।। বার্তাকক্ষ প্রতিবেদন ।।

ভাঙনের মুখে পড়েছে মুবিনুল হায়দার চৌধুরী ও শুভ্রাংশু চক্রবর্তীর নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)। ২০১৩ সালে এই নেতৃত্বই বাসদ (খালেকুজ্জামান) থেকে বেরিয়ে বাসদ মার্ক্সবাদী নাম দিয়ে দলের পথচলা শুরু করে।

সম্প্রতি মুবিনুল হায়দারের পক্ষ থেকে শুভ্রাংশু চক্রবর্তীসহ ১৬ জনকে বহিস্কারের ঘোষণা দেয়ার পর এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। ১৯৮০ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে দলটি এ নিয়ে পঞ্চমবারের মতো ভাঙনের মুখে পড়লো।

সোমবার কেন্দ্রীয় নেতা ফকরুল কবির আতিক স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (মার্কসবাদী) সাধারণ সম্পাদক মুবিনুল হায়দার চৌধুরী বলেন, “গত ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০ অনুষ্ঠিত কেন্দ্রীয় কার্যপরিচালনা কমিটির বৈঠকে নির্ধারিত ফোরামের ১৬ জন সদস্যকে দলবিরোধী কার্যকলাপ ও উপদলীয় চক্রান্তের অভিযোগে দল থেকে বহিস্কার করা হয়। একইসাথে দলবিরোধী চক্রান্তমূলক কার্যকলাপের অভিযোগে কেন্দ্রীয় কার্যপরিচালনা কমিটির সদস্য কমরেড শুভ্রাংশু চক্রবর্ত্তীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়া হয়।’

মুবিনুল হায়দার চৌধুরী বহিষ্কৃত দলের সদস‌্যদের সম্পর্কে বলেন, ‘বেশ কিছুদিন ধরে কমরেড শুভ্রাংশু চক্রবর্ত্তী উচ্চাকাঙ্ক্ষার বশবর্তী হয়ে চাইছিলেন, তিনি যে সাধারণ সম্পাদকের পরে সর্বোচ্চ নেতা হবেন, তার স্বীকৃতি দল দিক। স্বাভাবিকভাবেই বাসদের (মার্কসবাদী) মতো একটি মার্কসবাদী-লেনিনবাদী দলে এ ধরনের অমার্কসবাদী নীতি কার্যকর করা সম্ভব ছিল না। সে কারণে তাঁর প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। গত দুই বছর ধরে নানান বিষয়ে তিনি দলের ঘোষিত লাইন ও মূলনীতির বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন এবং দলের সকল শৃঙ্খলা ও নিয়ম-নীতি অগ্রাহ্য করে নিচের স্তরে ক্ষোভ-বিক্ষোভ ছড়াতে থাকেন। বহিষ্কৃত ১৬ জনের সঙ্গে চক্রান্তমূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়ে তিনি একটি অশুভ কোটারি গড়ে তুলেন। এই বহিষ্কৃত কমরেডদের কেউ কেউ ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন ২০১৩ সালে অনুষ্ঠিত দলের বিশেষ কনভেনশনে কেন্দ্রীয় কার্যপরিচালনা কমিটিতে স্থান না পেয়ে।’

দলের এই সদস‌্যদের বহিষ্কার ছাড়া অন‌্য পথ খোলা ছিল না বলে উল্লেখ করে বিজ্ঞপ্তিতে আরো বলা হয়, ‘বাসদ (মার্কসবাদী) বাংলাদেশের বুকে একটি যথার্থ মার্কসবাদী-লেনিনবাদী দল হিসেবে গড়ে উঠছে। গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার নীতি অনুসরণ করে দল কমরেড শুভ্রাংশু চক্রবর্ত্তী ও তাঁর সহযোগীদের আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে ঐক্য বজায় রাখার সমস্ত সুযোগ দেয়। অথচ সবরকম সুযোগ অগ্রাহ্য করে তাঁরা দলের শ্রেণিচরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলেন এবং বেপরোয়াভাবে দলের অভ্যন্তরে, বিশেষ করে নিচের স্তরে বলতে থাকেন যে, দল তার বিপ্লবী চরিত্র হারিয়েছে।  আরও এক পা এগিয়ে তারা দাবি করেন, দল যেহেতু আদর্শচ্যুত, সেহেতু কেন্দ্রীয় কমিটি ও দলকে ভেঙে দিতে হবে। এরপর দলের পক্ষ থেকে তাদের বহিষ্কার করা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না।

বিজ্ঞপ্তির শেষ দিকে মানুষের মুক্তির সংগ্রামে অবিচল থাকায় প্রত‌্যয় জানিয়ে মুবিনুল হায়দার চৌধুরী বলেন, ‘আমরা মনে করি, পার্টি নেতৃত্ব ও কেন্দ্রীয় কার্যপরিচালনা কমিটিকে খারিজ করে দলের অভ্যন্তরের পরিবেশ বিষিয়ে তোলা ও সামাজিক মাধ্যমে নানা নিম্নরুচির প্রচার শুধু বিপ্লবী দলের ক্ষেত্রে নয়, সামগ্রিক বাম আন্দোলনের জন্যও ক্ষতিকারক। বাসদ (মার্কসবাদী) মার্কসবাদ-লেনিনবাদ ও কমরেড শিবদাস ঘোষের চিন্তাধারা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে একটি সর্বহারা শ্রেণীর বিপ্লবী দল হিসেবে শোষিত-মেহনতী মানুষের মুক্তির সংগ্রাম পূর্বের মতোই অব্যাহত রাখবে।”

একই দিনে এক বিবৃতিতে শুভ্রাংশু চক্রবর্ত্তী বলেন, একটি বিপ্লবী দল গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষা ও অঙ্গীকার ব্যক্ত করে ২০১৩ সালে বাসদ (মার্ক্সবাদী) গড়ে উঠেছিল। কিন্তু মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদ ও শিবদাস ঘোষের চিন্তাধারার ভিত্তিতে দল গড়ে তোলার ঘোষিত নীতি অনুসরণ না করে দলের সাধারণ সম্পাদক কমরেড মুবিনুল হায়দার চৌধুরী ও তার অনুসারীদের আদর্শ-পরিপন্থী কর্মকাণ্ড দলকে গভীর সংকটের মুখে ঠেলে দেয়। এ পরিস্থিতিতে ১৬ জন নেতা বর্তমান কেন্দ্রীয় কার্যপরিচালনা কমিটি বিলুপ্ত করে অতীত সংগ্রামের পর্যালোচনা ও মূল্যায়নের ভিত্তিতে নতুন পার্টি-প্রক্রিয়া শুরু করার জন্য আহ্বান জানিয়েছিলেন।তিনি বলেন, এ নেতাদের আন্তরিক ও যৌক্তিক আহ্বান বিবেচনায় না নিয়ে তাদের উপলব্ধিজাত মতামতকে দলবিরোধী তত্পরতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এবং দলের অভ্যন্তরে মতাদর্শিক সংগ্রাম পরিচালনার সুযোগ রুদ্ধ করে দিয়ে সম্পূর্ণ স্বৈরতান্ত্রিক পন্থায় এ ১৬ জন নেতাকে বহিষ্কার করা হয়। তিনি এ বহিষ্কারদেশ প্রত্যাখ্যান করে দল গড়ে তোলার লক্ষ্যে ১৬ নেতার উদ্যোগের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেন।

১৯৮২ সালে আদর্শগত ও ব্যক্তি সম্পর্ককে কেন্দ্র করে বাসদ (মাহবুব) ও বাসদ (খালেকুজ্জামান) নামে দলটি দুই ভাগে বিভক্ত হয়। এরপর ২০০৫ সালে বাসদের ছাত্রসংগঠন সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের তৎকালীন সভাপতি নুরুল ইসলামসহ একটি বড় অংশের নেতারা বাসদ ও ছাত্রফ্রন্ট থেকে পদত্যাগ করেন।

২০১০ সালের জুলাই মাসে তৃতীয় বারের মতো বাসদের কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা আবদুল্লাহ সরকার (প্রয়াত), সাইফুর রহমান তপনসহ কয়েকজন নেতা দল ছেড়ে যান। যদিও পরবর্তীতে তারা অন্য কোনো দলে যোগ দেননি বা নতুন দল গঠন করেননি।

চতুর্থ দফা ভাঙনে ভারতের বাম রাজনীতির তাত্ত্বিক শিবদাস ঘোষকে কমিউনিস্ট আন্দোলনের আন্তর্জাতিক অথরিটি হিসেবে স্বীকৃতি না দেয়াসহ বেশকিছু কারণ দেখিয়ে ২০১৩ সালে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) থেকে মুবিনুল হায়দার চৌধুরী ও শুভ্রাংশু চক্রবর্ত্তীর নেতৃত্বে বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী বের হয়ে নতুন দল বাসদ (মার্ক্সবাদী) গঠন করে। এতে দুভাগে বিভক্ত হয় বাসদ (খালেকুজ্জামান) ও বাসদ মার্ক্সবাদী (মবিনুল-শুভ্রাংশু)।