পড়তে পারবেন 4 মিনিটে Samsungtv

।। এহ্‌সান মাহ্‌মুদ ।।

গত ২০ মে (২০২০) আমার করোনা সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছিল। এরপর থেকে পুরোটা সময় বাসায় থেকে ডাক্তারের পরামর্শ মেনে চিকিৎসা নিয়ে এখন আমি পুরোপুরি সুস্থ।

করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পরে একটি বিষয় বেশ ভাবিয়েছে, সেটি হলো—  করোনা বিষয়ে আমরা যতোটা জানি, তার ৫০ ভাগও যদি আমরা মেনে চলি, তাহলে এই রোগে আক্রান্ত হওয়া থেকে নিজেকে নিরাপদে রাখা যায়। এবং আক্রান্ত হলেও দ্রুতই সুস্থ হওয়া যায়। আমাদের জীবনে অর্জন করা জ্ঞানের ৫০ ভাগও আমরা কাজে লাগাই না বলে আমার ধারণা।

করোনা শনাক্ত হওয়ার পরে প্রথমে খুব ভয় পেয়েছিলাম। নিজে গণমাধ্যমে কাজ করার সুবাদে করোনা পরিস্থিতি নিয়ে মোটামুটি একটা ধারণা ছিল। করোনায় আমাদের দেশের অব্যবস্থাপনাই ভয়ের কারণ। বিশ্বের বহু উন্নত দেশও করোনা মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছে। তবে সেসব দেশের সঙ্গে আমাদের দেশের পার্থক্য হচ্ছে— সঠিক তথ্যের অভাব। আমাদের রাষ্ট্র নিজেই অসত্য তথ্য প্রচার করে থাকে। ফলে আমরা বাস্তব পরিস্থিত বিষয়ে জানতে পারি না। আর সঠিক তথ্য না জানার ফলে ঝুঁকিতে বসবাস করতে হয়। আমার করোনা উপসর্গ দেখা দেওয়ার পরে সরকারের করোনা নিয়ে যেই ওয়েবসাইট রয়েছে সেখানে গিয়ে হেল্প লাইনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করি। প্রায় ৩ ঘণ্টা চেষ্টার পরে একজনের সঙ্গে কথা বলতে পেরেছিলাম। সেটা ছিল সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল। কেবল ফোন করে তাদেরই পাওয়া গেল। কিন্তু সেখান থেকে কোনো রকমের সহায়তা পাই নাই। তিনি আমাকে বিনয়ের সাথে জানালেন— তারা বেসামরিকদের চিকিৎসা সেবা দিতে অপারগ। এরপর নিজেই পরিচিতজনদের মাধ্যমে করোনা পরীক্ষা করার চেষ্টা শুরু করি। শেষ পর্যন্ত বাসায় থেকেই নমুনা পরীক্ষা করানোর পরে করোনা শনাক্ত হয়েছিল। তারপরে মূলত শুরু হয়েছিল করোনার সঙ্গে বসবাস।

করোনা শনাক্ত হওয়ার পরে প্রথমে যে সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়, তা হলো— সিভিল সার্জন অফিস থেকে ফোন করে বাসার ঠিকানা জানতে চায়। তারা বাসা লকডাউন করার কথা বলে। এরপরে স্থানীয় থানার একজন ফোন করে আবার বাসার ঠিকানা জানতে চায় বাসা লকডাউন করার জন্য। করোনাকে শারীরিকভাবে মোকাবিলা করার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয় সামাজিকভাবে মোকাবিলা করা। ডাক্তারকে ফোন করার আগে তখন বাসায় পুলিশ আসা ফেরানোটাও জরুরি হয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতিটা আমি ভালোভাবেই মোকাবিলা করতে পেরেছিলাম।

করোনায় আমার যেসব উপসর্গ দেখা দিয়েছিল—

১. প্রথমে শরীর ব্যথা শুরু হয়েছিল।

২. খাবারের স্বাদ পাচ্ছিলাম না।

৩. জ্বর ছিল। (১০০-১০৩ ডিগ্রি পর্যন্ত)

৪. গলা ব্যথা ছিল খুব।

৫. কাশি। (কোনো কফ ছিল না।)

করোনার সঙ্গে লড়াইপর্ব

ছোটবেলা থেকেই শারীরিকভাবে আমি খুব দুর্বল প্রকৃতির ছিলাম। বলিষ্ঠ দেহ বলতে যা বোঝায় তা আমার কখনোই ছিল না। তাই আমার ধারণা করোনা আমাকে তার প্রায় সকল উপসর্গ নিয়ে জাপটে ধরেছিল। তবে শ্বাসকষ্ট আমার খুব ছিল না। ধূমপান এবং মদ্যপান না করার সুবিধা এটা বলে মনে হয়েছে। কেবল ৩/৪টা দিন কষ্ট হয়েছিল। কাশির শেষে বুক বেশ ধড়ফড় করতো এবং তখন শ্বাসকষ্ট অল্প অল্প টের পেতাম। তাতেই মাঝেমাঝে চোখ দিয়ে পানি চলে আসতো। আমার জ্বরের তীব্রতা ছিল অনেক। ওষুধে কাজ না করায় সাপোজিটরি নিতে হয়েছিল। করোনা শনাক্ত হওয়ার পর থেকেই বিভিন্নজন খাবার-দাবার বিষয়ে নানা পরামর্শ দিয়েছিলেন। প্রথম এক দুইদিন তা মানার চেষ্টা করলাম। দেখলাম, এসব মানা আমার দ্বারা সম্ভব নয়। আমি যেহেতু বাসায় যত্ন নেওয়ার মতো নিজে একাই ছিলাম, তাই শুরুতেই একটি ইলেকট্রিক কেটলি কিনিয়ে নিয়েছিলাম। সারাক্ষণ গরম পানি, মধু মিশিয়ে গরম পানি, গ্রিন টি, কালোজিরা- এসব ছিল আমার সার্বক্ষণিক খাবার। প্রতি আধাঘণ্টা পরপর এক মগ পরিমাণ গরম তরল গিলেছি। রোজ সেদ্ধ ডিম খেয়েছি একটা। আনারস, মালটা খেয়েছি প্রচুর। করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পরে প্রথম ৬ দিন আমি ভাত খেতে পারিনি। প্রথম দিনতো কেবল ফল এবং গরম পানি দিয়ে কাটিয়ে দিয়েছিলাম। পরের ৫ দিন স্যুপ এবং ফল খেয়েছি কেবল। একজনের পরামর্শ মেনে টমেটো, গাজর, বরবটি, ক্যাপসিক্যাম, কাঁচামরিচ, পেঁয়াজ, রসুন এবং মুরগির মাংস দিয়ে স্যুপ তৈরি করে খেয়েছি। সেই কয়টা দিন রোজ সকালে উঠেই প্রথম কাজ ছিল সবজি এবং মুরগি এক ডেকচি পানির মধ্যে দিয়ে চুলায় বসিয়ে দেওয়া। তারপরে একঘণ্টা পরে নামিয়ে ফেলতাম। সারাদিন অল্প অল্প করে সেসব-ই খেয়েছি। করোনা শনাক্ত হওয়ার ৭/৮ দিন পরের এক দুপুরে বিছানা থেকে বাথরুমে যাওয়ার পথে মাথা চক্কর দিয়েছিল, চোখ ঝাপসা হয়ে আসছিল। পরে দেখলাম প্রসাব খুবই হলুদ রঙ হচ্ছে। এটা বিভিন্ন ওষুধ এবং গরম পানির প্রভাবে হয়েছে বলে মনে হয়েছিল। সেদিন দুপুর থেকেই পরের এক সপ্তাহ রোজ ৪/৫ টি করে ডাবের পানি গিলেছি। এটাই ছিল ঠাণ্ডা পানি নেওয়া শরীরে।

ডাক্তারের পরামর্শ

আমি ভাগ্যবান যে প্রথমে দুইজন আন্তরিক ও সহৃদয় ডাক্তারের পরামর্শ পেয়েছিলাম। পরে একজন ইন্টার্ন ছাত্রী বেশ খোঁজখবর নিয়েছেন। তাদের সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা। আমার ধারণা করোনা চিকিৎসার জন্য বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের দরকার হয় না। কেবল দরকার আন্তরিক চেষ্টা ও পরামর্শ। ডাক্তারগণ আমাকে নিচের ওষুধগুলো পরামর্শ করেছিলেন—

1. Azithromycin – 500mg (৭ দিন ৭টা)

2. HPR DS- 500mg (রোজ ৩টা ৩ বেলা)

3. Xinc 20mg (১৫ দিন। রোজ ১টা করে)

4. Aristro D3 20000 IU (সপ্তাহে ১ টা ৭ সপ্তাহ)

5. sergel 20mg (রোজ ২টা ২ বেলা)

6. oroclean mouthwash (দিনে ২ বার)

7. Filwel gold A to z (রোজ ১টা)

8. Napa Extra 500mg (৩ বেলা ৩টা। জ্বর ১০০ ডিগ্রি বা তার অধিক হলে)

9. Ceevit 250mg (রোজ ২-৩ টা)

10. Orsaline N (রোজ একটা করে। যদি উচ্চ রক্তচাপ না থাকে।)

সতর্কতা

করোনার যেহেতু এখনও কোনো স্বীকৃত ওষুধ তৈরি হয়নি, তাই যেকোনো ওষুধ খাওয়ার আগে একজন ডাক্তারের সঙ্গে আলাপ করে নেওয়া ভালো। তবে আমি যেই ওষুধগুলো খেয়েছি, আমি দেখেছি এর মধ্যে অধিকাংশই শরীরের সক্ষমতা বাড়ানোর ওষুধ ছিল। যাতে করে করোনা শরীরকে দুর্বল করতে না পারে। তাই এসব ওষুধ খেয়ে মূলত করোনার সঙ্গে ফাইট দেওয়ার মতো শারীরিক সামর্থ্য গড়ে তোলাটাই আসল কাজ।

পরামর্শ

করোনা নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নাই। আমার পরিচিত ৮ জনের করোনা সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছিল। এরমধ্যে কেবল একজন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। বাকিরা বাসায় থেকেই চিকিৎসা নিচ্ছেন এখনও। তারাও সুস্থতার দিকে। শ্বাসকষ্টের সমস্যা হয়েছিল কেবল দুইজনের। কোনো অবস্থাতেই মনোবল হারানো চলবে না। নিজের শরীরের সঠিক তথ্য আপনজন এবং ডাক্তারকে জানাতে হবে। করোনা নিয়ে প্রচারিত, পরিবেশিত খবর দেখা থেকে বিরত থাকাটা ভালো। এতে করে মানসিক শান্তি আসবে। বিশেষকরে, অসত্য তথ্য শোনা থেকে বিরত থাকতে হবে। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে করোনার মৃত্যু নিয়ে নানা ভীতিকর ভুয়া খবর প্রচার করা হচ্ছে, এসব থেকে সত্য-মিথ্যা বুঝে নিতে হবে। মিথ্যা খবর মানসিক উত্তেজনা বাড়ায়। অসুস্থ শরীরে মানসিক স্থিরতা খুব দরকারি। মন ভালো রাখতে কাছের কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে নিয়মিত আলাপ করতে পারেন। সিনেমা দেখতে পারেন। তবে পর্যাপ্ত ঘুমও দরকার- এটা মনে রাখতে হবে। নিজের করোনার যত্ন নিজেই নিন। নিরাপদে থাকুন।

এহ্সান মাহ্মুদ: ঔপন্যাসিক, গল্পকার ও গণমাধ্যমকর্মী।

.

আলোকচিত্র: লয়েড তুহিন হালদার

Berger Weather Coat