১৯৪৭ সালের ১৪ জুন, রাজশাহী শহরে যে শিশুটি জন্মেছিল, যা ছিল শুধুই একটি সম্ভাবনা, আজ এতো বছর পরে সেই সম্ভাবনার কতোটা বিস্তৃতি ঘটেছে, কতোদূর পৌঁছে গেছে তাঁর পদচিহ্ন, কর্মচিহ্ন, কতোটা বড়ো তিনি হয়েছেন, কতোটা বড়ো তিনি করেছেন তাঁর শিল্প-সংস্কৃতিকে, দেশ-জাতিকে—বোধহয় এসব হিসাব-নিকাশেরও উর্ধ্বে উঠে গেছেন সেলিনা হোসেন। দেশভাগোত্তর সত্তর বছরে অখণ্ড বাংলার অখণ্ড বাঙালির লেখক হয়ে ওঠার কৃতিত্বের অধিকারী কয়েকজন লেখকের একজন তিনি। নামটি উচ্চারণ বা লেখাই যথেষ্ট, পরিচয় করিয়ে দেবার জন্য অতিরিক্ত একটি শব্দও খরচ করার প্রয়োজন হয় না যাঁর জন্য, সেইরকম একজন লেখকের কর্ম নিয়ে মূল্যায়ন করতে গেলে তার সম্পূর্ণটা কিছুতেই ধরে উঠা সম্ভব নয়, শুধু অসম্পূর্ণ কিছু বলা—এ কথা মাথায় রেখেই ‘গল্পকথা’র সেলিনা হোসেন সংখ্যার (২০১৫) কাজটি করেছিলাম। একজন আদর্শ, দায়বোধসম্পন্ন লেখকের যা যা করণীয় তার সবটাই করার চেষ্টা করেন সেলিনা হোসেন। দেশভাগ, দাঙ্গা, পাকিস্তানি অপশাসন, বাঙালির দীর্ঘ স্বাধিকার আন্দোলন, বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা-উত্তর বাস্তবতা, সামরিক শাসন, গণতন্ত্রের মোড়কে স্বৈরশাসন, শ্রেণিবৈষম্য, দারিদ্র্য, নারী নির্যাতন ইত্যাদি তাঁর লেখালেখির বিষয়। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রায় সকল পরিবর্তনেই সাড়া দেবার প্রচেষ্টা তাঁর শিল্পীসত্তার মৌলিক বৈশিষ্ট্য।

সেলিনা হোসেনের জন্ম, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক (মাঝখানে কয়েক বছর বগুড়ায় কাটিয়েছেন) শিক্ষা, লেখালেখির সূচনা, শিল্পিসত্তা গঠন, প্রথম গ্রন্থ প্রকাশ এসবই ঘটে রাজশাহীতে। তাঁর শিক্ষাজীবন সম্পর্কে তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। উত্তরে জানিয়েছিলেন: ‘আমার শিক্ষাজীবন শুরু হয়েছিল পঞ্চাশের দশকে। ভর্তি হয়েছিলাম বগুড়ার লতিফপুর প্রাইমারি স্কুলে। ক্লাস সিক্স-সেভেন পড়েছি বগুড়ার ভি.এম. গার্লস হাইস্কুলে। তারপরে আব্বা বদলি হয়ে যান রাজশাহীতে। রাজশাহীর পিএন গার্লস হাইস্কুল থেকে ১৯৬২ সালে ম্যাট্রিক পাশ করি। ১৯৬৪ সালে রাজশাহী মহিলা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করি। ১৯৬৭ ও ১৯৬৮ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অনার্স ও মাস্টার্স পাশ করি।’ অতঃপর তাঁর কাছে জিজ্ঞাসা ছিল, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। এই সময়ের ছাত্র রাজনীতি ও আপনাদের আন্দোলন তাঁকে কিভাবে প্রভাবিত করেছিল অথবা কিভাবে গ্রহণ করছিলেন? উত্তরে স্বভাবসূলভ সারল্য ও স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছিলেন : “রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ছাত্র ইউনিয়ন মতিয়া গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। রাকসুর নির্বাচনে দু’বার এ্যাসিসটেন্ট কমনরুম সেক্রেটারি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলাম। ১৯৬৬ সালে মন্নুজান হলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলাম। একবার রাজশাহী বেতারে আইয়ুব খানের প্রশংসা করে প্রোগ্রাম করতে বলা হলে আমরা পাঁচ-ছয়জন ছেলেমেয়ে প্রতিবাদ করে স্টুডিও থেকে বের হয়ে এসেছিলাম। ঊনসত্তরের গণআন্দোলন আমি পাইনি। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোক্টর ড. শামসুজ্জোহা রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক হলেও আমাদের খুব প্রিয় স্যার ছিলেন। এখনো গল্পের মতো মনে হয় স্যারের কথা। শিক্ষার্থীরা ১৯৬৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মিছিল নিয়ে বের হওয়ার সময় পাঞ্জাবি সেনারা তাদের দিকে রাইফেল তাক করেছিল। স্যার ছুটে এসে ওদের সামনে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, তোমাদের একটি বুলেট ওদের গায়ে লাগার আগে আমার গায়ে লাগবে। তাই হয়েছিল। ওরা স্যারকে বুলেট এবং বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে মেরেছিল। রাজনীতির এই উত্তরাধিকার এখনো আমার মাঝে সক্রিয়।

সেলিনা হোসেনের প্রথম লেখা একটি গল্প এবং তাঁর প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ একটি গল্পগ্রন্থ। তাঁর কাছে জানতে চেয়েছিলাম যে, আপনার প্রথম লেখালেখির বিষয় কি ছিল? আপনার প্রথম গ্রন্থ গল্পগ্রন্থ ‘উৎস থেকে নিরন্তর’ রাজশাহী থেকে প্রকাশিত হয়। এই গ্রন্থ প্রকাশের গল্পটি বলেন? প্রথম বইয়ের সাড়া পেয়েছিলেন কেমন? সেলিনা হোসেন জবাব দিয়েছিলেন এভাবে: “আমার প্রথম লেখা ছিল একটি গল্প। ১৯৬৪ সালে রাজশাহী শহরে আন্তঃবিভাগীয় সাহিত্য প্রতিযোগিতার জন্য গল্পটি লিখেছিলাম। গল্পটি প্রথম হয়। নাম মনে নেই। কোথাও ছাপা হয়নি। শুধু মনে আছে গল্পটি প্রেমের গল্প ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় যে গল্পটি মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ সম্পাদিত ‘পূবালী’ পত্রিকায় প্রথম ছাপা হয়েছিল তার নাম ‘বিষণ্ন অন্ধকার।’ তবে গল্প লেখার আগে প্রচুর কবিতা লিখেছি। ঢাকার কাগজ ‘পূর্বদেশ’, ‘বেগম’ ইত্যাদি পত্রিকায় কবিতা ছাপা হয়েছে।

‘উৎস থেকে নিরন্তর’ ১৯৬৯ সালে ছাপা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে যে গল্পগুলো লিখেছিলাম সেগুলো নিয়ে বইটি ছাপা হয়। আমার শিক্ষক আবদুল হাফিজ স্যার বলেছিলেন, একটি বই বের কর। চাকরি পেতে সহজ হবে। তোমার সিভির গুরুত্ব বাড়বে। বলেছিলাম, স্যার কে ছাপবে? স্যার বলেছিলেন, কেউ ছাপবে না। বাবার কাছ থেকে টাকা আনো। বাবা টাকা দিলে বই ছাপা হয়। দু’জন প্রখ্যাত মানুষ বইটির ভালো সমালোচনা করেছিলেন। একজন শহীদ অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী। তিনি তখন টেলিভিশনে বই নিয়ে অনুষ্ঠান করতেন। হাফিজ স্যার আমার বইটি মুনীর স্যারকে দিয়েছিলেন। পাবলিক সার্ভিস কমিশনের ইন্টারভিউ দিতে গেলে দেখেছিলাম বোর্ডে মুনীর স্যার আছেন। চাকরির জন্য আমার জীবনের প্রথম ইন্টারভিউ। তখন ঢাকা আমার জন্য এক অচেনা শহর। স্যার বলেছিলেন, গল্পগুলো ভালো লেগেছে। লেখা ছেড়ো না। পাবলিক সার্ভিস কমিশনের ইন্টারভিউতে উতরে গিয়েছিলাম। পোস্টিং হয়েছিল সিলেটের এমসি কলেজে। আমি কলেজের চাকরিতে যাইনি। এর মাঝে বাংলা একাডেমিতে জয়েন করেছিলাম। বাংলা একাডেমিতে আসতেন কবি-গবেষক হুমায়ুন আজাদ। তিনি আমার বইটির সমালোচনা লিখেছিলেন। প্রশংসা যেমন করেছিলেন ক্রটির কথাও বলেছিলেন। প্রথম বইয়ের সমালোচক হিসেবে দু’জন মানুষ আমার প্রিয় ব্যক্তিত্ব।”  অতঃপর লেখকের কাছে  আমার জানার ছিল, আপনার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ রাজশাহীতে কেটেছে। আপনার লেখকসত্তা নির্মাণে রাজশাহীর ভূমিকাকে কিভাবে দেখেন? লেখকের সরল স্বীকারোক্তি ছিল, “আমার লেখকসত্তার জন্ম রাজশাহীতে। এই শহরে বাস করার সময় আমার গল্প সাহিত্য প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে আমার গল্পের ভূমি তৈরি হয়। এই শহর থেকেই আমার প্রথম বই প্রকাশিত হয়। এই শহরে কাটে আমার স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবন। লেখাপড়ার যে ধাপটি ব্যক্তির গড়ে ওঠার সুযোগ, আমি তার সবটুকু রাজশাহীতে পেয়েছি।” লেখকের প্রতি আমার শেষ প্রশ্ন ছিল, লেখক হয়ে উঠার পেছনে পরিবার ব্যতীত অন্য আর কার কার প্রেরণা পেয়েছিলেন? আপনার লেখায় দেশ ও দেশের বাইরে কার বা কাদের প্রভাব সবচেয়ে বেশি বলে মনে করেন? উত্তরে তিনি বলেছিলেন, “পরিবারের বাইরে আমার শিক্ষকদের কাছ থেকে আমি সবচেয়ে বেশি অনুপ্রেরণা পেয়েছি। রাজশাহী মহিলা কলেজের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক আবদুল হাফিজ সরাসরি আমাকে অনুপ্রাণিত করেছেন। তিনি নানা বই পড়তে দিতেন। মার্কস-এঙ্গেলসের রচনাবলি কিনিয়েছিলেন। কোনো অধ্যায় না বুঝলে বুঝিয়ে দিতেন। গল্পের ভালোমন্দ বিষয়ে বলতেন। কোনো লেখা খারাপ লাগলে ছিঁড়ে ফেলতে বলতেন। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য শিক্ষকরা অনুপ্রেরণা যোগাতেন নানাভাবে। সবটুকুর ভেতরে নিজের উপলব্ধি কাজ করত। লেখক হয়ে ওঠার নানা উপকরণ নানাভাবে পেয়েছি।”

প্রত্যেক লেখকজীবনে প্রথম প্রকাশিত লেখা ও প্রথম প্রকাশিত বই প্রথম প্রেমের মতোই চিরস্মরণীয়। যতো দুর্বলই হোক সেই লেখা। সেলিনা হোসেন তাঁর দীর্ঘ লেখকজীবনে বহু মহৎ সৃষ্টিকর্ম উপহার দিয়েছেন এবং তাঁর লেখকখ্যাতিও পৌঁছে গেছে হিমালয় উচ্চতায়, কিন্তু তাঁর শিক্ষা, তাঁর শিল্পীসত্তার গঠন, তাঁর লেখালেখির হাতমকশো এবং তাঁর প্রথম লেখা ও গ্রন্থ প্রকাশের গৌরবের সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাজশাহী শহর। এই স্মৃতিকে সেলিনা হোসেন কখনই অস্বীকার করেননি।

Berger Weather Coat