Loading...
পড়তে পারবেন 2 মিনিটে

।। নজরুল ইসলাম তোফা ।।

পরিকল্পিত উন্নয়নের ছোঁয়াতে বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশ। বদলে যাচ্ছে- দেশের জনপ্রিয় ইতিহাস, ঐতিহ্যের তথ্য আদান-প্রদানের বৃহৎ  মাধ্যম ডাকঘর। বদলে গেছে চিঠির মাধ্যমে ভাবনা আদান-প্রদানের প্রচলন। চিঠির প্রচলন ও ইতিহাসটা ছিল অনেক পুরোনো। চিঠি অথবা পত্রের মাধ্যমে একজনের পক্ষ থেকে অন্যজনের কাছে লিখিত তথ্যধারক বার্তা বললেও ভুল হবে না। চিঠিতেই দুজন বা দুপক্ষের মধ্যেই যেন যোগাযোগ বজায় রাখে। বলাই চলে যে, বন্ধু এবং আত্মীয় স্বজনদের খুবই ঘনিষ্ট করে, পেশাদারি সম্পর্ককে খুব উন্নয়ন করে এবং আত্মপ্রকাশের সুযোগ প্রাণবন্ত করে তোলে। কিন্তু ‘ডিজিটাল সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে’ এসেই চিঠি লেখার পাট শেষের পথে। নিজ হস্তে চিঠি লেখার প্রচলন এখন নেই বললেই চলে।

কালি-কলম বা বল পেনের মাধ্যমেই চেয়ারে বসে ঠিক টেবিলের ওপর সাদাকাগজ কিংবা রঙিন কাগজে চিঠি আর কেউ লেখে না। বলতেই হয় যে আধুনিক যুগে উন্নত প্রযুক্তির ছোঁয়ায় কালের গর্ভে এ মাধ্যমের ব্যবহার বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে। স্ব-হস্তে লেখা চিঠির মধ্যেই হৃদয়ের শত সহস্র কথা ও তার আবেগ, আকুলতা এবং ব্যাকুলতা সব বিষয় প্রকাশ পেত। মা-বাবা তার সন্তানের হাতের লেখা চিঠিটা যখন কাছে পেত, ঠিক তখনই যেন লেখাটিতে কোমল হৃদয় দিয়ে পড়ে। চিঠির মধ্যেই বাবা মা নিজের সন্তানের মুখটাও দেখতে পেতো। অবচেতনে চিঠি বুকে জড়িয়েও আদর করে। প্রাচীন কাল থেকেই মানুষ চিঠি আদানপ্রদান করেছে। ইলিয়াডে, হিরোডোটাস ও থুসিডাইডিসের রচনাবলীতে তা উল্লেখ করাও আছে।

অশিক্ষিত মানুষরা শুধুমাত্র চিঠি পড়া ও লেখার জন্যেই যেন সাক্ষরতা অর্জনের খুব চেষ্টা করেছিল। সেই সময়ে সাক্ষরতা টিকিয়ে রাখার বিশাল অবদান ‘চিঠি’। আবার পারিবারিক চিঠিগুলো অনেক সময় খবরের কাগজের বিকল্প হিসেবেই যেন ব্যবহার করেছিল। কোনো চিঠিতে গ্রামের যেকোনো ঘটনা ও আশা ভরসার খবর, আবাদের খবর বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের খবরসহ বিভিন্ন খবর লেখা থাকত। আসলে, হাতে লেখা চিঠি পরিবারের মধ্যে যেন নিবিড় সম্পর্ক ও ভালোবাসার গভীরতার সেতুবন্ধন সৃষ্টি হতো। প্রেম ভালোবাসার চিঠিগুলো তো ছিল একেকটি কালজয়ী বৃহৎ প্রেমের ইতিহাস।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় চিঠিটা লিখেছিল নিউইয়র্কের ব্রুকলিনের একজন নারী তার প্রেমিককে। ১৯৫২ সালে কোরিয়াতেই যুদ্ধ চলাকালীন সময় লেখেন। তখন তার প্রেমিক মার্কিন সেনাবাহিনীর একজন যুদ্ধের সৈনিক ছিলেন। সেই চিঠিটার দৈর্ঘ্য ছিল ৩ হাজার ২০ ফুট লম্বা যা লিখতে সময় লেগেছিল একমাস। আবার ক্ষুদ্র চিঠি লিখেছিলেন ফ্রান্সের বিখ্যাত সাহিত্যিক ও ঔপন্যাসিক ভিক্টর হুগো।

চিঠির যুগে মানুষের ভাষাজ্ঞানের সীমাবদ্ধতা থাকলেও আন্তরিকতার বিন্দুমাত্র কমতি ছিল না। বানান ও ভাষাগত ভুলভ্রান্তি যেন চাপা পড়েছিল তাদের আন্তরিক ভালোবাসার আড়ালে।

জানা যায়, সম্রাট শের শাহের সময়েই ঘোড়ায় চড়ে ডাক বিলি প্রথা চালু হয়। কালক্রমেই জমিদারদের এমন প্রথা চালু ছিল। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের ৬৪টি জেলায় চিঠি আদান-প্রদানের প্রচলন দেখা দিয়েছিল। রানাররা পিঠে চিঠি বা সংবাদের বস্তা সহ ১ হাতে হারিকেন অন্য হাতে বর্শা নিয়ে রাতের অন্ধকারে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে ছুটে যেতো।

বর্তমানে দেশেই রয়েছে ৯ হাজার ৮৮৬টি ডাকঘর। এর মধ্যে বিভাগীয় ডাকঘরের সংখ্যা- ১ হাজার ৪২৬ ও অবিভাগীয় ডাকঘরের সংখ্যা ৮ হাজার ৪৬০টি। যেখানে কর্মরত ৩৯ হাজার ৯০৭ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী। আবার বিভাগীয় কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা ১৬ হাজার ৮৮৬ ও ভাতাপ্রাপ্ত বা অবিভাগীয় কর্মচারীর সংখ্যা- ২৩ হাজার ২১জন।

কালের পরিক্রমায় মোবাইল ফোন আর বহু যান্ত্রিক যোগাযোগের উন্নতির কারণে যে হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী এই চিঠি লিখন পদ্ধতি। হাতের লেখা চিঠির প্রচলন বর্তমানে না থাকলেও এখনো বহু মানুষ, পুরনো চিঠি পড়ে স্মৃতিরোমন্থন করে, খুঁজে পেতে চায় আপন মানুষগুলোর হার্দিক স্পর্শ। ব্যক্তিগত অনুভূতি মেশানো চিঠিগুলোতে থাকতো মনের গহিনে লুকানো ভাবাবেগ, উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা বা আনন্দ বেদনার সাবলীল প্রকাশ যা অন্য কোনো মাধ্যমে এভাবে বলা হয়ে ওঠে না বা ব্যক্ত করা সম্ভব না।

এখন চিঠির যুগ বদলে এসেছে ইমো, ই-মেইল, এসএমএস, হোয়াটসঅ্যাপ, ফেইসবুক, টুইটারসহ নানা ধরনের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। সব শ্রেণীর মানুষ প্রয়োজনের তাগিদেই যেন ‘মুঠোফোন’ ব্যবহার করছে। তাছাড়াও ইন্টারনেট, চ্যাট, ই-মেইল, এসএমএস কিংবা ফেসবুকের মতোই আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে আর কাগজ-কলমে হাতে লিখে চিঠি আদান-প্রদান করছে না।

সবশেষ আপডেট

উত্তরকাল

বিশ্বকে জানুন বাংলায়

All original content on these pages is fingerprinted and certified by Digiprove
%d bloggers like this: