Loading...
উত্তরকাল > বিস্তারিত > শিল্প ও সাহিত্য > মুহসীন মোসাদ্দেকের গল্প : জলের ভেতর জোছনা

মুহসীন মোসাদ্দেকের গল্প : জলের ভেতর জোছনা

পড়তে পারবেন 6 মিনিটে

সকালটাকে স্নিগ্ধ বলা যাবে না। পরিবেশটা ভারী, বাতাসে পোড়া পোড়া গন্ধ, ধোঁয়া-ধূসর আকাশ— স্নিগ্ধতা গ্রাস করেছে! তবে স্নিগ্ধতা ফিরে আসবে অচিরেই, তার আভাসও ভেসে আসছে বাতাসে!

জিপ গাড়ি থেকে নামলাম চিরচেনা পথটায়। আসতে বেশ কষ্ট হলো। রাস্তাঘাটের চরম বাজে অবস্থা। পুরো দেশটাই এখন একটা ধ্বংসস্তূপ। এই ধ্বংসস্তূপের ভেতর দিয়ে যে ফিরে আসতে পারলাম এটাই বড় কথা। চিরচেনা এ রাস্তাটা বড় অচেনা মনে হচ্ছে আমার। আকাশে কাক-শকুনের ওড়াউড়ি। সময়টা এখন কাক-শকুন-কুকুর-শেয়ালেরই! পুরো দেশটা এখন ওদের বিপুল খাদ্যভাণ্ডার। যেখানে সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে ওদের খাবার। খেয়ে কুলোতেই পারছে না!

রাস্তার পাশের বাড়িগুলোও আমার চেনা। অথচ এখন আশ্চর্য রকমের অচেনা লাগছে! আশ্চর্য রকমের নিস্তব্ধ সব বাসা, যেন কেউ ওদের খুব করে বকে দিয়েছে, বকা খেয়ে তটস্থ হয়ে আছে ওরা! অথচ তটস্থ-সন্ত্রস্ত থাকার দিন ফুরিয়েছে!

এই বাড়িটা, এইতো সেই বাড়িটা— কতদিনের চেনা, কত আপন এই বাড়িটা। অথচ এই বাড়িটাকেও আমার আশ্চর্য রকম অচেনা লাগছে! এই বাড়িটার সামনে নরেনের দোকানে চা খেতে খেতে কতদিন আমি বাড়িটার জানালা-ব্যালকনি কিংবা ছাদের দিকে তাকিয়ে থেকে একটা শরীর কিংবা শরীরের ছায়া খুঁজেছি! এইতো এইখানেই ছিল নরেনের চায়ের দোকান। কিন্তু কই দোকানটা, কই নরেন! দোকানটা নেই বলেই কি বাড়িটাকে এমন অচেনা লাগছে আমার! পরিকল্পনা করেছিলাম, এসেই নরেনের দোকানে এক কাপ চা খাবো, চা খেতে খেতে বাড়িটার দিকে তাকিয়ে থাকবো সেই সেদিনের মতো। কিন্তু তল্পি-তল্পা গুটিয়ে গেছে কোথায় নরেনটা?

নরেনের দোকানটা ঠিক যেখানে ছিল সেখানে দাঁড়িয়ে বাড়িটার দিকে তাকালাম আমি। বাড়িটার ঠিক সামনে মেঠোপথ, তার উল্টোপাশেই ছিল দোকানটা— আমার সারাদিনের ব্যস্ততার কেন্দ্রবিন্দু। নরেন আমার চেয়ে বয়সে বড় ছিল, কিন্তু আমি তাকে নরেন বলে ডাকতাম। মাঝেমধ্যে অবশ্য নরেন দা ডাকতাম। খুব আপন মনে করতো আমাকে। আমরা কত যে গল্প করতাম! কোনো বিষয়ই বাদ থাকতো না আমাদের গল্পে!

খুব শূন্য শূন্য লাগছে আমার। নরেনের দোকানটা যদি অন্তত থাকতো, তাও সান্ত্বনা পাওয়া যেত যে, এখন হয়তো নরেন নেই কিন্তু পরে ঠিক পাওয়া যাবে! অথচ আস্ত দোকানটাই যে নেই!

সবকিছুই কেমন যেন এলোমেলো লাগছে আমার! কোনো উচ্ছ্বাস-উত্তেজনা কাজ করছে না! অথচ আমার এখন অনেক উচ্ছ্বসিত থাকার কথা। তার পরিবর্তে অদ্ভুত শঙ্কা ও ভয় ভয় করছে ভেতরটা! কারণটা যদিও আমি অনুভব করতে পারছি, তবু ভেতরটাকে আশ্বস্ত করতে পারছি না!

বাড়িটার আশেপাশে চোখ বোলাতে বোলাতে দেখি কেউ একজন খুব আয়েশি ভঙ্গিতে মেঠোপথ ধরে এগিয়ে আসছে! আমাকে দেখেই ছুটে আসতে লাগলো, ভালো করে তাকিয়ে দেখি মনসুর চাচা!

মনসুর চাচা আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে জড়িয়ে ধরলো! তারপর মাথার এলোমেলো চুলগুলো আরো এলোমেলো করতে করতে বললো, ‘তুমি আসছো বাপজান! তুমি ফিরে আসছো!’

‘এইতো চাচা, অবশেষে আসতে পারলাম।’ আমি চাচাকে একটু স্থির হতে সময় দিলাম।

বুঝতে পারছেন নিশ্চয়, চাচার এমন উচ্ছ্বাসের কারণ? জি, আমি যুদ্ধ থেকে ফিরে এসেছি। অবশেষে দেশটা স্বাধীন হয়েছে। স্বাধীনতার পতাকা নিয়ে ফিরে এসেছি।

‘তোমারে নিয়ে খুব চিন্তায় ছিলাম! তোমার সাথের অনেকেই চলে আসছে। তোমার খবর নাই!’ চাচা চোখ মুছতে মুছতে বললো! এই ফাঁকে চাচা কেঁদেও ফেলেছে!

‘সবাই কি চাচা ফিরতে পেরেছে! সবাই কি ফিরতে পারবে!’

‘তা সত্য বাপজান!’

‘চাচা, নরেনের কী খবর? ওর দোকানটার কী হলো?’

চাচা একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে বললো, ‘শুধু নরেনের দোকান না বাপজান, এরকম অনেক কিছুই আগের মতোন নাই!’

বুকের ভেতর কিছুটা ধক করে উঠলো! অবশ্য এত বড় যুদ্ধের পর অনেক কিছুই আগের মতো থাকার কথা না! এত নির্যাতন-মৃত্যু-জ্বালাও-পোড়াওয়ের পর সবকিছু আগের মতো প্রত্যাশা করা স্বাভাবিকভাবেই অনর্থক!

‘তুমি বাপজান বাড়ি যাও আগে, আমি আসি!’ চাচা ব্যস্ত হয়ে চলে যেতে চাইলো হঠাৎ! আমি এরপরেই যা জানতে চাইবো তা অনুমান করে এড়িয়ে যাওয়ার জন্যই কি চাচা চলে যেতে চাইছে!

আমি চাচার হাত চেপে ধরি, ‘এত তাড়া কেন চাচা!’

‘বাড়িতে সবাই পথ চেয়ে আছে বাপজান! আগে বাড়ি যাও। বাকি কথা পরে হবে।’ চাচা হাতটা ছাড়িয়ে নেয়ার চেষ্টা করলো। আমি আরো চেপে ধরলাম।

‘চাচা, জোছনাদের কী অবস্থা? চলেন, একটু দেখা করে আসি!’

চাচা এবার হাতটা ছিনিয়ে নিল! তারপর চলতে শুরু করলো! আর তাকালো না পেছনে! কিছু বললোও না!

আমি ধপ করে বসে পড়লাম রাস্তার পাশে! বুকের ভেতরে দুমদুম শব্দ!

আমি যে বাড়িটার সামনে বসে আছি, যে বাড়িটা আমার একসময়ের প্রাণ ছিল, সেটা জোছনাদের বাড়ি। জোছনা আর তার বাবা থাকতো। মা ছিল না, আর কোনো ভাই-বোনও ছিল না! জোছনা খুব চুপচাপ একটা মেয়ে। আমার খুব ভালো লাগতো তাকে। জোছনা তো বটেই এলাকার সবাই-ই জানতো বিষয়টা! জোছনাকে দেখার জন্যই এখানে, নরেনের দোকানে আমার সকাল-দুপুর-সন্ধ্যা কাটতো। জোছনা আমাকে পাত্তা দিত না, আমিও কাছে গিয়ে কথা বলতে পারতাম না! আর জোছনার বাবা আমাকে দু-চোখে দেখতেই পারতো না! প্রায়ই আমার বাবার কাছে নালিশ করে আসতো আর আমি উথাল-পাথাল মার খেতাম! মার খেয়ে আবার নরেনের দোকানে এসে বসতাম!

জোছনা বাড়ির বারান্দায়, ছাদে কিংবা জানালায় আসলেই আমি তাকে দেখতাম! অদ্ভুত ভালোলাগা কাজ করতো ওকে দেখলেই! কী যে একটা মায়া! কাছে যাই না, ছুঁতে পাই না, তবু কত আপন যেন আমার!

জোছনাদের বাড়ির পেছন দিকটায় একটা পুকুর আছে। পুকুরের একটা পাড় বাঁধানো। দেশে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর একদিন ছাদ থেকে একটা কাগজ ছুড়ে মারে জোছনা! আমি মুহূর্তের জন্য হতভম্ব হয়ে পড়ি! এমন দৃশ্য আমি কখনো কল্পনা করি নি!

কাগজটা তুলে দেখি তাতে একটা আহ্বান— ‘বিকেলে পুকুর পাড়ে আসবেন…’

আমি অনেক সংকোচ এবং শঙ্কায় হাজির হই পুকুর পাড়ে! জোছনা আগে থেকেই ছিল সেখানে। তাকে খুব স্বতঃস্ফূর্তই লাগছিল। মনে হচ্ছিল সে প্রস্তুতি নিয়ে এসেছে।

আমি পুকুর পাড়ে একটা নারিকেল গাছে হেলান দিয়ে দাঁড়াই। কোনো কথা বলতে পারি না!

জোছনা কিছুটা উত্তেজিত ভঙ্গিতে বলে, ‘আপনি যা করে বেড়াচ্ছেন, তা কোনো বিবেচনায় কি ঠিক?’

আমি জবাব দিই না! জোছনা অপেক্ষাও করে না, ‘দেশের এখন এই অবস্থা, অনেকে এরই মধ্যে যুদ্ধে চলে গেছে আর আপনি এখানে বসে বসে সময় নষ্ট করছেন!’

আমি বিচলিত হয়ে বললাম, ‘না, না, আমি যুদ্ধে-টুদ্ধে যেতে পারবো না!’

‘তো, বসে বসে আমার চেহারা দেখবেন!’ জোছনা ক্ষেপে গেল!

জোছনাকে আমি চুপচাপ শান্ত মেয়ে বলে জানতাম! তার এমন ক্ষিপ্ত রূপ দেখে ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলাম! একটু সামলে নিতেই আমার মাথায় হঠাৎ একটা বুদ্ধি খেললো, ‘আচ্ছা ধরো, আমি যুদ্ধ করে ফিরে এলাম, দেশ স্বাধীন হলো, আমি যদি তোমার কাছে কিছু চাই, তুমি কি আমাকে দেবে?’

‘আপনাকে কাপুরুষ ভেবেছিলাম, কিন্তু আপনি যে মস্ত একটা স্বার্থপরও সেটা ভাবি নি!’

জোছনা মুখ ফিরিয়ে নেয়! আমি সাহস করে এগিয়ে যাই, ‘আমাকে তুমি এত অপছন্দ করো কেন, জোছনা? কাউকে ভালোলাগা কি অন্যায়!’

জোছনা একটু কোমল হয়, ‘আমি আপনাকে পছন্দ করি কিনা জানি না, তবে অপছন্দ করি না!’

আমি জোছনার মুখোমুখি হয়ে তার হাত ধরে ফেলি, ‘জোছনা, আমি যুদ্ধ থেকে ফিরলে তুমি আমার হবে, এইটুকু কথা দিতে পারো না!’

জোছনা কাঁপতে শুরু করে, হাত ছাড়িয়ে নিতে চায়, আমি আরো চেপে ধরি। জোছনা চোখ বন্ধ করে মাথা নিচু করে ফেলে! খুব নরম স্বরে বলে, ‘হাতটা ছেড়ে দিন।’

আমি জোছনার হাত ছেড়ে দিই। জোছনার হাত ধরে আমি নিজেও কাঁপছিলাম! জোছনার হাত অবাক করা শীতল! কাঁপনটা মনে হয় এজন্যই!

‘তুমি শুধু বলো জোছনা, আমি এখনই যুদ্ধে চলে যাবো!’

জোছনা মাথা নিচু করেই বলে, ‘এমন কোনো শর্তে যুদ্ধে যাওয়ার মানে নেই! দেশের এখন আপনাদের দরকার! এখানে কোনো শর্ত প্রযোজ্য নয়! সুযোগ পেলে আমি নিজেও যুদ্ধে চলে যাবো!’

বলার মতো ভাষা খুঁজতে গিয়ে আমার নাজেহাল অবস্থা! অবাক করলো জোছনার সরল অথচ গভীর উক্তি! আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকলাম। জোছনা আগের মতো করেই বললো, ‘দেখুন, এ যুদ্ধ কতকাল চলবে, যুদ্ধের পর আমরা কে কী অবস্থায় থাকবো, আদৌ থাকবো কিনা তা আমরা এখনই বলতে পারি না!’

আমার শরীর শিরশির করে উঠলো! জোছনার কথা শেষ হয় নি, সে আরো কিছু বলতে চায়, আমি তাই কিছু বলি না, শোনার অপেক্ষায় থাকি।

‘এমন হতে পারে, কোনো একদিন যুদ্ধ শেষে ফিরে এসে আপনি আমাকে পেলেন না—’

জোছনাকে থামিয়ে দিই আমি, ‘এ কারণেই আমি যেতে চাই না কোথাও! তোমার পাশেই থাকতে চাই—’

‘কী করবেন থেকে?’ ক্ষেপে গিয়ে বিস্ফারিত হয়ে ওঠে জোছনা!

‘তোমাকে আগলে রাখবো!’ মিনমিন করে বলি আমি!

‘কী দিয়ে আগলে রাখবেন! মিলিটারিরা যেভাবে মানুষ মারছে, ধরে নিয়ে যাচ্ছে, এখানেও যদি তেমন কিছু হয়— কী দিয়ে রক্ষা করবেন আপনি! কী আছে আপনার!’

আমি চুপ হয়ে যাই! সত্যিই আমার তেমন কিছু নেই!

জোছনা আমার কাছ থেকে কোনো কিছু শোনার অপেক্ষা করলো না! সে হেঁটে চলে গেল। কিছুটা গিয়ে পেছনে না ফিরেই শুধু বললো, ‘কোনো কাপুরুষ কখনো যেন আমার সামনে না আসে!’

আমি সেভাবেই দাঁড়িয়ে থাকলাম কিছুক্ষণ! জোছনার কথা আমার কাছে পরিষ্কার। কিন্তু আমি ভাবি অন্য কথা— আমার বাবা ভীতু মানুষ, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে সে আর ঘর থেকে বের হয় না সহজে। আমার মা নরম মনের মানুষ! কোনোভাবেই তারা আমাকে ছাড়বে না যুদ্ধে যাওয়ার জন্য! আমাকে তাই পালাতে হবে! এবং আমি পালিয়ে গেলাম, পুকুরঘাট থেকে সোজা, বাসায় আর পা দিই নি!

মনসুর চাচা আমাকে নিশ্চল করে দিয়ে গেল! আমি আর উঠে দাঁড়াতে পারছি না! রক্তের ভেতরে আশঙ্কার কণিকা ছুটে বেড়াচ্ছে— জোছনার বাড়ি গিয়ে আমি কী দেখবো! কী জানবো!

বসেই থাকলাম কিছুক্ষণ।

বেলা পড়ে এলে আশঙ্কার বোঝা মাথায় নিয়ে আমি এগিয়ে যাই জোছনার বাড়ির দিকে। বাড়িটা দোতলা। জোছনারা দোতলায় থাকে বা থাকতো! নিচতলায় ভাড়া থাকতো এক পরিবার। দেখে মনে হচ্ছে সেখানে এখন কেউ নেই। দোতলায় এসে দরজায় টোকা দিলাম বেশ কয়বার। কোনো সাড়া পাওয়া যায় না ভেতর থেকে! আশ্চর্য নীরব সবকিছু! শুধু আমার বুকের ভেতর থেকে দুমদুম শব্দ শোনা যাচ্ছে স্পষ্ট।

আরো কয়বার টোকা দেয়ার পর কেউ একজন দরজা খুলে দেয়, কিন্তু কে এলো না এলো সে খেয়াল বা স্বাগত জানানোর কোনো উদ্যোগ দেখা গেল না! দরজা খুলে দিয়েই ভেতরে চলে গেল লোকটা। পিছু পিছু আমিও ঢুকে গেলাম ভেতরে। লোকটা জোছনার বাবা। একটা ঘরে এককোণায় গিয়ে বসে পড়লো। আমার দিকে তাকালোও না! আমি জোছনার বাবার সামনে গিয়ে বসলাম। জোছনার বাবা তবু তাকালো না! ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলো পাশের জানালা দিয়ে বাইরের আকাশে!

জোছনার দেখা মিললো না, কোনো আওয়াজও না! জিজ্ঞেসও করলাম না কিছু। কারণ আমি বুঝে গেছি জিজ্ঞেস করলেও কোনো উত্তর আসবে না! আমি এ ঘর ও ঘর ঘুরে বেড়ালাম, জোছনার বাবা কিছু বললো না, সেভাবেই জানালা দিয়ে বাইরে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকলো! জোছনার ঘরে তার শাড়ি, দেয়ালে টানানো বাঁধাই করা ছবি, বালিশ, চিরুনি, আয়নায় গুঁজে রাখা কপালের টিপ, ডায়েরিতে হাত বোলাতে বোলাতে বুকের ভেতর হাহাকারের স্রোতে বইতে লাগলে চুপচাপ বের হয়ে এলাম। আমাকে বাসায় যেতে হবে! সেখানেইবা কী অপেক্ষা করছে কে জানে!

সন্ধ্যা নেমেছে! ঘোর অন্ধকার সন্ধ্যা! এমন অন্ধকার সন্ধ্যা আমি কখনো দেখি নি! অথচ আকাশে পরিপূর্ণ রূপালি চাঁদ! জোছনাদের পুকুরে চাঁদ ভাসছে। টলমল করছে চাঁদটা! পুকুরপাড়ে বসে জোছনার কথা ভাবতেই এলোমেলো লাগে সব! চোখের সামনে আরো অন্ধকার নেমে আসে!

এ পুকুরেই ডুবেছে জোছনা! সেদিনও ছিল পূর্ণিমা রাত, আজকের মতো! তবে কোনো এক অজানা কারণে জোছনার নিশ্চল দেহটা ভেসে ওঠে নি, তলিয়ে গেছে একেবারে। কেউ জাল ফেলে তোলার চেষ্টা করে নি! চেষ্টা করার মতো কেউ ছিলও না! পুকুরপাড়ে পড়ে ছিল তার পায়ের নূপুর!

জোছনাকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল ওরা! আরো অনেককেই তুলে নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু কেউ আর ফিরে আসতে পারে নি! কেবল জোছনাকে ফিরিয়ে দিয়েছিল! অন্তঃসত্ত্বা জোছনাকে!

আমি কাউকে জানিয়ে যুদ্ধে যাইনি, কিন্তু বেশ কিছুদিন আমার অনুপস্থিতিতে সবাই বুঝে গিয়েছিল! তার ফলস্বরূপ আমার বাবা-মাকে রক্তাক্ত করে ওরা তুলে নিয়ে গিয়েছিল আমার ছোট ভাইকে! তাকে আর পাওয়া যায় নি, দেহটাও না! আমার বাবা-মা সেই থেকে পাথর-মানব! আমি ফিরে এসেও সে পাথর তেমন গলাতে পারি নি!

এমন হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ ওলোটপালটের পর মিললো স্বাধীনতা! এ স্বাধীনতা মানে মুক্তি। আমার নিজের ভেতরেও একটা যুদ্ধ চলছে! এ যুদ্ধে ভেতরে সব তোলপাড় করছে! যুদ্ধটা শেষ করে স্বাধীন হতে ইচ্ছে করছে, মুক্ত হতে ইচ্ছে করছে আমার!

জোছনার ঘরে আমি একটা চিরকুট পেয়েছি। কাউকে উদ্দেশ করে নি, কিন্তু আসলে আমাকেই উদ্দেশ করে লেখা: ‘আমাকে খুঁজতে ইচ্ছে হলে পুকুরে জোছনা ভাসলে জলের ভেতরে খুঁজবেন…’

পুকুরে আজ জোছনা ভাসছে! আমি নেমে পড়লাম জোছনার খোঁজে, জলের ভেতরে…

.

অলংকরণ : রাজিব রায়

সবশেষ আপডেট

উত্তরকাল

বিশ্বকে জানুন বাংলায়

All original content on these pages is fingerprinted and certified by Digiprove
%d bloggers like this: