।। নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী ও বিবিসি বাংলা, ঢাকা ।।

রাজশাহীতে একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ঘটা করে আয়োজন করে অনুদান প্রদান অনুষ্ঠান। অনুদান নিতে রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনে সমবেত হন কয়েকশ মানুষ। শেষাবধি ভিড় সামলাতে হিমশিম খাওয়া কর্তৃপক্ষ উদ্বোধনী অনুষ্ঠান বাতিল করে ঘরে ঘরে অনুদান পৌঁছে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু ততোক্ষণে পেরিয়ে গেছে প্রায় দেড়টি ঘণ্টা। করোনা সংক্রমন থেকে সতর্কতার অংশ হিসেবে সরকারের নির্দেশনার কোনোকিছুই এখানে মানা হয়নি। ঝুঁকিপূর্ণ এই ঘটনা শুক্রবার ঘটেছে রাজশাহীতে।

শুধু রাজশাহী নয়, সারাদেশে এমন দৃশ্য উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। করোনাভাইরাস দুর্যোগে বাংলাদেশে লকডাউনের মধ্যে কর্মহীন বা নিম্ন আয়ের মানুষকে ব্যক্তি, সংগঠনসহ বিভিন্ন পর্যায় থেকে যে ত্রাণ সহায়তা দেয়া হচ্ছে, তাতে কোনো সমন্বয় না থাকায় জনসমাগম বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অনেক অভিযোগ উঠছে। এমন সাহায্যকারিদের অনেকে বলেছেন, জনসমাগম এড়ানো সম্ভব হচ্ছে না।

তবে সরকার বলছে, এখন থেকে সারাদেশে স্থানীয় প্রশাসনের সাথে সমন্বয় করে তালিকার মাধ্যমে বাড়ি বাড়ি গিয়ে সাহায্য দেয়া না হলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

দেশে লকডাউনের মধ্যে দরিদ্র জনগোষ্ঠী বা নিম্ন আয়ের দেড় কোটির বেশি মানুষকে খাদ্য সহায়তা দেয়া প্রয়োজন বলে ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের হিসাবেই বলা হচ্ছে।

বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা, সংগঠন এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগে অনেকে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় নিজেদের মতো করে ত্রাণ দিচ্ছে।

রাজশাহীতে শুক্রবারের আলোচিত অনুষ্ঠানটির আয়োজক ছিলো ব্র্যাক। সংস্থাটির রাজশাহী অঞ্চলের কো-অডিনেটর ফারহানা বেগম জানান, ব্র্যাক আরবান ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের আওতায় তাদের সমিতির কর্মহীন ৩৭৫ সদস্যকে দেড় হাজার টাকা করে অনুদান দেয়ার জন্য অনুষ্ঠানটির আয়োজন করা হয়েছিলো। করোনা সতর্কতার সময় এমন অনুষ্ঠান আয়োজনের ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি দাবি করেন, এরকম পরিস্থিতি তৈরি হবে তা তারা আগে বুঝতে পারেননি। বিষয়টি অনুধাবন করে অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়।

রাজশাহীর সেই আলোচিত অনুদান প্রদানের ব্যানার

অনুষ্ঠানে অংশ নেয়ার কথা ছিলো রাজশাহী সিটি মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের। তিনি জানান, জনসমাগমের খবর পেয়ে তিনি সঙ্গে সঙ্গে অনুষ্ঠানটি বন্ধ করার কথা জানিয়ে দেন। পরে তিনি নিজে নগর ভবনে আয়োজকদের ডেকে ছোট পরিসরে কয়েকজনের হাতে অনুদান তুলে দিয়ে এর উদ্বোধন করেন।

রাজশাহীর সিভিল সার্জন ডা. এনামুল হক বলেন, ‘এসময় এ ধরনের কোনো অনুষ্ঠান না করার জন্য বারবার সবাইকে অনুরোধ করা হচ্ছে। লোকসমাগত এড়ানোর জন্য প্রয়োজনে বাড়ি বাড়ি গিয়ে সহায়তার কথা বলা হচ্ছে। তারপরেও এমন আয়োজন বিপদের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।’ 

ঢাকার বাড্ডা এলাকার বাসিন্দা শাহানা নার্গিস শিউলী আত্নীয়-স্বজন মিলে বাসার সামনেই দুস্থদের ত্রাণ দিচ্ছেন।

“আমার বাসার কাছে বস্তিতে অনেক মানুষ আছে, আর এখানে অনেক রিক্সা চালক আছে, যাদের এখন আয় নাই। আমরা নিজেরা একটা তালিকা করে আমাদের বাসায় সামনে তাদের এনে সাহায্য দিচ্ছি। জনপ্রতি দুই কেজি চাল, এক কেজি ডাল, আলু এবং লবণ এবং সাবান প্যাকেট করে দিচ্ছি।”

ব্যক্তিগতভাবে বা বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে ত্রাণ দেয়ার এসব আয়োজনে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অনেক জমায়েত তৈরি হচ্ছে।

সরকারের অনেক প্রতিষ্ঠানের পক্ষেও ত্রাণ সহায়তা দেয়ার ক্ষেত্রে জনসমাগম করা এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় না রাখার অনেক অভিযোগ রয়েছে।

ফলে করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা সম্ভব তো হচ্ছেই না, সেই সাথে সৃষ্টি হচ্ছে বিশৃঙ্খলা। এমন অনেক ছবি এবং খবর নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে।

রাজশাহী থেকে একজন এনজিও কর্মী দিল সেতারা চুনী বলছিলেন, সরকারের পক্ষ থেকে কোনো সমন্বয় না থাকায় বিশৃঙ্খলা তৈরি হচ্ছে।

“এভাবে দিতে গিয়ে জনসমাগম বেশি হচ্ছে। লোকজন একেবারে হামলে পড়ছে যা সামাল দেয়া যায় না। আসলে কোনো সমন্বয় নাই। ব্যক্তি, সংগঠন, সরকার সবাই দিচ্ছে, কিন্তু এসব বিচ্ছিন্নভাবে হচ্ছে। ফলে কেউ পাচ্ছে এবং কেউ একেবারে পাচ্ছে না। একটা বিশৃঙ্খলা হচ্ছে।”

ঢাকার দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ত্রাণ দেয়ার সময় বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি নিয়ে অনেক সমালোচনা হয়েছে।

ঢাকার একটি এলাকায় ত্রাণ নিয়ে ফিরছেন নিম্ন আয়ের মানুষ

এই সিটি করপোরেশনের বিদায়ী মেয়র সাঈদ খোকন বলেছেন, ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে বাসিন্দাদের মধ্যে নিম্নআয়ের তালিকা করে ঘরে ঘরে খাদ্য সাহায্য পৌঁছানো হচ্ছে।

তবে একইসাথে তিনি স্বীকার করেছেন, এর বাইরে দুস্থদের জড়ো করে সাহায্য দিতে গিয়ে তারা সমস্যায় পড়েছিলেন।

“আমাদের বিভিন্ন ওয়ার্ডের বাসিন্দাদের মধ্যে রিক্সা চালক এবং দিনমজুর যারা আছেন তাদের চিহ্নিত করা খুব কঠিন। সেজন্য বিভিন্ন রাস্তায় ট্রাফিক পুলিশের সহায়তা নিয়ে তাদের এক জায়গায় জড়ো করে সাহায্য দেয়া হয়।”

“তাদের সাহায্য দিতে গিয়ে একটা রিক্সা থেকে আরেকটা রিক্সার মধ্যে দূরত্ব থাকে। এটাও সত্য আমরা যখন আমরা আমাদের রিক্সা চালক ভাইদের দিতে যাচ্ছি, তখন অনেক ছিন্নমূল ও দুস্থ মানুষ জড়ো হয়ে যায়। অমরা তিন চারদিন আগে এরকম সমস্যার মধ্যে পড়ে গিয়েছিলাম। তখন সেই কার্যক্রম আমাদের বন্ধ করতে হয়েছিল।”

এমন নানা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সরকারএখন ব্যক্তি বা কোনো সংগঠনের নিজেদের উদ্যোগে জনসমাগম না করে তাদের সাহায্য সারাদেশে জেলা প্রশাসনের কাছে দেয়ার নির্দেশ দিয়েছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, “এটা সত্যি যে ব্যক্তিগত উদ্যোগে সাহায্য করতে গিয়ে সামাজিক দূরত্বটা আর বজায় রাখতে পারে নাই। যার কারণে কমিউনিটি সংক্রমণের শংকা বাড়ছে। এটা দেখার পর আমি নিজেই ডিসিদের কাছে এই ইনফরমেশন পাঠাই, এবং সেনাবাহিনীকে অনুরোধ করি তারা যেনো এটা তত্বাবধান করে।”

তিনি বলেন, “কোনো অবস্থাতেই যেন কোনো জনসমাগম করে ত্রাণ বিতরণ না করা হয়। জেলা প্রশাসকদের তত্বাবধানে গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত যে তালিকা হচ্ছে, সেই তালিকা ধরে জেলা প্রশাসন যেন সমন্বয় করে বাড়ি বাড়ি ত্রাণ পৌঁছে দেয়।”

তিনি উল্লেখ করেছেন, ব্যক্তি এবং বিভিন্ন সংগঠন সহ বেসরকারি উদ্যোগে ত্রাণ সহায়তা দেয়া হোক – সেটা সরকার চাইছে। কিন্তু সেই সহায়তা সরকারের সাথে সমন্বয় করে দিতে হবে।

Digiprove sealCopyright protected by Digiprove © 2020
Acknowledgements: বিবিসি বাংলা
All Rights Reserved