Loading...
উত্তরকাল > বিস্তারিত > ভূরাজনীতি > কীভাবে বন্ধুত্ব ও প্রভাব হারাতে হয়

কীভাবে বন্ধুত্ব ও প্রভাব হারাতে হয়

পড়তে পারবেন 3 মিনিটে

।। চারু সুদান কস্তুরি ।।

গেলো মাসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি শ্রীলংকা ও মালদ্বীপের প্রেসিডেন্টের সাথে বৈঠকে এবং প্রকাশ্য সভায় ‘নেইবর ফার্স্ট’ নীতির উপর জোর দিয়েছেন।

আলাদাভাবে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ পার্লামেন্টে বিরোধী দলের উদ্দেশে বলেছেন, নাগরিকত্ব (সংশোধনী) বিল নিয়ে তাদের সকল উদ্বেগের জবাব দিতে তিনি আগ্রহী।

যদিও বাস্তবে, যে তাড়াহুড়ার সাথে সরকার বিতর্কিত এই বিলটি পাস করেছে – যেখানে পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও বাংলাদেশ থেকে আসা অমুসলিম ধর্মীয় সংখ্যালঘুদেরকে ভারতের নাগরিকত্ব দেয়ার বিধান রাখা হয়েছে – সেখান থেকে এটা স্পষ্ট হয়ে গেছে যে প্রতিবেশীদের সাথে সম্পর্ক বা বিরোধী দলের উদ্বেগের বিষয়গুলো মোদি এবং শাহের কাছে কোন বিবেচনার বিষয় নয়। বরং, সরকার এমন আচরণ করছে, যেটা দক্ষিণ এশিয়া এবং এর বাইরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বন্ধু ও প্রভাব হারাতে ভূমিকা রাখবে।

বিলটি পার্লামেন্টের উভয় হাউজে পাস হওয়ার পর সারা দেশ জুড়ে এটার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ শুরু হয়েছে মূলত দুটি কারণে। অনেকের দৃষ্টিতে স্বাভাবিক নাগরিকত্বের উপর এখানে ধর্মীয় শর্ত আরোপ করা হয়েছে, এবং মুসলিমদের টার্গেট করে বৈষম্য তৈরি করা হয়েছে। ২০১৪ সালের ডিসেম্বরের আগে পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও বাংলাদেশ থেকে যে সব হিন্দু, খ্রিস্টান, শিখ, পার্সি, জৈন ও বৌদ্ধরা ভারতে এসেছে, তারা দ্রুত ভারতের নাগরিকত্ব পাবে, কিন্তু এ অঞ্চলে শিয়া, আহমদিয়া, হাজারা ও রোহিঙ্গা সম্প্রদায় মারাত্মক নির্যাতিত হওয়ার পরও তারা এ সুযোগ পাবে না। অন্যদিকে, আসামের বিক্ষোভকারী ও উত্তরপূর্বাঞ্চলের অন্যরা মনে করছে, এই আইনের ফলে ভবিষ্যতে এ অঞ্চলে অভিবাসীদের অনুপ্রবেশ আরও বেড়ে যাবে, যারা তাদের সম্পদ দখল করে নেবে।

ভারতের নতুন আইনকে ঢাকা তাদের সেক্যুলার আদর্শের সরাসরি সমালোচনা হিসেবে দেখছে

কিন্তু ভারতের সীমান্তের বাইরে দেখলে বোঝা যায় তিনটি ভিন্ন কারণে দ্রুত হতাশা ছড়িয়ে পড়ছে। ভারতের প্রতিবেশীদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বাংলাদেশ। নয়াদিল্লীর সাথে গত এক দশকে ঢাকার যে সম্পর্ক চলে আসছে, সেটা সন্দেহাতীতভাবে প্রতিবেশী প্রথম নীতির সাফল্যের বড় উদাহরণ। উভয়ে মিলে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ষাঁড়াশি অভিযান চালিয়েছে, যারা উভয় দেশের জন্যই ক্ষতিকর ছিল। দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবনীয় উন্নতি হয়েছে। পাকিস্তানের সন্ত্রাসবাদের রেকর্ড উন্মোচনে দুজনে পাশাপাশি থেকেছে, এবং কৌশলগত বন্দর ও রেলওয়ে প্রকল্পের ব্যাপারে অংশীদারিত্ব গড়ে তুলেছে। এরপরও সিএবিতে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ তোলা হয়েছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ২০১৪ সাল পর্যন্ত যে ৪৩ বছর অতিক্রম করেছে, তার মধ্যে ১৪ বছর শাসন করেছে বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার বাবা শেখ মুজিবুর রহমান। সে কারণে ভারতের নতুন আইনকে ঢাকা তাদের সেক্যুলার আদর্শের সরাসরি সমালোচনা হিসেবে দেখছে।

ভারতে বিল পাসের পর হাসিনার মিডিয়া উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, “পাকিস্তান আর আফগানিস্তানের সাথে আমাদের মিলাবেন না, যারা মৌলবাদ আর সন্ত্রাসবাদের জন্য পরিচিত। আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সবসময় বলে এসেছেন যে, আমাদের মাটি কখনও ভারতের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হতে দেয়া হবে না।”

ভারতের যখন অন্যান্য প্রতিবেশীদের সাথে সম্পর্ক ভালো যাচ্ছে না – নেপাল আর শ্রীলংকা চীনের ঘনিষ্ঠ হচ্ছে, আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ ঝুলছে আমেরিকান সেনা প্রত্যাহারের উপর, পাকিস্তানের সাথে ভারতের সম্পর্কে উত্তেজনা বিরাজ করছে – এ অবস্থায় বাংলাদেশের সাথে অস্বস্তিকর সম্পর্ক কোন সুফল নিয়ে আসবে না। আফগানিস্তানে ভারত সমাদর পেয়ে আসলেও নয়াদিল্লীতে নিযুক্ত কাবুলের রাষ্ট্রদূতও নাগরিকত্ব বিলের বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, যেখানে ইঙ্গিত রয়েছে যে কাবুল সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে বৈষম্য করছে।

তবে এটা শুধু পররাষ্ট্রনীতির ব্যাপার নয়, যেটার আগুন ভারতকে নেভাতে হবে। বহু বছর ধরে ভারতের ধারাবাহিক একাধিক সরকার জাপানকে উত্তরপূর্ব ভারতে বিনিয়োগের জন্য রাজি করানোর চেষ্টা করে আসছে। এ অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের পাশাপাশি চীনকে একটা বার্তা দেয়ার জন্য এ চেষ্টা করে আসছে তারা। প্রাথমিক পর্যায়ে অনীহা থাকলেও প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের অধীনে কিছুটা আগ্রহ দেখিয়েছিল জাপান। ডিসেম্বরের মাঝামাঝি গোয়াহাটিতে প্রথমবারের মতো বার্ষিক ভারত-জাপান সম্মেলন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেখানকার ব্যাপক বিক্ষোভের কারণে জাপান পরিস্থিতি পুনর্বিবেচনা করেছে। সম্মেলন স্থগিত করা হয়েছে। কারণ কোন বিনিয়োগকারীই রাজনৈতিক অস্থিরতা পছন্দ করবে না। উত্তরপূর্বাঞ্চল যদি আশি আর নব্বই দশকের সহিংসতা আর উত্তেজনার সময়ে ফিরে যায়, তাহলে এ অঞ্চলে জাপানের বিনিয়োগের আগ্রহ থাকবে না।

প্রশান্ত মহাসাগরের ওপারে ডোনাল্ড ট্রাম্পের অধীন যুক্তরাষ্ট্রকে মোদি সরকারের স্বাভাবিক মিত্র মনে হয়। কারণ ট্রাম্প তার মেয়াদের শুরু থেকেই বেশ কিছু মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের নাগরিকদের আমেরিকায় প্রবেশের উপর বিভিন্ন ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করে রেখেছেন। কিন্তু এইভাবে হিসাব করতে গেলে ভুল হবে। ট্রাম্প হলো দর কষাকষির মানুষ, এবং সিএবি নিয়ে মোদি সরকারের যে নড়বড়ে অবস্থা তৈরি হয়েছে, সেখানে তিনি ছাড় দিবেন না। তিনি বরং আরও বড় ছাড় দেয়ার জন্য ভারতকে চাপ দিবেন, সেটা বাণিজ্য বা প্রতিরক্ষা যে ক্ষেত্রেই হোক না কেন, আর ভারতকে সেখানে জাতীয় স্বার্থেও ছাড় দিতে হতে পারে।

চারু সুদান কস্তুরি নয়াদিল্লির দ্য টেলিগ্রাফ পত্রিকার সাংবাদিক। লেখাটি তার পত্রিকা থেকেই ভাষান্তরিত।

সবশেষ আপডেট

Advertisements
উত্তরকাল

বিশ্বকে জানুন বাংলায়

All original content on these pages is fingerprinted and certified by Digiprove
%d bloggers like this: