।। বিশেষ প্রতিনিধি, রাজশাহী ।।

বায়োইন্ডাস্ট্রিয়াল গবেষণার কাজ এগিয়ে নিতে রাজশাহীতে বিনিয়োগ করতে যাচ্ছে চীন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে প্রাথমিকভাবে কাজটি করছে চীনের হুয়াজং কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।

শনিবার (২৮ ডিসেম্বর) রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি লিয়াজোঁ অফিস খোলা হয়েছে, যেখান থেকে পরিচালনা করা হবে ‘সিনো-বাংলাদেশ বায়োইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ ইন্সটিটিউট’। এই ইন্সটিটিউটের তত্ত্বাবধায়নেই স্থাপন করা হবে একটি অত্যাধুনিক বায়োইন্ডাস্ট্রিয়াল গবেষণাগার।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জীব ও ভূবিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. নজরুল ইসলাম বলেন, “এই প্রকল্পে কত খরচ হবে আমরা এখনও জানি না। মিলিয়ন হতে পারে, আবার বিলিয়ন বিলিয়নও হতে পারে।”

ইন্সটিটিউট বাস্তবায়ন প্রকল্পের প্রধান সমন্বয়কারী ড. এম. মনজুর হোসেন জানান, চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিসিয়েটিভের (বিআরআই) অংশ হিসেবে নতুন এই উদ্যোগটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

তিনি জানান, ২০১২ সালে প্রথম হুয়াজং বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি হয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের। গেলো বছর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচারয অধ্যাপক আবদুস সোবহানের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল চীন সফরে গিয়ে বায়োইন্ডাস্ট্রিয়াল গবেষণাগার স্থাপনের বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া দেন। তারপর গত শনিবার হুয়াজং বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে ৬ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল এসে চূড়ান্ত চুক্তি সই করে।

প্রসঙ্গত, প্রকল্পটি শুরু হলে বিশ্বজুড়ে আলোচিত চীনের বিআরআই’র অংশ হিসেবে প্রথম কোনো প্রকল্পে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের কোনো মহানগরী সম্পৃক্ত হবে।

শনিবার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রকল্পের লিয়াজোঁ অফিস উদ্বোধেনের পর রোববার (২৯ ডিসেম্বর) চতুর্থ বিজ্ঞান ভবনে এ সংক্রান্ত একটি সেমিনার আয়োজন করা হয়।

সেমিনার শেষে সংবাদমাধ্যমে আলাপকালে হুয়াজং কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পেং নান জানান, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে তারা সমঝোতা চুক্তির আওতায় প্রথম ধাপে একটি বায়ো ইন্ডাস্ট্রিয়াল গবেষণাগার স্থাপন করতে চলেছেন। এই গবেষণাগারে দুপক্ষের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে কৃষি ও ওষুধ খাতের গবেষণা সম্পন্ন করা হবে। পরবর্তীতে এই গবেষণার আলোকে রাজশাহী অঞ্চলে এই দুই খাতে তাদের দেশের পক্ষ থেকে শিল্প স্থাপনে বিনিয়োগ করা হবে।

ড. এম. মনজুর হোসেন জানান, বায়োইন্ডাস্ট্রিয়াল গবেষণার আওতায় প্রাথমিক পর্যায়ে তারা কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের কৌশল নিয়ে গবেষণা করবেন। বিশেষত রাজশাহী অঞ্চলে উৎপাদিক আম ও টমেটোর পাল্প তৈরির ব্যাপারটিকে তারা গুরুত্ব দেবেন। গুরুত্ব পাবে বর্তমানে হাঁস মুরগী ও মাছের খাদ্য হিসেবে অ্যান্টিবায়োটিকের বদলে নতুন চীনা প্রযুক্তি প্রয়োগ। এর বাইরে তারা ফার্মাসিউটিক্যালস নিয়েও গবেষণা করবেন।

আইকিউভিআইএ নামের একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বলছে, ২০১৭ সালে ওষুধের বৈশ্বিক বাজারের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোক্তা ছিল চীন। ধারণা করা হচ্ছে, ২০২২ সালের মধ্যে দেশটির ওষুধের বাজার ১৪৫ বিলিয়ন থেকে ১৭৫ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়াবে।

ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, ২০১৫ সাল থেকে ওষুধশিল্পের স্থানীয় বাজারে আমূল পরিবর্তন আনতে কাজ শুরু করে চায়না ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (সিডিএ)। ক্রমবর্ধমান বয়স্ক নাগরিকদের কথা মাথায় রেখে প্রথমে দেশের বাইরে থেকে আনা উন্নত ওষুধগুলোর ছাড়পত্র দ্রুত দেওয়ার পদক্ষেপ নেওয়া হয়। কমিয়ে দেওয়া হয় আমদানি শুল্ক। এ ছাড়া স্থানীয় কারখানাগুলোর ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ কিছুটা শিথিল করা হয়েছিল।

এবার স্থানীয় ওষুধ উৎপাদনকারীদের জন্য ফের কঠোর নিয়মকানুন চালু করছে সিডিএ। এতে হয়তো অনেক চীনা কোম্পানি বন্ধও হয়ে যেতে পারে। তবে উন্নত মানের ওষুধ তৈরি করতে হলে গবেষণা বিভাগ জোরদার করতেই হবে। আর এই গবেষণাতেই মিলবে নতুন উদ্ভাবন। এক হিসাবে দেখা গেছে, বর্তমানে চীন তার মোট জিডিপির আড়াই শতাংশ খরচ করছে গবেষণায়।

এখন ওষুধসংক্রান্ত নানা লাইসেন্স চীন কিনতে শুরু করেছে। ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছর শুধু চীনা জৈবপ্রযুক্তি কোম্পানিগুলোই ১৬৪টি আন্তর্দেশীয় লাইসেন্স কেনার চুক্তি করেছে। পাঁচ বছর আগের হিসাব ধরলে এই সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি। এই চুক্তিগুলো প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি ডলারের।

বিদেশি স্টার্টআপগুলোতে বিনিয়োগের পরিমাণ দিনকে দিন বাড়াচ্ছে চীন। এর মধ্য দিয়ে দেশটি নতুন নতুন উদ্ভাবন করায়ত্ত করতে চাইছে, যাতে একই সঙ্গে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা যায়। ঠিক একইভাবে বিদেশি তথ্যপ্রযুক্তিগত স্টার্টআপেও চীন বিনিয়োগ বাড়িয়েছিল। এর মধ্যেই রাজশাহীতে নতুন এই গবেষণাগার স্থাপনের বিষয়টি সামনে এসেছে। এই অঞ্চলে শিল্প স্থাপন করলে বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারতেও পণ্য রফতানির সুযোগ আছে।

ড. মনজুর জানান, এসব গবেষণায় দুই দেশের অংশগ্রহণ থাকবে। পরবর্তীতে রাজশাহী অঞ্চলে এ সংক্রান্ত শিল্প স্থাপনে চীনাদের বিনিয়োগ আসবে বলে তারা আশা করেন।

পেং নান জানান, চীনের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান রাজশাহীতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আগ্রহী। সেক্ষেত্রে উন্নত গবেষণার বিষয়টি তারা প্রাথমিক পর্যায়ে নিশ্চিত করতে চান।

তারা এই গবেষণাগার স্থাপন নিশ্চিত করতে এরই মধ্যে দুই দেশের সরকারি পর্যায়ে অংশীদারত্ব নিশ্চিত করতে আলোচনা শুরু করেছেন বলে জানান। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে তারা সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে রাজশাহী সিটি মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের সঙ্গে রোববার সাক্ষাৎ করেছেন। মেয়র লিটন এ ব্যাপারে পূর্ণাঙ্গ সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন।

আরও পড়ুন: চীনের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় থাকবে, আশাবাদ লিটনের