Loading...

মঈন শেখের গল্প: ফসল

পড়তে পারবেন 17 মিনিটে

“গরমে তো জানডা আর বাঁচে না দ্যাগোজি। একটাও গাজের পাতা পয্যন্ত লড়ে না। মুনে হয় ভিকম্প হোবেরে ময়নার মাও।” ছমির উদোম গায়ে গামছাটা একাঁধ ওকাঁধ করতে করতে ঘরে ঢুকে। কোকিলা শুয়ে আছে। হাতে পাখা। চোতের খরায় এবার আগুন লেগেছে সত্যি সত্যিই। মধ্যরাত পার পলেও আঁচ কমে না। দিনের বেলা গাছ-পালা, দেয়াল, জমিন সব গরম গিলে গিলে পেট হাঁড়া করে। রাতভর ঢেঁকুর তুলে কমায়। শুধু নেড়ি কুকুরই পানিতে পাছা ডুবিয়ে শান্তি খোঁজে না; সবাই খোঁজে।

ছমির আর কোকিলার তিন কবুল পড়া পাঁচ বছরে ঠেকলেও আব্বা আম্মা বলে ডাকার মত কেউ আসেনি তাদের কোলে। প্রথম দু’বছর ধৈর্য ধরেছিল। ধৈর্য যখন বাঁধ টপকালো তখন বসে থাকেনি ছমির। থাকেনি কোকিলাও। বাড়ির পাশের চেনু কবিরাজ থেকে শুরু করে সাত ক্রোশ দূরের কবিরাজও বাদ যায়নি। বাড়ির শীল-পাটার আয়ু কমেছে শিকড়-বাকড়ের সাথে যুদ্ধ করে। এই তো ক’মাস আগে সোয়া একুশ গোন্ডা গোল মরিচ, সাতচাকা আদা, সোয়া গোন্ডা লবঙ্গ’র সাথে কবিরাজের দেওয়া শিকড় পিষে খেয়ে যমের দুয়ারে ভুলকি দিয়ে আসলো। কাকের আয়ু পেয়েছিল বলে বেঁচে যাওয়া। সাত তওবা পড়ে ছেলের মুখে ঝাঁটা মারলেও পরের বছর তওবার মুখে বাড়ুন মেরেছিল। দশজনার কথাতে কুসুম্বা মসজিদে শেষবারের মত মানত করেছিল দু’জন। পাশের কালো দিঘিতে আঁচলে পানি ছেকেছিল। দাঁড়কানি মাছও উঠেছিল একটা। মাছ উঠলে বাচ্চা হবেই। এমনটাই বলল সবাই। আর যদি বোঝা যায় মাছটি ছেলে না মেয়ে, তবে মানতকারিও বুঝে যায়, তার কী হবে। না, কোকিলা মাছের ধরন বুঝতে পারেনি। তবে কালো পাথরের সামনে দাঁড়িয়ে কেঁদেছিল দু’জনেই। কোকিলা শব্দ করে, ছমির চোখ ঝাপসা করে। মানত করেছিল জোড়া খাসি। কালো রঙের খাসি; দাঁতের খাসি।

সেদিন বাড়ি ফিরে দু’জনের ঘুম আসে না। আঁচলে মাছ উঠেছে। আল্লা এবার মনের আশা পূরণ করবেই। ছমিরের নানা স্বপ্ন খেলা করে চোখের বারন্দায়। সেই বারান্দায় দোল খায় দোলনা। চালার বাঁশে দোলনার দড়ি ঘঁষা খেয়ে ক্যাচর ক্যাচর এক অদ্ভুদ শব্দ তোলে। দুলন্ত দোলনার মধ্যে ঝুলন্ত ঝনঝনির ওপর থেকে সরে গিয়ে দু’টি নিষ্পাপ চোখ সেই শব্দকে তাড়া করে।

ছমির অনেক দোলনা বানিয়েছে; পরের সন্তানের জন্য। বানাতেও পারে। এ ক্ষেত্রে সুনাম আছে ছমিরের। রঙিন দড়ির গাঁথনিতে নকশা তোলে। খোপ খোপ নকশা। আয়না খোপি, কইতর খোপি। কত বাহারি নাম। তার পাড়ায় অথবা গ্রামে কোন বাচ্চা হলে বা কোন ঝিয়ারি বাচ্চা হতে এলে আগাম বায়না আসে। ভাই একটা বানাইয়া দিতে হবে। আমার থোপের জিওর (সেরা) বাঁশ না হয় লিয়ে আইস। ছমির না করতে পারে না। কেউ টাকা কেউ লুঙ্গি। কেউ কেউ কোকিলার জন্য শাড়িও দেয়। যদিও দোলনার গাঁথুনির প্রতিটি গিটের সাথে লেগে থাকে শূন্যতার দাগ। ছমিরের গভীরের দাগ। এবার দোলনা বানাবে নিজ সন্তানের জন্য। মনের রং সব উগলে দিবে। লাল-সবুজ সুতলি দিয়ে গাঁথবে দোলনার জালি। কারও কাছে বাঁশ চাবে না; ঘরের চাল ঠিক করবার সময় যেভাবে চায়। কষ্ট করে হলেও কিনবে; ঘাম ঝরানো টাকা দিয়ে।

ছাগলের শিমগাছ খাওয়া নিয়ে ঝগড়া হলো নহিরের বউয়ের সাথে। তারই ঝাল ঢালল পুকুর ঘাটে। খুব সকালে পুকুর ঘাটে যেতেই মুখ ঘুরিয়ে খোঁটা দিল। আকাশের দিকে তাকিয়ে নহিরের বউ বলল, “দিনডা জি কেমন যাইবে। সকালেই আঁটকুরির মুগ দেগনু।”

ঘুমহীন শুয়ে আছে দু’জন। অথচ ঘুম আসবার কথা। সারাদিনের ধকল। দশ দশ বিশ মাইল রাস্তা ভ্যানে চড়ে যাওয়া-আসা। ভাঙা রাস্তা। তবুও ঘুমাতে দেয় না আঁচলের মাছ। কুসুম্বা দিঘির দাঁড়কানি। পিড়িক পিড়িক করে লাফায় মনের মধ্যে। কোকিলার মন আজ খুবই হালকা। একগুচ্ছ শান্তির বাতাস তার মনকে আকন্দ-তুলার মত ফুরফুর করে তাড়িয়ে বেড়ায়। মন হেঁসেল ঘরের বাসি থালা-বাসন থেকে পুকুর ঘাটে নিয়ে গেল। মোড়ল বাড়িতেও ঢু মারল। এখন থেকে বাড়ির অন্যান্য কাজের সাথে সকাল সকাল পুকুর ঘাটেও যেতে পারবে। কাঁসার থালাতে ঝনঝনানি তুলে মাজতে পারবে। বাড়ির সব কাজ সেরেই মোড়ল বাড়ি যেতে পারবে। না হলে মোড়ল বাড়ির গোয়াল সাফ করে ফিরতে ফিরতে এক বাঁশ বেলা হয়ে যায়। তখন এসে ফাঁকা ঘাটে থালা-বাসন মাজতে হয়। এতে তাল পাওয়া যায় না সংসারের কাজে। ক’মাস আগের কথা। ছাগলের শিমগাছ খাওয়া নিয়ে ঝগড়া হলো নহিরের বউয়ের সাথে। তারই ঝাল ঢালল পুকুর ঘাটে। খুব সকালে পুকুর ঘাটে যেতেই মুখ ঘুরিয়ে খোঁটা দিল। আকাশের দিকে তাকিয়ে নহিরের বউ বলল, “দিনডা জি কেমন যাইবে। সকালেই আঁটকুরির মুগ দেগনু।” স্পষ্ট শুনতে পেয়েছিল কোকিলা। কোন উত্তর দেয়নি। বাড়ি এসে ফুঁপিয়ে কেঁদেছে। আল্লার কাছে বিচার চেয়েছে। সেই থেকে আর সকাল সকাল পুকুর ঘাটে যায় না কোকিলা। আগে মোড়ল বাড়ির গোবর ফেলতে যায়। ফিরে এসে তবেই বাসন ধোয়া। হঠাৎ সিথানের ওপাশে হাঁড়ি-পাতিলের মধ্যে একটা শব্দ হলো। শব্দ হতেই মাথা তুলল কোকিলা। ছমিরও তাকালো। বিড়াল ইঁদুর ধরেছে। দু’জনার দু’টি নিঃশ্বাস বেরিয়ে এলো একসাথে; শব্দ করে। এতক্ষণ ছোট ছোট করে নিঃশ্বাস নেওয়াতে বাতাসের ঘাটতি পড়েছিল বোধহয়। সেটাই পুষিয়ে নিতে বুকভরে বাতাস নিয়ে শব্দ করে ছাড়ল। দু’জনেই ভেবেছিল, অন্যজন ঘুমিয়ে পড়েছে। প্রথমে ছমির কথা বলল, “ক্যারে এগনো ঘুমাসনি?”

“না।” সংক্ষিপ্ত জবাব দেয় কোকিলা।

“মাইনসত করার পর তুর ক্যামন মুনে হওজে?” আরো একটু গা ঘেঁষল ছমির।

“ক্যামন আবার মুন হোবে?”

“এবার মুনে হয় আল্লা হামারে দিগে দেগবে।”

“হামারও ক্যামন জানি বিশ্বাস হওজে।”

“আল্লা যুদি ছাওয়াল দ্যায়রে, তাইলে দেগিস মানসতের খাসি ক্যামন দিই। মাইনষে তাকাইয়া দেগবে।” ছমির বুক ভরে বাতাস নিলো।

“তুমি থামতো।” ধমক দিলো কোকিলা।

“আর একটা কদা।” আরও একটু গায়ে গা ঠেকায় ছমির।— “তুই কন্তুক রাগতে পারবু না। হামার যুদি ব্যাটা বেটি হয়, মানে আল্লা যুদি দ্যায়, তাইলে কিন্তু নাম হামি মুনে মুনে ঠিক করিজি।”

“তুমার ঢঙের কদা শুইনা গা জ্বলে।” কোকিলা রাগ দেখালেও মনে মনে হাসে। সেও সন্তানের নাম যে ভাবেনি, তা নয়। বলেনি। ভালো স্বপ্নের কথা বলতে নেই। দু’জনেই কিছুক্ষণ নিশ্চুপ। কোকিলার জানতে ইচ্ছা করে ছমিরের রাখা নাম। মিলাতে চাই তারটার সাথে। সে-ই নিরবতা ভাঙল— “তা কী থুইলা?”

“ব্যাটা হইলে তুতা আর বেটি হইলে ময়না। কোকিলার ছাওয়াল তো, তাই। তুতা আর ময়না। ক্যারে ভালো হয়নি?”

“হুঁ।” তার নামের সাথে মিলল না। তবে মেনে নিল স্বামীরটা। পছন্দ আছে লোকটার। একটু হাসল কোকিলা। শব্দহীন। আবারও নিশ্চুপ। এক দুই তিন করে অনেকক্ষণ। নিঃশ্বাস লাগা দূরত্বে থেকে অল্পক্ষণ কথা না বললে যা হয়। ঠিক ততক্ষণ। এবার ছমির বলল, “এই কোকিলা..”

“হুঁ।”

“আজ ক’দিন হইল, তুর গান শুনিনি। ময়না হামার কইতরের মুতন বাকুমবাকুম কইরা ডাকে। তগন মুনে হয় লুটোন কইতর। আজ গান শুইনতে খুব ইচ্ছা হওজে।” ছমির কোকিলার গাল টিপে দিল।

“থ্যাক অত গান শুনা লাগবে না।” কোকিলা মুখ ভ্যাংচালো। মৃদু ধাক্কা দিয়ে সরে যাবার ভান করলেও আরও ঘন হলো যেন। সেই সুযোগেই দু’বাহুর বিশ্বাসী খাঁচায় ছমির কোকিলাকে তুলে নিতে ভুল করল না। ডেকে উঠল কোকিলার কইতর। সে ঐ খাঁচার মধ্যে মৃদু-মন্দ ছটফট করতে লাগল সুখপাখিকে ধরবার জন্য। নতুন করে বাঁচবার জন্য। মাথা উঁচু করে জবাব দেবার জন্য। পুকুর ঘাটে, রাস্তায়, সবার সামনে দিয়ে বুক ফুলিয়ে চলবার জন্য।

পরদিন সকাল থেকে ছমির কোকিলাকে ময়না কিংবা তোতার মা বলে ডাকে। কখনও রাগাবার জন্য কখনও রাগ ভাঙাবার জন্য। এখন আর রাগে না কোকিলা। বরং সাড়া দেয়। ডাকটা অবশ্য প্রথম প্রথম শোবার ঘরেই ছিল। ক্রমেই সেটা ঘরের চৌকাঠ, বারান্দা টপকে উঠোনে নামলো। এখন হেঁসেল ঘর, গোয়াল ঘর করে খৈয়লান, পুকুর ঘাট, এবাড়ি ওবাড়ি পর্যন্ত পৌঁছেছে। চিল্লিয়েও ডাকে। বাতাসে জোর কাঁপন লাগে। প্রথম প্রথম লোকজন হাসি-ঠাট্টা করলেও এখন আর করে না। কোকিলাও যে কখনো সখনো তোতার আব্বা বলে ডাকে না; তা নয়। তবে তা ঘরের মধ্যে।

বিয়ের পাঁচ বছর পার হলেও কোকিলা যেন এখনও করছে যৌবনের গৃহস্থালি। অবশ্য তা হবারই কথা। বিয়ে হয়েছিল সেই তের বছর বয়সে। অনেকে বলেছিল, কাঁচা বাঁশে নির্ঘাত ঘুণ ধরবে। কলার গাছ না হয় শেষে। রাজার বেটি ছুঁড়ি এক বিয়ানে বুড়ি। না, বুড়ি হয়নি কোকিলা। বলতে গেলে যৌবনের ঝিঁঝি পোকা এতদিনে লম্বা গান ধরেছে। টানটান করছে যৌবনের বাকল। পাকার পূর্বাভাস। ডাঁসা। দেখতে কালো হলেও চিকনায় আছে। পুরোট শরীর। গত বছরের জামা এ বছর বেশ আটিল। মন্দ লাগে না ছমিরের। যে দেখে তারও। নামের সাথে রঙের মিল ষোলআনা। কোনো অভিজাত পরিবারের মেয়ে হলে আদরের নাম হোত ব্ল্যাক ডায়মন্ড। ছমির কোকিলা ডেকেই সুখ পায়। জমির আলে বসেও সুখ পায় বউয়ের মুখ ভেবে। গাছের নিচে না বসেও ছায়া নামে আল জুড়ে। ভাবে, ময়না কালো, কোকিল কালো, মূল্যবান পাথর কালো, আবার তার প্রিয় ফল জামও কালো। ছমির আকাশের দিকে তাকিয়ে বুক পাতলা করে বলে, কালোই জগতের আলো। আবার মনে মনে বলে, কোকিলা আমার আলো।

কালো ছমির নিজেও। তবে শিরিষ ঘঁষাতে কমতি আছে। অবশ্য বিয়ের আগে এই কমতি পুষিয়ে নেবার ঝোঁক ছিল। ঝোঁক ছিল তার বাপ-মায়েরও। ছেলের কালো রংটা পুষিয়ে নিবে ফর্সা বউ এনে। রং ফিরাবে উত্তর পুরুষের। কিন্তু তা আর হয়নি শেষ পর্যন্ত। জন্ম-মৃত্যু-বিয়া; এই তিন একজনের হাতে। সে জুটিয়ে দিল কোকিলাকে। এখন ছমির ভাবে, তার কোকিলাই ঠিক। সে নিজেও এখন কোকিলার সুরে ডাকে। কুহু কুহু।

পশ্চিম সিথানে শুয়ে আছে কোকিলা। হাতে পাখা। প্রতিদিনের মত সিথানে রাখা আছে পরনের শাড়ি। গায়ে মিলিয়ে আছে কালো রঙের ব্লাউজ। কালোর ওপরে কালো। নিচে লাল পেটিকোট (সায়া)। কোকিলার প্রিয় রং। এই রং দু’টো শরীরের সাথে মানানসই না হলেও তার পছন্দ। ছমির নিখুঁতভাবে দেখে তার কোকিলাকে। ব্লাউজের রং, পেটিকোটের রং আর তার কোকিলার রং। পাকা রং। কোকিলা বাহাদুরী দেখায় তার নামের তাৎপর্য নিয়ে। ছমির পারে না। সে মনে মনে বলে, আমি তোমার কালু। সুড়সুড় করে কোকিলার পাশে বসে কালু। পুবের জানালা টপকে চৈতের জোছনা খিলখিল করে হাসছে কোকিলার সারা গায়। জানালার রডের ছায়া লম্বাভাবে দুইভাগ করেছে তাকে। জানালার মাকড়সার জালে ঝুলন্ত বাঁশপাতার ছায়া ঝুমুর নৃত্য করে মরে কোকিলার নাকে, গালে, ঠোঁটে। পাতা মাতোয়ারা হয়ে কখনও আবার বনবন করে ঘুরে।

কাঁধ হতে গামছাটা সিথানে রেখে আরও একবার দেখে নিল কোকিলাকে। চোখ, নাক, নাকের ওপর জমা কয়েক বিন্দু ঘাম, ঠোঁট, শঙ্খমাজা বুক, বে আব্রু পেট। সব। একটা বিদ্যুৎ খেলে গেল ছমিরের মধ্যে। আবার সংবরণও করল তাকে। বিড়বিড় করে শুধু বলল, “হামার ময়নার মাও-ই ভালো। নিন আসলেও হাতোত থাইক্যা পাগা পড়ে না। ঘুরতেই থাকে।” বলতে বলতে ঘুরন্ত পাখার নিচে সুড়সুড় করে জায়গা করে নিল।

“থাইক থাইক, অত পটানা লাইগবে না।” কোকিলা বিপরীত দিকে পাশ ফিরে বলল।

“কিরে নিন আসিস নি। হামি মুনে করিজি তুই ঘুমাইয়া গেজু। তা মিথ্যা কী বুলনু? ওইদ্যা গবরা, হাবল, এলেম অরা সব গরমের ঠ্যালাত শুতে গ্যালো ডীপের ছাদে। হামাকো ডাইকলো। তা কী বুলনু জানিস?”

“কী বুললেন?”

“বুলনু, হামার বউ তো তুইরে বউয়ের মুতন লয়; হামার ঘরতই ম্যালা বাতাস। ফুরফুর কইরা ঘুরে। ঠাণ্ডা বাতাস।”

“তুমার মুখটা না থাইকলে কী জি করতেন?” অল্পক্ষণ থেমে আবার বলল, “ক্যান তারে সাথে গেলেই পারতেন।”

“গেলে হামার কোকিলাক কে পাহারা দিত শুনি? কথা বলার ফাঁকে কোকিলার টানটান পিঠে বুক ঠেকায়। তেলহীন লম্বা চুলের সুবাস নেয় বুক ভরে। গাভির দুধ চুরি করা দাঁড়াশের মত পায়ে পা আটকায়। বাহু টপকে কোকিলার উর্বর বুকে হালকা চাপ দিয়ে নিজের লোমশ বুকে টেনে নিতে চায়। কোকিলা তবুও নিশ্চুপ। আপত্তি বা সাড়া কিছুই মিলল না। মৃদু ধাক্কাও দিল না, অন্যদিনের মত। অন্তত গরমের দোহায়ও দিল না। ছমির খাবার স্যালাইন বানানোর লবণ তোলার মত কোকিলার কোথাও তিন আঙ্গুলের একটা চিমটি কাটলো। এই লবণ তোলা ক’দিন আগে স্বাস্থ্যকর্মী সুভাষের বউ শিখিয়ে গিয়েছিল। এখনও লবণ তোলা হয়নি। আজ ঝালিয়ে নিল। সেই চিমটিই ডাক হয়ে ফুটে উঠল, “ময়নার মা, এই ময়নার মা।”

“হুঁ” সাড়া দেয় কোকিলা।

“কিজু শুনতে পাওজু?”

“কী”

“দ্যাক, কত সুন্দরভাবে কোকিল ডাকোজে।”

“কোকিল তো ডাকপেই। কোকিল ঠিক তুমার মুতন, সুময় জ্ঞান নাই।”

“কোকিল কিসক ডাকে, তুই জানিস না। এ্যকনাও বুজিস না?” আবারও লবণতোলা চিমটি কাটে। কোকিলার কোন সাড়া নেই। উপুড় চিত বা অন্য কাতেও শুলো না। থাকল আগের মতই। শুধু লম্বা নিঃশ্বাসের একটা শব্দ হলো। ছমির নিরাশ হয়ে ছাদের পাড়নের কাবাড়ির শৃংখলাবোধ দেখে। তির বা বরগা গোণে। কোকিলটা আর ডাকছে না। ফিঙে বা অন্য পাখি কয়েকটা ডেকে উঠল একসাথে। পাখাও ঝাপটালো। বাঁশের পাতায় তার শব্দ হলো ঝনমনিয়ে। কোকিলা কাত থেকে চিত হলো। সে-ই নিরবতা ভাঙল, “ক্যানরে, নিন আইসলেন?”

“উহুঁ।” শোধ নেওয়া করে উত্তর দেয় ছমির। নিজেকে সংযত করে।

“একটা কদা বুলতুন।”

“কী কদা?”

“না মানে, একরাম ভাই বুইললো তাই।”

“একরাম আবার কী বুইললো?” ছ্যাঁৎ করে উঠল ছমিরের ভিতরটা। যেন পুড়ন্ত পলিথিন থেকে একটা গলন্ত দলা পানিতে পড়ল। মোড়লের বেটা সুবিধের নয়। মেয়ের দোষ আছে। বিধবা লক্ষ্মী রানির সংসার নাকি সে-ই চালায়। লক্ষ্মী তার মেয়েটিকেও ভালই সাজিয়ে রাখে। যৌবনে দুপুরলাগা মেয়ে। মা ও মেয়ে; দু’জনার সেরাতেই একরাম পানতোয়া হয়ে ভাসে। এটা এখন খোলা-গোপন। সবাই জানে। একরাম কোকিলার রূপেরও প্রশংসা করে। কোকিলা নিজেই ছমিরকে বলেছিল কথাটা। আরও বলেছে, কেমন কেমন বাঁকা করে তাকায়। গোবর তোলার সময় সামনে আসে। কাপড়ে আছাড় দেবার সময় ঘাটেও গেছে কয়েকদিন। এইতো সপ্তাহই হয়নি। একরাম গবরার কাছে খুব প্রশংসা করেছিল কোকিলার রূপের। কোন অঙ্গ বা উপাঙ্গ বাদ পড়েনি প্রশংসা থেকে।  গবরা সব বলেছিল ছমিরের কাছে। একটু বাড়িয়ে ছাড়া কম নয়। তা শুনে রক্ত ফুটেছিল; পাকোয়ান ভাজা তেলের মত। প্রতিজ্ঞা করেছিল, কোকিলাকে মোড়ল-বাড়িমুখো হতে দেবে না। না খেয়ে মরবে, তবুও। কিন্তু পরক্ষণেই হাজারও প্রশ্নের বেড়া তাকে কোণঠাসা করে। মোড়লের সহানুভূতির হাত যে হঠাৎ একটা তপ্ত সাঁড়াশি হতে পারে, ছমির তা জানে। কেড়ে নিতে পারে অনেককিছু। কোকিলার যাওয়া বন্ধ হলে পাঁচজনের মুখে হাত দেওয়া যাবে না। যা নয় তা বলবে। উপাধি পাবে কোকিলা। প্রতিজ্ঞার গিট এমনিতেই ঢিলা হয়ে যায়।

“একরাম ভাই বুলিজোলো রাজশাই যাবার কদা।” ইঁদুর দেখা বিড়ালের পায়ের সাথে মিলিয়ে কোকিলা কথাগুলো বললেও ছমির এক লাফ দিলো ইঁদুরের ঘাড়ে। এবার হয়তো আছাড় মারবে।

“এই, তুক লিয়া যাইবে ক্যান; তুই কি তার ঘরের মাইগ?”

“তুমার খালি ইয়া ভরা রাগ। হামি বুলি কি আর উই শুনে কী।”

“রাজশাইয়ের বাড়ির কামও তুক দিয়া কইরা লিবে। দুনিয়াত কামকরনীর এ্যতই আকাল?”

“আরে না না, তুমার তো খালি কাম করাডাই চোগত বাদে। একরাম ভাই বুইললো হামারে দুইজনাক ডাক্তার দেগাতে। ভালো ডাক্তার দেগালে নাকি মুনের আশা পূরণ হোতেও পারে।”

“ও আচ্ছা।” আনমনে মাথা ঝোঁকালো ছমির।

“একরাম ভাইয়ের রাজশাইয়ের বাড়ির পাঁজরের বাড়ির এক মিয়া নাকি বিয়ার আট বছর পর ডাক্তারক দেগাইয়া ছাওয়াল হইজে। হামারোকও নাকি ঐ ডাক্তারকে দেগাবে।”

“ও বুজিজি; একরাম তাহলে তুক ভালই পটাইজে।”

“তুমি আবার পটানার কী দেগলেন? একরাম ভাই তো ভালই বুলিজে।”

“বুজতে পারিজিরে বুজতে পারিজি। তুর কুরকুরিই বেশি। তা যাও মাগি, কানোত কইর‌্যা ত্যাল লিয়া যাও।”

দিয়াশলাইয়ের কাঠিতে ছমির যেন ঘঁষা দিল। ফস করে জ্বলে উঠল কোকিলা । চিৎ হয়ে থাকা শরীর বাম কাত হলো; ছমিরের বিপরীত দিকে। গরগর করতে লাগল আমন করে।— “ছাওয়াল য্যান হামার একলাই দরকার। তার কিজুই লয়।”

এবার রাগল কোকিলা। দিয়াশলাইয়ের কাঠিতে ছমির যেন ঘঁষা দিল। ফস করে জ্বলে উঠল কোকিলা । চিৎ হয়ে থাকা শরীর বাম কাত হলো; ছমিরের বিপরীত দিকে। গরগর করতে লাগল আমন করে।— “ছাওয়াল য্যান হামার একলাই দরকার। তার কিজুই লয়।” কিছুক্ষণ থামল। গলার স্বর খাটো আর ভারী হয়ে উঠল।— “নিজের ছোট ভাইয়ের বউ একটা বিয়ান দ্যাওয়ার পর আবার পুয়াতি হইল। সেডা চোগত পড়ে না। মানুষ তাক আঁটকুরা বুলে, তাও শুনে না। সকাল সকাল পগুরের ঘাটোত যাইতে পারি না। তাও দ্যাগে না।” কোকিলা ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল; নাকে আঁচল চেপে। ছমিরও থমকে যায়। একটা শূন্যতা গিলে ফেলে তাকে। গাঢ় আর আঠালো হয়ে উঠল ঘরের অন্ধকার। কেউ যেন ঘরে  ধোঁয়া দিয়ে দরজা জানালা আটকে দিয়েছে। ঝাপসা হলো চোখ। কোকিলাকে কিছু একটা বলতে গিয়েও পারলো না। তার ঠোঁট দু’টো যেন জোর করে ভেতরে সেঁধিয়ে যেতে চায়। রাতটা পার হলো এভাবেই। ঘুমহীন।

গরুর খোঁয়াড়ে খড় ভেঙে দিয়ে চোখ তুলতেই ছমির দেখতে পেল, একরাম একটা টিপছাতা বগলে করে তার দিকেই আসছে। ছমিরই আগবেড়ে কথা বলল, “কি গো ভাই কুনডে যাওজেন?”

“পশ্চিম দিকের মাঠে যাওজি। ম্যালাদিন মাঠে যাওয়া হয়নি।” একটু থেমে আবার বলল, “কালক্যা পুবের মাঠে গেজিনু। তা তুর ধানতো মাঠের মধ্যে সেরা। মানুষ আর এমনিতেই বুলে না, তুর ওপর দিয়া আবাদ করার মরদ নাই। সত্যিই তাই।”

“হ্যাঁ ভাই, আল্লার রহমতে ভালই হইজে। তা তুমারে মুতন তো অত সার-পাউষ দিতে পারি না।” ছমির বাহাদুরী ফুটিয়ে তোলে চোখে মুখে।

“তা বাইরের মাঠে ফসল ফলালেই চইলবে? তুর ঘরের জমিতেও ফসল ফলা, চেষ্টা কর।”

ছমির চুপষে যায়। জোঁকের মুখে লবণ পড়ে। খানিক আগের দীপ্ততা ফুড়ুত করে উড়াল দেয়, চোখ-মুখ থেকে। কোকিলার রাতের মুখ আসন করল তার চোখের উঠানে। তাড়া করল অসহায় মুখটা। ছমিরের আর ভালোলাগে না মানুষের ধাক্কা মারা কথা শুনতে। নিজে থেকেই কথাটা তুলল ছমির— “কোকিলা রাত্তিরে তুমার কদা কুইললো। ডাক্তারক দ্যাগালে কি কাম হোবে ভাই?”

“ক্যান, ম্যালা মানুষেরই তো হওজে। তাহলে তুর হোবে না ক্যান? শুন ছমির, চ্যাংড়া বয়সেই চিকিৎসাডা কইর‌্যা লে। বয়স হোলে হয়তো চেষ্টা কইর‌্যাও হোবেনানি। সময়ে এক ফোঁড় অসময়ে দশ ফোঁড়। অসময়ে ধানডাই লাগালে কি হয় বুল? গাছ হোলেও ফল হয় না। ফল হলেও দানা হয় না। তুইতো আবাদী চ্যাংড়া, তুক আর কী বুঝামু।” একটু জ্ঞান ফলিয়ে নিল একরাম।

“হুঁ ভাই হামিও ভাইবা দেগনু। একবার শেষ চেষ্টা কইরা দ্যাগা দরকার। তা বোরা-বাড়ি কাইট্যা যাইতে পারি। তুমাক কিন্তুক থাকা লাইগবে।”

“বোরা কাটতে তো এগনও এক দেড় মাস দেরি। পারলে আগেভাগেই যা।”

“হামারে তো ধানডাই মরদানি। অত ট্যাকা কুনডে পামু।”

“ও বুজিজি। শুন, হামি পরশু রাজশাই যামু। তুরা গেলে চল হামার সাথে। ট্যাকা যা লাগে হামিই দিমুনি। ধান-টান কাইট্যা তগন দিস।”

“না ভাই, লিয়া তগন দিতে পারমুকি না। তার থাইক্যা পরে গেলেই হোবে। এই তো কডা দিন।”

“তা তুর যা ভালো হয় তাই কর। এগন হামি অবসর ছিনু তাই বুলনু। তগন কুন কামত থাকমু। হয়তো সুময়ই পামু না।” একরাম যাবার জন্য তাড়া দেখাল। যদিও দাঁড়িয়েই থাকল কান খাঁড়া করে। ছমির ঝটপট যা ভাবা সম্ভব তাই ভাবল। এবং ভেবেই বলল, ঠিক আজে ভাই, কোকিলার সাতে কদা-বার্তা বুইল্যা কাইলক্যা সকালেই তুমাক জানামুনি।”

“আচ্ছা ঠিক আজে।” একরাম মনের মধ্যে হাসলেও মুখে তা ভেসে উঠতে দিল না। হাঁটা দিল মাঠের দিকে। ছমিরও একরামের ভালো-মন্দ সব গুণগুলো এপিঠ-ওপিঠ করে দেখতে দেখতে বাড়ির মধ্যে গেল। ভালো ও মন্দের পাল্লা অবশ্য কোনদিকেই হিলে থাকতে দেখল না।

দুই

এক খাটেই বসে আছে দু’জন। কোকিলা ও ছমির। তেমন কথা হচ্ছে না। অথচ দুইজনার মধ্যেই খই ফোটার কথা। আশার বাণী কিছুটা শুনতে পেয়েছে। কোকিলা কথা বললেও দায়সারা উত্তর দেয় ছমির। ঘরে ঢোকার পর ছমিরের কেমন জানি দম বন্ধ হয়ে আসছে। ঘরটা খুব ছোট নয়; তবুও। বড় বাল্বের আলোতে সব ঝলমলে। তবুও একটা অন্ধকার জানালার ওপারে ঘাপটি মেরে বসে আছে। আলো নেভাতে যা দেরি; ঘুমাতে যা দেরি। ওঁৎ পেতে থাকা অন্ধকার অমনি ছুটে আসবে। শুঁষে নিবে বেঁচে থাকার ছন্দ, আনন্দ, সুখ, অভিমান; যা কিছু। এই ঘর বাদে আরও দু’টো ঘর আছে এই বাড়িতে। সেগুলো ভাড়া দেওয়া। এক ট্রাক ড্রাইভার তার পরিবার নিয়ে থাকে। শুধু এ ঘরই ফাঁকা। মোড়লের বাড়ির লোকজন শহরে এলে এই ঘরে থাকে। আজ থাকবে তারা। কোকিলা, ছমির আর একরাম।

“ডাক্তার কী বুইললো তা শুনলেন তো? সব দুষ কিন্তুক তুমার। তবে ডাক্তার আশা দিজে। ওষুধ খাইলে কাম হোবে।” মুচকি এক অর্থপূর্ণ হাসি ছড়িয়ে পড়ল কোকিলার ভরাট গালে।

“ইটে আবার দুষের কী দেগলু? আর তুই অমন ধুইয়া উডোজু ক্যান। দুষটা যুদি তুর ধরা পড়তো?” খ্যাটম্যাট করে উঠে ছমির।

“তুমি অমন ক্ষ্যাপোজেন ক্যান। অমন যুদি রাগ দেগাবেন, তাইলে আইসলেন ক্যান? না আইসলেই হইতো।” কোকিলাও রাগ দেখাল। আর এর মধ্যেই চলে আসে একরাম। হোটেলে ভাত আনতে গিয়েছিল। হাতে চার বাটি যুক্ত টিফিন ক্যারিয়ার, কয়েল ও একটা ছোট পেপসির বোতল। মেঝের ওপর রাখতে রাখতে বলল, “তুইরে আবার কী হইল? লে ঐসব বাদ দিয়া এগন খাওয়া হোক। ক্ষিদ্যা লাগিজে। বাপরে শালা ডাক্তার গো। দুনিয়ার রুগী ঐ শালার কাজে। হামি কি জানি অত ভিড় হোবে। জানলে আরও আগে আইসা সিরিয়াল দিতুন। তাইলে চল্লিশ নম্বারে পড়তুক না। এত রাতও হইত না। আজকাই বাড়িত যাওয়া যাইতো।” কোন বিরতি ছাড়া হড়হড় করে বলে ফেলল একরাম।— “ও বাবা তুমি আবার বইসা ক্যান? আলমারিত থাইক্যা পেলেটগুলো নামাও। হামি পানি আনি।” কোকিলাকে বলে জগ নিয়ে একরাম পানি আনতে গেল উঠানের চাপকলে।

ভাত খেতে খেতে অনেক কথা বলল একরাম। তার বাপ এই বাড়িটা কিনেছিল তাদেরকে শহরে রেখে লেখাপড়া শেখানোর জন্য। মানুষ করার জন্য। আসলে তারা হয়েছে গরু। গরু বলাতে কোকিলা হাসল। একরাম হাসল শব্দ করে। বিষম খেল। কোকিলা তাড়াহুড়ো করে গ্লাসটা এগিয়ে দিল তার দিকে। ছমির মনে মনে বলল, গরু লয় শালা, অমানুষ হইজু।

খাওয়া শেষে পেপসির বোতল একরাম হাতে নিতেই কোকিলা বলল, “হামি কিন্তুক খাইতে পারমু না। হামারে একবার আনিজোলো। বাপরে কি ঝাঁঝ!”

“হামি তা জানি। তুমি একদিন গল্প করিজেলেন। তাই একটাই আননু। হামার তো এডা হারাম। ডাক্তার মানা করিজে। লে ছমির তুই খা।” ছমিরের দিকে এগিয়ে দেয় বোতল।

“ঠিক আজে হামাক দ্যাও। তা ভাই মুগিডা খুইলা দ্যাও। হামি খুলতে লাইগলে আদ্দেক লাপ মাইরা পইড়া যায়।” ছমিরের কথা শুনে কোকিলা খিলখিল করে হেসে উঠে। কোকিলা জানে, গত ঈদে বোতলের মুখ খুলতে গিয়ে কীভাবে ছমির অর্ধেক পেপসি ফেলেছিল। একরামও মনে মনে হাসে। দু’জনের হাসি দুই রকম।— “আরে না না, হামি কাঁচা কাম করিনি। দুকানোত থাইকা মুগি খুইলা আনিজি।” মুখটা খুলে বোতল ছমিরের দিকে এগিয়ে দিল। ছমির মুখে ঢালে আর বীরত্ব দেখায়। কিন্তু দু তিন ঢোক গিলে মুখটা কেমন বিকৃত করে তোলে। বলে— “কেমন জানি তিতো তিতো লাগোজে। এমন ক্যান?”

“ও এডা নতুন আসিজে। এরমধ্যে ভিটামিনও আজে।” একরামের যুক্তি অত তলিয়ে না দেখে ছমির থেমে থেমে কয়েক নিঃশ্বাসে শেষ করল। খাওয়া শেষে ছমির ও একরাম ঘুমালো খাটে। কোকিলা মেঝেতে। অবশ্য কোকিলাকেই খাটে রাখতে চেয়েছিল একরাম, আর তারা দু’জন নিচে। কোকিলা রাজি হয়নি।

মাস গেল, ধান কাটা হলো। ফসল হয়েছে ভালোই। আর পাঁচজনের চেয়ে বেশি। তবুও ওষুধ কিনকে আরও একমাস দেরি হলো। নিজের তাগিদে নয়; কোকিলার জোঁকের মত লেগে থাকাতে। রেগে। আরও বেশি রেগেছে প্রতিবেশীর ওপর। ছোট বড় কেউ দেখলেই হয়। জোর করে আটকিয়ে বলে— ‘আচ্ছা হাড়কিপটে তুমি। ডাক্তারোক না দেগালেই হইতো।’ আরও হাজার কথা। ছমির ঝগড়া করে না। মনে মনে রাগে, বিড়বিড় করে। ‘হামার অসুখ আর শালারে চোগত ঘুম নাই।’ একরামও বলেছে দু’দিন। অবশেষে কতকটা বাধ্য হয়েই কিছু ওষুধ কিনে। কোকিলা সময় গুনে গুনে খাওয়ায়। জোর করেই খাওয়ায়। ছমির নাও বলে না, হ্যাঁও বলে না। নির্বোধ শিশুর মত ফ্যাল ফ্যাল করে তাকায়। কোকিলাকে নতুন করে আবিষ্কার করে; দু’মাস আগের আর দু’মাস পরের কোকিলাকে। ছমিরের হাসি আনন্দ সব প্রথম আষাঢ়ের পানি পাওয়া কৈ মাছের মত উছলে গেছে উজানে। আবার কে যেন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে তা ধরে জিউয়ে রেখেছে তারই কোকিলার ডাবরে। কোকিলা সেই ডাবরের পানি প্রত্যহ বদলায়। খুশিতে থমক তোলে পুরোট শরীরে; মাছের খলবলিয়ে ওঠা দেখে।

শুধু ওষুধ নয়, সবকিছুতেই অবহেলা ছমিরের। ঘর, সংসার, আবাদ-ফসল; যা কিছু। এখন এক অন্য মানুষ ছমির। বাড়িতে হাসি মসকরা করে না। ময়না বা তোতার মা বলে ডাকে না। ফিরেও রাত করে। দু’দিন আগে যারা কাছের মানুষ ছিল, তাদের সাথেও দূরত্ব তৈরি হয়েছে। ছোটখাটো কথাতে খ্যাঁক করে ওঠে। তবে বাড়িতে সে অন্য মানুষ। বড় অচেনা। আদেশ করে না, উপদেশ দেয় না। লবণ ছাড়াই পান্তা খাবে, তবুও লবণ চাবে না। দুম মেরে বসে থাকবে। তিন ডাকে একবার সাড়া দেয়, চমকে উঠে। যেন কাঁচা ঘুম। একটা অপছায়া তাড়া করে সব সময়। কখনও কখনও ওই ছায়া ছবি হয়ে ভেসে উঠে চোখের সামনে। গাঢ় অন্ধকার, গভীর ঘুম। ঘুমের মধ্যে ভেসে আসা এক পরিচিত শব্দ। যা তার খুব চেনা। ফিসফিসানি, ধড়ফড়ানি। অনেক তপস্যার পর হুলো বিড়াল ইঁদুরটা ধরতে পেরেছে। কায়দা করে ঘায়েল করছে ইঁদুরের তেজ।

তিন

পাড়া থেকে গ্রামসুদ্ধ জানাজানি হয়ে গেল, ছমিরের বউয়ের বাচ্চা হবে। একেবারে হইচই। কেউ আবার ঘটা করে দেখে যায় কোকিলাকে। হাজারও বিধি-নিষেধ চাপিয়ে যায় পাড়ার বয়স্করা। খেতে বলে অনেককিছু। সবার কাথাই শোনে কোকিলা। জোর করে হাসে। তার মনেও এখন গুমোট মেঘ-বিদ্যুৎ চমকায়। মুহুর্মুহু ডাকে। বৃষ্টি হয় না। নিঃষ্প্রাণ এক রক্ত মাংসের মূর্তি হয়ে উঠে দিনদিন। তবে চেষ্টা করে ছমিরের সাথে দূরত্ব কমাতে। পারে না। তার চুম্বকের মেরু যেন প্রান্ত বদলিয়েছে। সে একধাপ এগুলে ছামির দুইধাপ পিছনে সরে। কোকিলা রাত জেগে বসে থাকে। বিছানায় বসে নতুন অতিথির জন্য কাঁথা সেলাই করে। এতে জেগে থাকতে সুবিধে হয়। কখন সে আসবে। দু’জনে বসে খাবে। না চাইলেও এক চামচ ভাত তুলে দিবে স্বামীর থালে। খ্যাকর খেলেও খাবে। না, ছমির আসে না। অসুস্থ মুরগির মত ঝিমায়। সুঁচের খোঁচাতে আঙ্গুল ফুটো হয়। রক্ত ঝরে। এক সময় গা এলিয়ে দেয়। কখনও বালিশে মাথা থাকে, কখনও নিচে। কোকিলার খাওয়া হয়  না। ছমির বিনু ভাঙ্গির মজমায় যায়। সেখানে গাঁজার আসরে গান শুনে। একতারা ও সরাজের তালে পাতিল বাজিয়ে তাল মিলায়। ইদানীং নাকি কোলকিও হাতে নেয়।

অনেকদিন পর ছমির আজ জমির আলে পা দিলো। যে লোকের আবাদ সপ্তাহে চার-পাঁচদিন সালাম পেতো; সেই লোক আজ এলো কুড়ি দিন পর। তবে সালাম দেয়নি। ধান এক কোমর হয়েছে। সদ্য প্রসবিত হয়েছে ধানের শীষগুলো। প্রতিটি ধানের মুখে ফুল। এখনও গা ঝাড়া দিয়ে মেলে ধরেনি নিজেকে। পথিক লুঙ্গি উল্টিয়ে যতই ওপরে তুলে হাঁটা দিক; ধানের ডগার শিশির নির্ঘাত ভেজাবে। শিশির ভেজা ধান-ফুল লেপটে লাগবে পায়ে, হাঁটুতে, উরুতে কিংবা অন্য কোথাও। এ যে কার্তিকী ধানের আল, তোমাকে ভেজাবার দায় আছে। লুঙ্গি তুলেই হাঁটো আর ছেড়েই হাঁটো।

একটু বেলা হলেও কার্তিকের শিশির  সকালটা ধরে নিয়ে আছে। ছমির এবার আমন ধান কিছুটা বেশি করেছে। দেড় বিঘা। আগে থেকে দশকাঠা বর্গা করলেও এবার এক বিঘা বাড়িয়ে দিয়েছে মোড়ল। অবশ্য একরামের সুপারিশে। ছমিরের আবাদের বিধি মোতাবেক এবার বেশ অবিচার করেছে। যার জমির তলা ঘরের মেঝের মত ঝকঝক করত, আজ তারই জমির আগাছা ফসলের সাথে পাল্লা দেয়। আতুঁরে থাকা ধানশীষ উত্তরের বাতাসে বাড়ি খায়। কী যেন বলে ছমিরকে। ছমির ঠিক পড়ে ফেলে ধানের ভাষা। ধানের অভিযোগ, অনুযোগ আর অভিমান সে ঠিক বুঝতে পারে। যেভাবে বুঝতে পারে কোকিলার। আর দাঁড়ায় না ছমির। সোজা হাঁটা দিলো; লুঙ্গি ভিজিয়ে ঊরু ভিজিয়ে। অন্য জমির ধান প্রথম পুয়াতির মত খিলখিল করে হাসে। প্রসবিত শীষ দুলিয়ে ছমিরকে ঠাট্টা করে। কোনো কোনো ক্ষেতের পায়জাম ধানের শীষ মাথা গড়িয়ে দিয়েছে। রং ধরেছে শরীরে। পাড়া বেড়ানী রঙিলা রমণীর মত বাতাসে ঢেউ তোলে। তাকাতে বলে পথিককে। এই রং তার মনিবের হয়ে ছমিরকে উপহাস করে। বলে, ছমির এবার তুমি পারনি। এই দেখ আমার দিকে। ডানের ক্ষেত, বামের ক্ষেত, সামনের ক্ষেত একই কথা বলছে ছমিরকে। ছমির পারলে কানে আঙ্গুল দেয়। অসহ্য লাগে। ছুটে পালাতে চায়। রওনা দিল বাড়ির দিকে। কয়েক ভুঁই আগাতেই সামনে পড়ল এলেম আর গবরা। তারাও মোড়লের জমি বর্গা করে। ছমিরের পাশেই জমি।— “কিরে ছমির, তুক জি ভুঁইয়ের দিগে দেগাই যায় না। কেউ তো বুলবেই না, এইডা তুর ভুঁই। তাই হয় তাই হয়…।” ছমিরের ভুঁইয়ের দিকে ইশারা করে বলল গবরা; বাঁম চোখ বাঁকা করে। এলেম গবরার কথা কেড়ে নিয়ে বলে, “ছমির ভাই নিজের জমিত যেই ফসল ফলাইজে, মাইনষের জমিত কি মুন বসে?”

কয়েকটা কালো শিং মাছ এক সাথে গুঁতো মারল ছমিরের দুর্বল গন্তব্যে। তবুও নিশ্চুপ। পায়ের নখে মাটি খোঁটরায়।

“ক্যারে ছমির, এবার কার সাথে ধান কাটপু।” এলেমকে থামিয়ে গবরা বলল।

“ক্যা এবার তুইরে দলে লিবুনা নাকি? না লিলে বুল। অন্য দলত যামু।”

“না মানে, তুমার দিনকাল তা বদলাইয়া গেজে। ধান নাও কাটতে পারেন।” আবারও খোঁচা মারে এলেম। ছমিরের মাথায় রক্ত ওঠে। কিছু একটা ঘটে যেতে পারে। সে দাঁড়ায় না। টং টং করে হাঁটা দেয় বাড়ির দিকে। গবরা পিছন থেকে ডাকে, “এই ছমির শুন শুন। তুক কিন্তুক হামারে দলের ভিতর ধইরা থুইনু।” ছমির দাঁড়ায় না। বরং গতি বাড়ায়।

চার

আজ ধান কাটতে যাবে ছমির। আরও ক’দিন আগে কাটলে হতো। কামলা না পাওয়াতে হয়নি। আজ দু’জন পেয়েছে। তারা এতক্ষণে জমিতে পৌঁছে গেছে। ভোর ফর্সা হবার আগেই তাদের পৌঁছার কথা। সে না গেলে কাজ আগাবে না। গতকাল বিকাল থেকে কোকিলার পেটের ব্যাথাও উঠেছে। কাকে দিয়ে সংবাদ পাঠিয়ে মাকে নিয়ে এসেছে কোকিলা। মায়ের ইচ্ছা ছিল কোকিলাকে তার বাড়িতে নিয়ে যাবে। সেখানেই বাচ্চা হোক। জামাইকে বলার আগেই কোকিলা না করেছে। তার ইচ্ছা, বাচ্চার প্রথম কান্না ছমির শুনুক। সন্তানের মুখটা দেখে তার বুক পাতলা হোক। রাত থেকে ব্যথাটা বেড়েছে। ভোরে আরও বেশি। তবুও কাস্তে নিয়ে বের হয় ছমির। সাতদিন আগে থেকে দিনটা ঠিক হয়ে আছে। কোন ধানকাটার দলে সে যোগ দেয়নি। হাজারও রঙ্গরস করে দলের সবাই। কোন রসই বাদ যায় না। এই রঙ্গ ক্লান্তি দূর করে, শক্তি বাড়ায়। রঙ্গ ভালোলাগে না ছমিরের। উল্টো গণ্ডগোল হবে।

ছমিরের জমির পাশেরগুলো এখন ফাঁকা। ধান কাটা হয়ে গেছে। এতেও সুবিধা। ফাঁকা মাঠে ধান কাটবে। ছমির বারান্দা টপকে উঠোনে নামতেই শাশুড়ি এসে সামনে দাঁড়ায়।— “বাবা তুমি একটা মানুষ? এমন বিপদে ব্যাটা ছাওয়াল বাড়িত না থাকলে হয়। দোহায় বাবা, যাইও না।” থমকে দাঁড়ায় ছমির। হাতে গত হাটের রেতে আনা কাস্তে। বাতাসে কাঁপন তুলে একবার চিল্লিয়ে উঠল কোকিলা; মা বলে। ছমিরের শাশুড়ি হাত ও মুখের ইশারায় কী বলতে গিয়ে পারল না। ঘরে দৌড় দিল। আবারও একটা মাড়ি পিষা আর্তি কানে আসল। আর্তির গতি কোকিলার মুখকে ভাসিয়ে আনলো, একটা ঘূর্ণির মত। আয়ত চোখ, নিভাঁজ গাল, থুঁতনি-ঠোঁটের দূরত্ব, নাক ও নাকের পিছন দিকের মিলিয়ে যাওয়া; দু’চোখের মাঝামাঝি। একটু হাসিতেই সামনের বেড়দাঁতের ফলা নিক্ষেপ। যার গতি গভীর থেকে গভীরে পৌঁছায়। কোকিলার পূর্ণতা দান করে ঐ হাসি। কতদিন দ্যাখেনি ওই সৌন্দর্য! গতরাতে একবার দেখেছিল সেই মুখ। দাঁতটাও দেখেছিল কোকিলার ডুকরে কাঁদার সময়। ছমিরের দু’পা জড়িয়ে বুকে নিয়েছিল কোকিলা। বলেছিল, “হামাক তুমি ক্ষমা কর। হামি মুনে হয় আর বাঁচমু না।” ছমিরও ডুকরে কেঁদে উঠতে চাইল। বলতে চাইল, কোকিলা তুমাক মরতে দিমু না। ছমির দু’হাত নামাল কোকিলাকে বুকে তুলে নিতে। এমন সময় কোকিলা আরও একবার ডুকরে কেঁদে বলল, “হামি তুমাক ঠকাতে চাইনি। বিশ্বাস কর, হামার কিজুই করার ছিল না। হামি ময়নার মাও, তুতার মাও হইতে চাই না। হামি তুমার কোকিলা থাকতে চাই। তুমাক গান শুনাইতে চাই।” মুখের রস শুকিয়ে যায় কোকিলার। তবুও জোর করে বলে চলে; শুকনো গলায় ঢোক চিপে ঢোক চিপে। যেন অনেক দিনের আটকিয়ে রাখা কথামালা বাঁধ ভেঙেছে। এক গ্লাস পানি কোকিলার খুব দরকার। দিতে পারেনি ছমির। বুকেও নিতে পারেনি। পরের কথাগুলো তার হাত শরীর অবশ করেছিল। কোকিলার হাজার কথার কোন উত্তরও দেয়নি ছমির। এখন সব মনে পড়ছে তার। বিবাহোত্তর ছয় বছরের দিনপঞ্জীর পাতা এমনিতেই যেন সামনে থেকে উল্টায়। পড়তে অসুবিধা হয় না। ছোট ভাইয়ের বউ ডেকে আনল পাশের বাড়ির দুই ভাবিকে। তারা হনফন করে ঘরে ঢুকল। তবে ছমিরকে খোঁচা মারতে ছাড়ল না।— “তুই কি মানুষ, ধান কাটতে যাওজু?”

যখন দরজার খিল ভেঙে ঢোকা হলো, তখন ছমির জ্ঞানশূন্য। রক্তের বান ডেকেছে মেঝেতে। টানা হেঁছড়া করে ছমিরকে বাহিরে আনা হলো। কে একজন ছুটে গেল ভ্যান ডাকতে। হাসপাতালে নিতে হবে।

ছমির এবার নিজের প্রশ্নে নিজেই ক্ষত-বিক্ষত হয়। হাজারও কথা বেজে উঠল মনের মধ্যে।— সত্যই কি আমি একটা মানুষ? আবার নিজেই উত্তর দেয়।— না মানুষ নই। ক্যান কোকিলাকে এত কষ্ট দিলাম। কোকিলার কী দোষ। সব দোষ তো তার। তার দোষের ভার সে বইবে কেন। ব্যর্থতা তার। সে ব্যর্থ পুরুষ। সফল কোকিলা। বরং কোকিলাই তাকে পূর্ণতা দিতে চেয়েছে। দিয়েছে। এমন হাজারও কথা ছমিরের মধ্যে অনুরণিত হতে থাকে। ভেসে উঠে সেই ভয়ংকর ছবি। রাতের ছবি। গাঢ় অন্ধকার। গভীর ঘুমের মধ্যে পরিচিত শব্দ। শব্দমালা। আকুতি-মিনতি। কাল-ঘুম, কাল-স্বপ্ন।

ছমির বারান্দায় আর দাঁড়ায় না। সোজা পাশের ঘরে ঢুকে দরজা আটকে দেয়। না, কোকিলার চিৎকার সে শুনবে না। চিৎকারে ভর দিয়ে আসে গত রাতের কান্নার ধ্বনি। মেঝেতে বসে ছমির। হাতে ক্ষয়ে যাওয়া কাস্তে। চকচকে ধার; ঝিলিক খেলে এপার ওপার। কাস্তে দিয়ে মাটি খোঁটায়। চোখ কাস্তের ধারে। মানুষের জমির ফসল কেটেই আয়ু কমেছে কাস্তের। না, সে আর মানুষের জমিতে আবাদ করবে না। ফসল কাটবে না। নিজের জমিনেই যে চাষা ফসল ফলাতে পারে না, তার কী দরকার অন্যের গোলা পূর্ণ করবার। তার চেয়ে হীন চাষা জগতে নাই। নিজের মধ্যে সেঁধিয়ে যায়। আবাদ ও ফসল ফলানোর খেলা সে আর খেলবে না। দরকার নেই আবাদের। ফসল তার দানাশূন্য। শীষহীন ধানগাছ থাকা না থাকা সমান। আগাছা আর তার মধ্যে তফাত কী? কাস্তে আরও জোরে জোরে চলছে। মনেই হলো না এটা ঘরের মেঝে। শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ বাড়ে ক্রমশ।

সূর্য উঠে গেছে। পাখিরা আর তেমন ডাকছে না। তারা উড়ে গেছে অন্য কোথাও। তারাও কি আবাদ-ফসলের খেলা খেলে। হ্যাঁ খেলে। নিজের জমিনে খেলে। জানালার ওপারে দু’টো চড়ূই বাসা বেঁধেছে। বাচ্চার চিঁচিঁ ডাক শোনা যায়। বড় দু’টো উড়ে এলো। একটার মুখে পোকা। বাচ্চার দগদগে লাল মুখে তুলে দিয়ে আবার উড়ে গেল। কাকে কী যেন বলতে বলতে উড়ে গেল। ছমির ভাবল, তাকে। কটাক্ষ, ঠাট্টা নাকি উপহাস। ছমির তাকিয়ে আছে তাদের দিকে। ইচ্ছা হলো পাখির মুণ্ডু চিবাতে। হাতের কাস্তে তুলে মারতে। কোকিলা আবার চিৎকার দিয়ে উঠল। এবারের চিৎকারে যেন ঘরের চালও কেঁপে উঠল। আর সেখানে ধাক্কা খেয়েই বোধহয় ছমিরের কানে ঠেকল। শব্দটা বাতাসে মিলালেও ছমিরের ভিতরে তখনও ছিল। এই থাকার মধ্যেই একটা নিষ্পাপ শব্দ খলবলিয়ে গুচ্ছ তীর হয়ে বিঁধল বুকে। জ্বালা ধরল বুকে, পাঁজরে; সবখানে। এখন অনেকেই বাড়িতে। আঁতুরঘর থেকে কে একজন বলল, “তুমরা কেউ আয়যান দ্যাও গো।” আবার ছমিরের দরজার কাছে গিয়ে বলে, “ছমির তুই কুনডে গেলুরে, তুর তুতা হইজে। মিষ্টি লিয়া আয়। পুন্নিমার চাঁদ হইজে। এ যে ধবধবে বকের বাচ্চা। রাজপুত্তর রে, রাজপুত্তর।”

সব শুনতে পেল ছমির, সব। শেষের কথাগুলো চার দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে বেজে উঠে বারবার। কোকিলার পেট থেকে কোকিল বা কাক কোনটাই হয়নি। হয়েছে বক; সাদা বক। পুন্নিমার চাঁদ। এ যে ধবধবে বকের বাচ্চা। এ যে রাজপুত্তর। রাজপুত্তর রে, রাজপুত্তর। রাজপুত্তর রে, রাজপুত্তর।…

ছমির লাফ দিয়ে সটান দাঁড়াল। কাস্তের দিকে তাকাতেই দেখতে পেল একটা ভূঁই। ছমিরের ভূঁই। যেখানে ছমির অনেক বীজ বুনেছে। অঙ্কুরিত হয়নি। অথচ ঊর্বর ভূঁই। পাকা আবাদীও বটে। আজ সেই জমিতেই ডগমগ ফসল। তার রোপিত বীজের উল্টোটা। সৌখিন ফসল। জমির বিজয় ছমিরকে দাঁত কেলিয়ে বলছে, ওহে ছমির তুমি আবাদ করতে জানো কিন্তু ফসল ফলাতে পার না। তুমি অপারক; তোমার বীজে ভ্রুণ নাই। বন্ধ্যা…। ঘর বাড়ি কাঁপিয়ে বিকট চিৎকার হলো। কোকিলার আগের চিৎকারকে হার মানালো এটি। মুরগি কেটে কে যেন ছেড়ে দিয়েছে মেঝেতে।

যখন দরজার খিল ভেঙে ঢোকা হলো, তখন ছমির জ্ঞানশূন্য। রক্তের বান ডেকেছে মেঝেতে। টানা হেঁছড়া করে ছমিরকে বাহিরে আনা হলো। কে একজন ছুটে গেল ভ্যান ডাকতে। হাসপাতালে নিতে হবে। এক বৃদ্ধ বলল, ‘মরদ ব্যাটা ছাওয়ালের ওডাইতো জীবন। আর সেডাই কাইট্যা ফেলিজে। বাঁইচপে বুইল্যা ভরসা কম।’

প্রচ্ছদ ◘ রাজিব রায়

সবশেষ আপডেট

উত্তরকাল

বিশ্বকে জানুন বাংলায়

All original content on these pages is fingerprinted and certified by Digiprove
%d bloggers like this: