জটিল হয়ে পড়তে পারে। ২০১৪ সালের মে মাসে নির্বাচিত হওয়ার পরপরই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সার্কভুক্ত দেশগুলো তথা আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, ভুটান, মালদ্বীপ, নেপাল, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার নেতাদের আমন্ত্রণ জানান তার অভিষেক অনুষ্ঠানে। আগের কোনো প্রধানমন্ত্রীই এমন আয়োজন করেননি। প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) ইশতেহারের আলোকে তা করা হয়।

মোদি প্রায়ই প্রতিবেশী প্রথম কথাটি বলতেন। এর মাধ্যমে তিনি সার্ক দেশগুলোর সাথে সম্পর্ককে অগ্রাধিকার প্রদান করার প্রতি তার গুরুত্বারোপকে প্রতিফলিত করতেন। এই প্রকল্পকে ফলপ্রসূ করার জন্য আঞ্চলিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ ব্যাপকভাবে বাড়ানোর দরকার ছিল, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা প্রশমনের ব্যবস্থা থাকা দরকার ছিল। আর চীনের বিরামহীন সম্প্রসারণ প্রয়াসের বিরুদ্ধেও অনেক কাজ করার প্রয়োজন ছিল।

প্রাথমিকভাবে মোদি যেসব পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, তাতে নতুন নীতির প্রতি তার দায়বদ্ধতা ফুটে ওঠেছিল। ২০১৪ সালের জুন মাসে তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার প্রথম বিদেশ সফরে ভুটান যান। আঞ্চলিক সম্পর্কের খুবই প্রতিশ্রুতিশীল সূচনা সত্ত্বেও যেভাবেই হোক না কেন, সম্পর্কের অবনতি করে ফেলে নয়া দিল্লি। এর ধারাবাহিকতায় ২০১৯ সালে পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধে যায়, বেশ কয়েকবার ব্যাপক মাত্রায় সীমান্ত সংঘর্ষ হয়, যা সহজেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারত; বাংলাদেশের সাথে সম্পর্কে স্থবিরতা সৃষ্টি হয়; ভারতের নিয়ন্ত্রণে থাকা ভূমি নতুন মানচিত্রে ঠাঁই দিয়ে তা অনুমোদন করে নেপাল; শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপ ঐতিহাসিকভাবে ভারতের মিত্র হলেও দ্রুততার সাথে চীনা প্রভাববলয়ে চলে যাচ্ছে। আফগানিস্তানের গণতন্ত্র সঙ্কটে পড়েছে, তালেবানের প্রভাব-প্রতিপত্তি বাড়ছে। এর ফলে কয়েক দশক ধরে সেখানে ভারতের বিনিয়োগ ও কূটনীতি বিপর্যয়ে পড়তে পারে। একমাত্র যে দেশ এখনো ভারতের সাথে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখেছে, তা হলো ভুটান। 

এখন প্রশ্ন হলো, ভারতের বেশির ভাগ প্রতিবেশীকে স্বাগত জানানো একটি নীতি ২০১৪ সালের পর পুরোপুরি ভিন্ন দিকে কীভাবে চলে গেল। মোদি অন্তত প্রথম মেয়াদে হলেও আঞ্চলিক পররাষ্ট্রনীতি ইস্যুগুলোতে সময়, মনোযোগ ও শক্তি ব্যয় করেছেন উল্লেখযোগ্য মাত্রায়। তিনি বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক রাজধানী সফর করেছেন, অনেক জাতীয় নেতার সাথে ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন।

পাকিস্তানের বিষয়টি ব্যতিক্রম ধরে বলা যায়, এই সুনির্দিষ্ট ও উচ্চাভিলাষী নীতি ব্যর্থ হওয়ার জন্য মোদি সরকারের বেশ কিছু ভুলই দায়ী। উদাহরণ হিসেবে নেপালের কথা বলা যায়। ২০১৫ সালে বিপর্যয়কর ভূমিকম্পের পর ভারতের দ্রুততম সময়ে সহায়তা পাঠানো ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছিল। কিন্তু তা বেশি সময় স্থায়ী হয়নি। একই বছরের শেষ দিকে নতুন সংবিধান গ্রহণ করে নেপাল। নেপাল-ভারত সীমান্তে বসবাসরত মদেশিদের কাছে থেকে এই সংবিধানের বিরোধিতা শুরু হয়। এই জাতিগত সম্প্রদায় (তাদের একটি অংশ উত্তর ভারতেও থাকে) মনে করতে থাকে যে নতুন সংবিধানে তাদের যথাযথ প্রতিনিধিত্ব দেয়া হয়নি। এই প্রেক্ষাপটে ভারত অঘোষিত অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে নেপালের ওপর। এটি নেপালি অর্থনীতিতে বিপর্যয় সৃষ্টি করে। চালের দাম দ্বিগুণ হয়ে যায়, রান্নার গ্যাসের দাম বাড়ে ৫ গুণ। এতে ভারতের প্রতি ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। চীন সুযোগটি লুফে নেয়। নেপাল এর ফলে ভারতের ওপর নির্ভরশীলতা হ্রাস করার সিদ্ধান্ত নেয়।

প্রতিবেশী বাংলাদেশের সাথে ২০১৫ সালে সীমান্ত বিরোধ মিটিয়ে ফেলে ভারত। কিন্তু এই ইতিবাচক পদক্ষেপ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ২০১৯ সালে মোদি সরকার আসামে জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন (এনআরসি) প্রণয়ন করে। এর মাধ্যমে আসামে কথিত অবৈধ বাংলাদেশীদের শনাক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। মোদি সরকার এটিকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে ভারতের মুসলিম সংখ্যালঘুদের মধ্যে ভয় ঢুকিয়ে দেয়। ভারত এনআরসি থেকে বাদ পড়াদের বহিষ্কার করার হুমকি দিতে থাকে। বাংলাদেশ জানিয়ে দেয় যে এরা বাংলাদেশের নয়। এরপর থেকে ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কে অবনতি ঘটে। এদিকে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে চীন থেকে অনেক বেশি সহায়তা পেয়েছে বাংলাদেশ।

শ্রীলঙ্কাতেও অবস্থান অনেকাংশে হারিয়েছে ভারত। মৈত্রিপালা সিরিসেনাকে মোদি সরকার সমর্থন দিয়েছিলেন। কিন্তু ২০১৯ সালের নভেম্বরে গোতাবায়া রাজাপাকসা আবার ফিরে আসেন ক্ষমতায়। রাজাপাকসারা বেইজিংয়ের সাথে সম্পর্ক গড়তে আগ্রহী। 

সবশেষে আসে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের কথা। মোদি এই দেশটির সাথেও সম্পর্ক উন্নয়নে উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু কাজে আসেনি। ২০১৬ ও ২০১৯ সালে দুবার পাকিস্তানে হামলা চালিয়েছে ভারত। তারপর ২০১৯ সালের আগস্টে জম্মু ও কাশ্মিরের স্বায়ত্তশাসন বাতিল করলে পাকিস্তানের সাথে সম্পর্কে আরো অবনতি ঘটে।

‘প্রতিবেশী প্রথম’ নীতির কথা বলে যাত্রা শুরু করা মোদির ছয় বছরে সামান্য কিছু সাফল্য ছাড়া বেশির ভাগ প্রতিবেশীর সাথে সম্পর্কের অবনতিই ঘটে। ফলে নয়াদিল্লি বেশ কিছু সম্ভাবনাময় লক্ষ্য হাসিলে ব্যর্থ হয়। বিশেষ করে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, পরিবেশের অবনতি রোধ করা, খাদ্য ও পানির দুষ্প্রাপ্যতা রোধ করার মতো অভিন্ন আঞ্চলিক সমস্যাবলী সমাধানে ঐক্যবদ্ধ হওয়া। এসব বিষয়ে সাফল্য অর্জন করা সম্ভব হলে চীনকে দূরে রাখা যেত। বরং মোদির আমলে ভারতের সাথে প্রতিবেশীদের সম্পর্ক আগের চেয়েও অবনতি হয়েছে। ভারতের প্রায় সব প্রতিবেশী এখন বলা যায় চীন-প্রথম নীতি অনুসরণ করছে।

সুমিত গাঙ্গুলী ব্লুমিংটন ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক। লেখাটি ফরেন পলিসি থেকে ভাষান্তরিত

Berger Weather Coat