।। নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী ।।

পুঠিয়ার শিলমাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাজ্জাদ হোসেন মুকুল গেলো প্রায় এক সপ্তাহ ধরে উদ্বিগ্ন। সরকারি নির্দেশনা লঙ্ঘন করে এক-দুজন করে প্রায় প্রতিদিনই তার এলাকায় ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর থেকে আসছেন মানুষ।

তিনি বলেন, ‘আমরা প্রথমদিকে বেশ ভালোই ছিলাম। কিন্তু এই গত কয়েকদিন ধরে যে হারে মানুষ ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ আর গাজীপুর থেকে আসছে, তা নিয়ে আমরা খুবই চিন্তিত। আমার ইউনিয়নে আমরা এমন লোকদের তালিকা করে দেখেছি, এখন (রোববার) পর্যন্ত এর সংখ্য ৫১। তাদের সবার নাম ঠিকানা আমরা প্রশাসনকে দিচ্ছি।’

তিনি জানান, পুঠিয়া উপজেলার বেশিরভাগ ইউনিয়নের চিত্রই কমবেশি এমন। প্রতিটি ইউনিয়নেই গত এক সপ্তাহে বাইরে থেকে অনেক মানুষ এসেছেন।

মুকুল বলেন, ‘আমার মাথায় ঢোকে না সরকারি নির্দেশ লঙ্ঘন করে রাস্তায় রাস্তায় এতোসব চেকপোস্ট পার হয়ে এরা আসছে কীভাবে?’

শিলমাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের এই বিস্ময়জড়ানো প্রশ্নের জবাব মিলতে পারে রোববার পুঠিয়া উপজেলারই আরেক ইউনিয়নে করোনা শনাক্ত হওয়া ৪৫ বছর বয়সী এক ব্যক্তির ঘটনা থেকে।

আরও পড়ুন: রাজশাহীতে প্রথম করোনা শনাক্ত ঢাকা-ফেরৎ রোগীর শরীরে

স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সংক্রমিত ব্যক্তি ঢাকার শ্যামলীতে একটি দর্জির দোকানে কাজ করেন। গণপরিবহন বন্ধ হয়ে যাবার পর থেকে তিনি বাড়িতে ফেরার চেষ্টা শুরু করেন। এসময় তিনি জানতে পারেন, পুঠিয়ার জিউপাড়ায় তার বাড়ির পাশের এক ট্রাকচালক ঢাকা থেকে পণ্য নিয়ে আসবে। ৮ এপ্রিল রাতে সেই ট্রাকচালকের সহায়তায় তারই ট্রাকে চেপে বাড়ি ফেরেন ওই ব্যক্তি।

অর্থাৎ পণ্যবাহী যান চলাচলে কোনোরকম বাধা না থাকার সুযোগ নিয়ে দিব্যি করোনা সংক্রমিত এই রোগী চলে এসেছেন বাড়িতে।

পুঠিয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান জিএম হিরা বাচ্চু জানান, গত কয়েকদিন ধরে তাদের এলাকায় মাছ ও সবজিবাহী ট্রাকে করে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ থেকে মানুষ এসেছেন নির্বিঘ্নে। তাদেরকে কোথাও কোনো তল্লাশির মুখেও পড়তে হয়নি। পরে খোঁজ পেয়ে স্থানীয় প্রশাসনসহ তারা বাড়িতে রাখার উদ্যোগ নিচ্ছেন।

বাচ্চু বলেন, ‘বারবার বলার পরেও বাইরে থেকে আসা অনেকে হাটবাজারেও গিয়েছে বলে খবর পেয়েছি আমরা। এদের আসা থামানো আর যারা এসেছে তাদের সবাইকে বাসায় না রাখা গেলে আগামীতে পরিস্থিতি আমাদের জন্য খুবই খারাপ হতে পারে। এদের সবাইকে পরীক্ষাও করাতে হবে দ্রুত।’

রাজশাহীর পুলিশ সুপার মো. শহিদুল্লাহ’র দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি জানান, পণ্য পরিবহন ও জরুরি সেবাজনিত যানবাহন চলাচল করতে স্বাভাবিক কারণেই পুলিশ কোনো বাধা দেয় না। আর সেই সুযোগ নিয়েই নির্দেশনা লঙ্ঘন করে মানুষ আসছে বলে তারা খবর পেয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘ঢাকা থেকে রাজশাহী পথ কিন্তু কম না। এই পথে কতোগুলো চেকপোস্ট খেয়াল করেন। তারপরেও তারা কখনও ট্রাকের শ্রমিক সেজে, কখনও ভ্যানে লুকিয়ে, আবার কখনও বা অ্যাম্বুলেন্সে রোগী সেজে চলে আসছে। সঙ্গত কারণেই প্রথমদিকে এসব যানবাহন তল্লাশি করিনি আমরা। তবে কয়েকদিন ধরে তাদের চেকপোস্টে এ ধরনের যানবাহনও তল্লাশি করে প্রবেশ করানো হচ্ছে।’

হাইওয়ে পুলিশের এক কর্মকর্তা নাম পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে জানান, জেলার চেকপোস্টে একটু কড়াকড়ি করলেই কৌশল বদল করে মানুষ আসছে।

সাম্প্রতিক ঘটনার দৃষ্টান্ত দিয়ে তিনি বলেন, ‘চেকপোস্টের আগেই ফাঁকা জায়গায় ওরা নেমে যাচ্ছে। কদিন আগে এরকম দুজনকে আমরা ধরেছিলাম নাটোর জেলার সীমানায়। পরে তাদেরকে স্থানীয় প্রশাসনের হাতে তুলে দেয়া হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘কেউ কেউ আবার ভেঙে ভেঙে চলে আসছে। তারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হাইওয়েও ব্যবহার করছে না। এদেরকে ধরা আরও মুশকিল হয়ে যাচ্ছে।’

পুলিশ সুপার মো. শহিদুল্লাহ বলেন, ‘আমরা মানুষকে বোঝাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। কিন্তু তারপরেও অনেকেই কথা শুনছেন না। নিজেদের বিপদ বুঝছেন না। তারা না বুঝলে, সবাই সচেতন না হলে পরিস্থিতি ভালো রাখা যাবে না।’

রাজশাহী মহানগর পুলিশ (আরএমপি) কমিশনার হুমায়ূন কবির জানান, তারা শুরু থেকেই নানা কৌশলে নগরীতে বাইরে থেকে মানুষের আসার সংখ্যা যথাসম্ভব কমানোর চেষ্টা করেছেন। সে কারণে পরিস্থিতি অপেক্ষাকৃত ভালো বিবেচিত হয়েছে অনেকদিন।

তিনি বলেন, ‘গত কয়েকদিনে আমরা আমাদের নগরীর চেকপোস্টগুলো আরও কঠোর করেছি। প্রয়োজনে আরও কড়াকড়ি আরোপ করা হবে। অহেতুক কাউকে নগরীতে ঢুকতে বা বেরুতে আমরা কোনোভাবেই দেবো না। এটা মানুষের প্রয়োজনে, নগরবাসীর ভালোর জন্য। আশা করি মানুষ আমাদের সহযোগিতা করবেন।’

সম্প্রতি নগরীতে ফরিদপুর থেকে এক ব্যক্তি আসার পর খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে তার বাড়ি লকডাউন করে দিয়ে আসে।

গত কয়েকদিন ধরেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও আলোচিত হচ্ছে বিষয়টি। অনেকেই প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। সতর্কও করেছেন কেউ কেউ।

তাদেরই একজন রাজশাহীর সংবাদকর্মী সৌরভ হাবিব। রোববার পুঠিয়ায় বিভাগ ও জেলার প্রথম রোগী শনাক্তের পর তিনি ফেসবুকে লিখেছেন, ‘দুদিন আগে ফেসবুকে আশংকার কথা বলেছিলাম। নারায়নগঞ্জ ও ঢাকা থেকে রাতের আঁধারে কয়েকদিন ধরেই ট্রাকে করে ফিরছিলেন গার্মেন্টসকর্মীরা। তাদেরই একজন এই রোগী।’

তিনি শঙ্কা প্রকাশ করে লিখেছেন, ‘এমন অসংখ্য মানুষ ঢাকা ও নারায়নগঞ্জ থেকে রাজশাহীতে ফিরেছেন। তাদের নিয়েই এখন আতংক দেখা দিয়েছে। ঢাকা ও নারায়নগঞ্জ ফেরতদের বিষয়ে দ্রুত প্রশাসনকে তথ্য দিয়ে তাদের হোম কোয়ারেন্টিন নিশ্চিত করুন। আল্লাহ চাইলে আমাদের রক্ষা করবেন।’

প্রশাসনকে এখনই পদক্ষেপ নেয়ার দাবিও তুলেছেন অনেকে। কামরুল হাসান সুমন নামের একজন ফেসবুক ব্যবহারকারী লিখেছেন, ‘রাতের আঁধারে বিশেষ করে অ্যাম্বুলেন্স ও কাভার্ড ভ্যানে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ সহ বিভিন্ন জেলা থেকে রাজশাহীতে লোক প্রবেশ করছে। সাধারনত এ বাহন গুলি পুলিশ প্রশাসন চেক করে না মানবিক ও পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করার স্বার্থে। তবে এভাবে লোক ঢুকতে থাকলে রাজশাহীর পরিস্থিতি আরও ভয়ঙ্কর হবে। জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের কাছে উদাত্ত আহ্বান রাজশাহীতে ঢোকার প্রবেশপথগুলোতে পুলিশ তল্লাশি চৌকি জোরদার করা হোক এবং অ্যাম্বুলেন্স ও কাভার্ড ভ্যানগুলো তল্লাশির আওতাভুক্ত করা হোক।’

এর আগে গত ৮ এপ্রিল রাজশাহীর জেলা প্রশাসক তার ফেসবুক পেজে নিজে একটি বার্তা দিয়েছিলেন। সেখানে তিনি লিখেছিলেন, ‘যাঁরা ঢাকা বা নারায়ণগঞ্জে আছেন, দয়া করে এখন রাজশাহী আসবেন না। নিজে বাঁচুন, আপনার আপনজনকেও বাঁচতে দিন।’

তার সতর্ক সংকেত উপেক্ষা করে আসা একজনের শরীরে রোববার করোনা সংক্রমন শনাক্তের পর জেলা প্রশাসক হামিদুল হকের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টাটা করছি। কিন্তু মানুষকে সচেতন হতে হবে। আমাদের সহায়তা করতে হবে। ভালো থাকতে হলে এর কোনো বিকল্প নেই।’

তিনি জানান, বাইরে থেকে আসা ঠেকাতে আরও কঠোর হওয়ার পাশাপাশি এখন প্রতিটি এলাকা থেকে তারা আগতদের তালিকা সংগ্রহ শুরু করেছেন। সে অনুযায়ী তারা প্রত্যেকের সঙ্গে যোগাযোগ করে হোম কোয়ারেন্টিন নিশ্চিত করার ব্যবস্থা নিচ্ছেন। প্রয়োজন অনুসারে তাদের নমুনা পরীক্ষাও করা হবে।