।। বিশেষ প্রতিনিধি, রাজশাহী ।।

“আমরা মনে হয় দেশের প্রথম শহর, যারা করোনাভাইরাস নিয়ে সবার আগে সবচেয়ে বেশি তৎপরতা দেখিয়েছি। সেটা কোয়ারেন্টিন বা আইসোলেশন কিংবা চিকিৎসার প্রস্তুতি নেয়ার কথাই বলেন; আর ঢাকা চট্টগ্রামের বাইরে করোনা শনাক্তের পরীক্ষা শুরুর কথাই বলেন। সবখানেই কিন্তু আমরা এগিয়ে। এগুলো সবই করোনা থেকে রাজশাহীকে যতটা সম্ভব নিরাপদ রাখতে।”

সোমবার সন্ধ্যায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলছিলেন এসব কথা।

তিনি বলেন, “সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমরা এখনও ভালো আছি। কিন্তু আমরা কতোটা ভালো থাকবো, তা কিন্তু নির্ভর করবে আগামীতে আমরা সামাজিক সংক্রমন কতোটা ঠেকাতে পারবো।”

আলাপের সময় পাশেই ছিলেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের একজন পদস্থ কর্মকর্তা। সংবাদমাধ্যমে নাম পরিচয় প্রকাশে অনীহা তারও।

তিনি বলেন, “এখানে যখন একজন নার্সকে আইসোলেশনে নেয়ার হয়েছিলো, সেই সময় থেকেই আমাদের দিক থেকে আমরা প্রশাসনকে বলেছি কোয়ারেন্টিন ও সামাজিক দূরত্বের ক্ষেত্রে কঠোরতার কোনো বিকল্প নেই।”

মার্চের গোড়ার দিকের একটি ঘটনা তুলে ধরে ওই কর্মকর্তা বলেন, “সরকারিভাবে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে যেহেতু অনেকরকম বিষয় ও প্রস্তুতির প্রশ্ন আছে, সে কারণে আমরা কিন্তু শুরু থেকেই ভিন্ন প্রক্রিয়ায় রাজশাহীর সঙ্গে দূরপাল্লার যোগাযোগ বন্ধ করতে সক্ষম হই। কিন্তু এখন যে পরিস্থিতি তাতে সেটাও যথেষ্ট নয়। আমাদের ভালো থাকতে হলে পুরো জেলাটাকে বিচ্ছিন্ন করা হলো সবচেয়ে ভালো উপায়। আমরা সেটা সফলভাবেই করতে পারলেই পরিস্থিতি হয়তো নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবো।”

এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও কর্মকর্তার কথায় স্পষ্ট যে, তারা করোনা সংক্রমন ঠেকাতে সবাইকে বাসায় রাখতে কড়াকড়ি ও পুরো জেলাকে আপাতত বিচ্ছিন্ন করার মধ্যেই মূল সম্ভাবনা দেখছেন।

সোমবার (৬ এপ্রিল) রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক সমন্বয় সভা থেকে রাজশাহী জেলার প্রবেশদ্বার বন্ধ করার বিধিনিষেধ আরোপের সিদ্ধান্ত তাদের দুজনকেই আশান্বিত করেছে।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজের ভায়রোলজি বিভাগের প্রধান ডা. সাবেরা গুলনাহার জানিয়েছেন, এ পর্যন্ত তারা মোট ৯২টি নমুনা তাদের ল্যাবে পরীক্ষা করেছেন। রাজশাহী ছাড়াও বিভাগের অন্য জেলাগুলোর নমুনা এখানে আছে।

মেডিকেল কলেজের একটি সূত্র জানিয়েছে, এর মধ্যে বগুড়ায় আইসোলেশনে থাকা এক রোগীর নমুনা পরীক্ষায় তার মধ্যে করোনা সংক্রমন পাওয়া গেছে।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ডা. নওশাদ আলীর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমরা পরীক্ষার ফলাফল ঢাকায় পাঠিয়ে দিই। এখান থেকে আমাদের তথ্য দেয়ার সুযোগ নেই। তবে আমরা যতটা জানতে পেরেছে সেই আলোকে আপনাকে শুধু এটুকু বলতে পারি যে, আমাদের রাজশাহী জেলার অবস্থা এখনও অনেক ভালো।”

সরাসরি না বললেও অধ্যক্ষ ইঙ্গিত করেন, এখনও পর্যন্ত এই জেলার কেউ করোনা সংক্রমিত হিসেবে শনাক্ত হয় নি।

ঢাকায় স্বাস্থ্য অধিদফতরের যে পরিসংখ্যান, সেখান থেকেও এই তথ্যের সত্যতা মিলছে। যেসব জেলাগুলোতে আক্রান্ত রয়েছে, তার মধ্যে রাজশাহীর নাম নেই। যে ক্লাস্টারগুলো সংক্রমনের পরিধি তৈরি করেছে, তার সঙ্গে আপাতদৃষ্টিতে রাজশাহীর কোনো সম্পৃক্ততাও নেই।

সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশা বলেন, “এটাই এখন পর্যন্ত আমাদের রাজশাহীর জন্য একটা ভালো খবর। কিন্তু এই ভালোটাকে তো ধরে রাখতে হবে। সেই কাজটা আমাদের সবাইকে মিলেই করতে হবে। আমরা সেটাই করছি। আমরা সবাই মনে করেছি, এই সময়ে কিছুদিনের জন্য আমাদের রাজশাহীকে বাইরের অন্যসব জেলা থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা উচিত। সে কারণে আমরা তেমন সিদ্ধান্তই নিয়েছি। বাইরে থেকে যদি করোনা সংক্রমিত কারো আসা আমরা রোধ করতে পারি এবং আমরা যদি না যাই আর নিজেদের এলাকায় যদি সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে পারি, তাহলে আমাদের ভালো থাকার সম্ভাবনা আছে। বিশ্বের অভিজ্ঞতা আমাদের তাই বলছে।”

তিনি আরও বলেন, “আমি এবং মেয়র সাহেব (খায়রুজ্জামান লিটন) শুরু থেকেই প্রতিটি ক্ষেত্রে নিজেরা সম্পৃক্ত থেকেছি। কারণ এটা আমাদের এলাকা। আমরা জনগণের প্রতিনিধি। জনগণের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা আছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, একটি মৃত্যুও কাম্য নয়। আমরা সেই লক্ষ্যে আমাদের সর্বোচ্চটা দিয়ে রাজশাহীর মানুষকে ভালো রাখার স্বার্থে কাজ করছি। একই উদ্দেশ্যে আমাদের যদি কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হয়, সেটাও নিচ্ছি।”

অন্যদিকে রাজশাহীতে করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার জন্য আরো স্থান সংকুলান কীভাবে করা যায়, তা নিয়ে এখন থেকেই কাজ শুরু করেছেন সংশ্লিষ্টরা। সম্প্রতি রামেক হাসপাতাল পরিচালকের নেতৃত্বে চিকিৎসকদের একটি দল নগরীর একাধিক বেসরকারি হাসপাতাল ঘুরে দেখেছেন।

রামেক হাসপাতালের করোনা চিকিৎসায় গঠিত কমিটির আহ্বায়ক মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. আজিজুল হক আজাদ বলেন, “সেরকম পরিস্থিতি দেখা দিলে চিকিৎসার জন্য যেন আমাদের জায়গা নিয়ে সংকট তৈরি না হয়, সেজন্য আগে থেকেই আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি। আমরা রোগীদের সেবা দিচ্ছি, দেবো। কিন্তু আমাদের প্রথম লক্ষ্য হওয়া উচিত নিজেরা যাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করি সরকারি নির্দেশনা মানার। তাহলে আমরা ভালো থাকবো আশা করি।”

আলোকচিত্র মাহফুজুর রহমান রুবেল