।। নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী ।।

অনিয়ম আর ‍দুর্নীতির গুরুতর সব অভিযোগ এখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আলোচনার কেন্দ্রে। বর্তমান প্রশাসনের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ নিয়ে যখন শিক্ষকদের একটি অংশ সরব হয়েছেন, তখনই আরেক অংশ অবস্থান নিয়েছেন এর আগের প্রশাসনের বিরুদ্ধে।

দুপক্ষই অনিয়ম আর দুর্নীতির বিরোধিতা করছেন। দাবি করছেন, এসবের তদন্ত ও বিচারের। কিন্তু দুপক্ষের চোখে অভিযুক্ত আলাদা। আর দুপক্ষই ক্যাম্পাসে আওয়ামী ও বামপন্থি শিক্ষক হিসেবে পরিচিত।

২০১৭ সালের গোড়ার দিকে তৎকালীন প্রশাসনের বিরুদ্ধে ঢাকায় গেস্ট হাউস ক্রয়ে দুর্নীতিসহ কয়েকটি অভিযোগ ওঠে। সে বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজ এ নিয়ে একটি সংবাদ সম্মেলন করতে গেলে আরেক অংশ তাতে বাধ সাধে।

সেই সময় সংবাদ সম্মেলনে আগ্রহী শিক্ষকদের অংশটি দাবি করেছিলো, তৎকালীন প্রশাসনপন্থি শিক্ষকদের বাধার মুখে পড়েছিলেন তারা।

সেই প্রশাসনের উপাচার্য অধ্যাপক মিজানউদ্দিনের মেয়াদ শেষে উপাচার্য হিসেবে অধ্যাপক আবদুস সোবহান দায়িত্ব পান। আর এর মধ্য দিয়েই প্রগতিশীল শিক্ষক ফোরামের দুই অংশের প্রশাসনপন্থি পরিচিতির পালাবদল ঘটে।

গত বছরের মাঝামাঝি সময় থেকেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান প্রশাসনের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠতে শুরু করে। এর মধ্যে সব থেকে আলোচিত হয় উপাচার্য অধ্যাপক আবদুস সোবহানের অবসর গ্রহণ ও ফিরে আসা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টি আচার্য রাষ্ট্রপতিকে অসত্য তথ্য প্রদানের অভিযোগ।

অক্টোবরে প্রশাসনের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগের আলোচনা আরও জোরেশোরে শুরু হয় উপউপাচার্য অধ্যাপক চৌধুরী মো. জাকারিয়ার সঙ্গে এক নিয়োগপ্রত্যাশীর টেলিফোন আলাপ ফাঁস হবার পর। অভিযোগকারীদের দাবি ছিলো, ফোনালাপে আসা টাকার প্রসঙ্গটি নিয়োগ বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত। আর উপউপাচার্যর পক্ষ থেকে অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করা হয়, নিয়োগপ্রত্যাশী চাকরিবাণিজ্যের সিন্ডিকেটের হাতে পড়েছেন এমন সন্দেহে তিনি ফোন করেছিলেন।

নতুন বছরের শুরুতেই দুর্নীতির আলোচনা নতুন মাত্রা পায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজের একাংশ উপাচার্য অধ্যাপক আবদুস সোবহানের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে ৩০০ পৃষ্ঠার দুর্নীতির অভিযোগ দিলে। বাঁধাই করা ঢাউস বই আকারের এই অভিযোগের ফিরিস্তিতে ১৭টি অনিয়ম দুর্নীতির কথা উল্লেখ করা হয়।

এসব অভিযোগে আছে, উদ্দেশ্যমূলক শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালার অস্বাভাবিক পরিবর্তন এবং দুর্নীতি করে নিজ কন্যা, জামাতাসহ বিভিন্ন বিভাগ ও ইনস্টিটিউটে কম যোগ্যদের নিয়োগ, বাড়ি ভাড়া নিয়ে দুর্নীতি, উপাচার্যের অবসর গ্রহণ, পুনরায় দায়িত্ব পালন এবং রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্যকে অসত্য তথ্য প্রদান, অধ্যাপক চৌধুরী মো. জাকারিয়াকে উপ-উপাচার্য নিয়োগ ও তাঁর নিয়োগবাণিজ্য, বিভিন্ন নিয়োগে স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতি, বিভিন্ন বিভাগে সভাপতি নিয়োগে অনিয়ম ও দুর্নীতি, উদ্দেশ্যমূলকভাবে অফিসার, সহায়ক ও সাধারণ কর্মচারীদের নিয়োগ নীতিমালার পরিবর্তন এবং গণহারে অযোগ্যদের অ্যাডহক নিয়োগদান, উন্নয়নে সমন্বয়হীনতা ও অর্থের অপচয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌন নিপীড়কদের দায়মুক্তি, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ইংরেজি বিভাগে এমএ পরীক্ষার ফলাফল পরিবর্তনের চেষ্টা।

এ ছাড়া মুক্তিযুদ্ধ প্রকল্প বাস্তবায়নে অনীহা, বাধা ও অবমাননা, দুষ্কর্মে সহযোগী না হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী সিরাজুম মুনিরকে নিপীড়ন ও বেআইনিভাবে প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি প্রদান, বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টারপ্ল্যানে তৈরি প্রকল্পে দুর্নীতি (শেলটেক), প্রশাসনে বিভাজন ও সমন্বয়হীনতা, শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নিপীড়ন ও অত্যাচার, নিয়োগবাণিজ্যের আদায়কারী, উপাচার্য প্রফেসর আবদুস সোবহানের প্রথম মেয়াদের অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগও তোলা হয়।

দুর্নীতিবিরোধী শিক্ষক সমাজের ব্যানারে অভিযোগকারী শিক্ষকরা আন্দোলন করে আসছেন বর্তমান প্রশাসনের বিরুদ্ধে। তাদের একজন অধ্যাপক এস এম আক্রাম উল্লাহ বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে রাবি উপাচার্যের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের তথ্য-উপাত্ত আমরা জমা দিয়েছি। আমাদের তৈরি তালিকায় এসব অভিযোগ ছাড়াও উপাচার্যের বর্তমান ও অতীতের বেশ কিছু অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার তথ্য-উপাত্ত রয়েছে।’

বর্তমান উপাচার্যর বিরুদ্ধে তাদের অভিযোগ জমা দেয়ার পর থেকেই প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজের আরেকটি অংশ অধ্যাপক মিজানউদ্দিন উপাচার্য থাকাকালে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় আনেন। তারা দাবি করেন, বর্তমান উপাচার্যর বিরুদ্ধে অভিযোগকারীরা বিগত প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের বাঁচাতে এমনটি করছেন।

বিগত প্রশাসনের আমলের দুর্নীতির বিচার দাবিতে তারা সম্প্রতি ক্যাম্পাসে মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচিও পালন করেছেন। তাদের একজন কম্পিউটার সাইন্স বিভাগের অধ্যাপক জাহিদুর রহমান বলেন, গত প্রশাসনের আমলে বুদ্ধিজীবী স্মৃতিফলক নির্মাণ, কফিশপ নির্মাণ, ঢাকাস্থ অতিথি ভবন নির্মাণে ভয়াবহ দুর্নীতি করলেও যাদের বিচার হয়নি; তারাই আজকে সুশৃঙ্খল একাডেমিক পরিবেশ নষ্ট করার উদ্দেশে প্রশাসনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তুলছে। এই দুর্নীতিগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান তিনি।

শাহ মখদুম হলের প্রাধ্যক্ষ আরিফুর রহমান বলেন, ‘বরাবরই দুর্নীতিপরায়ণ কিছু শিক্ষক নিজেদের দুর্নীতি ঢাকতে এই প্রশাসনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলছে। এর আগে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলনেও তারা বাধা দিয়েছে। এছাড়াও ক্যাম্পাসকে অস্থিতিশীল করার পাঁয়তারাও করছে তারা।’

এই দুই শিক্ষকের দাবি, গত প্রশাসনের আমলে স্মার্টকার্ড দেওয়ার নাম করে কোটি কোটি টাকা নাই হয়ে গেছে। আজ পর্যন্ত স্মার্টকার্ডের কোনোরকম ব্যবহার ও উপকারিতা পায়নি শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। আর আজ যিনি দুর্নীতিবিরোধী শিক্ষকদের ব্যানারে প্রধান তার নামেও ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপে প্রায় পৌনে এক কোটি টাকা অনিয়মের অভিযোগ আছে যা তদন্তাধীন।

ছাত্র শিক্ষক কেন্দ্রের পরিচালক অধ্যাপক হাসিবুল আলম প্রধান বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী খোঁজ-খবর নিয়েই বর্তমান উপাচার্যকে দ্বিতীয়বারের মতো উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। তার বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবেই ষড়যন্ত্রে করছে একটি মহল।’

যদিও এমন অভিযোগ মানতে নারাজ বর্তমান উপাচার্যর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উত্থাপনকারীরা। তাদের একজন অধ্যাপক সুলতানুল-উল ইসলাম বলেন, ‘আমরা কারো পক্ষ নিয়ে কারো বিরুদ্ধে কিছু করছি না। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতেই এসব অনিয়ম দুর্নীতির বিহিত চাইছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা বর্তমান উপাচার্যর বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ এনেছি, তার সপক্ষে প্রয়োজনীয় নথিপত্রও সংযুক্ত করেছি। কাজেই এখানে কোনো ভিত্তিহীন অভিযোগ তোলার সুযোগ নেই।’