পড়তে পারবেন 6 মিনিটে Berger Weather Coat

।। বার্তাকক্ষ প্রতিবেদন ।।

মার্কিন দার্শনিক নোম চমস্কি মনে করেন, করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে (ডব্লিউএইচও) ‘বলির পাঁঠা’ বানাচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। উদ্দেশ্য, এর বরাদ্দ কমাতে কমাতে সংস্থাটিকে একেবারেই ধ্বংস করে দেয়া। এর পেছনে এক ধরনের পৈশাচিক মনোবৃত্তি কাজ করছে বলেও মনে করেন আলোচিত এই বুদ্ধিজীবী।

এই পরিস্থিতিতে ইউরোপীয়দের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে চমস্কি বলেন, ইউরোপীয়রা এতটাই ভীরু যে তারা এক কোণায় সেঁধিয়ে গিয়ে শুধু “আমরা এর সমর্থন করি না” বলা ছাড়া আর কিছুই করছে না।

সম্প্রতি নেন্নি ফউন্ডেশনের ব্লগে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে চমস্কি কথা বলেন করোনা-উত্তর রাষ্ট্র ও অর্থব্যবস্থা নিয়ে। সেরেসা জেনেত ও পিয়েরলুইজি পেত্রিকোলার নেয়া সাক্ষাৎকারটি ভাষান্তর করে প্রকাশ করেছে ‘অরাজ’।

এই মহামারির রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিণতি নিয়ে চমস্কি বলেন, বর্তমানে আধিপত্য বিস্তারের জন্য দুটি শক্তি কার্যকর আছে। একটি হচ্ছে ব্যবসায়ী শ্রেণি, গত ৪০ বছর ধরে যারা অস্বাভাবিক মাত্রায় রাজত্ব করে আসছে। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দুইভাবেই যাদের প্রতিনিধিত্ব করছে নয়াউদারনৈতিক ভাবাদর্শ।  মহামারির পরিণতি যাতে আরও কঠোর স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থায় গিয়ে পৌঁছে, যা কিনা ধনী ও কর্পোরেট সেক্টরের স্বার্থে কাজ করবে সেটা নিশ্চিত করাই এদের উদ্দেশ্য।

অন্যদিকে, একটি প্রতিরোধী শক্তিও মূর্ত হয়ে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্রের বার্নি স্যান্ডার্স ও ইউরোপের DiEM25-এর ইয়ানিস ভারুফাকিসের উদ্যোগে প্রগ্রেসিভ ইন্টারন্যাশনালের মাধ্যমে। তাদের লক্ষ্য হচ্ছে বৈশ্বিক ঊষ্ণায়ন ও অন্যান্য যেসকল গুরুতর সমস্যা রয়েছে সেগুলোর মোকাবিলা করা। আর ইউরোপের ক্ষেত্রে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের মধ্যে মূল্যবান যা কিছু আছে সেগুলো উদ্ধার করা,  ক্ষতিকারক ও ধ্বংসাত্মক শক্তিগুলোকে প্রতিহত করা, সম্পদের কেন্দ্রীকরণ ও জালিমের শাসনকে ভেঙে গুড়িয়ে দেয়া।

সাম্প্রতিক মহামারির কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, এর আগের বৈশ্বিক মহামারি যে কারণে সৃষ্টি হয়েছিল সেই একই বিষয়গুলো এখানেও কার্যকর। এখনই দমন করা না গেলে পরবর্তীতে আরও মহামারির কারণ হয়ে উঠবে এগুলো।

২০০৩ সালে প্রথম সার্স মহামারি দেখা দেয়, সার্সও ছিল একটি করোনাভাইরাস। ঔষুধ কোম্পানিগুলো তখনই বুঝতে পেরেছিল যে আরও একটি মহামারি এগিয়ে আসছে। এই ঔষুধ কোম্পানিগুলোর পেছনে রাজনৈতিক দলগুলো, বিশাল পরিমাণ রিসোর্স, ল্যাব এবং ফান্ডের সহায়তা ছিল। কিন্তু এই ক্ষেত্রে, প্রধান বাধা ছিল পুঁজিবাদ— মুনাফা। দশ বছর পরে ঘটতে যাওয়া কোনো বিপর্যয়ের জন্য ভ্যাকসিন তৈরি করেতো আর পয়সা কামানো যায় না। বিশেষ করে যেই ভ্যাকসিন নিয়মিত ব্যবহার হবে না, যেহেতু এমন মহামারির ঘটনা সচরাচর ঘটে না।

দ্বিতীয় কারণটি হলো ৪০ বছর আগে রিগ্যান ও শিকাগো বয়েজের অর্থনীতিবিদদের চালু করা বর্বর পুঁজিবাদ। সে সময়ে তাদের মূলনীতি ছিল, “সরকারই হচ্ছে সমস্যা, সমাধান নয়।“

ফলে আমরা সেখানেই আটকে রইলাম। না ঔষুধ কোম্পানিগুলো পারল আসন্ন মহামারি মোকাবিলার প্রস্তুতি নিতে, না পারল সরকার।

এটা ঠিক সব সরকারই এই মতবাদের সমর্থন করে না পুরোপুরি। যুক্তরাষ্ট্র ও চীন মিলে ভবিষ্যতে আসন্ন বৈশ্বিক মহামারির উৎস খুঁজে বের করায় চমৎকার কিছু কাজ করেছে।

তাছাড়া করোনা ভাইরাসের উৎস একেবারে অজ্ঞাতও নয়। এই ভাইরাসগুলোর বেশিরভাগই বাদুর থেকে অন্যান্য স্তন্যপায়ীতে সংক্রমিত হয়েছে, যার থেকে মানুষের সংস্পর্শে এসেছে। এই্ গবেষণাটি মূলত উহান সেন্টার অফ ভাইরোলজিতে সম্পন্ন হয়েছে। বেশ বিপজ্জনক কাজ এটি— বেশ কয়েকজনের মৃত্যুও হয়েছে এ গবেষণায় কাজ করতে গিয়ে।

ট্রাম্প হচ্ছেন কর্পোরেট সেক্টরের দাস, তিনি লোকরঞ্জনবাদের মিথ্যা ঝাণ্ডা উড়াচ্ছেন মাত্র। এই কর্মসূচিগুলো বন্ধ করে দিয়ে এখন তিনি আমেরিকার বিরুদ্ধে করা নিজের অপরাধের দায় চাপাতে বলির পাঠা খুঁজে বেড়াচ্ছেন। রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্তের কারণে হাজার দশেক মানুষের মৃত্যু হয়েছে, এখন সেটা ধামাচাপা দিতে হচ্ছে তাকে চীনকে দোষারোপ করে। তার দায়িত্বকালীন প্রতিবছরই সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল এবং অন্যান্য সরকারি স্বাস্থ্যখাতগুলোর বরাদ্দ কমিয়েছেন তিনি।

ফেব্রুয়ারির ১০ তারিখে যখন মহামারি তুঙ্গে, তখন তিনি তার ফেডারেল বাজেট নিয়ে হাজির হলেন :  সিডিসির বরাদ্দ আরও কমানোর ঘোষণা দিয়ে জীবাশ্ম জ্বালানী শিল্পে ভর্তুকির পরিমাণ বাড়িয়ে দেন তিনি। এটাই বর্বর পুঁজিবাদের সাধারণ মানসিকতা।

চীনে অজানা এক রোগের লক্ষণ প্রকাশের এক সপ্তাহের মাথায় চীনা বিজ্ঞানীরা ভাইরাসটিকে চিহ্নিত করে এর জিনোম অনুক্রম বের করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মাধ্যমে সারা দুনিয়ার কাছে প্রকাশ করে। জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ের মধ্যেই আগ্রহী যে কোনো বিজ্ঞানীরই জানা হয়ে যায় কী ঘটছে আসলে। কেউ কেউ ব্যবস্থাও গ্রহণ করে— অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, মধ্য এশিয়া, তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং চীন। এরা সবাই এখন মহামারিকে যথেষ্ট নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছে। ইউরোপ বেশ বিলম্ব করেছে ব্যবস্থা নিতে, কেউ কেউ কার্যকরী ব্যবস্থা নিয়েছে, কেউ কম কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। আর সবচেয়ে বাজে অবস্থা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের।

প্রথমত, এখানকার সরকার হলো প্রচণ্ড আত্মকেন্দ্রিক সোসিওপ্যাথ, নিজের স্বার্থ ছাড়া আর কিছুই চিনে না। তার উপর যুক্তরাষ্ট্র হচ্ছে অস্বাভাবিকমাত্রায় ব্যবসা-নিয়ন্ত্রিত একটি সমাজ। এমনকি ট্রাম্পের আগেও, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা বিপর্যস্ত অবস্থায় ছিল। সমতুল্য অন্যান্য দেশের তুলনায় আমাদের এখানে দ্বিগুণ খরচে আমরা সবচাইতে বাজে সুবিধা পাই— যা কিনা চরম অদক্ষ ও চূড়ান্ত আমলাতান্ত্রিক। ধনীদের পকেট ভর্তি করার জন্য একে ব্যক্তিমালিকানাধীন করা হয়েছে। ব্যবসায়িক আদর্শইতো এটা যে কিছুই অতিরিক্ত দেয়া যাবে না— সবকিছুকেই সর্বোচ্চ পরিমাণে কমিয়ে আনতে হবে।

বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে পরবর্তী বৈশ্বিক মহামারিতে পরস্থিতি আরও খারাপ হবে। কীভাবে এর জন্য প্রস্তুত হতে হবে তা আমাদের জানাই আছে, কিন্তু কাউকে না কাউকে এগিয়ে আসতেই হবে।

মহামারির পর গণতন্ত্র বিপদের মুখে পড়বে কি না জানতে চাইলে চমস্কি বলেন, এটা নির্ভর করছে চলমান শ্রেণি সংগ্রামের ফলাফলের উপর। লুডভিগ ভন  মিসেস ও ফ্রিদরিশ হায়েকের মতো নয়া উদারনীতিবাদের গুরুরা বলেছে, গণতন্ত্র খারাপ কারণ এটা উন্নত অর্থনীতির পরিপন্থী।

তাদের দৃষ্টিতে, পিনোশের স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্র ছিল নয়া উদারনীতিবাদের সবচেয়ে যথার্থ পরীক্ষা। সেখানে কোনো বিরোধিতা ছিল না, নির্যাতনকক্ষগুলো সেটা নিশ্চিত করেছিল। আলেন্দের সরকারকে গলা টিপে মারে আমেরিকা এবং এখন সে চিলেতে নয়াউদারনৈতিক স্বপ্নের স্বার্থে টাকা ঢালছে, একই কাজ করছে আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। চিলির অর্থনীতির পুরোটাই নির্ভরশীল ছিল CODELCO নামের অত্যন্ত দক্ষ ও রাষ্ট্রায়ত্ব কপার মাইনিং কোম্পানির উপর। ফলে সেখানে একটি অনুকূল পরিবেশ ছিল, পাঁচ বছরের মাথায় তারা এই অর্থনীতিকে ভেঙে গুড়িয়ে দেয়।

নয়া উদারনৈতিক রাষ্ট্রে যেহেতু গণতন্ত্রকে বিপদ হিসেবে দেখা হয়, সেহেতু দরকার হলে সহিংসতার মাধ্যমে সবরকম প্রতিরোধকে দমন করা আবশ্যিক হয়ে উঠে সেখানে। নয়া উদারনীতিবাদের পথ-প্রদর্শকদের উদ্যমী সমর্থনে ১৯২০-এর দশকে অস্ট্রিয়ার লেবার ইউনিয়নগুলোকে দমন করার সময় যা হয়েছিল। ঠিক যেই কাজটা করেছিল পিনোশে।

যখন আমরা শুনি যে যুক্তরাষ্ট্রকে গণতন্ত্রের বাতিঘর বলা হচ্ছে, তখন আমাদের এটাও মাথায় রাখা উচিত যে সংবিধান নির্মাণের বুদ্ধিবৃত্তিক মানদণ্ডকে বলা হয়ে থাকে ‘ফ্রেমার’স ক্যু“। এই ক্যু সাধারণ জনগণ ও তাদের গণতন্ত্রের দাবির বিরুদ্ধে।

খোদ গণতন্ত্রের সম্ভাবনাকেই ধ্বংস করার উদ্দেশ্য নিয়ে আমেরিকার সংবিধানের পরিকল্পনা করা হয়েছে। জেমস মেডিসন নিখুঁতভাবে এটা ব্যাখ্যা করেছেন। সরকারের মুখ্য উদ্দেশ্য হলো “সংখ্যাগরিষ্ঠদের হাত থেকে সংখ্যালঘু বিত্তশালীদের রক্ষা করা“। গণতন্ত্র এতে বাধা সৃষ্টি করে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এর পরবর্তী রাজনৈতিক ইতিহাস এই দুই শক্তির বিশাল লড়াই। অন্যান্যা জায়গায়ও একই ব্যাপার, এখন যেমন আছে মহামারির পরেও থাকবে।

করোনার তথ্য নিয়ে সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা মূল্যায়ন করতে গিয়ে তিনি বলেন, মিডিয়া সর্বোচ্চ যা করেছে তথ্যউপাত্তের সত্যনিষ্ঠ প্রতিবেদন, নিউ ইয়র্ক টাইম এবং সাউথ চাইনা মর্নিং পোস্টের কথা মাথায় আসছে। তবে তারা এই মহামারির কারণ অর্থাৎ এটি যে একটি পুঁজিবাদী বিপর্যয়; নয়া উদারনীতিবাদ ও  অতি ডানপন্থী রাজনীতির বিশ্বাসঘাতকতা যার তীব্রতা বহুগুণে বাড়িয়ে তুলেছে সেটা নিয়ে অনুসন্ধান করেনি কখনো।

অন্যদিকে যদি আমরা রিপাবলিকান পার্টির কথা বিবেচনা করি, এর বেশিরভাগ সদস্যরাই এই প্রশ্নগুলোর অস্তিত্বই স্বীকার করবে না। আর তারা এটাই শুনে অভ্যস্থ ফক্স নিউজের কাছ থেকে, যারা অতি ডানপন্থী প্রশাসনের কথারই প্রতিধ্বনি করে— “বিজ্ঞান হচ্ছে শুধুই ছলনা“, “গ্লোবাল ওয়ার্মিং হচ্ছে ধাপ্পাবাজি”, “লক ডাউন তুলে নাও“, ইত্যাদি ইত্যাদি। সারাবিশ্বেই এর গুরুতর প্রভাব পড়েছে।

তিনি মহামারি পরিস্থিতি নিয়ে বলেন, বিশেষ করে উত্তর ইতালিতে মহামারির অবস্থা খুবই গুরুতর, কিন্তু এর ঠিক কয়েক কিলোমিটার উত্তরেই এমন ধনী দেশও আছে যারা সফলভাবেই এই সংকটের মোকাবিলা করেছে। ইতালিতে কোনো জার্মান চিকিৎসক আছে?  সবাইতো কিউবান! কিউবা চিকিৎসক সরবরাহ করছে, কিন্তু জার্মানি কোনোরূপ সাহায্য করছে না ইতালিকে।

সমসাময়িক বিশ্বের পরিণতি প্রসঙ্গে চমস্কি বলেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ইতোমধ্যেই একটা সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদি আমরা এ নিয়ে কিছু না করি তাহলে মেরু অঞ্চলের বরফ গলার সাথে সাথে আরও এমনসব প্রক্রিয়া শুরু হবে যা পৃথিবীর অধিকাংশ অঞ্চলকেই বসবাসের অযোগ্য করে তুলবে, হয়তো আগামী ৫০ বছরের মধ্যেই এসব ঘটে যাবে। মানব প্রজাতির টিকে থাকার জন্য অত্যাবশ্যকীয় জলবায়ু পরিস্থিতি এতটাই প্রতিকূল হয়ে উঠবে যে, সে ক্ষতি পোষানো সম্ভব হবে না আর। কিছু কিছু দেশ টেকসই শক্তি উৎপাদনের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করছে। অথচ এদিকে যুক্তরাষ্ট্র পরিস্থিতিকে যতটা বাজে দিকে নিয়ে যাওয়া যায় সেটাই চেষ্টা করছে, জীবাশ্ম জ্বালানিখাতসহ শোষণের নতুন নতুন ক্ষেত্রগুলোতে বিনিয়োগ করে এবং এই মহামারির চেয়েও অনেক বেশি বিপজ্জনক বিষয়গুলোর প্রভাব কাটিয়ে উঠার জন্য যেসব নীতিমালা রয়েছে সেগুলোকে উপেক্ষা করে। সর্বশক্তি দিয়ে অধপতনের দিকে এগিয়ে চলেছি আমরা ।

প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি বলেন, আমি মনে করি বিশেষজ্ঞ আলোচনাগুলোতে প্রাচ্যের প্রধান দেশগুলোর অগ্রগতি নিয়ে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে বলা হয়েছে। সারাবিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রই সবচাইতে শক্তিশালী দেশ। যুক্তরাষ্ট্রই একমাত্র এমন বিধিমালা আরোপ করতে পারে যা অন্যদের মেনে চলতে হবে। এর কর্পোরেশানগুলো দুনিয়ার অর্ধেক সম্পদের মালিক। অভ্যন্তরীণ সম্পদের হিসাবে অন্য কোনো দেশ এর সমতুল্য হবে না। না কৃষিজ বা খনিজ সম্পদের ক্ষেত্রে, না  এর সামাজিক সমরূপতার ক্ষেত্রে।

চীন প্রচুর প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে ঠিক তবে এটা এখনো অনেক গরিব একটি দেশ। জাতিসংঘের মানব উন্নয়ন সূচকে চোখ রাখলেই দেখবেন, সেখানে চীনের অবস্থান প্রায় ৯০’র কাছাকাছি। দেশটি জনমিতি ও বাস্তুসংস্থান সম্বন্ধীয় নানা অভ্যন্তরীণ সমস্যায় পরিপূর্ণ, পাশ্চাত্যের কাছে যেগুলো একদমই অজানা। চীনের রপ্তানিখাতের পরিকল্পনা ও নিয়ন্ত্রণ রয়েছে তাইওয়ানের ফক্সকন এবং অ্যাপলের মতো কোম্পানিগুলোর হাতে, কিন্তু মুনাফার অংশ চীনে থাকছে না। অ্যাপল আয়ারল্যান্ডে তার অফিস বসিয়ে কর ফাঁকি দিয়ে যাচ্ছে। এটাই হচ্ছে আজকের দিনের নয়া উদারনীতিবাদ।

যুক্তরাষ্ট্র নিজেই নিজের ক্ষতির কারণ হয়ে উঠতে পারে— ট্রাম্পের অধীনে আদতে সেটাই হচ্ছে, কিন্তু এখনো তার সামনে দীর্ঘ পথ বাকি আছে। এখনো অন্যসব দেশের মধ্যে সবচাইতে শক্তিশালী অবস্থানে থাকার সুযোগ আছে তার।

মহামারি মোকাবেলায় ভুলগুলো প্রসঙ্গে নোম চমস্কি বলেন, প্রথম ভুলটা হয় ২০০৩ সালে, যখন বর্তমান বৈশ্বিক মহামারির কোনো পূর্বপ্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়নি। এখন আমাদের পরবর্তী মহামারির জন্য প্রস্তুতি নেয়ার প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, চীন থেকে যখন বাইরের দুনিয়ায় তথ্যউপাত্তগুলো প্রকাশ পেল (খুব দ্রুতই এগুলো প্রকাশ পেয়েছিল) অনেক দেশই কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি।

ইতালিতে একটা বড় ফুটবল খেলা হলো। বলতে খারাপ লাগলেও স্পষ্টত এটাই সংক্রমণের একটা উৎস ছিল। এমনিতে ইতালীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থা খুব ভালো হলেও তারা এরকম কিছু একটার জন্য প্রস্তুত ছিল না, নয়াউদারনৈতিক নীতিমালার বাজেট কর্তন ও ব্যায়সঙ্কোচনই এর জন্য দায়ী। ঘটনাচক্রে এই ব্যাপারস্যাপার এখনো চালু আছে।

আপনি হয়তো খেয়াল করেছেন, এই কিছুদিন আগেই জার্মানির সাংবিধানিক আদালত রায় দেয় জার্মান ব্যাংকগুলো ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের নীতিমালা মেনে চলতে পারবে না। এই রায়ের কারণে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে ভাঙন ধরতে পারে। জার্মানির বড় বড় ব্যাংকগুলো যেহেতু ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের পেছনে কাজ করছে। পুরো ইউরোপজুড়েই খরচের ভার ভাগ করে দেয়ার জন্য  ইউরোবন্ড তৈরির প্রচেষ্টায় বাধা দিয়ে আসছে জার্মানি।

অর্থাৎ, মোটের উপরে ইউরোপের কিছু দেশ ভালো করলেও, তারা অন্যদের সাহায্যে এগিয়ে আসছে না।

আর যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে এটা ভুল নয়, বরং শয়তানি। যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো হোয়াইট হাউজকে নিয়মিত সতর্ক করে আসছে। কিন্তু ট্রাম্পের দৃষ্টি শুধুমাত্র টিভি রেটিং আর শেয়ার বাজারেই পড়ে ছিল, তার ধারণা এগুলোই তাকে নির্বাচনে জিতিয়ে দিবে। হুট করেই যখন শেয়ার বাজারে ধ্বস নামল তখন তার টনক নড়ল যে কিছু একটা ঘটে গেছে।

এখন তার নির্বাচনী কৌশল হচ্ছে রাজ্যগুলো আর সেগুলোর সরকারকে দোষারোপ করা। অবস্থা খারাপ হলে ট্রাম্প বলবে ধনী রাজ্যগুলো বিশেষ করে যেগুলোতে ডেমোক্রেটরা ক্ষমতায়, সেগুলো তাদের ফান্ডের অপব্যবহার করছে। এটা তাকে কিছুটা নির্বাচনী সুবিধা এনে দিবে। আবার কোনো সাফল্য আসলে সেটার কৃতিত্বও সে নিজে নিতে পারবে। ফান্ড আর অর্থতো ফেডারেল সরকারের হাতেই।

সুতরাং একে ভুল বলা যায় না, বরং বলা যায় সোসিওপ্যাথিক ম্যাগালোম্যানিয়া। জনসাধারণ বা আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিকে ট্রাম্প থোড়াই তোয়াক্কা করেন।

১৯৩০’র দশকে, আমার ছেলেবেলার স্মৃতি মনে পড়ছে, ফ্রাঙ্কোর জেনারেলের সেই ফ্যাসিবাদী স্লোগান— ‘বুদ্ধিজীবিতার মৃত্যু ঘটুক, মৃত্যু দীর্ঘজীবী হোক“।