।। যুবরাজ ঘিমাইর ।।

গত মাসে তীব্র গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছিল যে, ২৪ মাস আগে পার্লামেন্টে দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে যিনি প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন, সেই প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলিকে ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপালের ভেতরের তীব্র অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে হয়তো পদত্যাগ করতে হতে পারে। 

দলের ৯ সদস্যের সেন্ট্রাল সেক্রেটারিয়েটের বেশির ভাগ সদস্য প্রকাশ্যেই অবস্থান নিয়েছিল যে, তারা ওলির প্রস্থানের পক্ষে। তবে, সেক্রেটারিয়েটের যে দিন বৈঠকে বসার কথা, তার ঠিক এক দিন আগে ১ মে, চীনা রাষ্ট্রদূত হাউ ইয়ানকি পুস্প কমল দহল ‘প্রচণ্ডের’ সাথে এক ঘন্টা ধরে কথা বলেন, এবং এরপর মাধব কুমার নেপালের সাথে বৈঠক করেন, যাদের উভয়েই সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং যাদের মধ্যে মতভিন্নতা রয়েছে। হাউয়ের বার্তা ছিল স্পষ্ট: চীন মনে করে, চীন-নেপাল সম্পর্ক, সহযোগিতা ও সমৃদ্ধির জন্য ক্ষমতাসীন দলের ঐক্যটা সবচেয়ে জরুরি। 

রাষ্ট্রদূত হাউ যেদিন বৈঠক করেন, তার চার দিন আগে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং নেপালের প্রেসিডেন্ট বিদ্যা দেবী ভাণ্ডারির সাথে টেলিফোনে আলাপকালে প্রধানমন্ত্রী ওলির সুস্বাস্থ্য, ও ‘সুখ’ কামনা করেন। ২ মে’র বৈঠকে প্রচন্ড হঠাৎ তার অবস্থান থেকে ঘুরে দাঁড়ান এবং রাষ্ট্রদূত হাউয়ের পরামর্শ অনুযায়ী ‘ঐক্যের’ আহ্বান জানান। 

তবে, ওলির টিকে যাওয়ার বিষয়টিকে দিল্লি নেপালের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব বৃদ্ধির প্রমাণ হিসেবে দেখেছে। দিল্লি সবসময় নেপালকে তাদের নিজেদের প্রভাব বলয়ের অংশ হিসেবে দেখে এসেছে, এবং সেখানে চীনের খোলামেলা কূটনৈতিক সাফল্যে তাদের ধারণার উপর আঘাত হেনেছে। 

কাঠমাণ্ডুতে ওলির টিকে যাওয়ার ঠিক এক সপ্তাহের মাথায় দিল্লি এমন একটা কাজ করেছে, যেটা নেপালের পার্লামেন্টে এবং রাজপথে তীব্র উত্তাপ ছড়িয়ে দিয়েছে। ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রাজনাথ সিং লিপুলেখ অঞ্চল নিয়ে নির্মিত ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি সড়কের উদ্বোধন করেছেন। ভারত, নেপাল ও চীনের ত্রিদেশীয় সংযোগ পয়েন্টের এই জায়গাটিকে নেপাল তাদের নিজেদের অংশ হিসেবে দাবি করে আসছে। এই সড়ক ইস্যুটিকে কেন্দ্র করে নেপালে বড় ধরনের বিক্ষোভ হয়েছে, যেটা ওলির সম্ভাবনাকে আরও মজবুত করেছে। দিল্লি হয়তো এটা চায়নি কারণ ওলিকে তারা চীন-পন্থী হিসেবে বিবেচনা করে, যার আরেকটি অর্থ হলো ভারত-বিরোধী। 

নেপাল ও ভারত পরস্পরের মধ্যে উত্তপ্ত বার্তা বিনিময় করেছে এবং দাবি ও পাল্টা-দাবি করেছে যে, ত্রিদেশীয় সংযোগ বিন্দুতে লিপুলেখ-কালাপানি এবং লিমপিয়াধুরার মধ্যবর্তী ত্রিভুজ ভূখণ্ড – যেটির আয়তন প্রায় ৩৩৫ বর্গকিলোমিটার, সেটা তাদের নিজেদের অংশ।

ওলির মন্ত্রিসভা শুধু দেশের আনুষ্ঠানিক মানচিত্র সংশোধন করে এই অঞ্চলগুলোকে নেপালের অংশ হিসেবেই ঘোষণা দেয়নি, বরং প্রধানমন্ত্রী পার্লামেন্টে এটাও ঘোষণা দিয়েছেন যে, নেপাল যে কোন মূল্যে অবৈধভাবে দখলকৃত অঞ্চলগুলোকে পুনরায় নিজেদের হিসেবে দাবি করবে। এই বিবাদ মীমাংসার জন্য দ্রুততম সময়ের মধ্যে আলোচনার সময় নির্ধারণ জন্য ভারতের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। 

এই পদক্ষেপের মাধ্যমে তিনি শুধু বিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপালের সমর্থনই পাননি, বরং বিরোধী দলগুলোর সমর্থনও পেয়েছেন, যারা সীমান্ত ইস্যুতে দৃঢ়ভাবে তার পেছনে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। 

পরিবর্তিত মানচিত্রটির জন্য সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন হবে, এবং এ জন্য পার্লামেন্টে একটি বিল উত্থাপন করা হয়েছে। 

ব্যাপক দুর্নীতি, কোভিড-১৯-এর কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতি সামলানোর ক্ষেত্রে অদক্ষতা, ত্রাণ প্যাকেজ ঘোষণার ক্ষেত্রে সামর্থহীনতা, বিদেশ থেকে ফিরে আসা নেপালিদের সাথে বিরূপ আচরণ, ডুবন্ত পর্যটন ব্যবস্থা এবং সার্বিক অর্থনৈতিক অবনতির বিষয়গুলো নেপালের রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রাধান্য বিস্তার করে আছে, যেটা ওলির জন্য অস্বস্তির কারণ। 

জার্মান সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, নেপালে বছরে ২৫০ মিলিয়ন ইউরোর সহযোগিতা প্রকল্পকে তারা আর এগিয়ে নেবে না। স্পষ্টতই ওলির আমলে ব্যাপক মাত্রার দুর্নীতি আর দুর্বল মানবাধিকার পরিস্থিতির কারণে তারা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু ভৌগলিক সীমানার ইস্যু নিয়ে ওলি ভারতের মুখোমুখি হওয়ার কারণে এই সব ইস্যুগুলো এখন চাপা পড়ে গেছে। ভারত-বিরোধী মনোভাব এখন নেপালে ‘জাতীয়তাবাদী’ ইস্যুতে রূপ নিয়েছে। 

১৫ মে দিল্লিতে ভারতের সেনাবাহিনী প্রধান মনোজ নারাভানে একটি মন্তব্য করেন, যেখানে তিনি দাবি করেছেন যে, মানসরোবরে যাওয়ার জন্য লিপুলেখ দিয়ে যে সড়ক নির্মিত হয়েছে, সেই ভূখণ্ডটি ভারতের। এর পরেই তিনি বলেন যে, নেপালে যে ধারাবাহিক বিক্ষোভ হচ্ছে, ‘কোন বিশেষ পক্ষের ইঙ্গিতে’ সেটা করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে স্পষ্টই তিনি চীনের দিকে ইঙ্গিত করেছেন – কাঠমাণ্ডু যেটাকে ভালভাবে নেয়নি। 

এই সবকিছুর মধ্যে ভারত জানিয়েছে যে, করোনা মহামারী কমে যাওয়ার পরেই কেবল এ বিষয়ে আলোচনা হতে পারে। 

১৮১৬ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাথে যে চুক্তি হয়, সেই চুক্তি অনুযায়ী নেপালের বর্তমান সীমানা নির্ধারিত হয়। নেপাল দাবি করেছে যে, তাদের কাছে ঐতিহাসিক দলিলপত্র রয়েছে, যেটা মূলত চুক্তির কপি, যেটা অনুসারে কালি নদীর পূর্ব পাশের ভূখণ্ডটি মূলত নেপালের অংশ। তাছাড়া, নেপাল দাবি করেছে যে, এই সব অঞ্চল এবং সেখানকার জনগণ নেপালের কর্তৃপক্ষের কাছে ভূমির খাজনা দিয়ে এসেছে এবং ষাটের দশক পর্যন্ত সেখানকার জনগণকে জাতীয় আদমশুমারির অন্তর্ভুক্ত করে এসেছে নেপাল। 

নেপাল ও ভারতের মধ্যে উন্মুক্ত সীমান্ত রয়েছে, কোন ভিসা ছাড়াই মানুষ দুই দিকে যাতায়াত করছে, এবং এরপরও দুই দেশের মধ্যে সীমান্ত বিবাদ খুব একটা অস্বাভাবিক নয়। 

৯৩ বছর বয়সী বিশ্ববন্ধু থাপা ১৯৬২ সালে নেপালের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন। তিনি বলেছেন যে, নেপালের রাজা মাহেন্দ্র ত্রিদেশীয় সংযোগ পয়েন্টের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ডটি জওহরলাল নেহরুর অনুরোধে ভারতকে দিয়ে দেন। ১৯৬২ সালে চীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বড় ধরনের পরাজয়ের শিকার হওয়ার পরপরই ওই ঘটনা ঘটে। কিন্তু নেপাল পরে এই ইস্যুটি উত্থাপন করে। প্রথম করা হয় নব্বইয়ের দশকে। প্রধানমন্ত্রী জি পি কৈরালা এবং অটল বিহারী বাজপেয়ী ২০০০ সালের জুলাই মাসে একমত হন যে, কূটনৈতিক চ্যানেলে আলোচনার মাধ্যমে ইস্যুটির নিষ্পত্তি করা হবে এবং দুই দেশের পররাষ্ট্র সচিব পর্যায় থেকে বিষয়টির তত্ত্বাবধান করা হবে। কিন্তু এ পর্যন্ত এ বিষয়ে কোন অগ্রগতি হয়নি। 

২০১৫ সালের মে মাসে এই ইস্যুটি আরও জটিল হয়ে ওঠে, যখন ভারত আর চীন নেপালের সাথে কোন ধরনের আলোচনা ছাড়াই প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ে চুক্তি করেন যে, লিপুলেখ দিয়ে সড়ক তৈরি করা হবে। নেপাল প্রতিবাদ জানালেও দুই পক্ষের কারো দিক থেকেই সাড়া মেলেনি। বিবাদটি ঝুলে থাকা অবস্থাতেই রাজনাথ সিং ৮ মে সড়কের উদ্বোধন করেন, এবং এর কারণে দেশে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয় এবং বাতাসে ‘গো ব্যাক ইন্ডিয়া’ শ্লোগান ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। 

নেপালের রাজনীতিতে চীন যে ভূমিকা রাখছে, সড়ক উদ্বোধনের মাধ্যমে ভারত কি তার জবাব দিয়েছে? কেউ জানে না। দুটো ঘটনা একটা অন্যটির পর পর ঘটেছে। তবে ভারতের একটি টেলিভিশন চ্যানেলে ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব কানোয়াল সিবাল ওলিকে ‘চীনের পুতুল’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে তাকে বদলে দেয়ার পরামর্শ দেন। সেই সাথে ভারতের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকা সাবেক কর্মকর্তারা বলেছেন যে, মাওবাদী গেরিলাদের আশ্রয় দেয়ার কারণে এবং ২০০৬ সালে বিশ্বের একমাত্র হিন্দু রাজ্যকে ধ্বংসের ব্যাপারে সমর্থন দেয়ার কারণে ভারতকে এখন মূল্য দিতে হচ্ছে। 

ওলি সরকার আদেশ দিয়েছে যে সাবেক দুই রাজা – বিরেন্দ্র আর জ্ঞানেন্দ্র’র ছবিসহ মুদ্রার নোট আর ছাপা যাবে না। রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা গভীর হওয়ার কারণে জ্ঞানেন্দ্র যে ব্যাপক জনসমর্থন পাচ্ছেন, সেটা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছেন ওলি। ক্ষমতাসীন এনসিপি’র মধ্যে এই আশঙ্কাও রয়েছে যে, ভারতের নরেন্দ্র মোদি সরকার নেপালকে আবার হিন্দু রাজ্যে পরিণত করার ‘ষড়যন্ত্র’ করছে। 

ভারতের সিনিয়র রাজনীতিক এবং বিরোধী রাষ্ট্রীয় জনতা দলের নেতা শারদ যাদব – যিনি নেপালের বর্তমান সরকারের একজন বন্ধু – তিনিও ভারতের পার্লামেন্টে এই সন্দেহের প্রতিধ্বনি করেছেন। সম্প্রতি তিনি প্রধানমন্ত্রী মোদিকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, নেপালে কোন ধরনের ‘অনাকাঙ্ক্ষিত’ পদক্ষেপ নেয়া উচিত হবে না। 

২০০৬ সালের পরে চীন নেপালে বিশাল রাজনৈতিক প্রভাব অর্জন করেছে এবং তাদের বিনিয়োগ ও ক্রমবর্ধমান স্বার্থ রক্ষার জন্য নেপালে একটা বন্ধুত্বপূর্ণ সরকার দরকার তাদের। কিন্তু এ পর্যন্ত যে ভারত-বিরোধী বিক্ষোভ হয়েছে, সেটা বলা যায় অনেকটাই স্থানীয়দের প্রতিবাদ, এবং ভারতের আশঙ্কার বিপরীতে সেখানে চীনের ভূমিকা নেই বললেই চলে। 

এই অচলাবস্থা কত দীর্ঘ হবে, সেটা নির্ভর করছে সীমান্ত বিবাদ মিটিয়ে ফেলতে দুই পক্ষ কতটা সিরিয়াস, তার উপর। এতে দেরি হলে নেপালে চীনের প্রভাব বাড়তেই থাকবে, এবং সেখানে ক্ষতির শিকার হবে ভারত।

যুবরাজ ঘিমাইর একজন নেপালী সাংবাদিক

Berger Weather Coat