।। শোবিজ প্রতিবেদন ।।

‘কাঠবিড়ালী’ নামটি সার্থক নয়, বরং ছবিটির নাম হতে পারতো ‘কাঠঠোকরা’। একটা সরল, সতেজ ভালোবাসার সম্পর্ককে পরকীয়া নামক কাঠঠোকরার খুঁটে খুঁটে নষ্ট করে ফেলার গল্প ‘কাঠবিড়ালী’।

এ ছবি প্রযুক্তি-বর্জিত বাংলার কোনও এক গ্রামের এক জোড়া মানুষের গল্প। এ গল্পে নৌকা আছে, ঢেউ আছে, নদী আছে, দু’কূল ভাসিয়ে তার বয়ে চলা আছে। জলের বুকে জাল ফেলে মাছ ধরা আছে। চোখ জুড়ানো সবুজ ক্ষেত আছে। ক্ষেতের শুকনো আইল ধরে ছুটে চলা আছে।

আরও আছে এক জোড়া চঞ্চল মন- হাসু আর কাজল! যারা রেললাইনে উড়ে বেড়ায় ডানা ছড়িয়ে। কাঠের পাটাতনের সেতুর নিচে দাঁড়িয়ে নাকে নাক ঘষে। পাটক্ষেতের নাভিতে বিছানা সাজিয়ে স্বপ্ন দেখে বাসরের। হাসু আর কাজলের প্রেমের বাগানে একটাই ছিল চোরকাঁটা, হাসুর সরলতা। কুলহীন, ধনহীন হাসু বড্ড বোকা। নিজের সামান্য জমিটুকুও কথার চিড়েতে ভিজে তুলে দেয় প্রতিবেশীর হাতে। রাত-বিরেতে গ্রামের পথে বিড়ি টেনে ঘুরে বেড়ায়। একমাত্র বন্ধু আনিসকে নিয়ে গ্রামের ঘিঞ্জি থিয়েটারে রগরগে সিনেমা দেখে। তার চালচুলোহীন জীবনে একমাত্র পুঁজি বলতে রূপসী কাজলের প্রেম।

তার দিকেও চোখ পড়েছিলো মাতবরের সবেধন পুত্রমণি আসগরের। বাবা কৌশলে তাকে সৌদি আরব পাঠিয়ে দিলে হাসু আর কাজলের সংসার সাজাতে আর কোনও বাধাই থাকে না। কাজল সুন্দরী হলেও লোভী নয়। মাকে নিয়ে তার অভাবের সংসার। গরিব, অপরিচ্ছন্ন, এমনকি ট্যারা হাসুকে বিয়ে করতে তার মন আটকায় না। সে পারতো আসগরের মতো লম্পটকে বিয়ে করে পায়ের ওপর পা তুলে খেতে। সে বেছে নিয়েছিলো ঘুঁটে কুড়োনির জীবন। ভেবেছিলো হাসুর ভালোবাসার জোয়ারে তার যৌবনের দু’কূল ভাসবে।

ভুল চোখে স্বপ্ন এঁকেছিলো কাজল। হাসু শুধু বৈষয়িক দিক থেকেই দেউলিয়া নয়, যৌবনের প্রারম্ভেই সে হারিয়ে ফেলেছে তার সামর্থ্য। নববিবাহিত স্ত্রীকে হাসু পরম আকর্ষণে জড়িয়ে ধরলেও তাতে কাজলের ‘রাতের ঘুম শেষ’ হয়ে যায়। হাসু বাজারের তেল-মালিশ কিনে এনেও বৈবাহিক সম্পর্কের শেষরক্ষা করতে পারে না। তার প্রেমের গাছে ততদিনে যে বাসা বেঁধে ফেলেছে আনিস নামের এক কাঠঠোকরা! অসুন্দরী, অক্ষম, অসুস্থ স্ত্রীর কাছে সুখ না পেয়ে যে সুখ খুঁজে বেড়ায় পরস্ত্রীর কাছে। কাজল ও আনিস এই দুই অতৃপ্ত শরীর গোপনে, গভীরে মিলে গেলে গ্রামের সজল প্রকৃতিতে এসে লাগে ইটভাটার গনগনে আগুনের আঁচ। কীভাবে একটা রোমান্টিক গল্প টানটান থ্রিলারের চেহারা নেয়, সেটুকু দর্শকরা দেখে নেবেন সিনেমা হলে গিয়ে।

‘কাঠবিড়ালী’ নির্মাতা নিয়ামুল মুক্তার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবি। প্রথম হাঁটতে গেলে একটা শিশু যেভাবে পড়ে গিয়েও খিল খিল করে হেসে ওঠে, মুক্তার ছবিতেও আছে এমনই এক নির্মাতা-শিশুর হোঁচট খাওয়া আনন্দ। গহিন, গ্রামীণ জীবনে রক্ত হিম করা রহস্য গল্প আমাদের রুপালি পর্দায় বিরল। আর সেই গল্প বলার ভঙ্গি যদি হয় প্রচলিত থ্রিলারের মেজাজ এড়িয়ে, তবে আমাদের মগজের মনিটরে ভেসে ওঠে দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমার থ্রিলার কাঠামো।

দক্ষিণের প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রেক্ষাপটে প্রচুর থ্রিলার ছবি হয়। সেসব গল্পের নায়ক দেখতে বদখত, কখনও কখনও নায়িকাও প্রচলিত অর্থে সুন্দরী থাকে না, কিন্তু অপরাধই হয়ে ওঠে সেসব গল্পের প্রধান চরিত্র। গ্রামের শান্ত, স্থির, নিস্তরঙ্গ জীবনে অপরাধের চোরা স্রোত কীভাবে বয়ে যায়, দক্ষিণের ছবিতে এমন গল্প দেখে আমরা অভিজ্ঞ হয়েছি। কিন্তু এ দেশের বড় পর্দায় এমন কোনও গল্প যে উঠে আসতে পারে, তা প্রথম ভেবেছেন নিয়ামুল মুক্তা। তার কাঁচা হাতে একটা বড় প্রয়াস তিনি নিয়েছেন। মুক্তার এই সাহসিকতা চোখে পড়ারই মতো।

মুক্তা তার ‘কাঠবিড়ালী’কে ঠিক ঠিক জায়গায় নিয়ে ফেলেছেন। অবারিত সৌন্দর্যের এক লীলাভূমিকে তিনি বানিয়েছেন তার গল্পের পটভূমি, যেখানে মানুষের চেয়ে প্রকৃতিই তার ক্যামেরায় আকর্ষণীয় হয়ে ধরা পড়েছে বেশি। এত আশ্চর্য সুন্দর সুন্দর লোকেশনে তিনি দৃশ্য ধারণ করেছেন, যা দর্শকদের হা করে গিলতে হয়েছে। লোকেশন নির্বাচনে নির্মাতা ছিলেন অনায়াস ও আন্তরিক; কিন্তু প্রকৃতির ঐশ্বরিক রূপে তিনি সংযম হারিয়েছেন।

প্রকৃতিকে গল্পের একটা চরিত্র হিসেবে দাঁড় করানোর বদলে বিজ্ঞাপনচিত্রের মতো চাকচিক্যময় ফ্রেমিং দিয়ে দর্শকদের আবিষ্ট করে রাখতে চেয়েছেন। বিশাল মাঠ, উঁচু গাছ, বর্ষার জল তার গল্পের পটভূমিকে দর্শকদের কাছে প্রতিষ্ঠিত করেছে, কিন্তু এই প্রকৃতিকে গল্পের গাঁথুনির সঙ্গে জুড়ে দিতে ব্যর্থ হয়েছেন নির্মাতা। অথচ নদীর পাড়ের কুঁড়েঘর, হেঁসেল, মেঠোপথ, রেলসেতু, এগুলো দৃশ্যের সৌন্দর্য বৃদ্ধি না করে হয়ে উঠতে পারতো একেকটি চরিত্র।