Loading...
উত্তরকাল > বিস্তারিত > মতামত > সম্ভাবনার নতুন সূত্র শ্রিংলার সফরে

সম্ভাবনার নতুন সূত্র শ্রিংলার সফরে

পড়তে পারবেন 3 মিনিটে

।। শিবলী নোমান ।।

ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের দায়িত্ব নেয়ার পর হর্ষবর্ধন শ্রিংলা যে তার প্রথম বিদেশ সফরের সূচিতে ঢাকাকে বাছবেন, তা অনেকের কাছেই পূর্বানুমিত। এর দুটো প্রেক্ষাপট আছে। একটি পুরোপুরি রাষ্ট্রীয় ও কূটনৈতিক। অন্যটি খানিকটা ব্যক্তিগত যোগাযোগকেন্দ্রিক।

দুদিক দিয়েই ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের এই বড়কর্তার প্রথম সফরস্থল হিসেবে এগিয়ে থাকার কথা ছিলো ঢাকা। এবং কার্যত সেটাই হয়েছে। দুদিনের এক সফর সেরে কদিন আগে তিনি ফিরেছেন দিল্লি।

এই সফরের শুরুর দিনেই বাংলাদেশে ভারতের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করে যাওয়া এই কূটনীতিক এক সেমিনারে মূল আলোচনাসূত্র উত্থাপন করেন। পরে কিছু প্রশ্নেরও জবাব দেন। সরকারি পর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক নানা বৈঠক ছিলো দুদিন তার। তবে সেসব নয়, আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে সেমিনারে উত্থাপিত শ্রিংলার আলোচনাসূত্রটি। আমার বিবেচনায় তার পুরো আলোচনায় খুবই বাস্তবভিত্তিকভাবে আগামীর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের গতিরেখা আঁকা হয়েছে। আমার মনে হয়েছে, দুদেশের সম্পর্কের অবশিষ্ট জটিলতা কাটাতে শ্রিংলা একটি সম্ভাবনার সূত্র ধরিয়ে দিতে চেয়েছেন, যা ধরতে পারা দুদেশের জন্যই ভীষণ জরুরি।

সেমিনারে উন্মুক্ত আলোচনা পর্বে এক সংবাদকর্মী তুলে আনেন তিস্তার জলবণ্টন চুক্তি ইস্যু। জানতে চান, কেন হচ্ছে না এবং কবে নাগাদ হতে পারে। জবাবে শ্রিংলা বলেন, “দুই দেশের মধ্যে সাতটি আন্তঃসীমান্ত নদীর পানি প্রবাহের হালনাগাদ তথ্য আমরা বিনিময় করেছি। এই তথ্যগুলোর সমন্বয় ত্বরান্বিত করতে হবে, যাতে পানিবণ্টন চুক্তি যত দ্রুত সম্ভব চূড়ান্ত করা যায়; সম্ভব হলে এ বছরই।”

তবে সেজন্য পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের ঐকমত্যের প্রয়োজনীতার কথা তুলে ধরে শ্রিংলা বলেন, ”আমাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থার মধ্যে কোনো চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার ক্ষেত্রে সবপক্ষের মতামত দরকার হয়। আপনাদের নিশ্চয়তা দিচ্ছি, যত দ্রুত সম্ভব এই বিষয়টির সমাপ্তি টানতে কাজ করছি আমরা।”

বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই মুহূর্তে একটি নেতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে অনেকেই তুলে আনেন তিস্তাকে। সেই ইস্যু নিয়ে সেমিনারে শ্রিংলা যে জবাব দিলেন, তা আশা জাগায় বটে। তবে তার এই জবাবের চেয়েও ইতিবাচক সূত্র লুকানো ছিলো তার মূল আলোচনায়। যেখানে শুধু তিস্তা নয়, সবগুলো অভিন্ন নদীর ক্ষেত্রে নতুন একটি কর্মপরিকল্পনার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

তিনি সেমিনারে তার মূল আলোচনায় বলেছিলেন, “আমাদের অভিন্ন নদীর পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে অনেক কাজ করা উচিত। তার সুযোগও রয়েছে। আমি জানি, আমাদের মত ঘনবসতির ও জীবিকার জন্য নদীর উপর নির্ভরশীল দেশে এই বিষয়টা কতটা নাজুক। এটা প্রমাণিত যে, ৫৪টি অভিন্ন নদীর পানির পরিবেশবান্ধব, টেকসই এবং ন্যায্য বণ্টন করার মধ্যেই আমাদের বৃহত্তর স্বার্থ নিহিত। আমি বলতে পেরে খুশি হচ্ছি যে, আমাদের দুই পক্ষই স্বীকার করে যে, অভিন্ন নদী বিষয়ে আমাদের আরও উন্নতির সুযোগ আছে এবং এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আগস্ট ২০১৯ থেকেই দু’পক্ষের মধ্যে সংলাপ শুরু হয়েছে। আমি আপনাদের আশ্বস্ত করছি যে, শুষ্ক মৌসুমে আমাদের পানিসংকটের সর্বোত্তম সমাধান খুঁজতে এবং আমাদের পানি ব্যবস্থাপনার মান উন্নয়ন করতে আমরা বদ্ধপরিকর, যেন এসব নদীগুলো আগামী প্রজন্মেও জীবিকার উৎস হয়ে থাকতে পারে।”

এরপরেই তিনি বলেন, “এজন্য বিভক্তি সৃষ্টি নয় বরং যা আমাদের বন্ধনকে দৃঢ় করবে সেসব বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে আমরা বাংলাদেশের উত্তর–দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় ভূমিকা রাখা নৌপথগুলোর নাব্য বৃদ্ধিতে একমত হয়েছি। আমরা আশুগঞ্জ ও জকিগঞ্জের মধ্যবর্তী কুশিয়ারা এবং সিরাজগঞ্জ ও দইখোয়ার মধ্যবর্তী যমুনা নদীর খনন কাজে একমত হয়েছি। এর এক তৃতীয়াংশ ব্যয় ভারত বহন করবে। সেই সাথে অভ্যন্তরীণ নৌ প্রটোকল সম্প্রসারণের পাশাপাশি আশুগঞ্জের মতো গুরুত্বপূর্ণ নদীবন্দরগুলোর উন্নয়নে যৌথভাবে কাজ করছি আমরা।” 

শ্রিংলার এই আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা তৈরি হয়। আমরা ভালোভাবেই জানি যে, কোনো দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কই ঢালাও নয়। কাজেই অভিন্ন নদীতে দুপক্ষেরই স্বার্থ আছে। সেই স্বার্থ প্রতিষ্ঠা ও তা নিশ্চিত করতে হলে যে উভয়পক্ষের অংশগ্রহণেই বর্তমান ও আগামীর জীবন-জীবিকা-ঘনিষ্ঠ কোনো একমুখি উদ্যোগ নেয়া জরুরি, তা বেশ স্পষ্ট তার আলোচনায়।

এবার তার আলোচনা থেকে একটু বেরিয়ে আমাদের নদীবাস্তবতার দিকে চাইলেও আমরা দেখতে পাবো, পর্যাপ্ত নাব্য থাকলে আমরা দেশিয় তো বটেই, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও নদীপথকে ব্যবহার করতে পারবো পুরোপুরিভাবে। এক্ষেত্রে একটি নদী যেমন বাংলাদেশের জন্য জরুরি, ঠিক ততোটাই ভারতের জন্যও জরুরি। নদীকেন্দ্রিক বাণিজ্য যদি পণ্যপরিবহনের খরচ কমায়, তাহলে তা দুপক্ষের জন্যই ভীষণ লাভজনকও বটে। আর লাভজনক কোনোকিছুর জন্য কারোই আন্তরিকতার কোনো ঘাটতি থাকতে দেখা যায় না!

শ্রিংলা তার এই সম্ভাবনার সমীকরণকে আলোচনার মধ্যেই একটি বাক্যে চিত্রিত করার চেষ্টা করেছেন, “আমাদের অংশীদারত্ব যখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে, তখন আমরা দুপক্ষই সমানভাবে অনুধাবন করতে পারব যে, আমাদের স্বার্থ অভিন্ন এবং এতে দুপক্ষেরই লাভ।”

ভারতের বিদেশ সচিব একই ইঙ্গিত দিয়েছেন তার আলোচনার আরেক অংশে। বলেছেন, “সরকার, ব্যবসা-বাণিজ্য, নাগরিক সমাজ এবং জনগণের মধ্যে সবচেয়ে নিকটতম সহযোগিতামূলক সম্পর্কে সৃষ্ট প্রক্রিয়ায় পারস্পরিক স্বার্থ থাকে। অন্যকথায়, একটা সত্যিকারের বিকশিত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক হচ্ছে যেখানে একপক্ষের স্বার্থ সংরক্ষিত না হলে অন্যপক্ষের স্বার্থ নষ্ট হবে। সে পর্যায়ে পৌঁছাতে হলে আমাদের একটা বিষয় বুঝতে হবে যে, আজকে আমরা একটা মধুর সমস্যার সম্মুখীন: যে গতিতে আমাদের সম্পর্ক বিকশিত হয়েছে তা আমাদের আশা এবং আমাদের সরকারের সক্ষমতা দুটোই ছাপিয়ে গেছে।”

পেশার খাতিরেই ভারতের সদ্য সাবেক বিদেশ সচিব বিজয় কেশব গোখলে ও তার উত্তরসুরি হর্ষবর্ধন শ্রিংলার সঙ্গে আমার একাধিকবার যোগাযোগের সুযোগ হয়েছে। পেয়েছি সাক্ষাৎকার নেয়ার সুযোগও। সেইসব অভিজ্ঞতার ঝুলি থেকে আমার ধারণা, হর্ষবর্ধন শ্রিংলা এই প্রতিবন্ধকতাগুলোকে খুবই গভীরভাবে অনুধাবনের কথা ঢাকায় তার আলোচনায় বলতে চেয়েছেন বারবার।

সম্পর্কের অনেকগুলো সমস্যা একে একে সমাধান করে এসেছে বাংলাদেশ-ভারত, সেই অভিজ্ঞতা থেকেও আশা খুঁজে পান শ্রিংলা। কিন্তু তার থেকেও তার আলোচনায় সবচেয়ে বেশি প্রকট হয়ে এসেছে তাগিদ, “আমাদের একটা দ্রুত ও বাস্তবসম্মত সমাধান খোঁজার প্রচেষ্টা চালাতে হবে।”

আশা করি, সেই প্রচেষ্টায় সম্ভাবনার যে নতুন সূত্রের দিকে ইঙ্গিত করে গেলেন, তা বাস্তবায়নে সামনে থেকেই ‍ভূমিকা রাখবেন খোদ সাউথব্লকের বড়কর্তা হর্ষবর্ধন শ্রিংলা। কারণ, যে সম্পর্কে উইন-উইন পরিস্থিতি যত বেশি সে সম্পর্কের বিচরণ ততো সচ্ছন্দ আর দীর্ঘস্থায়ী।

শিবলী নোমান একজন সংবাদকর্মী, লেখক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা

সবশেষ আপডেট

উত্তরকাল

বিশ্বকে জানুন বাংলায়

All original content on these pages is fingerprinted and certified by Digiprove
%d bloggers like this: