Loading...
উত্তরকাল > বিস্তারিত > মতামত > বাংলাদেশ কীভাবে ভারতকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে

বাংলাদেশ কীভাবে ভারতকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে

পড়তে পারবেন 3 মিনিটে

।। করণ থাপার ।।

সত্যি বলতে, আমি হেনরি কিসিঞ্জারকে দায়ী করি। সত্তুরের দশকে তিনি বাংলাদেশকে “আন্তর্জাতিক ঝুড়ি” বলে অভিহিত করেছিলেন। সেই সময় নিশ্চিতভাবেই তা ছিলো। নিয়মিত হানা দেয়া বিধ্বংসী বন্যাগুলোর টেলিভিশন চিত্র বিষয়টি তুলে ধরে। কাজেই বিবরণও তেমনই ছিলো।

আজকের বাংলাদেশ একদমই আলাদা। বিশ্ব হয়তো এ নিয়ে তার মতামত বদলাতে সময় নিতে পারে। তবে আমরা যারা ভারতের মানুষ, তাদের সেই সত্তুরের দশকে ফেঁসে থাকার কোনো অধিকার নেই। যদিও গেলো সপ্তাহের শেষে আমাদের একজন কনিষ্ঠ মন্ত্রী এই কাজটিই করেছেন।

ওইদিন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জি কিশান রেড্ডি বলেছেন, “ভারত যদি তাদের নাগরিকত্ব দেয় তবে বাংলাদেশের অর্ধেক অংশ খালি হয়ে যাবে। নাগরিকত্বের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলে অর্ধেক বাংলাদেশি ভারতে চলে আসবেন।” তিনি যা বলেছেন তা অকূটনৈতিক, অপ্রত্যাশিত ও আপত্তিকর তো বটেই। এর বাইরেও রেড্ডি যে বাংলাদেশের সত্যিকারের অবস্থা সম্পর্কে অজ্ঞ, তা তার বক্তব্যে প্রকাশ পেয়েছে। সবচেয়ে খারাপ কথা, তিনি জানেন না যে, জীবনের মান নির্ধারণকারী সূচকের বেশিরভাগ নয়, তবে অনেকগুলোর ক্ষেত্রে ভারতের চেয়ে বাংলাদেশ অনেক ভালো আছে।

প্রথমত, বাংলাদেশের যে বৃদ্ধি আমরা ভারতে তা অর্জন করতে আরও দুই থেকে তিন বছর পেছনে আছি। আমরা শতাংশের নিচে পিছলে যাই, বাংলাদেশ ৮ শতাংশের ওপরে এগিয়ে চলে।

দ্বিতীয়ত, নির্মলা সিথারমন যখন ১৫ শতাংশ হারে কর্পোরেট ট্যাক্সের প্রস্তাব দিয়ে চীন ছেড়ে আসা বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার জন্য মরিয়া চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, তখন বাংলাদেশ সেই দুটি দেশের একটি, যারা সেই বিনিয়োগ পেয়েছে। ফলস্বরূপ, লন্ডন ও নিউইয়র্ক বাংলাদেশে তৈরি পোশাকে উদ্বেলিত হচ্ছে। তুলনায় লুধিয়ানা কিংবা তিরুপুরের উৎপাদিত কাপড় খুবই কম। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাংলাদেশের পণ্য রফতানি ডাবল ডিজিটে বৃদ্ধি পাওয়ায় কিংবা ভারতের দ্রুত হ্রাস পাওয়ায় অবাক হওয়ার কিছু নেই।

যাই হোক, অর্থনৈতিক পারফরম্যান্স বাংলাদেশকে ভারত থেকে আলাদা করার নিয়ামক হিসেবে কাজ করা ক্রমবর্ধমান পার্থক্যের একটি মাত্র অংশ। অন্যটি আরও বেশি প্রকট। বলতে গেলে, বাংলাদেশের জীবন ভারতের তুলনায় অনেক বেশি আকর্ষণীয়।

রেড্ডিকে কারও বলা উচিত যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদি নাগরিকত্বের প্রতিশ্রুতি দেয় তবে অর্ধেক ভারত তা লুফে নিয়ে চলে যাবে। আসলে, এটি আরও অনেক বেশি হবে।

শুধু চোখ মেলে দেখুন। বাংলাদেশে নারী-পুরুষের গড় আয়ু যথাক্রমে ৭৪ ও ৭১ বছর। ভারতে তা যথাক্রমে ৭০ ও ৬৭ বছর। আপনি যখন এই চিত্রটি ভেঙে ভেঙে তুলে ধরবেন, তখনই পার্থক্য আরও প্রকট হয়ে ওঠে।

প্রথমত, সন্তান নেয়ার কথা ধরা যাক। ভারতে প্রতি একহাজার সদ্যোজাতের মধ্যে ২২ দশমিক ৭৩ জন মারা যায়। বাংলাদেশে নবজাতক মৃত্যুর এই সংখ্যা হাজারে ১৭ দশমিক ১২। শিশুমৃত্যুর ক্ষেত্রে ভারত ২৯ দশমিক ৯৪, বাংলাদেশ ২৫ দশমিক ১৪। ৫ বছরের নিচের বয়সী শিশু মৃত্যুর সংখ্যা আমাদের হাজারে ৩৮ দশমিক ৬৯, ওদের ৩০ দশমিক ১৬।

এখন, নারীদের দিকে ফেরা যাক। বাংলাদেশে ১৫ বছরের বেশি বয়সী নারীদের ৭১ শতাংশ স্বাক্ষর। যেখানে ভারতে এই হার ৬৬ শতাংশ। বাংলাদেশে উৎপাদনশীল শ্রমে নারীর অংশগ্রহণ ৩০ শতাংশ, যা বাড়ছে। আমাদের তা ২৩ শতাংশ এবং দশ বছরে তা ৮ শতাংশ কমেছে।

সর্বোপরি, ভবিষ্যতের বিকাশ কীভাবে ঘটছে তা নির্দেশ করে এমন একটি সূচকের কথা বলি। ছেলে-মেয়েদের উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তির হার ভারতে দশমিক ৯৪ আর বাংলাদেশে ১ দশমিক ১৪। সীমান্তের অপর পার শুধু ভাল আছে, তা নয়, তারা এখন আরও ভাল হতে চলেছে। আর আমরা পিছনে পড়ে যাচ্ছি।

সুতরাং যখন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আবদুল মোমেন বলেন, “কিছু ভারতীয় নাগরিক অর্থনৈতিক কারণে অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে”, তখন তিনি ঠিকই বলেছিলেন। লোকেরা তাদের জীবন উন্নতির জন্য মাইগ্রেশন করে এবং বাংলাদেশের জীবন স্থিরভাবে আরও ভাল বলে মনে হয়। আপনি যদি ভারতীয় মুসলমান হন। আপনি যদি মাংসের ব্যবসার জন্য শাস্তির ঝুঁকিতে পড়েন, হিন্দুর সঙ্গে প্রেমে পড়ার জন্য “লাভ-জিহাদে” অভিযুক্ত হন, অথবা যদি আপনি নাগরিকত্ব হারানোর ভয়ে থাকেন, তাহলে আপনি সহজেই অন্যপাড়ে পাড়ি দিতে প্রলুব্ধ হতে পারেন।

এই মুহূর্তে বিপরীত দিকে যাত্রার খুব বেশি একটা ঝোঁক থাকার কোনো কারণ নেই। আমি যে পরিসংখ্যানগুলি উদ্ধৃত করেছি সেগুলি বলে যে ভারতের আইনী নাগরিকের চেয়ে বাংলাদেশে বাসা বাঁধা অনেক বেশি আকর্ষণীয়।

একটা শেষ কথা। রেড্ডিকে কারও বলা উচিত যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদি নাগরিকত্বের প্রতিশ্রুতি দেয় তবে অর্ধেক ভারত তা লুফে নিয়ে চলে যাবে। আসলে, এটি আরও অনেক বেশি হবে। আর, ভালো কথা, বাস্তবতা কিন্তু এটাও যে, মার্কিন দুয়ার যে এখন খোলা নেই, তাও কিন্তু আমাদের ঠেকাতে পারছে না।

করণ থাপার ভারতের সাংবাদিক। জনপ্রিয় অনেকগুলো টেলিভিশন শো রয়েছে তার।

এই লেখাটি হিন্দুস্তান টাইমস থেকে অনূদিত।

সবশেষ আপডেট

উত্তরকাল

বিশ্বকে জানুন বাংলায়

All original content on these pages is fingerprinted and certified by Digiprove
%d bloggers like this: