দুপুরটা তেতে উঠেছে ভীষণ। রোদ্দুর খৈ ফোটাচ্ছে হাওয়ায়। ঘামে জবজব মুখটা ওড়নায় মুছে আবার হাতের উল্টোপিঠে দরজায় শব্দ করে মহু, এবার খানিকটা জোরে। ভেতরে, সম্ভবত মোবাইলে, গান বাজছে, মাইয়া ও মাইয়া রে তুই অপরাধী রে… লাউডস্পিকারে গানের শব্দ ভরদুপুরের এই গরমকে যেন বাড়িয়ে তুলছে আরও।

গরমে সেদ্ধপ্রায় মহু কী করবে ভেবে পেলো না প্রথমটায়। মাথার ওপর খাঁড়াভাবে দাঁড়িয়ে সূর্য তখনও শাসাচ্ছে ভীষণ দাপটে। ভাদ্রের গরম ভয়ানক রেগে কামড়ে ধরছে গা। ফিরে যাবে, ভেবে কয়েক পা বাড়িয়েও আবার কী ভেবে থামলো মহু। ভাবলো ক্ষণকাল। দ্বিধাগ্রস্ত দেখালো তাকে, চিন্তিত। তারপর দরজায় আবার ঘা দিলো, জোরে। দিতেই থাকলো। খুট শব্দে খুললো এবার। বিরক্ত, ঘুম-ঘুম একটা মুখ, লাল, ফোলা চোখে তাকিয়ে থাকলো মহুর চোখে। চোখের তারায় এঁটে রাখল প্রশ্নের তির। অস্বস্তিতে চোখ কুঁচকে ফেললো মহু। ভেতরে কেমন একটা অস্থির, বুনো বোধ উঁকি দিলো। সাবধানে চাপা দিলো সেটা, চেষ্টা করলো নিজেকে সামলে নেয়ার। শান্ত, গম্ভীরস্বরে বললো, খালা নাই বাসায়?

কায়দা করে চুলে একটা ঝাঁকুনি দিলো ছেলেটা। দ্রুত এপাশ ওপাশ মাথা নেড়ে জানিয়ে দিলো, নাই। একান্ত সময়ে মহুর এই বেহুদা অনুপ্রবেশে যারপরনাই ত্যক্ত ছেলেটা উটকো এই ঝামেলা ঝটপট বিদেয় করতে পারলেই খুশি, ভঙ্গিতে স্পষ্ট সেটা। কিন্তু মহু সেসবের তোয়াক্কা না করেই জেরা চালিয়ে গেলো, কোথায় গেছে?

নাছোড় মহুর যন্ত্রণায় এবার মুখ খোলে ছেলেটা। মুখটাকে সরু আমসি করে জবাব দেয়, আম্মু কাজে গেছে।

কোন বাসায় গেছে জানো?

ইদানীংকালের বখাটে কাটে ছাঁটা চুলে অনর্থক আঙুল চালিয়ে, কাঁধ ঝাঁকিয়ে, জানিয়ে দেয় ছেলেটা, জানে না। মেজাজ খারাপ হতে থাকে মহুর। ছেলেটার হাতের বাহারি ব্রেসলেট আর কিম্ভুত ডিজাইনের বালার দিকে চোখ রেখে বলে, খালা আসলে আমাকে ফোন দিতে বলবে।

সাথে সাথে ছেলেটা মাথা নেড়ে বলে, আচ্ছা।—বলেই দরজা বন্ধ করে দিতে উদ্যত হয়। মরিয়া মহু বলে, আমার নাম্বারটা রাখো।

বলেন।—বলে নিজের ফোনটা হাতে নিয়ে অপেক্ষা করে ছেলেটা। ছেলেটার মুখে তীক্ষ্ণ চোখ রেখে নাম্বার বলতে বলতে থেমে যায় মহু। বুঝতে পারে, নাম্বার সেভ করার ভাণ করছে ছেলেটা, আদতে সে নাম্বারটা তুলছেই না ফোন স্ক্রিনে। মেজাজ খারাপ করে বলে, খালার কাছে ফোন আছে?

এপাশ-ওপাশ মাথা নেড়ে আবার `না’ জানায় ছেলেটা। রোখ চেপে যায় মহুর। ধমকের সুরে বলে, এই ছেলে! তোমার নাম্বারটা বলো তো! আমি ফোনে কথা বলে নেবো খালার সাথে।

আম্মু আইলে আমিই ফোন দিমুনে আপনেরে।—কথাটা বলে নির্বিকারভাবে দরজাটা ঠাস করে মুখের ওপর বন্ধ করে দেয় ছেলেটা। ক্ষণপরেই, মাইয়া ও মাইয়া রে তুই… গানটা মহুর কানে এসে আছড়ে পড়ে আবার, বিষের মতো। প্রচণ্ড রকম মেজাজ খারাপ নিয়ে ফিরে চলে মহু। গজগজ করতে থাকে নিজের মনেই।

বিলকিস বানুর কান্নাভেজা মুখটা চোখে ভাসে। বেচারা। জগতের সব মায়েরাই কি এমন বোকা হয়? প্রশ্নটা মনে আসতেই নিজের মায়ের মুখটা দুম করে মনে পড়ে আজ, অনেকদিন বাদে। মাকে তেমন একটা মনে পড়ে না মহুর, প্রয়োজনও পড়ে না মনে করার। তবু, তার মা আল্পনা বেগম বোকা ছিলেন না। অন্তত বিলকিস বানুর মতো বোকা তো মোটেই ছিলেন না। বিলকিস বানু যেখানে স্বামীর মৃত্যুর পর একমাত্র ছেলে আর মেয়েকে আগলে রেখে, বাসাবাড়িতে কাজ করে, শরীরের রক্ত জল করা পয়সায় আপ্রাণ চেষ্টা করছেন ছেলেমেয়েদুটোকে মানুষ করার, মহুর মা আল্পনা বেগম সেখানে স্বামীর মৃত্যুর পর দেড়বছরের মহুকে শ্বাশুড়ির কাছে রেখে প্রেমিকের হাত ধরে পালিয়েছিলো। মহিলার ওপর একসময় ভয়ানক ক্ষোভ ছিলো মহুর, ঘৃণাও। কিন্তু যত দিন গেছে, ঘাত-প্রতিঘাতে জীবনকে যতটা চিনেছে মহু, চিনছে প্রতিদিন, ক্ষোভ আর ঘৃণার পারদটা ততই উড়ে যাচ্ছে সময়ের তাপে। বরং সেখানে দানা বাঁধছে আশ্চর্য এক মায়া আর করুণার বোধ। এ সমাজে পনেরো বছরের বিধবা এক কিশোরীর জীবন সহজ নয়। শুরু হওয়ার আগেই থমকে যায় যে জীবন, যাকে থামিয়ে দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা থাকে সব কাছের মানুষদের, সে জীবন কতটা দুর্বহ, সে আর অজানা নয় এখন অতটা। এখন বরং মনে মনে মায়ের বুদ্ধির তারিফই করে মহু। নইলে অত অল্প বয়সের কিশোরী একটি মেয়ের পুরো জীবন কী করে কাটতে পারতো! মহুকে বড় করে? উঁহু! তাতে মহু বড় হয়ে উঠতো, মায়ের আদর যত্নও পেতো সন্দেহ নাই, কিন্তু ঐ একজনের গোটা জীবনটা যে বরবাদ হয়ে যেতো, তারই বা কী সমাধান দিতে পারতো মহু বা অন্য কেউ! তারচে এইই ঢের ভালো। দাদি গোলাপজান তাকে মায়ের স্নেহ দিতে পারেননি সে কথা সত্যি, কিন্তু সাধ্যমতো ভালোবাসার উত্তাপে বড় করে তুলেছেন মহুকে, সে-ও তো মিথ্যে নয়! শুনেছে নতুন জীবনেও সুখে নেই আল্পনা বেগম। তা সে না-ই থাকতে পারে। সংসারে কতজনই আর সুখে থাকে! বরং সুখে যদি সত্যিই থাকে কেউ, নেহাতই দৈব-দুর্ঘটনা সেটা, নিতান্তই কাকতালীয় ব্যাপার, অন্তত নিজের জীবন দিয়ে একথা বুঝতে তো আর বাকি নাই মহুর! সুতরাং মা আল্পনা বেগমের শৈশবের ভুলকে সে ক্ষমা করে দিয়েছে ঢের আগেই। তাকে আবার কখনও সামনে পেলে স্বাভাবিকভাবেই কথা বলতে পারবে মহু। কিন্তু আল্পনা বেগমের নিজের ভেতরই অপরাধবোধের গ্লানি, সন্তানকে ত্যাগ করে যাওয়ার মানসিক দ্বন্দ্ব, যার প্রভাবে মহুর মুখোমুখি হতে ভয় পায় সে, ভীষণ অন্তর্যাতনায় পোড়ে, টের পায় মহু। অথচ বোকার হদ্দ বিলকিস বানু স্বামীর মৃত্যুর পর শিশু দুটিকে আগলে রেখেছে মাতৃস্নেহের উত্তাপে, রক্তজল করা টাকায় স্কুলে দিয়েছে। পড়াশোনায়ও নাকি ভালোই ছিলো তারা, বিলকিস বানুর মুখেই শুনেছে মহু। বাসাবাড়িতে কাজ করেও ছেলেমেয়ের গায়ে কষ্টের বিন্দুমাত্র আঁচ লাগতে দেয়নি সে, যখন যা চেয়েছে পূরণ করার চেষ্টা  করেছে আপ্রাণ। কতজন বলেছে, শুধু শুধু কষ্ট না করে ছেলেমেয়ে দুটোকেও কাজে লাগিয়ে দাও কোনো বাসায়!

সেসব কানে তোলেনি বিলকিস বানু। সন্তানদের পড়াশোনা শিখিয়ে বড় মানুষ করবে সে, লক্ষ্য স্থির ছিলো তার। বিলকিস বানুর মুখটা আবার মনে পড়ে। সেদিন তাদের অফিসে গিয়ে কেঁদে পড়েছিলো বেচারা। সব শুনে সত্যিই মায়া হয়েছিলো ভীষণ। কিন্তু তাদেরই বা কী করার ছিলো! এসব কাজে তাদের দায়িত্ব বাধা। ভিক্টিমকে যতটা সম্ভব সাপোর্ট দেওয়ার নির্দেশ আছে তাদের, কোনো ঝামেলায় না গিয়ে। কিন্তু বিলকিস বানুর ছেলেটাকে দেখে মেজাজ হঠাৎ সপ্তমে চড়ে গেছে মহুর। মা অন্যের বাসায় কাজ করে, রক্তজল করে খাবার তুলে দিচ্ছে মুখে, অথচ এতবড় দামড়া ছেলেটা স্কুলকামাই করে বেলা দেড়টা অবদি দরজা বন্ধ করে ঘুমাচ্ছে! আর চুল কাটার কী ছিরি!  অথচ এই ছেলের জন্য গতমাসে লোন তুলে ল্যাপটপ কিনেছে বিলকিস বানু! ছেলে তাকে বুঝিয়েছে, ল্যাপটপ ছাড়া এ যুগে পড়াশোনা অসম্ভব।

মনে পড়তেই, হেসে ফেললো মহু মেজাজ খারাপ সত্বেও।  অভিভাবক অশিক্ষিত হলে, তাদের অতি অল্পেই বেকুব বানানো যায়। বিলকিস বানুর ছেলেটা নির্ঘাত ল্যাপটপে পর্ণ আর হিন্দি মুভি দেখছে, গান শুনছে আর নয়তো গেম খেলছে ধুমসে। ওদিকে বেচারা বিলকিস বানু ভাবছে ছেলে তার বিদ্যাদিগগজ হয়ে উঠছে খুব। ছেলের পেরেশানি কমাতে সে নিজে না খেয়ে ছেলের মুখে তুলে দিচ্ছে পুষ্টিকর খাবারটুকু। মেয়েটাও এমনি করেই বখে গেছে তার। মাসচারেক আগে মহুদের অফিস একটা বিদেশি সংস্থার মাতৃসদনে রেখে এসেছে বিলকিস বানুর মেয়েকে। ডেলিভারি করিয়ে তারা অবাঞ্চিত সন্তানটাকে তুলে দেবে কোনো বিদেশি নিঃসন্তান দম্পতির হাতে। তারপর বিলকিস বানুর মেয়েকে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করবে কোথাও। কুমারী মা আর তার সন্তান দুইই লজ্জার এ সমাজে। হাহা। শব্দ করে হাসে মহু।  সমাজ বড় অল্পেই লজ্জিত হয় এদেশে। কত কত জোচ্চুরি, দুই নাম্বারি কাণ্ড ঘটছে চারপাশে, সেসবে কিছু নয়, সেসবে বরং নাকে তেল দিয়ে ঘুমায় সমাজবাবাজি। শুধু কাউকে প্রকাশ্যে ভালোবাসতে বা চুমু খেতে দেখলেই লজ্জায় মাথা কাটা যায় তার। পরকীয়া লুকিয়ে চুরিয়ে করলে দোষ নেই কিছু, ধরা পড়লেই লজ্জায় মাটিতে মিশে যেতে চায় একেবারে। এ সমাজ ভারি লাজুক। লজ্জাবতী লতা। অবুঝ, কিশোরী মেয়ে ধর্ষিত হয়ে সন্তানসম্ভবা হলে সে মা আর সন্তান নিয়ে লজ্জার শেষ নেই তার, কিন্তু বুড়ো ভাম ধর্ষক বুক ফুলিয়ে নাকের ডগা দিয়ে ঘুরলে কোনো লজ্জা নেই তার। লজ্জা নেই প্রেমের ভাণ করে সন্তান জন্ম দিয়ে পিতৃত্ব অস্বীকারকারী সোনার টুকরো ছেলেদের নিয়েও। বিলকিস বানুর মেয়েকে তাই লজ্জার বোঝা নিয়ে লুকিয়ে পড়তে হয়েছে সমাজ থেকে। সমাজের চোখের ওপর দিব্যি গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরছে তার প্রেমিকপ্রবর।

মহুর হাসির শব্দে পথচারি লোকজন অবাক হয়ে তাকায়। পাগল ভাবে হয়তো। পাত্তা দেয় না মহু। ভাবুক।  হাসতে হাসতে এদিক ওদিক দেখে নেয়, নিরাপদ বুঝে পার হয়ে যায় ব্যস্ত রাস্তা।  অফিসে অনেক কাজ জমেছে আজ। দ্রুত শেষ করতে হবে সেগুলো। বিলকিস বানুকে খবরটা দেয়া জরুরি ছিলো। দেয়া গেলো না আপাতত। কোনো ফোন নাম্বারও নাই তার। ছেলেটা সম্ভবত তার মাকে বলবে না যে, তার খোঁজে এসেছিলো মহু।  অবশ্য একদিক দিয়ে ভালোই হলো। মহুকে এই খবরটা নিজ মুখে জানাতে হলো না বিলকিস বানুকে। বিলকিস বানুর মেয়েটা অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মারা গেছে আজ। ছেলেটা বেঁচে আছে। বিদেশি, নিঃসন্তান কোনো দম্পতির ঘর আলো করে হেসে উঠবে সে অচিরেই। অনেক বছর পর সে হয়তো  ফিরে আসবে বাংলাদেশে। অনেক ঘাম ঝরিয়ে, শ্রম দিয়ে হয়তো সে খুঁজে বের করবে বিলকিস বানুদের কোনো একজনকে। সমাজ সেদিন লজ্জা ভুলে বিজয়ীর হাসি নিয়ে হাসিমুখে বরণ করবে তাকে। বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত, বলে গর্বে উজ্জ্বল হবে তার অবয়ব।

বিলকিস বানুর মুখটা চোখে ভাসে। মেয়ের মৃত্যুর খবরে কি খুব কষ্ট হবে তার? হবে। হওয়াই উচিত। তবু কিছু কষ্ট স্বস্তিও বয়ে আনে, জানে মহু। বিলকিস বানুর এই কষ্ট সারাজীবন বিষাক্ত কাঁটার মতো ফুটে থাকবে বুকের ভেতর, রক্তাক্ত, ক্ষতবিক্ষত করে তুলবে তার মাতৃহৃদয়। তবু ছোট্ট, ভীষণ ছোট্ট একটুকরো স্বস্তির হিমেল হাওয়াও জুড়ে থাকবে তার তপ্ত হৃৎপিণ্ডের ভিটে। দখল করে থাকবে তার শোকবিহ্বল বুকের জমিন। সমাজের লজ্জা ঘুচিয়ে বিলকিস বানু আবার স্বপ্ন দেখবে নতুন দিনের।

ভাদ্রের গরম তেতে উঠেছে আরও। অফিসে, নিজের ডেস্কে বসে ঢকঢক জল ঢাললো গলায়। মুখ, শরীর জ্বলছে মহুর। জলের ঝাপটা দিলো মুখে। জ্বলছে মনও। বিলকিস বানুর সাথে নিজেকে একই বিন্দুতে আবিষ্কার করার যন্ত্রণাটা বিষের মতো বিঁধছে। তার মেয়েটা! সমাজের লজ্জার বলি হলো সে-ও! বোকা মেয়েটা! কেন যে বুঝলো না, সমাজের লজ্জা নয়, মহুর কাছে পুরো পৃথিবীর চেয়ে মূল্যবান ছিলো একমাত্র মেয়েটা তার! কেন যে বুঝলো না বোকা মেয়েটা তার! মায়ের মুখটা কি একবারও মনে পড়লো না তার, যখন সে ঝুলে পড়লো ফ্যানের সাথে! ভুলে গেলো মায়ের এত এত যুদ্ধ আর ত্যাগ!

ফাইলটা টেনে নিলো মহু। জীবন আসলে ছোট নয়। দীর্ঘ। দীর্ঘতর। ভাবালুতার সময় নেই এখানে। কাজ জমেছে অনেক। বিলকিস বানুর ফাইলটা টেনে নিয়ে মন দিলো কাজে। ভাদ্রের সূর্য তখনও রেগে আছে ভীষণ। সমানে আগুন ঢালছে রোদ।

প্রচ্ছদ ◘ রাজিব রায়

Berger Weather Coat