।। বার্টিল লিনটার ।।

জাতিগত যুদ্ধ, নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং সরকারের ধীর গতির কারণে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) অধীনে চীনের দক্ষিণপশ্চিম অঞ্চল থেকে মিয়ানমারের সহিংস উত্তরাঞ্চলের মধ্য দিয়ে ভারত মহাসাগর পর্যন্ত উচ্চ-গতির রেললাইন নির্মাণের বিষয়টি থমকে যেতে বসেছিল। 

তবে বেইজিংয়ের একটা বিকল্প পরিকল্পনা রয়েছে: মিয়ানমারের ইরাবতী নদী দিয়ে নিরাপদ বাণিজ্য রুট গড়ে তোলা। ২২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ জলপথ দেশের উত্তর থেকে দক্ষিণে চলে গেছে, বিশেষ করে যে দেশে সেভাবে আধুনিক সড়ক ও রেল যোগাযোগ গড়ে ওঠেনি। 

চায়না-মিয়ানমার ইকোনমিক করিডোরটি (সিএমইসি) বিআরআইয়ের একটি প্রকল্প, যেটার অধীনে ট্রেন, সড়ক ও বন্দর যোগাযোগ গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো সংকীর্ণ মালাক্কা প্রণালী এবং প্রতিযোগিতাপূর্ণ দক্ষিণ চীন সাগর এড়িয়ে চীন যাতে তাদের জ্বালানি ও পণ্য পরিবহন করতে পারে, কারণ এই দুই জায়গাতেই যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চীনে সঙ্ঘাতের আশঙ্কা রয়েছে। 

সে কারণে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বিআরআইয়ের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে মিয়ানমার। এক ট্রিলিয়ন ডলারের বিআরআইয়ের অধীনে বৈশ্বিক অবকাঠামোগুলো গড়ে তোলার যে পরিকল্পনা, সেটি বাস্তবায়িত হলে নতুন বিশ্ব ব্যবস্থা এবং নিরাপত্তা কাঠামোর কেন্দ্রে চলে আসবে চীন। 

ইরাবতী নদীর নিম্নাঞ্চলের ১৩০০ কিলোমিটার দিয়ে বাণিজ্যিক নৌযান চলাচল আগে থেকেই চলে আসছে। কাচিন রাজ্যের ভামো শহর থেকে শুরু করে এটা ভারত মহাসাগর পর্যন্ত চলে গেছে। 

সাম্প্রতিক কিছু রিপোর্টে বলা হয়েছে যে, ভামোতে বর্তমানে যে নদীবন্দর রয়েছে, তার চেয়ে আরও বেশ বড় বন্দর গড়ে তোলার জন্য উপযুক্ত জায়গার অনুসন্ধান ও জরিপ চালাচ্ছেন চীনের ঠিকাদাররা।

বহু বছর আগেই দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের ইউনান প্রদেশের বাণিজ্যিক কেন্দ্র রুইলি ও একই প্রদেশের সীমান্তবর্তী লুয়োজের মধ্যে হাইওয়ে নির্মিত হয়েছে, যেখানে বড় ধরণের বাণিজ্যিক প্রবাহের জন্য নতুন ফ্যাসিলিটিজ রয়েছে। 

লুয়েজে থেকে ভামো পর্যন্ত প্রায় ৭৫ কিলোমিটার জুড়ে এখন যে নুড়ি বিছানো ভাঙাচোরা সড়ক রয়েছে, সেখানে আধুনিক হাইওয়ে নির্মাণের বিষয়টি এখন বেইজিংয়ের শীর্ষ সিএমইসি প্রকল্পের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার পাচ্ছে। 

২০০২ সালের শেষের দিকে লুয়েজে বাণিজ্য ও ব্যবসার জন্য স্বীকৃত সীমান্ত পোস্ট হয়ে ওঠে। রুইলির বিপরীতে মিয়ানমারের মিউজ শহর এবং আরও কিছু সীমান্ত পোস্টও এ সময় সক্রিয় হয়। লুয়েজে থেকে ভামো পর্যন্ত সড়ক তখন ছিল ধুলিময় এবং এখন যে নুড়ির রোড রয়েছে, সেটিও চীনের সহায়তায় সে সময় তৈরি হয়েছিল। 

কিন্তু এই সাম্প্রতিককালে এসে চীন ইরাবতীকে কেন্দ্র করে আরও বড় ধরণের পরিকল্পনা গ্রহণ করছে। 

জানুয়ারিতে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সফরের সময় যে ৩৩টি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়, এগুলোর মধ্যে অনেকগুলোই হলো ইরাবতী বরাবর উন্নয়ন প্রকল্প। এবং এর মধ্যে নতুন নদী বন্দর ও এর সাথে সংযুক্ত হাইওয়েও রয়েছে। 

চীনের এই পরিকল্পনা আলাদাভাবে নতুন কিছু নয়। কারণ মিয়ানমারের ব্যবসা ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে নদীগুলো ঐতিহাসিকভাবেই বিরাট ভূমিকা পালন করে আসছে। 

দ্য ইরাবতী গত ডিসেম্বরে রিপোর্টে জানিয়েছিল যে, ইউনান-ভিত্তিক চীনা গবেষকরা সম্প্রতি মিয়ানমারে ঘন ঘন সফর করেছেন। এর মধ্যে ইরাবতী নদী সফরের বিষয়টিও ছিল। ‘মিয়ানমারের প্রাণসঞ্জিবনী এই নদীটিকে বাণিজ্য ও যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে তারা এই সফর করছেন”।

কাচিন রাজ্যের স্থানীয় সরকার এরই মধ্যে চীনা কোম্পানিকে লুয়েজে থেকে ভামো পর্যন্ত সড়ক উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দিয়েছে। তবে স্থানীয়দের অনেকে এই এলাকায় বড় ধরণের চীনা সহযোগিতার বন্দর প্রকল্প হতে দিতে রাজি নয়। 

ভামোর স্থানীয় এমপি জাউ থিন দ্য ইরাবতীকে বলেন যে, “কে ইরাবতী প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে, সেটার ব্যাপারে আমরা কোন সিদ্ধান্ত নিইনি। যেই এখানে বিনিয়োগ করুক, তাকে মিয়ানমার ইনভেস্টমেন্ট কমিশিনের নিয়ম নীতি মেনে চলতে হবে”।

তার মন্তব্যের মধ্য দিয়ে মিয়ানমারের অন্যান্য অঞ্চলের মানুষের মতামতের প্রতিধ্বনি হয়েছে, যে সব জায়গায় চীনা কোম্পানিগুলো সক্রিয়। ওই সব জায়গায় চীনা শ্রমিকদের আধিক্যের কারণে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ জন্ম নিয়েছে, সেখানে পরিবেশের অবনতি হয়েছে এবং স্থানীয়দের অবদান ও মানসিকতার ব্যাপারে একটা অবজ্ঞা তৈরি হয়েছে। 

বার্টিল লিনটার এশিয়া বিষয়ক বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচিত সুইডিস সাংবাদিক