Loading...
উত্তরকাল > বিস্তারিত > বিদেশ > করোনায় ট্রাম্পের ‘হুমকিবাজি’

করোনায় ট্রাম্পের ‘হুমকিবাজি’

পড়তে পারবেন 4 মিনিটে

।। বার্তাকক্ষ প্রতিবেদন ।।

করোনাভাইরাস সংক্রমন বেড়েই চলেছে মার্কিন মুলুকে। নিজ দেশে এসময়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নানা কথাবার্তা ও পদক্ষেপ নিয়ে সমালোচনাও কম হচ্ছে না। এবার ট্রাম্পের দেয়া দুটি হুমকি আলোচিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে।

প্রথম হুমকি দেয়া হয় এশিয়ায় চীনকে মোকাবেলায় যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অংশীদার হিসেবে পরিচিত ভারতকে। ট্রাম্প ‘ম্যালেরিয়া-প্রতিরোধী ওষুধ হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন তার দেশে রফতানি না-করা হলে ভারতকে তার ফল ভুগতে হবে’ বলে হুমকি দেন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসির সংবাদে বলা হয়, এই হুমকি দেয়ার পর ভারত নিজ দেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশীদের চাহিদা মিটিয়ে ওষুধ রফতানির সিদ্ধান্ত নেয়।

ট্রাম্পের দ্বিতীয় হুমটিটি বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থাকে (হু) দেয়া। সংস্থাটি চীনের পক্ষে কাজ করছে ও তথ্য গোপন করেছে বলে অভিযোগ তুলে মঙ্গলবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট হুমকি দিয়েছেন, তারা হু-কে অর্থসহায়তা পুরোপুরি বন্ধ করে দেবেন।

কদিন আগেই যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে করোনাভাইরাস প্রতিরোধে ব্যবহৃত মাস্ক ‘ছিনতাই’ করার অভিযোগ তুলেছে জার্মানি ও কানাডা। ইউরোপের আরও কয়েকটি দেশ একই ঘটনার শিকার হয়ে ট্রাম্পের সমালোচনায় মুখর হয়।

‘ওষুধ না পাঠালে পাল্টা আঘাত’, ভারতকে হুমকি

বিবিসি জানায়, ম্যালেরিয়া-প্রতিরোধী ওষুধ হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন আমেরিকাকে রফতানি না-করা হলে ভারতকে তার ফল ভুগতে হবে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নজিরবিহীন ভাষায় এই হুঁশিয়ারি দেওয়ার কয়েক ঘন্টার মধ্যেই ভারত ওই ওষুধ রফতানির ওপর নিষেধাজ্ঞা শর্তসাপেক্ষে তুলে নিয়েছে।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, করোনাভাইরাসের হানায় যে সব দেশগুলির অবস্থা সবচেয়ে খারাপ তাদেরকে এরকম ২৬টি ড্রাগ সরবরাহ করা হবে – তবে সেটা করা হবে ভারত ও তার প্রতিবেশী দেশগুলোর নিজস্ব প্রয়োজন মিটিয়েই।

যেহেতু হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন এখন ভারতেও করোনাভাইরাস প্রতিরোধে ব্যাপকভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে, তাই সেই ওষুধটির রফতানিতে ভারত নিজেও দ্বিধায় ভুগছে বলে তারা অনেকেই মনে করছেন।

বস্তুত ম্যালেরিয়া প্রতিরোধে কার্যকরী ওষুধ বলে পরিচিত হাইড্রক্সিক্লোরোকুইনের চাহিদা সারা দুনিয়া জুড়েই হঠাৎ করে সাঙ্ঘাতিক বেড়ে গেছে – কারণ করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসাতেও কোনও কোনও ক্ষেত্রে এই ওষুধটি বেশ ভাল কাজ করছে বলে ডাক্তাররা জানিয়েছেন।

এই ওষুধটি ভারতেও বিপুল পরিমাণে কাজে লাগতে পারে, এই বিবেচনায় বিশ্বের বৃহত্তম জেনেরিক ড্রাগ রফতানিকারী এই দেশটি গত মাসে আচমকাই হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন-সহ মোট ২৬টি ড্রাগ রফতানির ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করে।

এতে প্রচন্ড চটে যান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, যিনি গত বেশ কিছুদিন ধরে করোনাভাইরাসের চিকিৎসায় হাইড্রক্সিক্লোরোকুইনের হয়ে জোরালো ওকালতি করে আসছেন।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার সোমবারের ব্রিফিংয়ে বলেন, “ভারত যদি এই নিষেধাজ্ঞা না-তোলে তাহলে আমি অবাকই হব, কারণ আমেরিকার সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ভাল। তারা বহু বছর ধরে আমাদের কাছ থেকে বাণিজ্য সুবিধা নিয়েছে।”

“আমাদের ওষুধের জোগান যাতে পাঠানো হয়, সেটা বলতে আমি রবিবার সকালে প্রধানমন্ত্রী মোদীর সঙ্গে কথাও বলেছি। যদি তারা না-পাঠায় – তাহলে ঠিক আছে, কিন্তু আমরাও সে ক্ষেত্রে পাল্টা আঘাত করব। কেন করব না?”

কয়েক সপ্তাহ আগেই ভারতের দুটি বৃহৎ ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি, ইপকা ল্যাবরেটরিজ ও জাইডাস ক্যাডিলা আমেরিকার কাছ থেকে হাইড্রক্সিক্লোরোকুইনের বিপুল পরিমাণ অর্ডার পেয়েছিল।

ভারতের নিষেধাজ্ঞায় সেই চালান অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ক্ষুব্ধ ছিলেন ঠিকই, কিন্তু তিনি যে এই ভাষায় দিল্লিকে হুমকি দেবেন কূটনৈতিক মহলও তা ভাবতে পারেনি।

হু-কে টাকা দেয়া বন্ধ করবো’, হুমকি ট্রাম্পের

রয়টার্স জানিয়েছে, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ে তাদের সতর্ক করেনি বলে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার সমালোচনা করেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। মঙ্গলবার তিনি সংস্থাটির বিরুদ্ধে ভুল তথ্য দেয়ার অভিযোগ করে দাবি করেন, ‘হু চীনের হয়ে কাজ করছে।’

ট্রাম্প বলেন, “হু-কে প্রচুর অর্থ সাহায্য করে আমেরিকা। কিন্তু দেশে যখন ভ্রমণ সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলাম করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে, তারা আমার সমালোচনা করেছিল। আমার এই কাজকে সমর্থন করেনি।” তাঁর আরও মন্তব্য, “অনেক ভুল বার্তা দিয়েছে হু। অনেক আগে থেকে তারা সব কিছু জানত, কিন্তু সেটা জানায়নি।”

মঙ্গলবার হোয়াইট হাউসে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে ট্রাম্প জানান, বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থাকে অর্থ দেয়া বন্ধ করবেন তিনি।

মাস্ক ‘ছিনতাই’

জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়েচেভেলে জানায়, করোনা ভাইরাসের ভয়াবহ সংক্রমণে বিশ্বের প্রায় সব দেশের চিকিৎসা সুরক্ষা পণ্যেই টান পড়েছে৷ কিন্তু স্বাস্থ্যসেবায় প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে অ্যামেরিকা ‘দস্যুতা’ করছে বলে অভিযোগ করেছে জার্মানি৷

এসব মাস্কের দাম আগেই পরিশোধ করে দেয়া হয়েছে৷ কিন্তু তারপরও মার্কিন কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে সেগুলো জব্দ করার অভিযোগ এনেছে বার্লিন৷ এমন কর্মকাণ্ডকে ‘আধুনিক যুগের দস্যুতা’ বলেও প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন জার্মান কর্মকর্তারা৷

বার্লিনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রেয়াস গাইসেল বলেছেন, বার্লিনের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হওয়া দুই লাখ মাস্কের একটি চালান ব্যাংককে আটকে দিয়েছে মার্কিন কর্তৃপক্ষ৷ করোনা সংকটের মধ্যেও কাজ চালিয়ে যাওয়া বার্লিন রাজ্য পুলিশ সদস্যদের জন্য এফএফপি-টু ক্লাসের এইসব মাস্ক অর্ডার দেয়া হয়েছিল৷

রাজনৈতিক দল এসপিডির সংসদীয় গ্রুপের চেয়ারম্যান রোল্ফ ম্যুৎসেনিশ মাস্ক ‘জব্দের’ ঘটনাকে ‘বেআইনী’ আখ্যা দিয়ে এর ব্যাখ্যা দাবি করেছেন৷ ডয়চে ম্যুৎসেনিশ ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘সুরক্ষা মাস্ক সংগ্রহ করার সময় অবৈধ পন্থা অবলম্বন করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়৷ অংশীদারদের ক্ষেত্রেও বিশেষভাবে এ কথা সত্যি, এমনকি তাদের নিজেদের সরবরাহে সংকট থাকলেও৷ যদি যা শোনা যাচ্ছে তা সত্যি হয়, ফেডারেল সরকারের অবশ্যই উচিত হবে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া৷”

গাইসেল জানিয়েছেন বার্লিন এই মাস্কগুলো একটি মার্কিন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কিনেছে৷ তবে জার্মানির টাগেসশ্পিগেল পত্রিকা জানিয়েছে এগুলো উৎপাদন করা হয়েছে চীনে৷ গাইসেলও ফেডারেল সরকারকে আহ্বান জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে চলতে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ প্রয়োগের৷

অ্যামেরিকান মাস্ক প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান থ্রিএম অবশ্য জার্মানির এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে৷ জার্মান বার্তা সংস্থা ডিপিএকে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, এমন কোনো ঘটনা ঘটেছে বলে তাদের জানা নেই৷

ফ্রান্স এবং ক্যানাডাও তীব্র সমালোচনা করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এমন কর্মকাণ্ডের৷ ফ্রান্সের সবচেয়ে বেশি করোনা আক্রান্ত অঞ্চল ইল দ্য ফঁস এর প্রেসিডেন্ট ভালেরি পেক্রোঁস বার্তা সংস্থা এএফপিকে জানিয়েছেন, শেষ মুহূর্তে বেশি দাম দিয়ে ফ্রান্সের জন্য প্রস্তুত করা মাস্ক যুক্তরাষ্ট্র কিনে নিয়েছে৷ তিনি বলেন, ‘‘অ্যামেরিকানরা অনেক বেশি দাম দিচ্ছে, ফলে পৃথিবীর এই দুর্দশার সময়েও কেউ কেউ বেশি টাকা কামানোর লোভ সামলাতে পারছে না৷”

ক্যানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোও একই ধরনের ঘটনায় ‘উদ্বেগ’ প্রকাশ করেছেন৷ ক্যানাডার অর্ডার করা মাস্ক এসে পৌঁছেছে, তবে তা অর্ডার দেয়া সংখ্যার তুলনায় অনেক কম৷ তিনি অভিযোগ করেন, ‘বেশি দাম’ দিয়ে ‘কেউ একজন’ বাকি মাস্ক কিনে নিয়ে গেছে৷ তিনি বলেন, ‘‘আমরা বুঝতে পারছি অ্যামেরিকার প্রয়োজন অনেক বেশি, কিন্তু ক্যানাডারও একই অবস্থা৷ ফলে আমাদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে৷”

করোনা সংক্রমণের ফলে বেশিরভাগ দেশই লাখ লাখ মাস্কের প্রয়োজন নিজেদের উৎপাদন দিয়ে মেটাতে পারছে না৷ ফলে মাস্ক ও অন্যান্য মেডিক্যাল সুরক্ষা সরঞ্জামের জন্য বেশিরভাগ দেশকেই চীন ও এশিয়ার অন্যান্য দেশের শরণাপন্ন হতে হয়েছে৷

ট্রাম্পকে ‘অবিবেচক-অনুভূতিহীন ভাঁড়’ বললেন চমস্কি

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা জানায়, সম্প্রতি ক্রোয়েশিয়ার দার্শনিক ও লেখক সার্কো হর্ভাটের কাছে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন বুদ্ধিজীবী নোম চমস্কি কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্পের।

তিনি বলেন, ‘করোনাভাইরাস মহামারি ঠেকানো যেত, এটি ঠেকানোর জন্য পর্যাপ্ত তথ্য ছিল। আসলে ২০১৯ সালের অক্টোবরে, এ ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের ঠিক আগে, যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপকভাবে ধারণা হয়েছিল যে এটা মহামারি আকারে ছড়াতে পারে।’ চমস্কি বলেন, এর মোকাবিলায় আসলে কিছুই করা হয়নি। ভঙ্গুর রাজনৈতিক ব্যবস্থা, যা আসন্ন বিপদের কথা জানতো, তাদের অবহেলার কারণেই করোনা সংকট আরও জটিল হয়ে পড়েছে।

সাক্ষাৎকারে চমস্কি বলেন, ‘৩১ ডিসেম্বর চীনারা নিউমোনিয়া টাইপের একটি রোগের বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে তথ্য দিয়েছিল। সপ্তাহ খানেক পর কিছু চীনা বিজ্ঞানী এটিকে করোনাভাইরাস হিসেবে চিহ্নিত করেন। এরপর তারা এ বিষয়ে বিশ্বকে একের পর এক তথ্য দিতে থাকেন। ওই সময়ে কিছু ভাইরোলজিস্টসহ অন্যরা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদনের জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন। তারা করোনাভাইরাস সম্পর্কে অবগত ছিলেন। তারা এটাও জানতেন যে সামনে এই ভাইরাসকে মোকাবিলা করতে হবে।’ চমস্কির প্রশ্ন: কোনও পদক্ষেপ কি নেওয়া হয়েছিল? 

‘ট্রাম্প একদিন বললেন, এটা কোনও ঘটনাই না। একেবারে সাধারণ ফ্লুর মতো। একদিনের মাথায় তার বক্তব্য, এখন ভয়াবহ সংকটের সময় এবং আমি এসবই জানতাম। এর পরের দিনই তিনি আবার বলেন, আমাদের সবাইকে সবার কাজে ফিরে যেতে হবে। কারণ, আমার নির্বাচনে জিততে হবে।’ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ‘অবিবেচক-অনুভূতিহীন ভাঁড়’’ আখ্যা দিয়ে চমস্কি বলেন, ‘আমরা একটা বিপর্যয়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দৌড়াচ্ছি। মানব জাতির ইতিহাসে এখন পর্যন্ত এর চেয়ে বাজে সময় আর আসেনি।’ তিনি আরও বলেন, ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গরা এই প্রতিযোগিতায় নেতৃত্ব দিয়ে পরিস্থিতি আরও রসাতলে নিয়ে যাবে। এমনকি আমরা বিশাল এক হুমকির মুখে পড়তে যাচ্ছি। একটি হচ্ছে নিউক্লিয়ার যুদ্ধ, অন্যটি বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি।’

চমস্কি মনে করেন, করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে। তবে এই দুই  হুমকির ক্ষেত্রে পরিস্থিতি উত্তরণের সুযোগ থাকবে না। সব শেষ হয়ে যাবে।

সবশেষ আপডেট

উত্তরকাল

বিশ্বকে জানুন বাংলায়

All original content on these pages is fingerprinted and certified by Digiprove
%d bloggers like this: