।। ভাষান্তর: হাসিনুল ইসলাম ।।

[‘সেলেস্টিয়াল বডিজ’ ইংরেজি শিরোনামের উপন্যাসের জন্য প্রথম আরবি সাহিত্যিক হিসেবে জোখা আলহার্থি ২০১৯ সালের ম্যান বুকার ইন্টারন্যাশনাল প্রাইজ জিতেছেন। বইটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মার্লিন বুথ। এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ধ্রুপদী আরবি সাহিত্যে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করে বর্তমানে মাসকাটে সুলতান কাবুস বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন জোখা আলহার্থি। এ পর্যন্ত তাঁর একাধিক ছোটগল্প সংকলন, ছোটদের বই ও তিনটি উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে। এখানে তাঁর একটি ছোটগল্প ‘গ্রিন ডটস এন টিচার ফাতিহাজ ড্রেস’ বাংলায় অনুবাদ করা হলো। গল্পটি আরবি থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন ইবতিহাজ আলহার্থি।]

আমরা দুজনেই দাঁড়িয়ে ছিলাম, ম্যাডাম এবং আমি। আমরা তখন মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, তাঁর দৃষ্টি আমার চোখের মাঝে আটকে ছিল। আমার চোখে ভীতসন্ত্রস্ত ছাপ, দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল তাঁর পোশাকের ওপর, সেইসাথে আমাদের পিছনের জানালা আর তাঁর পাশের ফ্রিজের দিকেও দৃষ্টি।

আমার ছোট্ট হাতটা তাঁর শ্যামলা রঙের বড় হাতের মধ্যে যেন ডুবে গিয়েছিল। আমরা মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিলাম। তিনি কথা বলছিলেন, আর আমি কাঁপছিলাম। করিডোরের ছাদে ঝুলন্ত একটি বাতি থেকে নীল আলো আসছিল, এরপরও সেখানে অন্ধকার ছিল। আমার চুলের ভেতর ঘামের নহর বেয়ে আসছিল, আমি ঠিক অনুভব করছিলাম, এরপর ঘামের নহর আমার পিঠের কাছে এসে টপটপ করে হলুদ রঙের স্কুলের ইউনিফর্মের ওপর পড়ে দাগ সৃষ্টি করছিল। তাঁর কপালে ঘামের ফোঁটা চকচক করছিল। তাঁর বক্ষযুগলের ঠিক উপরের চামড়ায় ঘামের ফোঁটা চকচকে হয়ে উঠেই আবার শূন্যে উবে যাচ্ছিল, সমুদ্র-রঙিন গলাকাটা গাউনের উম্মুক্তাংশে এমন খেলা চলছিল। স্যান্ডেল পায়ে তিনি পা-দুটো কিছুটা ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমার পায়ে জুতা, জুতার ভেতরে প্লাস্টিকের টুকরো, সেই জুতো পায়ে আমি দুই পা আঁটোসাটো করে দাঁড়িয়েছিলাম। তাঁর হিসহিসানি যখন বেড়ে গেল, তখন তিনি আমার দিকে বেশি ঝুঁকে এলে তাঁর মেদী-সুগন্ধী শ্বাস আমার মুখে এসে আঘাত করল। তাঁর হাতের মুঠিতে আমার হাত মোচড় খেল। আমার নতুন আঙটি, এটাই আমার জীবনের প্রথম আঙটি, আমার আঙুলের মাংসের ভেতর দেবে যাচ্ছিল। কিন্তু ফাতিহা ম্যাডামের ঘর ও রান্নাঘরের মাঝের করিডোরে দাঁড়িয়ে আমি দাঁতে দাঁত চেপে ধৈর্য ধরে তাঁর কথা শুনছিলাম।

সকালে অ্যাসেম্বলিতে যখন দাঁড়িয়েছিলাম, সেই সময় সময় তিনি আমার কাছে এসেছিলেন। আমার কাঁধ টেনে ধরে তাঁর দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে তিনি বলছিলেন যে, তাঁর সম্পর্কে আমি যে খারাপ কথা বলেছি তা তিনি শুনেছেন। তিনি আমার চোখের দিকে তাকালেন, আমি তাঁর হাতে ধরা বাগানে পানি দেওয়ার জন্য ব্যবহৃত সবুজ পাইপের টুকরোর দিকে তাকালাম। এরপর তিনি আমার সামনে থেকে চলে গেলেন।

তাঁর পিছনের জানালাটি লাল টেপ দিয়ে আটকানো ছিল। ফ্রিজের দরজাটা সামান্য খোলা ছিল, সেই ফাঁক দিয়ে আমি অনেকগুলো ক্যান এবং বিভিন্ন খাবারের স্তূপ দেখতে পেলাম। রান্নার গন্ধ থেকে তৈরি হওয়া কেমন এক টকটক গন্ধ করিডোরে ঘুরপাক খাচ্ছিল। ফাতিহা ম্যাডাম দাঁড়িয়ে থেকে ক্লান্ত হয়ে যাওয়ায় হাঁপাতে শুরু করলেন।

ছুটির ঘণ্টা বাজার কয়েক মিনিট আগে তিনি আমার ক্লাসরুমে মাথা ঢুকিয়ে আমার দিকে ইঙ্গিত করলেন। আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাঁর পোশাকের সবুজ ফুটকি অনুসরণ করে চলতে শুরু করলাম, একসময় আমরা স্কুলের মাঠের পেছনের শিক্ষিকাদের কোয়ার্টার্সে পৌঁছলাম। সেখানে পৌঁছলে তিনি আমার হাত ধরে আমাকে নিয়ে তাঁর ঘরে ও রান্নাঘরে ঢুকলেন।

তাঁর পিছনে ফ্রিজটা পুরোপুরি খুলে গেল, আমি তখন আমার দৃষ্টি নীচের দিকে নিলাম। তিনি আমার দিকে ঝুঁকে আসছিলেন, বারবার ঝুঁকে এসে খুব দ্রুতলয়ে বকবক করতে থাকলেন। হঠাৎ, তিনি আমার হাত ছেড়ে দিতেই আমি প্রায় পড়েই যাচ্ছিলাম। তিনি বিপরীত কোণের দিকে আঙুল দিয়ে নির্দেশ করলেন, আমি সেই কোণা থেকে একটি স্বচ্ছ প্লাস্টিক ব্যাগ টেনে আনলাম। সেটার ভেতর অনেক খাতা দেখতে পেলাম। প্লাস্টিক ব্যাগটা সেই খাতায় পুরোপুরি পূর্ণ। তিনি সেটি নিয়ে একটি ঘোলাটে রঙের প্লাস্টিক ব্যাগে পুরে ফেললেন, সেটার ওপর একটা বিখ্যাত সিগারেট কোম্পানির স্লোগান ছাপানো। খাতাপূর্ণ সেই প্লাস্টিক ব্যাগের ওজনে আমার হাতে রক্তের ছোপের মতো দুটি লাল রেখা ফুটে উঠল, কিন্তু এরপরও আমি কোনো দ্বিধা না করে ব্যাগটা বয়ে নিচ্ছিলাম। তিনি দরজাটা খুললেন, ঠিক তাঁর পিছনে আমি সবুজ পাইপটা দেখতে পেলাম এবং সেই সময় আমার স্মৃতিতে আমার মাথায় আঘাতের কথাটা ফুটে উঠলো। “সবগুলো একা একা দেখে শেষ করবে। কেউ যেন না জানে। কালকে সব নিয়ে আসবে,” তিনি জানালেন।

প্রচ্ছদ ◘ রাজিব রায়