পড়তে পারবেন 3 মিনিটে Samsungtv

।। কনটেন্ট এডিটর, ডিপ্লোম্যাটিক ডেস্ক ।।

ভারত ক্রমবর্ধমান হারে নিজেকে বিপজ্জনক বিশ্বে দেখতে পাচ্ছে বলে মনে করেন ভারতের সাবেক নিরাপত্তা উপদেষ্টা শিবশঙ্কর মেনন। তার মতে, চীনের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিকভাবে সম্পৃক্ত হওয়ার মাধ্যমে এই অঞ্চলটিকে বহুমেরুর সমন্বয়ে রাখতে ভারতকে কাজ করতে হবে।

সম্প্রতি দ্য হিন্দু পত্রিকায় ভারতের এই প্রভাবশালী সাবেক কূটনীতিক একটি নিবন্ধ লিখেছেন। সেখানে তিনি পরিবর্তিত বিশ্বে ভারতের অবস্থান ও করণীয় নিয়ে তার দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন।

ভারতের জন্য যুক্তরাষ্ট্র অনিবার্য অংশীদার হলেও এতে করে বর্তমান বিশ্ব থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করা হয় বলে মনে করেন শিবশঙ্কার মেনন। তার মতে, এমনটি ঘটলে তা চীনকে মোকাবেলা করার চেয়েও অনিশ্চিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

তার লেখাটির বাংলা রূপান্তর এখানে হুবহু তুলে ধরা হলো-

“ভারত ক্রমবর্ধমান হারে নিজেকে বিপজ্জনক বিশ্বে দেখতে পাচ্ছে। এর একটি হলো অর্থনৈতিকভাবে ভঙ্গুর ও মন্থর হতে থাকা। আমরা আজ একটি নতুন ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে পড়েছি। এর সৃষ্টি হয়েছে বিশ্বের নতুন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত জনাকীর্ণ এশিয়া-প্যাসিফিকে চীন, ভারত ও অন্যান্য শক্তির (ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, ইরান, ভিয়েতনাম) উত্থানে।

এই অঞ্চলে ক্ষমতার ভারসাম্যে দ্রুত পরিবর্তন অস্ত্র প্রতিযোগিতার সৃষ্টি করেছে এবং অনিশ্চয়তার উদ্ভব ঘটিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সদা পরিবর্তনশীল নীতি, প্রথাবিরুদ্ধতা এবং ‘আমেরিকান ফার্স্ট’ মনোভাবও এতে ইন্ধন দিয়েছে। অর্থনৈতিক পারস্পরিক নির্ভরতা অনিয়ন্ত্রিতভাবে বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে চীন-যুক্তরাষ্ট্র কৌশলগত বিরোধ বাড়ছে। মার্কিন প্রাধান্যবিশিষ্ট বিশ্বে চীন তার অবস্থান জোরালো করতে চাচ্ছে। ফলে বিশ্ব একটি অস্থিতিশীল ক্ষমতার পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় একটি পালাবদলের মুহূর্ত।

কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন

নতুন পরিস্থিতিতে ভারতের প্রতিক্রিয়া কী হওয়া উচিত? ভয়ের কারণে অনেকে জোটের পরামর্শ দেন। অনেকে অপ্রতিরোধ্য চীনকে দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে জোট গড়ার কথা বলেন। এসব লোকের ধারণার চেয়ে ভারত অনেক বড় ও অনেক বেশি স্থিতিস্থাপক।

ভারতে যে বা যারাই ক্ষমতাই থাকুক না কেন, বর্তমানটির আগে পর্যন্ত উপর্যুপরি সরকারগুলোর মধ্যে একটি অভিন্ন বন্ধন দেখা যায়। তা হলো, তারা ভারতের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন কামনা করেছেন। তারা যেখানে সংযত থাকলে চলে এবং অন্যদের সাথে বিরোধে না জড়ালেও চলে, সেখানে তারা না জড়িয়ে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতে চেয়েছে। কোনো জোটে শরিক হওয়াটা তাদের কাছে ভুল জবাব বলে মনে হয়েছে।

২০১৭ সালে দোকলাম সঙ্কট হলো সবচেয়ে সাম্প্রতিক উদাহরণ। যাতে দেখা যায়, অন্য কেউই ভারতের সবচেয়ে বড় কৌশলগত চ্যালেঞ্জ চীনের সাথে মোকাবেলা করতে প্রস্তুত নয়। বিশ্বের বাকি অংশ থেকে কেবল হালকা প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে। অন্য কারো কাছ থেকে কিছু প্রত্যাশা করা অযৌক্তিক।

চীন প্রশ্ন

চীনের উত্থান সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এবং তা ভারতের যাত্রাকে লাইনচ্যুত করতে পারে। তবে এটি একটি সুযোগও। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, চীনকে কিভাবে সামাল দেয়া হবে। একটি সম্ভাবনা হলো চীনের সাথে দ্বিপক্ষীয়ভাবে সম্পৃক্ত হওয়া। ১৯৮৮ সালে রাজীব গান্ধীর সফরের সময় যে আনুষ্ঠানিকতা হয়েছিল, সেটির বদলে নতুন একটি কর্মপদ্ধতি প্রণয়ন করা। আগের কাঠামো এখন আর কাজ করছে না এবং টানাপোড়েনের লক্ষণ সম্পর্কের সব জায়গায় দৃশ্যমান।

ভারতের যত উত্থান ঘটবে, ততই চীনা বিরোধিতার প্রত্যাশা করা যায় এবং প্রতিবেশী, এই অঞ্চল ও বিশ্বে যাতে তার স্বার্থগুলো সুরক্ষিত থাকে, সেজন্য অন্যান্য শক্তিগুলোর সাথেও কাজ করতে হবে। চীনের সাথে সহযোগিতা ও প্রতিযোগিতার ভারসাম্যই ওই সম্পর্কের বৈশিষ্ট্য গড়ে দেবে।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দ্রুততার সাথে ব্যবহারোপযোগী ও কার্যকর শক্তি সঞ্চয় করা। স্বার্থের হিসাবই বলে দেয় যে সাদামাটা বর্ণনার চেয়ে অনেক জটিল চীন-ভারত সম্পর্ক। আবার উভয় পক্ষের সামনেই আছে নতুন কর্মপন্থা বের করার সুযোগ। এজন্য প্রয়োজন তাদের মূল স্বার্থ, লাল রেখা, মতপার্থক্য ও একমতের জায়গাগুলো নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে উচ্চ পর্যায়ের কৌশলগত সংলাপ।

ভারতের পরিবর্তনের জন্য যুক্তরাষ্ট্র অনিবার্য অংশীদার। কিন্তু এতে করে বিশ্ব থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করা হয়। আর তা চীনকে মোকাবেলা করার চেয়েও অনিশ্চিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, এতে করে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক, সমুন্নত করা আর হয় না। ভারতকে অবশ্যই অন্যান্য শক্তির সাথে কাজ করতে হবে যাতে এই অঞ্চলটি বহু মেরুর থাকে এবং চীন যৌক্তিক আচরণ করে।

অপেক্ষা করছে দ্বিগুণ সুযোগ

আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে কৌশলগত বিভ্রান্তির গভীর অনুভূতি বিরাজ করছে। ভারতের ক্ষেত্রে যে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে, তা কেবল ভারতের পররাষ্ট্রনীতি কী তাই নয়, কিভাবে তা হাসিল করা হবে তা নিয়েও। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলছেন, ভারত হতে চায় ‘বিশ্ব গুরু।‘ কিন্তু সেটা অনেক দূরের কথা। বিশেষ করে যখন ভারত জ্ঞান ও প্রযুক্তির আমদানিকারক। এটাও পরিষ্কার নয় যে এই মর্যাদা ভারতের নাগরিকদের জীবনে পরিবর্তন আনতে ভূমিকা পালন করবে, অবশ্য এটি অহংকে তৃপ্ত করতে পারে।

আশাবাদী থাকাটা ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ভারত যদি তার পথ পরিবর্তন করে তবে এটি হবে দ্বিগুণ সুযোগের সময়। কৌশলগতভাবে চীন-যুক্তরাষ্ট্র বিরোধ সম্ভবত আরো কিছু সময় অব্যাহত থাকবে, যদিও উভয় পক্ষই সাময়িক চুক্তি করে নিজেদের জয়ী ঘোষণা করেছে। কিন্তু এই বিরোধের ফলে অন্যান্য শক্তির জন্য সুযোগ ও অবকাশ সৃষ্টি করবে।

তবে চীন ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়েই তাদের জন্য উদ্বেগ সৃষ্টিকারী কারো সাথে মোকাবেলার সময় নিজেদের মধ্যকার সঙ্ঘাত ও উত্তেজনা স্থগিত করে ফেলে। ২০১৮ সালে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও মোদির মধ্যে উহানে যে সম্মেলন হয়েছিল, তাতে তা পরিষ্কারভাবে দেখা গিয়েছিল। তারা বিদ্যমান সমস্যাগুলো নিরসন করতে না পারলেও ওই সম্মেলনে উভয় দেশ দৃশ্যত সাময়িক যুদ্ধবিরতি করেছিল।

আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভারত বাকি বিশ্বের কাছে অনেক বেশি নির্ভরশীল। জ্বালানি, প্রযুক্তি, সার, কয়লার মতো নিত্যপণ্য, বাজারে প্রবেশ, মূলধনের জন্য সে বিশ্বের কাছে নির্ভরশীল। সেইসাথে যদি নিরাপত্তা এজেন্ডা, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ বিশ্বের অভিন্ন বিষয় ও সাইবারস্পেস ও গভীর সাগরের কথা বিবেচনা করলে আরো বেশি উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতার সৃষ্টি হয়।

ভারত উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার বাস মিস করবে যদি সে অব্যাহতভাবে গতানুগতিক কাজ ও রাজনীতি করে যায়, গত ৪০ বছর ধরে চীনা অভিজ্ঞতার অনুকরণ করে, অভ্যন্তরীণ সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যা আরো ভালোমতো ব্যবস্থাপনা না করে। ভারতের সবচেয়ে বড় উন্নতি যেখানে করতে হবে তা হলো জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামোতে নমনীয়তা সৃষ্টি করা। কারণ পরিবর্তনই হলো জীবনের একমাত্র নিশ্চিত বিষয়।”

Berger Weather Coat